গ্রামীণ জীবন

Print Friendly, PDF & Email

প্রিয় স্বদেশ, আমি তোমাকে আবার গড়ে তুলব,
যদি প্রয়োজন হয়, আমার জীবন দিয়ে গড়া ইট দিয়ে।
আমি স্তম্ভ নির্মাণ করব, তোমার ছাদ ধরে রাখার জন্য,
যদি প্রয়োজন হয়, আমার অস্থি দিয়ে।

সিমিন বেহবাহানি, ইরানী কবি

জীবন সংগ্রাম

ঢাকা থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে, ধামরাই’র শৈলান গ্রামে, আমাদের একটা টিনের ঘর, পেছনে একটু জায়গা, এবং ছোট্ট একটা পুকুর আছে । না, এটা কোনও বাগান বাড়ি নয় । সাধারণ একটা গ্রামের বাড়ি । সামনে দক্ষিনে একটা খাল । আমি এবং আমার স্ত্রী প্রায় প্রতি শুক্রবার ওখানে যাই । গত সপ্তাহে যেয়ে দেখি খালে পানি বেড়েছে এবং আমাদের সীমানা ছুই ছুই করছে । জমি যাতে ভেঙ্গে না যায়, তাই নালা তৈরি করে ভেতরের পুকুরের এবং খালের পানি সমান করি ।

আজও গিয়ে দেখি পানি আরো বেড়ে জমির প্রায় একফুট উপর পর্যন্ত হয়েছে । পুকুরে কিছু পোনা ছেড়েছিলাম তার বেশ অনেক গুলোই খালে ভেসে গেছে । বাকিগুলোকে রাখার জন্য পাশের কালামপুর বাজার থেকে নেটের মশারির কাপড় এনে বাঁধ দিতে হলো ।

 

অভিবাদন বাংলাদেশের গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের যারা প্রতিদিন এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন ।

দাও ফিরিয়ে অরণ্য লহ এ নগর

ঢাকা থেকে শৈলান গ্রামে যাওয়ার পথে নয়ারহাট ব্রিজ পার হয়ে প্রতি সপ্তাহে খানিকটা সময়ের জন্য যাত্রা বিরতি করি । রাস্তার পাশে কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ফল ও শাকসবজি নিয়ে বসেন । উদ্দেশ্য, তাঁদের কাছ থেকে কিছু কেমিক্যাল মুক্ত পণ্য কেনা । দেখতে কিছুটা অপরিষ্কার, এবড়ো থেবড়ো, কোথাও, কোথাও দাগযুক্ত এবং দ্রুত পচনশীল । কিন্তু রান্না করলেই স্বাদের পার্থক্য বোঝা যায় ।

আমাদের খাবার দাবার এর মানের এত দ্রুত অবনতি ঘটলো কেন? ফলে, মাছে ফরমালিন, সবজিতে বিষাক্ত রঙ; সবকিছুতেই ভেজাল, কীটনাশক আর রাসায়নিক সার ।এর কারন কি?

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে সন্দ্বীপ এর বাটাজোড়া গ্রামের বাজারে গেছি । দুধ বিক্রি হচ্ছে । হঠাৎ বাজারে একটা সাড়া পড়ে যায়, স্যানিটারি ইন্সপেক্টর এসেছে । লুঙ্গিশার্ট পরা একজন মাঝ বয়সী লোক, হাতে একটা লাক্টোমিটার । এক এক করে সব দুধের ঘড়ায় লাক্টোমিটার ডুবাচ্ছেন, মিটার দেখছেন । থেমে এক কিশোরকে বললেন, কি দুধে পানি দিছো নাকি? অ্যাঁয়, জি, না-হতবম্ব কিশোরের জবাব । আবার প্রশ্ন? কোথা থেকে পানি মিশাইছ? পুকুরের না চাপকলের? বাড়িতে চাপকল নাই, পুকুরের পানি- সরল স্বীকারোক্তি ।কি করবা এখন? খাইবা না গায়ে দিবা? দুধের প্রতি মায়া বশতঃ বলে খাব । কিছুটা খাবার পর আর পারে না । বাকি দুধটা মাথায় ঢেলে দেয়া হয় । খাদ্যে ভেজালের তাৎক্ষনিক শাস্তি । স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের কোনো অফিস ছিল না, পোস্ট অফিসের মাধ্যমে বেতন পেতেন । আজ যত্রতত্র সরকারি দফতর, বেশুমার কর্মকর্তা ও জন প্রতিনিধি । কিন্তু জনস্বার্থ দেখার কেউ নেই ।

তবে কি আমাদের অনগ্রসর অতীতই ভালো ছিলো?

