সিদ্দিকা কবীর চিরকাল এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র

0
163
সিদ্দিকা কবির
সিদ্দিকা কবির
Print Friendly, PDF & Email

কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন শুধু রান্না করে আর শিখিয়ে। এটি প্রমাণ করেছেন তিনি- সিদ্দিকা কবির। ব্যক্তিগত জীবনে একজন পুষ্টিবিদ ও শিক্ষিকা এই নারী অধিকারী ছিলেন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও গুনের।

তিনি বলতেন, ‘২০ বছর পর্যন্ত আমরা ইচ্ছামতো খেতে পারব। কিন্তু ২০ বছরের পর থেকে খাবারের বিষয়ে কিছুটা সতর্ক হয়ে যাওয়াই ভালো। চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের চলে যেতে হবে ডায়েট রুটিনে।’

ব্যক্তিগত পরিচয়

তাঁর জন্ম পুরানো ঢাকার মকিম বাজারে, ১৯৩৫ সালের ৭ মে। তাঁর পিতা মৌলভি আহমেদুল্লাহ , মাতা সৈয়দা হাসিনা খাতুন। ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসে সিদ্দিকা কবীর ব্যাংকার সৈয়দ আলী কবীরকে বিয়ে করেন।

তিনি সব সময় বলেন বিশ্রাম ও পরিশ্রম—দুটোকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি রাখতে হবে স্বাস্থ্যকর খাবার। রান্না একটা শিল্প। ভালো হলে সবাই প্রশংসা করে, এবং খারাপ হলে নিন্দাও কিছু কম জোটে না।

তিনি পছন্দ করতেন কম মসলা দেওয়া স্বাস্থ্যকর খাবার। দুধ-ভাত প্রায় প্রতিদিনের তালিকায় থাকত। যেকোনো ধরনের শাক, ছোট মাছ, নরম খিচুড়ি, থানকুনিপাতা দিয়ে ফলি মাছের ঝোল ভালোবাসতেন।

শিক্ষা ও চাকরি জীবন

সিদ্দিকা কবীর পড়াশোনা করেন প্রথমে ইডেন কলেজে। সেখান থেকে তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে ভর্তি হন ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় তিনি তৎকালীন পাকিস্তান রেডিওতে ঘোষক হিসাবে খণ্ডকালীন চাকরীতে যোগ দেন।

স্নাতক ডিগ্রী অর্জনের পরে প্রথমে ভিকারুন্নিসা নুন স্কুলে শিক্ষিকা হিসাবে কাজ করেন। এরপর তিনি ইডেন কলেজে গণিতের প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন।

এর পর তিনি ফোর্ড ফাউন্ডেশনের বৃত্তি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটি হতে ১৯৬৩ সালে খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি পান। যুক্তরাষ্ট্রে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভের পর দেশে ফিরে তিনি গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত হন। সেখান থেকে তিনি ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

লেখালিখি

সিদ্দিকা কবীর তাঁর “রান্না খাদ্য পুষ্টি” বইটির জন্য ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন।

বাংলাদেশের সর্বাধিক বিক্রিত বইগুলির মধ্যে এখন পর্যন্ত বইটি অন্যতম। বইটি প্রথম প্রকাশের সময় মুক্তধারা, বাংলা একাডেমী সহ অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থা এটি প্রকাশ করতে রাজী হয়নি, পরে এটি নিজ খরচে প্রকাশ করেন লেখিকা। প্রকাশের পর এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

১৯৮৪ সালে ইংরেজি ভাষায় একটি কারি রান্নার বই লিখেন। ১৯৮০ সালে লিখেন পাঠ্যবই খাদ্যপুষ্টি ও খাদ্য ব্যবস্থা।

যা স্নাতক পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো হয়। এছাড়া তিনি ১৯৯৭ সালে দৈনিক জনকণ্ঠে রসনা নামে কলাম লিখেন, যা পরবর্তীতে খাবার দাবারের কড়চা নামে প্রকাশিত হয়।

রান্না ও রান্নার অনুষ্ঠান

১৯৬৫ সালে সরকারি প্রতিষ্ঠান হতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রান্না শেখা শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি তদানিন্তন পাকিস্তান টেলিভিশনে “ঘরে বাইরে” নামে রান্নার অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করা শুরু করেন।

তবে তাঁর সবচাইতে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল এন টিভি তে সিদ্দিকা কবীর’স রেসিপি অনুষ্ঠানটি। এই একটি অনুষ্ঠান তাঁকে করে তুলেছিল বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এক অতি আপনজন।

বাংলাদেশকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে অধ্যাপক সিদ্দিকা কবীর ৩১ জানুয়ারি ২০১২-তে ঢাকার স্কয়্যার হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

বাংলাদেশের রন্ধনশিল্পে সিদ্দিকা কবীর চিরকাল এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হয়ে জ্বলবেন। রন্ধনবিদ অনেকেই আছেন, ভবিষ্যতে আরও হবেন। কিন্তু তিনি অতি পরিচিত মুখ হিসেবে রয়ে যাবেন বাংলার বুকে অদ্বিতীয় রন্ধনবিদ হিসেবে।

আরও জানুন » কাগজ দিয়ে তৈরি করুন নিজের ব্যবহারের জিনিস পত্র »

Comments

comments