অসামাজিক

0
352
ফয়সাল সাইফ রচিত ছোট গল্প অসামাজিক
ফয়সাল সাইফ রচিত ছোট গল্প অসামাজিক
Print Friendly, PDF & Email

অসামাজিক

ফয়সাল সাইফ

এই তো সেদিনও বায়োজিদের সাথে তাঁর বন্ধু সাদাফের মায়ের দেখা হয়েছিল। বায়োজিদ মহিলার সাথে কোনো কথাই বলেনি। এ নিয়ে তিনি ভারি বিরক্ত। বাসায় ফিরে সাদাফকে বলেছিলেন, বায়োজিদ ছেলেটা জানি কেমন। রাস্তা-ঘাটে দেখাটেখা হলে কথা বলে না।

জবাবে সাদাফ তাঁর মাকে বলেছিল, সে আসলে এমনি। নিজের মা-বাবার সাথেই খুব একটা কথা বলে না। রাস্তায় পরিচিত কারো সাথে দেখা হলে নিজে থেকে হাত বাড়িয়ে দেয় না। চোখে চোখ না পড়লে তো পাশ কাটিয়েই চলে যায়। এমনকি আমি হলেও।

কিছুদিন আগেও বায়োজিদ সত্যিকার অর্থেই অদ্ভুত একটা ছেলে ছিল। মানুষের সংস্পর্শে কম যেত। কম কথা বলত। বেশির ভাগ সময়ই বই পড়ে সময় কাটাত। তাঁর মধ্যে আবেগের চেয়ে পেশাদারী মনোভাব ছিল বেশি। মাঝে মাঝে তাঁর আচরণে মনে হতো সে যেন একটা যন্ত্র। যেকোনো কিছুর চেয়ে সব সময় সে তাঁর ব্যাক্তিত্বকে মূল্য দিত। সে জন্য অদ্ভুতভাবে নারীদের এড়িয়ে চলত। রাস্তায় হাঁটলে কোনো অপরিচিতার দিকে তাকাতো না। পরিচিত নারীদের সাথেও প্রয়োজনের বাইরে মেলামেশা করতো না। তাঁর চরিত্রের অনেক কিছুই এখনো বর্তমান। কিন্তু স্বভাব বিরুদ্ধভাবে সে পড়ে গেছে এক জনের প্রেমে। তাঁর নাম জিমা।

এখন কনকনে শীতের সময়। একটু আঁধার নামতেই চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায়। সারারাত জুড়ে শিশির কণা বর্ষিত হয়। সেই আলসে বর্ষণে সবুজ ঘাস আর গাছের পাতা ভিজে সিক্ত হয়ে থাকে। সকালে নতুন আলোর ঝলকানিতে কলেজ মাঠে ঘাসের বুক আঁকড়ে থাকা শিশির বিন্দুগুলোকে ছোট ছোট মুক্তোর দানা মনে হয়। এগুলো বরফের মতো ঠান্ডা থাকে। বায়োজিদ এসবের ওপর দিয়েই খালি পায়ে হাটে। নিজেতেই বুদ হয়ে সময়ে-অসময়ে হাসে। উত্তেজনায় কাঁপে। জোরে জোরে শ্বাস নেয়। তাঁর ভেতরের নাচন প্রজাপতিটা ক্ষণে ক্ষণেই সুরসুরি দিয়ে ওঠে। সে তখন নিজেকে সামলাতে না পেরে এসব কান্ডকীর্তি করে।

জিমা স্থানীয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসেবে নতুন যোগ দিয়েছে। বায়োজিদ এখন প্রতিদিনই দুইবার করে জিমার স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। গাছের আঁড়ালে দাঁড়িয়ে জিমাকে দেখে। জিমার প্রাণরসে ভরা তারুণ্য, হৃদয়কাড়া হাসি, রহস্যভরা চাহনী, তুষার শুভ্র গায়ের রং, স্পাইরাল কার্ল চুল; বায়োজিদের সবকিছুই ভাল লাগে। বন্ধুরা বলে, শুধু ভাল লাগলেই চলবে? জিমাকে বলতে হবে না সেই ভাললাগার কথা?

বায়োজিদ বুঝতে পারে, ঠিকই তো। জিমাকে বলতে হবে তাঁর ভাললাগার কথা, ভালবাসার কথা। কিন্তু সে তো বায়োজিদ; অন্য সবার চেয়ে আলাদা। নিজে থেকে এসব কথা জিমাকে বলা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। বায়োজিদ তাঁর ব্যাক্তিত্বের ভয়ে ভীতু।

একদিন হাঁটতে হাঁটতে কথার ফাঁকে বায়োজিদ সাদাফকে  জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা মানুষের জীবনে এমন কি আছে যাঁর জন্য সে তাঁর সবচেয়ে ভাললাগার জায়গাটাও ত্যাগ করতে পারে?

সাদাফ জানতে চায়, হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?

শুনলাম তোর বাবা নাকি তোকে অস্ট্রেলিয়া পাঠাতে চায়, তুই রাজি হচ্ছিস না।

হুম, না করে দিয়েছি। আমি এলাকা ছেড়ে কোথাও গিয়ে থাকতে পারব না।

আমিও পারব না। তাই ভেবেছি জীবনেও এলাকা ছেড়ে কোথাও যাব না। অবশ্য একটা জিনিসের জন্য যেতে পারি।

কি?