 

অন্যের অধিকার

বর্ষাকাল গাছ লাগানোর সবচেয়ে ভাল সময়  । কিন্তু একটা সমস্যা  । আমরা একদিকে গাছ লাগাই, আরেক দিকে ছাগলে খেয়ে ফেলে । শহরে থাকি বিধায়, “পাগলে কি না বলে” তা অনেক আগেই জেনেছি । শৈলানে এসে “ছাগলে কি না খায়” তা টের পেলাম । গ্রামের মতো করে থাকব ভেবে কোনও সীমানা প্রাচীর দিই নাই । ছেলে বেলায় দেখেছি গরু বা ছাগলের গলায় একটা দড়ি বেধে এদের একটা খুঁটি মাটিতে পুতে বিচরণ করতে দেয়া হত,  যাতে করে অন্যের ফসল বা বাগানের ক্ষতি না করতে পারে । এখন মানুষের মতো গরু, ছাগল ও স্বাধীন – গলায় দড়ি বা খুঁটিতেআবদ্ধ নয় ।আগে এ ধরণের গরু, ছাগল কারো ক্ষেত বা ফসলের ক্ষতি করলে পশুকেখোঁয়াড়ে দেয়া হতো।খোঁয়াড় থেকে মালিককে কিছুটা জরিমানা দিয়ে পশু ছাড় করতেহতো। এখন খোঁয়াড় ও নেই । অগত্যা বাধ্য হয়ে প্রথমে সিনথেটিক কাপড়ের নেটের বেড়া, পরে কাজ না হওয়ায় বাঁশের বেড়া দিয়েছি। গিন্নী গরু, ছাগলের উপদ্রব থেকে বাঁচার জন্য আরো স্থায়ী ব্যবস্থার কথা ভাবছেন । আসলে শহরের মতো গ্রামে ও অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ অনেকটাই কমে গেছে।

২০১০ সালের অগাস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্ট অঙ্গরাজ্যে গেছি মেয়ের বিবাহোত্তর বউভাত এর জন্য । আমাদের বেয়াই এবং বেয়ান উডস্টকে তাঁদের এক বন্ধুর বিশাল এক খালি বাসায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন । আমাদের বাসায় উঠিয়ে দিয়ে চলে যাবার সময় বাড়ির চাবি চাইলাম ।বেয়াইন বললেন, “আমাদের এখানে তালাচাবির নিয়ম নেই। বাইরে যাবার সময় সামনের দরজা ভেজিয়ে দিলেই চলবে।” আমরা কিছুটা বিস্মিত, ঘর ভরতি জিনিষ । কি নেই ভেতরে? কেউ কারো সম্পত্তিতে অনধিকার প্রবেশ করছেনা!

বিশ্রাম নিয়ে বের হয়ে দেখি মেলা হচ্ছে। বেশ কিছু জায়গায় দেখলাম, পন্য আছে, দাম লেখা আছে, কিন্তু কোনো বিক্রেতা নেই । গ্রাহকরা পন্য কিনে, দাম অনুযায়ী, ডলার ওখানে রাখা বাক্সে রেখে পছন্দের পণ্য নিয়ে যাচ্ছে। ভাবা যায়?

এজন্যই বোধকরি দার্শনিক কবি ইকবাল বলেছিলেন, “আমি যখন পশ্চিমে যাই, ইসলাম দেখি – কিন্তু মুসলমান দেখিনা; আবার যখন পূর্বে ফিরে আসি, মুসলমান দেখি -কিন্তু ইসলাম দেখি না।”

 

পুরানো দিনের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষন

শৈলান গ্রামে শতবর্ষী, চুন সুরকি দিয়ে নির্মিত একটি ভারী সুন্দর মসজিদ আছে । মসজিদের সামনের দিক, মিনার, ও গম্বুজ, ভাঙা বাসন কোসন দিয়ে নিপুণভাবে চিত্রিত করা হয়েছে (ছবি দেখুন) । প্রধানতঃ প্রাচীন এ মসজিদটি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একজন সহপাঠী বন্ধুর গ্রামে উপস্থিতি, আমাকে এ গ্রামে টেনে আনে ।

মসজিদে পানি পড়ে এবং ভেঙে পড়তে পারে এ আশংকার কথা বিবেচনা করে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শফিউল বারীর অভিমত নেয়া হয় । তিনি পরিদর্শন করে মত দেন যে, মসজিদের বর্তমান কাঠামো আরো ত্রিশ/চল্লিশবছরের জন্য নিরাপদ । তবে তিনি ছাদ চুইয়ে পানি পড়া বন্ধ করার জন্য ‘বড়াল কেমিক্যালের’ পরামর্শ এবং সহায়তা গ্রহণ করতে বলেন । বড়াল কেমিক্যালের পরামর্শ এবং সহায়তায় ছাদ চুইয়ে পানি পড়া বন্ধ করা হয়েছে । কিন্তু সংখ্যা গরিষ্ট গ্রামবাসীর দাবী পুরনো মসজিদটি ভেঙে নতুন মসজিদ তৈরি করতে হবে । প্রয়োজনবোধে এজন্য তাঁরা মসজিদের ভূসম্পত্তি বিক্রি করতে আগ্রহী। কেউ কেউ রানা প্লাজার ন্যয় ট্রাজেডির সম্ভাব্যতার কথাও তুলে ধরেন । উল্লেখ্য, ইতোমধ্যেই মসজিদের কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে যা মুল স্থাপত্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

