ভাঙ্গা হৃদয়ের চিৎকার

0
313
ভাঙ্গা হৃদয়ের চিৎকার
Print Friendly, PDF & Email

ভাঙ্গা হৃদয়ের চিৎকার

কাউসার আহমেদ

একই বিমানে চড়ে ভ্রমনে বের হয়েছিল তিন বন্ধু । এদের মধ্যে একজন আমেরিকান, একজন চাইনিজ ও একজন বাঙ্গালী। হঠাৎ করেই আমেরিকান ব্যক্তিটি তার গায়ে জড়ানো সুন্দর ব্লেজারটি খুলে জানালা দিয়ে বাহিরে ফেলে দিল। তা দেখে বাঙ্গালী ব্যক্তিটি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল -কী ব্যপার, এতো সুন্দর দামী ব্লেজারটি ফেলে দিলেন?
-আমাদের দেশে এগুলো পর্যাপ্ত পরিমানে পাওয়া যায়। আমেরিকান ব্যক্তির উত্তর ।
তাই দেখে চাইনিজ ব্যক্তিটিও তার দেশের মর্যাদা বাড়ানোর জন্য অনুপ্রাণিত হয়ে তার হাতের দামী ডায়মন্ডের তৈরী কলমটি জানালা দিয়ে বাহিরে ফেলে দিল। এবার বিস্ময়ের সাথে বাঙ্গালি ব্যক্তির প্রশ্ন-
– এতো দামি, মূল্যবান জিনিসটি ফেলে দিলেন?
– আমাদের দেশের এগুলো পর্যাপ্ত পরিমানে পাওয়া যায়। চাইনিজ ব্যক্তির উত্তর।
বাঙ্গালী ব্যক্তিটি তখন ভীষণ চিন্তিত। কি করা যায় ভেবে পাচ্ছিল না। হঠাৎ করেই সে এক ব্যক্তিকে ধরে জানালা দিয়ে বিমান হতে বাহিরে ফেলে দিল। অবাক হযে আমেরিকান ব্যক্তিটি বলল-
– এ কি করলেন!!! লোকটাকে বাহিরে ফেলে দিলেন?
– আরে ভাই , আমাদের দেশে এগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায়। বাঙ্গালী ব্যক্তিটির উত্তর।
উপরোক্ত কৌতুকটি হাস্য রসের সৃষ্টি করলেও, এটা শুধু নিছক হাসির জন্য লেখা হয় নি। এটার আসল উদ্দেশ্য হলো, আজকাল পর্যাপ্ত পরিমান এই জীবটিকে যেনতেন ভাবেই মেরে ফেলা হচ্ছে। কখনওবা আমরা শুনতে পাই, যৌতুকের জন্য খুন করছে। আর সবচেযে ভয়ঙ্কর হচ্ছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যারা নিছক জীবজন্তুর মতোই মেরে ফেলছে এই পর্যাপ্ত জীবটিকে।

আমেরিকান ও চাইনিজ ব্যক্তি দুজন তাদের দেশের মর্যাদা বাড়ানোর জন্যই হয়তো ঐ কাজগুলো করেছে। কিন্তু বাঙ্গালী ব্যক্তিটি যা করল, তা সত্যিই বাস্তব। হয়ত তা দেশের মর্যাদা বাড়াবে না, কিন্তু সত্য। ছোট্ট সুন্দর এই দেশটি প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। কিন্তু এই মানব সম্পদ আমাদের দেশে বোঝা হয়ে দাড়িয়েছে। এগুলো হয়তো কোন রচনার অংশ বিশেষ বলে মনে হচ্ছে। তাই এগুলো নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ। তদুপরি, মনে প্রশ্ন জাগে আমরা কি পেরেছি আমাদের ভবিষ্যৎ কর্ণধারদের জন্য সুন্দর একটা বাংলাদেশ গড়ে তুলতে? উত্তরটা অজানা। হয়ত পারিনি!!! পারিনি বলেই ব্যর্থতার দায়ভারটুকু নিতে হচ্ছে আমাকে, আমাদের সবাইকে।
সেদিন পত্রিকার একটি সংবাদ দেখে ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলাম। বাংলাদেশের লোকদের মাথাপিছু বার্ষিক আয় ১০০০ (এক হাজার) ডলার ছাড়িয়েছে। গর্ববোধ করলাম তারপরও এ দেশে মানুষ অনাহারে থাকে- ভিক্ষা করে। জীবিকার জন্য ভিক্ষা করে সেটা স্বাভাবিক কথা। কিন্তু যদি সেই ভিক্ষুকটি একটা ছোট্ট শিশু হয়? তবে তা হয়তো আমাদের জন্য একটু বেশিই লজ্জাজনক। মা তার সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছে ভিক্ষার থালা। যে হাতে এই বয়সে বই থাকার কথা। কিন্তু হায়! এখন অসহায় বাবা তার ছেলের হাতে ইট ভাঙ্গার জন্য হাতুরি তুলে দেয়। এখনও ধরিয়ে দেয় রিকশার হাতল।