কি করে যে তোকে বলি… বায়োজিদ লাজুক হাসি হাসে। তারপর বলে, সেটা জিমাকে যদি কখনো পাওয়ার প্রশ্ন আসে। সে যেখানে চাইবে আমি সেখানেই যাব। তখন তাঁর ভাললাগাটাই হবে আমার ভাললাগা।

বাহ, এতদিনে গভীরতা বোঝা গেল। তা তুই জিমাকে সে কথা বলে ফেললেই তো হয়।

পারছি না তো।

না পারলে হবে?

মাঝে মাঝে জানিস কি মনে হয়?

কি মনে হয়?

জিমার বাবাকে গাড়ি দিয়ে হালকা একটা বাড়ি দিয়ে ড্রেনে ফেলে দেই।

কেন?

জিমাকেও একটা বাড়ি দিতে মন চায়।

সাদাফ হাসে, কেন?

তা ছাড়া তো জিমাকে জীবনেও বলতে পারব না।

নির্বোধ!

মনের কথা জিমাকে বলতে না পেরে বায়োজিদ সারাদিন এমন কত শত চিন্তা করে। সেসব শুনে তাঁর বন্ধুরা হাসে। কিন্তু এ পর্যন্তই। আর অগ্রগতি হয় না।

দিন, মাস, বছর যায়। ধীরে ধীরে জিমার প্রতি বায়োজিদের টান কমে আসে। আগের মত সে আর স্কুলের সামনে জিমাকে দেখতে যায় না। আবার বই নিয়ে পড়ে থাকে। নারীদের সংস্পর্শ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে। শুধু মাঝে মাঝে জিমার জন্য অপেক্ষা করে। এখন ভাবে জিমা নিজে এসেই তাঁকে ভালবাসার কথা বলবে। জানে এটা অলীক কল্পনা। তা জেনেও ব্যর্থ অপেক্ষা করে। কিন্তু সময় কারো জন্য চিরদিন অপেক্ষা করে বসে থাকে না। একদিন জিমার বিয়ে হয়ে যায়। তারপর কিছুদিনের মধ্যে চাকরী ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথে মেয়েটা বায়োজিদের জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়।

বায়োজিদের এসবে খুব একটা যায় আসে না। সে তাঁর নিজেকে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। সমাজের রীতিনীতির মধ্যে থেকে তাঁর জীবন অতিষ্ট। একটু নিজের মত করে নিশ্বাস নেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তাঁর মন তৃষ্ণার্থ। মানুষ অহরহ মিথ্যা কথা বলে, বায়োজিদ বলতে পারে না। সমাজের তালে তালে অভিনয় করতে পারে না। মানুষের সাথে তর্ক-বিতর্ক করতে পারে না। পরিবারের মানুষের সাথে মিশে পরিকল্পনা করতে পারে না। বাবার ব্যবসায় মন বসাতে পারে না। তাঁর মন শুধু নির্জন উপত্যকায় পাখা মেলে ঊড়তে চায়। কাছের মানুষজনকে বায়োজিদ জানায়, সে এখন তাঁদের কাছ থেকে দূরে গিয়ে একা বাস করতে চায়। অনেক আপত্তি সত্ত্বেও সবাই এক সময় রাজি হয়।

প্রায় ছয় বছর পর…

বায়োজিদ সৃষ্টিশীল ছেলে। সে এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় এক পত্রিকায় সিনিয়র সাব এডিটর হিসেবে কাজ করে। দার্শনিক সূলভ বই লেখে। সমাজে তাঁর লেখার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। কিন্তু এখনো সে একাই থাকে। নিজেই রান্না করে। পরিবারের সাথে খুব একটা যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করে না। মাঝে মাঝে মায়ের কথা মনে পড়লে, মাকে ফোন করে। দুই-একটা কথা বলে। তাঁর মধ্যে সৌজন্যবোধের ঘাটতি প্রকট। তাই মায়ের সাথে বেশিক্ষণ কথা বলার মত কথাও থাকে না তাঁর। মাকে অতৃপ্ত রেখেই ফোন রেখে দেয়। বরং শিশুদের মত ফিফা, পেসের আপডেট ভার্সনগুলো ইন্সটল করে খেলাতেই তাঁর যত আনন্দ।

কয়েকদিন হল আগের ফ্ল্যাট বদলে নতুন একটা ফ্ল্যাটে উঠেছে। চার তলায় তিন বেড রুম নিয়ে একাই থাকে। কাজের সময় কাজ করে, আর বাকিটা সময় টিভি দেখে, বই পড়ে, গেম খেলে কাটায়। জীবনে কারো প্রয়োজন মনে করে না। কিন্তু সমাজের মধ্যে বসবাস করে আর কত অসামাজিক থাকা যায়। নতুন ফ্ল্যাটে এসে বায়োজিদ আবিষ্কার করে এখানে তৃতীয় তলায় জিমা’রা থাকে। একদিন সিগারেট নেওয়ার জন্য বাইরে যাওয়ার পথে জিমার সাথে তাঁর দেখা হয়ে যায়। জিমা আর আগের মত নেই। শরীরে মেদ জমেছে। গালে মাংস বেড়েছে। তাছাড়া দুই সন্তানের জননী। আগের রূপ তাঁর অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বায়োজিদ তাঁকে পুরোপুরি চিনতে না পারলেও জিমা তাঁকে ঠিকই চিনতে পারে। নিজে থেকেই মেয়েটা ডেকে জিগ্যেস করে,

বায়োজিদ, কেমন আছেন?