শুধু গ্রামে নয়, আমাদের দেশের সর্বত্র আমরা কেবল নতুন নির্মাণে আগ্রহী, মেরামতে অনভ্যস্ত, এবং সংরক্ষণের রীতিমত বিরোধী । তাই তো আমাদের রাস্তাঘাটের এ বেহাল দশা । আমাদের ঐতিহ্যের প্রায় অনেক স্মারকই সংস্কারের অভাবে বিলুপ্ত প্রায় ।অথচ আমাদের পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ এবং অন্যান্য পূর্ব সূরিরা, তাঁদের অস্বচ্ছল অবস্থার মধ্যে, কি কষ্টেই না এসব স্থাপত্যকর্ম সৃষ্টি করেছিলেন । আমরা কি পারি না পুরাতন অবয়ব ঠিক রেখে নতুন কিছু গড়তে?

আমাদের উত্তরাধিকার হিসেবে নতুন প্রজন্মকে দেখানোর জন্য কি কিছুই থাকবে না? আমরা কি দ্রুত একটি শেকড়হীণ জাতিতে পরিণত হতে যাচ্ছি?

 

কুরবানি

শৈলান গ্রামে কুরবানির পদ্ধতিটি সচরাচর আমাদের দেখা নিয়ম থেকে কিছুটা ভিন্ন । সাধারনতঃ দেখা যায় যে প্রত্যেকে নিজ নিজ বাড়ির আঙিনায় কুরবানি দিয়ে থাকেন । শৈলানে সবাই একসাথে নির্ধারিত স্থানে কুরবানি দিয়ে থাকেন । স্থানীয় মাদ্রাসার পাশে কুরবানির ব্যবস্থা করা হয় । শৈলানে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার বসবাস করে । সবাই মিলে এ বছর মোট ৩৪ টি গরু কুরবানি দেয়া হয়েছে । সবাই তাঁদের কুরবানির পশু এখানে নিয়ে আসেন । ব্যক্তিগত ব্যবস্থায় পশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো এবং মাংস কাটা হয় । পুরো প্রক্রিয়াটাই বেলা ১ টার মধ্যে শেষ হয়ে যায় । কুরবানির পর সবাই এক সাথে মিলে কুরবানির পশুর রক্ত এবং অন্যান্য বর্জ্য পরিষ্কার করে ফেলেন ।

মাংস কাটা শেষ হলে তা তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ ‘সমাজের’ জন্য রেখে দেয়া হয় । বাকী দুইভাগ কুরবানিদাতা নিজের বাড়ি নিয়ে যান । সমাজের জন্য সংগৃহীত সকল মাংস যারা কুরবানি দিতে পারেননি তাঁদের মধ্যে বিলি করা হয় । মাংস গ্রহিতারা আমাকে জানিয়েছেন যে তাঁরা পরিবার প্রতি ৬/৭ কেজি মাংস পেয়েছেন । শৈলানে অনুসৃত পদ্ধতির সুবিধা সমুহ হলোঃ কুরবানির আত্মত্যাগের মূলনীতি অনুসৃত হচ্ছে; গ্রামের সবাই কুরবানি ঈদের আনন্দের অংশিদার হচ্ছেন ফলে তাঁদের সামাজিক সম্পর্ক নিবিড় হচ্ছে; এক জায়গায় কুরবানি করার ফলে যত্রতত্র কুরবানির পশুর রক্ত এবং অন্যান্য বর্জ্য দেখা যায় না ।

শৈলান ছাড়াও, কাপাসিয়া ও শেরপুরের আরো বেশ কিছু গ্রামে এ ধরনের একসাথে মিলে কুরবানি, মাংস বিলি, কুরবানিরঁ পশুর রক্ত এবং অন্যান্য বর্জ্য পরিষ্কার করার পদ্ধতি প্রচলিত আছে ।

এটি একটি অনুকরণীয় পদ্ধতি বলে মনে করি । দেশের সর্বত্র, গ্রামীণ নেতৃত্ব উদ্যোগ নিলে এটি বাস্তবায়িত হতে পারে ।

আরও জানুন » কীর্তিনাশা: গল্প-১ “এরোপ্লেনের লাল আলো” »

ডঃ এম, ফাওজুল কবির খান, বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিসিওএল এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস এর প্রাক্তন অধ্যাপক। মাঝে, মাঝে, নিজের পছন্দমতো বিভিন্ন বিষয়ে লিখে থাকেন।

Comments

comments