মাথাপিছু হাজার ডলার আয়ের এই দেশ এখনও মানুষ রাতে ঘুমাবার একটু জায়গা পর্যন্ত পায় না। এখনও নবজাতক জন্ম নেয় বস্তিতে, রাস্তার পাশের ঝুপড়িতে অথবা কোন বড় পাইপের ভেতর। তারপর সেই নবজাতকটি বেড়ে উঠে নোংরা পরিবেশে। কিছু বুঝে উঠার আগেই তার হাতে তুলে দেয়া হয় আবর্জনা কুড়ানোর থলে। শুরু হয় তার অনিশ্চিত পথচলা। এই শিশুটিই হয়তো হতে পারতো একজন ডাক্তার, উকিল, ইঞ্জিনিয়ার অথবা সরকারী কর্মচারী। কিন্তু এখন সে কি হচ্ছে? সেটা না হয় সময়ের কাছেই প্রশ্ন রইল।
তবে এখন একটা সত্য ঘটনা বলে লেখাটা শেষ করব। একদিন আমি শাহবাগ হতে টি.এস.সি এর দিকে হেটে যাচ্ছিলাম। এরই মাঝে একটি ছোট্ট ছেলে হাতে কিছু লজেন্স নিয়ে আমার কাছে এসে বললঃ
– স্যার একটা লজেন্স নেন।
আমি ছেলেটিকে পাঁচ টাকার একটা নোট দিয়ে পাঁচটি লজেন্স কিনে নিলাম। ছেলেটি টাকাটা নিয়ে যাওয়ার সময় এক ভদ্রলোকের সাথে ধাক্কা লাগল। ভদ্র লোকটি ছেলেটিকে ঘাড় ধরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। ছেলেটি তার পড়ে যাওয়া লজেন্সগুলো কুড়িয়ে আবার পথ চলা শুরু করল নতুন উদ্দীপনায়। যেন কিছুই ঘটেনি কিছুক্ষণ আগে।

ঘটনাটা বললাম এই জন্য যে আমাদের সমাজে কিছু ভদ্র, শিক্ষিত জানোয়ার আছে যারা মানবতাবোধ বোঝে না, নারীর সম্মান দেয় না, শিশুদের প্রাপ্য অধিকার দেয় না। আর আমরা যারা সাধারণ মানুষ ছোট্ট সেই ছেলেটির মতোই সবকিছু ভুলে যাই। ভুলে যাই অতীত , অতীতের সব অঘটন- অত্যাচার। আমার এই লেখা হয়তো খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না এই সমাজে। তবুও প্রার্থনা আজ চারদিকে পরিবর্তনের যে হাওয়া লেগেছে। তার সুফলটা যেন আমরা পাই। একটু একটু করে পরিবর্তন করি আমাদের নিজেকে- সমাজকে। গড়ে তুলি এক আলোকিত দেশ। ভেদাভেদ ভুলে একসাথে চলি। গড়ে তুলি সুন্দর সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ।

উৎসর্গঃ আমার প্রিয় বড়আপাকে, যে আমারআদর্শ ও আজীবন আমাকে অনুপ্রেরণা যোগাবে। আপা তোমাকে ভুলব না।

আরও জানুন » অসামাজিক »

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো তা আমাদেরকে অবশ্যই জানাবেন। আপনার মতামত আমাদের কাছে খুবই মূল্যবান। আপনি যদি আপনার নিজের লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ বা অন্য যেকোনো বিষয় বাঙালিয়ানা Magazine এ প্রকাশ করতে চান, তবে আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে আপনার লেখা প্রকাশে সচেষ্ট হব । আগ্রহীদের এই ইমেইল ঠিকানায় bangalianamagazine@gmail.com যোগাযোগের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হল । Copy করা কোন লেখা পাঠাবেন না। দয়া করে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আপনার পাঠানো লেখাটি অনলাইনে আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। যদি অনলাইনে আগে অন্য কোথাও আপনার লেখাটি প্রকাশিত হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সেটা প্রকাশ করতে পারব না। আমরা অরাজনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক এবং নিরপেক্ষ।
বিঃ দ্রঃ লেখাটি কোনরকম পরিমার্জন ব্যতিরেকে সম্পুর্ণ লেখকের ভাষায় প্রকাশিত হল। লেখকের মতামত, চরিত্র এবং শব্দ-চয়ন সম্পুর্ণই লেখকের নিজস্ব । বাঙালিয়ানা Magazine প্রকাশিত কোন লেখা, ছবি, মন্তব্যের দায়দায়িত্ব বাঙালিয়ানা Magazine কর্তৃপক্ষ বহন করবে না।

জন্ম ১৯৮৩ সনে নারায়ণঞ্জের ফতুল্লা থানার রসুলপুর গ্রামে। ছোট্ট মধ্যবিত্ত সুখি পরিবারের ৪ সদস্যের মধ্যে আমি ছোট। বাবা স্কুলশিক্ষক ছিলেন ও মা গৃহিনী। Bangladesh Institute of Science & Technology হতে বি.বি.এ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম.বি.এ শেষ করে বর্তমানে ইউনাটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংক লিমিটেড এ কর্মরত আছি।

Comments

comments