বায়োজিদ একটু চোখ বড় করে তাঁর দিকে তাকাতেই জিমা হেসে বলে, আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি আপনাদের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা, জিমা।

ওহ, তাই তো। বায়োজিদ পুরোপুরিই চিনতে পারে। তারপর কিছুক্ষণের জন্য তাঁর ভেতর পুরোনো প্রেম জাগ্রত হয়ে উঠলেও সে নিজেকে সামলে নেয়। জিমার কদুর মত হাত আর বিকট শুভ্র মূখটার দিকে তাকিয়ে বায়োজিদ অদ্ভুত এক অস্বস্তি বোধ করে। তারপর একটু তাড়ার সাথে মৃদ্যু হেসে বলে, ভাল। আপনি কেমন আছেন?

এই তো স্বামী-সংসার নিয়ে ভালই দিন কাটছে। কোথায় যাচ্ছেন?

নীচেই, সিগারেট নেব। শেষ হয়ে গেছে।

বদ অভ্যাস! ছেড়ে দিলেই তো পারেন।

ভেবে দেখিনি। এর আগে আমাকে এটা ছাড়ার কথা কেউ কোনোদিন বলেনি।

যাইহোক, ভালই হল। এখানে আপনাকে প্রতিবেশী হিসেবে পেয়ে ভাল লাগছে।

আসলে কতটুকু ভাল হয়েছে? বায়োজিদ সেটা জানে না। কিন্তু সে যেহেতু নিজের মত থাকতেই বেশি পছন্দ করে, তাই জিমা তাঁর জন্য উঠকো একটা ঝামেলাই হবে।

শুক্রবার সন্ধায় বায়োজিদ রুমে বসে ফিফা-১৪ খেলছে। এমন সময় দরজায় বেল বাজতে শুনে। তারপর উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখে সেজেগুজে পরিপাটি এক সুন্দরী তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। সাথে একটা ছোট ছেলে। বায়োজিদ তাঁদের চেনে না। আগে কখনো দেখেওনি।

মেয়েটা অপ্রস্তুত হেসে খাঁকাড়ি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে। বলে, জিমা হাবিব আমার ভাবি। শুনেছি ভাবি এক সময় আপনাদের এলাকায় থাকতেন। পরিচিত হতে এলাম। আমি রিহানী। আইইউবিতে বিবিএ পড়ছি, ফোর্থ সেমিষ্টার। বসুন্ধরা রেসিডেন্সিয়ালে থাকি। ক্লাস না থাকায় মামাতো ভাই-ভাবিকে দেখতে চলে এলাম।

বায়োজিদ র্নিলিপ্ত ভঙ্গিমায় বলে, হুম ভাল।

জানি। ভেবেছিলাম এই অসময়ে আপনাকে পাওয়া যাবে না হয়তো।

হুম।

কি করছিলেন?

একটু বিনোদিত হচ্ছিলাম।

মানে?

বায়োজিদ তাঁর দেহের ভাষায় ল্যাপটপের স্ক্রিনটা ইশারা করে।

রিহানী সেদিকে তাকিয়ে ফুটবলারদের দেখে বলে, এই বয়সে?

হুম।

বায়োজিদের চেহারার অস্বস্তি দেখে রিহানী মিষ্টি হেসে জিগ্যেস করে, ভেতরে আসতে বলবেন না?

সেটা আপনার সিদ্ধান্ত।

বায়োজিদ দরজা ছেড়ে দিলে মেয়েটা ভেতরে প্রবেশ করে। রিহানী রুমটার চারপাশের দেয়ালের দিকে তাকায়। একদম খালি। কিছুই সাটানো নেই। তা দেখে সে বলে, আমি ভেবেছিলাম সাহিত্যিক মানুষ। দেয়ালে ঐহিত্যের সাথে সম্পর্কিত সুন্দর সুন্দর চিত্রকর্ম সাটানো থাকবে। কিছুই তো নেই দেখছি।

ঐহিত্য জাদুঘরে শোভা পায়। নিজের মধ্যে এটাকে ধরে রাখার কিছু নেই। অবশ্য কেউ যদি চায় ভিন্ন কথা।

আহ, তাই বুঝি? দার্শনিকদের কথা আমার খুব ভাল লাগে। দারুণ বলেছেন। বাসায় কেউ নেই?

নাহ।

সবাই বাইরে গেছে?

নাহ।

না মানে?

আমি একাই থাকি।

আপনার কেউ নেই?

আছে।

তাঁরা কোথায়?

এলাকায় থাকে।

কেন?

সবকিছু প্রকাশ করে দেওয়ার স্বাধীনতা নিজেরও থাকা উচিত নয়।

ওহ! সরি। আমি জানি এটাই আপনার দর্শন। আমি আপনার বই দুটো পড়েছি।

ধন্যবাদ।

বইয়ের আকারগুলো কি আর একটু ছোট হতে পারত না?

নাহ।

এমনিতেও যতটুকু আছে ঠিকই আছে, পারফেক্ট।

মানুষের কাজে কোনো পারফেকশন নেই।

সেটাও সত্যি। কিন্তু আপনি কি পারফেকশন আশা করেন না?

নাহ।

অদ্ভুত মানুষ তো আপনি। কেন?

আমি কে? কিইবা আমি?

বায়োজিদ, শুধুই বায়োজিদ। নাইবা হলেন কেউ বা কিছু।

আপনি দেখছি বুদ্ধিমতি।

বায়োজিদের মূখের প্রশংসাটা শুনে রিহানীর মূখ মুহুর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠে। বায়োজিদ তাঁর দিকে তাকানোর সাথে সাথে সে আরও বেশি লাল হয়ে যায়।

বায়োজিদ সেটা বুঝতে পারে। নার্ভাসনেস কাটানোর জন্য সে বলে, সরি। আমি আপনাকে এক কাপ কপি দিতে পারতাম। কিন্তু আমি যা খাই বা পান করি, সব অখাদ্য। আমার কোনো বোয়া নেই। বোয়ার ব্যাপারটা পছন্দও করি না। নিজেই রান্না করি। আমি সরি। আমি কখনোই কাউকে আপ্যায়ন করিনি।

না ঠিক আছে। আজ রাতে আপনি আমাদের সাথে খেতে পারেন। আমি ভাল রান্না জানি। সবাই খুব প্রশংসা করে। আপনার জন্য স্পেশাল কিছু রান্না করতে পারলে আমার ভালই লাগবে।

নাহ সরি। আমি কোথাও যেতে পছন্দ করি না।

এই তো মাত্র নীচ তলায়।

আমি জানি। জিমা হাবিবের সাথে একদিন সেখানেই দেখা হয়েছিল।

তাহলে আসছেন?

নাহ, আমি ওসব পছন্দ করি না। মোটেই না।

কি আশ্চর্য! কেন?

যাঁর যেভাবে ভাল লাগে তাঁর সেভাবেই থাকা উচিত। অবশ্য মানুষ থাকতে দিতে একেবারেই বাধ্য নয়।

অদ্ভুত তো।

এরপর তাঁদের মধ্যে আরও অনেক কথা হয়। রিহানী বায়োজিদ সম্পর্কে অনেকগুলো অদ্ভুত ধারণা নিয়ে রুমে ফিরে যায়। কিন্তু যখন জানে বায়োজিদের কোনো মনের মানুষ নেই, তখন এই অদ্ভুত মানুষটিকেই সে তাঁর মনের মানুষ হিসেবে ভাবতে থাকে। এরপর যে কয়দিন সে তাঁর ভাই-ভাবির বাসায় থেকে যায়, তার প্রতিদিনই সময়ে-অসময়ে বায়োজিদকে গিয়ে জ্বালাতন করতে থাকে। সরাসরি মনের কথাগুলো বলতে না পেরে কৌশলে নানা প্রশ্ন করে। ভাবখানা এমন যেন বায়োজিদ নিজেই ব্যাপারটা বুঝে নেয়। কিন্তু বায়োজিদ সেটা বুঝেও এড়িয়ে যায়। তাঁর ইচ্ছেই নয় কারো সাথে সম্পর্কে জড়ানো। ঝামেলার পথে এগুনো। আর রিহানী তো অনেক দূর।

কিন্তু রিহানীর স্বপ্ন এত ঠুনকো নয়। সে নাছোড় হয়ে বায়োজিদের নাম্বারটা সংগ্রহ করে। নিজেদের বাসায় ফিরে গিয়েও নিয়মিত বায়োজিদের সাথে ফোনে যোগাযোগ রাখে। ভাল-মন্দ খোঁজ খবর নেয়। বায়োজিদ বেশির ভাগ সময়ই ফোন ধরে না। কখনো কখনো ধরলেও বিরক্তি বোধ করে। কারণ তাঁর ভেতর আলগা রসবোধ নেই। আবার রিহানী সেসব বুঝলে তো?

ভালই চলছিল দুজনের মধ্যে খেলাটা। কিন্তু একদিন…

রিহানীর ছিল ভীষণ জ্বর। জেনেছিল ২রা নভেম্বর বায়োজিদ রেসিডেন্সিয়ালে আসবে। রিহানীর অনুরোধ ছিল সে যেন তাঁকে দেখে যায়। বায়োজিদ অপারগতা জানায়। রিহানী শেষে বলেছিল, বায়োজিদ এসে যেন অন্তত তাঁকে একটা ফোন দেয়। রিহানী নিজেই গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করবে। যেভাবেই পারে দেখা করবে। কিন্তু বায়োজিদ ফোন দেয়নি। বাধ্য হয়ে রিহানীই দিয়েছিল। বলেছিল যমুনায় থাকতে। সে আসছে…

কিন্তু যমুনায় এসে যখন বায়োজিদকে ফোন দেয়, বায়োজিদ জানায় সে চলে গেছে। তখন প্রচন্ড জ্বর গায়ে নিয়ে ফ্যাকাশে মূখে রিহানী শুধু এটুকুই বলতে পেরেছিল, ওহ, চলে গেছেন!

এই তো সেদিনও বায়োজিদের সাথে তাঁর বন্ধু সাদাফের মায়ের দেখা হয়েছিল। বায়োজিদ মহিলার সাথে কোনো কথাই বলেনি। এ নিয়ে তিনি ভারি বিরক্ত। বাসায় ফিরে সাদাফকে বলেছিলেন, বায়োজিদ ছেলেটা জানি কেমন। রাস্তা-ঘাটে দেখাটেখা হলে কথা বলে না।

জবাবে সাদাফ তাঁর মাকে বলেছিল, সে আসলে এমনি। নিজের মা-বাবার সাথেই খুব একটা কথা বলে না। রাস্তায় পরিচিত কারো সাথে দেখা হলে নিজে থেকে হাত বাড়িয়ে দেয় না। চোখে চোখ না পড়লে তো পাশ কাটিয়েই চলে যায়। এমনকি আমি হলেও।

কিছুদিন আগেও বায়োজিদ সত্যিকার অর্থেই অদ্ভুত একটা ছেলে ছিল। মানুষের সংস্পর্শে কম যেত। কম কথা বলত। বেশির ভাগ সময়ই বই পড়ে সময় কাটাত। তাঁর মধ্যে আবেগের চেয়ে পেশাদারী মনোভাব ছিল বেশি। মাঝে মাঝে তাঁর আচরণে মনে হতো সে যেন একটা যন্ত্র। যেকোনো কিছুর চেয়ে সব সময় সে তাঁর ব্যাক্তিত্বকে মূল্য দিত। সে জন্য অদ্ভুতভাবে নারীদের এড়িয়ে চলত। রাস্তায় হাঁটলে কোনো অপরিচিতার দিকে তাকাতো না। পরিচিত নারীদের সাথেও প্রয়োজনের বাইরে মেলামেশা করতো না। তাঁর চরিত্রের অনেক কিছুই এখনো বর্তমান। কিন্তু স্বভাব বিরুদ্ধভাবে সে পড়ে গেছে এক জনের প্রেমে। তাঁর নাম জিমা।

এখন কনকনে শীতের সময়। একটু আঁধার নামতেই চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায়। সারারাত জুড়ে শিশির কণা বর্ষিত হয়। সেই আলসে বর্ষণে সবুজ ঘাস আর গাছের পাতা ভিজে সিক্ত হয়ে থাকে। সকালে নতুন আলোর ঝলকানিতে কলেজ মাঠে ঘাসের বুক আঁকড়ে থাকা শিশির বিন্দুগুলোকে ছোট ছোট মুক্তোর দানা মনে হয়। এগুলো বরফের মতো ঠান্ডা থাকে। বায়োজিদ এসবের ওপর দিয়েই খালি পায়ে হাটে। নিজেতেই বুদ হয়ে সময়ে-অসময়ে হাসে। উত্তেজনায় কাঁপে। জোরে জোরে শ্বাস নেয়। তাঁর ভেতরের নাচন প্রজাপতিটা ক্ষণে ক্ষণেই সুরসুরি দিয়ে ওঠে। সে তখন নিজেকে সামলাতে না পেরে এসব কান্ডকীর্তি করে।

জিমা স্থানীয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসেবে নতুন যোগ দিয়েছে। বায়োজিদ এখন প্রতিদিনই দুইবার করে জিমার স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। গাছের আঁড়ালে দাঁড়িয়ে জিমাকে দেখে। জিমার প্রাণরসে ভরা তারুণ্য, হৃদয়কাড়া হাসি, রহস্যভরা চাহনী, তুষার শুভ্র গায়ের রং, স্পাইরাল কার্ল চুল; বায়োজিদের সবকিছুই ভাল লাগে। বন্ধুরা বলে, শুধু ভাল লাগলেই চলবে? জিমাকে বলতে হবে না সেই ভাললাগার কথা?

বায়োজিদ বুঝতে পারে, ঠিকই তো। জিমাকে বলতে হবে তাঁর ভাললাগার কথা, ভালবাসার কথা। কিন্তু সে তো বায়োজিদ; অন্য সবার চেয়ে আলাদা। নিজে থেকে এসব কথা জিমাকে বলা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। বায়োজিদ তাঁর ব্যাক্তিত্বের ভয়ে ভীতু।

একদিন হাঁটতে হাঁটতে কথার ফাঁকে বায়োজিদ সাদাফকে  জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা মানুষের জীবনে এমন কি আছে যাঁর জন্য সে তাঁর সবচেয়ে ভাললাগার জায়গাটাও ত্যাগ করতে পারে?

সাদাফ জানতে চায়, হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?

শুনলাম তোর বাবা নাকি তোকে অস্ট্রেলিয়া পাঠাতে চায়, তুই রাজি হচ্ছিস না।

হুম, না করে দিয়েছি। আমি এলাকা ছেড়ে কোথাও গিয়ে থাকতে পারব না।

আমিও পারব না। তাই ভেবেছি জীবনেও এলাকা ছেড়ে কোথাও যাব না। অবশ্য একটা জিনিসের জন্য যেতে পারি।

কি?

কি করে যে তোকে বলি… বায়োজিদ লাজুক হাসি হাসে। তারপর বলে, সেটা জিমাকে যদি কখনো পাওয়ার প্রশ্ন আসে। সে যেখানে চাইবে আমি সেখানেই যাব। তখন তাঁর ভাললাগাটাই হবে আমার ভাললাগা।

বাহ, এতদিনে গভীরতা বোঝা গেল। তা তুই জিমাকে সে কথা বলে ফেললেই তো হয়।

পারছি না তো।

না পারলে হবে?

মাঝে মাঝে জানিস কি মনে হয়?

কি মনে হয়?

জিমার বাবাকে গাড়ি দিয়ে হালকা একটা বাড়ি দিয়ে ড্রেনে ফেলে দেই।

কেন?

জিমাকেও একটা বাড়ি দিতে মন চায়।

সাদাফ হাসে, কেন?

তা ছাড়া তো জিমাকে জীবনেও বলতে পারব না।

নির্বোধ!

মনের কথা জিমাকে বলতে না পেরে বায়োজিদ সারাদিন এমন কত শত চিন্তা করে। সেসব শুনে তাঁর বন্ধুরা হাসে। কিন্তু এ পর্যন্তই। আর অগ্রগতি হয় না।

দিন, মাস, বছর যায়। ধীরে ধীরে জিমার প্রতি বায়োজিদের টান কমে আসে। আগের মত সে আর স্কুলের সামনে জিমাকে দেখতে যায় না। আবার বই নিয়ে পড়ে থাকে। নারীদের সংস্পর্শ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে। শুধু মাঝে মাঝে জিমার জন্য অপেক্ষা করে। এখন ভাবে জিমা নিজে এসেই তাঁকে ভালবাসার কথা বলবে। জানে এটা অলীক কল্পনা। তা জেনেও ব্যর্থ অপেক্ষা করে। কিন্তু সময় কারো জন্য চিরদিন অপেক্ষা করে বসে থাকে না। একদিন জিমার বিয়ে হয়ে যায়। তারপর কিছুদিনের মধ্যে চাকরী ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথে মেয়েটা বায়োজিদের জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়।

বায়োজিদের এসবে খুব একটা যায় আসে না। সে তাঁর নিজেকে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। সমাজের রীতিনীতির মধ্যে থেকে তাঁর জীবন অতিষ্ট। একটু নিজের মত করে নিশ্বাস নেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তাঁর মন তৃষ্ণার্থ। মানুষ অহরহ মিথ্যা কথা বলে, বায়োজিদ বলতে পারে না। সমাজের তালে তালে অভিনয় করতে পারে না। মানুষের সাথে তর্ক-বিতর্ক করতে পারে না। পরিবারের মানুষের সাথে মিশে পরিকল্পনা করতে পারে না। বাবার ব্যবসায় মন বসাতে পারে না। তাঁর মন শুধু নির্জন উপত্যকায় পাখা মেলে ঊড়তে চায়। কাছের মানুষজনকে বায়োজিদ জানায়, সে এখন তাঁদের কাছ থেকে দূরে গিয়ে একা বাস করতে চায়। অনেক আপত্তি সত্ত্বেও সবাই এক সময় রাজি হয়।

প্রায় ছয় বছর পর…

বায়োজিদ সৃষ্টিশীল ছেলে। সে এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় এক পত্রিকায় সিনিয়র সাব এডিটর হিসেবে কাজ করে। দার্শনিক সূলভ বই লেখে। সমাজে তাঁর লেখার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। কিন্তু এখনো সে একাই থাকে। নিজেই রান্না করে। পরিবারের সাথে খুব একটা যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করে না। মাঝে মাঝে মায়ের কথা মনে পড়লে, মাকে ফোন করে। দুই-একটা কথা বলে। তাঁর মধ্যে সৌজন্যবোধের ঘাটতি প্রকট। তাই মায়ের সাথে বেশিক্ষণ কথা বলার মত কথাও থাকে না তাঁর। মাকে অতৃপ্ত রেখেই ফোন রেখে দেয়। বরং শিশুদের মত ফিফা, পেসের আপডেট ভার্সনগুলো ইন্সটল করে খেলাতেই তাঁর যত আনন্দ।

কয়েকদিন হল আগের ফ্ল্যাট বদলে নতুন একটা ফ্ল্যাটে উঠেছে। চার তলায় তিন বেড রুম নিয়ে একাই থাকে। কাজের সময় কাজ করে, আর বাকিটা সময় টিভি দেখে, বই পড়ে, গেম খেলে কাটায়। জীবনে কারো প্রয়োজন মনে করে না। কিন্তু সমাজের মধ্যে বসবাস করে আর কত অসামাজিক থাকা যায়। নতুন ফ্ল্যাটে এসে বায়োজিদ আবিষ্কার করে এখানে তৃতীয় তলায় জিমা’রা থাকে। একদিন সিগারেট নেওয়ার জন্য বাইরে যাওয়ার পথে জিমার সাথে তাঁর দেখা হয়ে যায়। জিমা আর আগের মত নেই। শরীরে মেদ জমেছে। গালে মাংস বেড়েছে। তাছাড়া দুই সন্তানের জননী। আগের রূপ তাঁর অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বায়োজিদ তাঁকে পুরোপুরি চিনতে না পারলেও জিমা তাঁকে ঠিকই চিনতে পারে। নিজে থেকেই মেয়েটা ডেকে জিগ্যেস করে,

বায়োজিদ, কেমন আছেন?

বায়োজিদ একটু চোখ বড় করে তাঁর দিকে তাকাতেই জিমা হেসে বলে, আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি আপনাদের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা, জিমা।

ওহ, তাই তো। বায়োজিদ পুরোপুরিই চিনতে পারে। তারপর কিছুক্ষণের জন্য তাঁর ভেতর পুরোনো প্রেম জাগ্রত হয়ে উঠলেও সে নিজেকে সামলে নেয়। জিমার কদুর মত হাত আর বিকট শুভ্র মূখটার দিকে তাকিয়ে বায়োজিদ অদ্ভুত এক অস্বস্তি বোধ করে। তারপর একটু তাড়ার সাথে মৃদ্যু হেসে বলে, ভাল। আপনি কেমন আছেন?

এই তো স্বামী-সংসার নিয়ে ভালই দিন কাটছে। কোথায় যাচ্ছেন?

নীচেই, সিগারেট নেব। শেষ হয়ে গেছে।

বদ অভ্যাস! ছেড়ে দিলেই তো পারেন।

ভেবে দেখিনি। এর আগে আমাকে এটা ছাড়ার কথা কেউ কোনোদিন বলেনি।

যাইহোক, ভালই হল। এখানে আপনাকে প্রতিবেশী হিসেবে পেয়ে ভাল লাগছে।

আসলে কতটুকু ভাল হয়েছে? বায়োজিদ সেটা জানে না। কিন্তু সে যেহেতু নিজের মত থাকতেই বেশি পছন্দ করে, তাই জিমা তাঁর জন্য উঠকো একটা ঝামেলাই হবে।

শুক্রবার সন্ধায় বায়োজিদ রুমে বসে ফিফা-১৪ খেলছে। এমন সময় দরজায় বেল বাজতে শুনে। তারপর উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখে সেজেগুজে পরিপাটি এক সুন্দরী তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। সাথে একটা ছোট ছেলে। বায়োজিদ তাঁদের চেনে না। আগে কখনো দেখেওনি।

মেয়েটা অপ্রস্তুত হেসে খাঁকাড়ি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে। বলে, জিমা হাবিব আমার ভাবি। শুনেছি ভাবি এক সময় আপনাদের এলাকায় থাকতেন। পরিচিত হতে এলাম। আমি রিহানী। আইইউবিতে বিবিএ পড়ছি, ফোর্থ সেমিষ্টার। বসুন্ধরা রেসিডেন্সিয়ালে থাকি। ক্লাস না থাকায় মামাতো ভাই-ভাবিকে দেখতে চলে এলাম।

বায়োজিদ র্নিলিপ্ত ভঙ্গিমায় বলে, হুম ভাল।

জানি। ভেবেছিলাম এই অসময়ে আপনাকে পাওয়া যাবে না হয়তো।

হুম।

কি করছিলেন?

একটু বিনোদিত হচ্ছিলাম।

মানে?

বায়োজিদ তাঁর দেহের ভাষায় ল্যাপটপের স্ক্রিনটা ইশারা করে।

রিহানী সেদিকে তাকিয়ে ফুটবলারদের দেখে বলে, এই বয়সে?

হুম।

বায়োজিদের চেহারার অস্বস্তি দেখে রিহানী মিষ্টি হেসে জিগ্যেস করে, ভেতরে আসতে বলবেন না?

সেটা আপনার সিদ্ধান্ত।

বায়োজিদ দরজা ছেড়ে দিলে মেয়েটা ভেতরে প্রবেশ করে। রিহানী রুমটার চারপাশের দেয়ালের দিকে তাকায়। একদম খালি। কিছুই সাটানো নেই। তা দেখে সে বলে, আমি ভেবেছিলাম সাহিত্যিক মানুষ। দেয়ালে ঐহিত্যের সাথে সম্পর্কিত সুন্দর সুন্দর চিত্রকর্ম সাটানো থাকবে। কিছুই তো নেই দেখছি।

ঐহিত্য জাদুঘরে শোভা পায়। নিজের মধ্যে এটাকে ধরে রাখার কিছু নেই। অবশ্য কেউ যদি চায় ভিন্ন কথা।

আহ, তাই বুঝি? দার্শনিকদের কথা আমার খুব ভাল লাগে। দারুণ বলেছেন। বাসায় কেউ নেই?

নাহ।

সবাই বাইরে গেছে?

নাহ।

না মানে?

আমি একাই থাকি।

আপনার কেউ নেই?

আছে।

তাঁরা কোথায়?

এলাকায় থাকে।

কেন?

সবকিছু প্রকাশ করে দেওয়ার স্বাধীনতা নিজেরও থাকা উচিত নয়।

ওহ! সরি। আমি জানি এটাই আপনার দর্শন। আমি আপনার বই দুটো পড়েছি।

ধন্যবাদ।

বইয়ের আকারগুলো কি আর একটু ছোট হতে পারত না?

নাহ।

এমনিতেও যতটুকু আছে ঠিকই আছে, পারফেক্ট।

মানুষের কাজে কোনো পারফেকশন নেই।

সেটাও সত্যি। কিন্তু আপনি কি পারফেকশন আশা করেন না?

নাহ।

অদ্ভুত মানুষ তো আপনি। কেন?

আমি কে? কিইবা আমি?

বায়োজিদ, শুধুই বায়োজিদ। নাইবা হলেন কেউ বা কিছু।

আপনি দেখছি বুদ্ধিমতি।

বায়োজিদের মূখের প্রশংসাটা শুনে রিহানীর মূখ মুহুর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠে। বায়োজিদ তাঁর দিকে তাকানোর সাথে সাথে সে আরও বেশি লাল হয়ে যায়।

বায়োজিদ সেটা বুঝতে পারে। নার্ভাসনেস কাটানোর জন্য সে বলে, সরি। আমি আপনাকে এক কাপ কপি দিতে পারতাম। কিন্তু আমি যা খাই বা পান করি, সব অখাদ্য। আমার কোনো বোয়া নেই। বোয়ার ব্যাপারটা পছন্দও করি না। নিজেই রান্না করি। আমি সরি। আমি কখনোই কাউকে আপ্যায়ন করিনি।

না ঠিক আছে। আজ রাতে আপনি আমাদের সাথে খেতে পারেন। আমি ভাল রান্না জানি। সবাই খুব প্রশংসা করে। আপনার জন্য স্পেশাল কিছু রান্না করতে পারলে আমার ভালই লাগবে।

নাহ সরি। আমি কোথাও যেতে পছন্দ করি না।

এই তো মাত্র নীচ তলায়।

আমি জানি। জিমা হাবিবের সাথে একদিন সেখানেই দেখা হয়েছিল।

তাহলে আসছেন?

নাহ, আমি ওসব পছন্দ করি না। মোটেই না।

কি আশ্চর্য! কেন?

যাঁর যেভাবে ভাল লাগে তাঁর সেভাবেই থাকা উচিত। অবশ্য মানুষ থাকতে দিতে একেবারেই বাধ্য নয়।

অদ্ভুত তো।

এরপর তাঁদের মধ্যে আরও অনেক কথা হয়। রিহানী বায়োজিদ সম্পর্কে অনেকগুলো অদ্ভুত ধারণা নিয়ে রুমে ফিরে যায়। কিন্তু যখন জানে বায়োজিদের কোনো মনের মানুষ নেই, তখন এই অদ্ভুত মানুষটিকেই সে তাঁর মনের মানুষ হিসেবে ভাবতে থাকে। এরপর যে কয়দিন সে তাঁর ভাই-ভাবির বাসায় থেকে যায়, তার প্রতিদিনই সময়ে-অসময়ে বায়োজিদকে গিয়ে জ্বালাতন করতে থাকে। সরাসরি মনের কথাগুলো বলতে না পেরে কৌশলে নানা প্রশ্ন করে। ভাবখানা এমন যেন বায়োজিদ নিজেই ব্যাপারটা বুঝে নেয়। কিন্তু বায়োজিদ সেটা বুঝেও এড়িয়ে যায়। তাঁর ইচ্ছেই নয় কারো সাথে সম্পর্কে জড়ানো। ঝামেলার পথে এগুনো। আর রিহানী তো অনেক দূর।

কিন্তু রিহানীর স্বপ্ন এত ঠুনকো নয়। সে নাছোড় হয়ে বায়োজিদের নাম্বারটা সংগ্রহ করে। নিজেদের বাসায় ফিরে গিয়েও নিয়মিত বায়োজিদের সাথে ফোনে যোগাযোগ রাখে। ভাল-মন্দ খোঁজ খবর নেয়। বায়োজিদ বেশির ভাগ সময়ই ফোন ধরে না। কখনো কখনো ধরলেও বিরক্তি বোধ করে। কারণ তাঁর ভেতর আলগা রসবোধ নেই। আবার রিহানী সেসব বুঝলে তো?

ভালই চলছিল দুজনের মধ্যে খেলাটা। কিন্তু একদিন…

রিহানীর ছিল ভীষণ জ্বর। জেনেছিল ২রা নভেম্বর বায়োজিদ রেসিডেন্সিয়ালে আসবে। রিহানীর অনুরোধ ছিল সে যেন তাঁকে দেখে যায়। বায়োজিদ অপারগতা জানায়। রিহানী শেষে বলেছিল, বায়োজিদ এসে যেন অন্তত তাঁকে একটা ফোন দেয়। রিহানী নিজেই গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করবে। যেভাবেই পারে দেখা করবে। কিন্তু বায়োজিদ ফোন দেয়নি। বাধ্য হয়ে রিহানীই দিয়েছিল। বলেছিল যমুনায় থাকতে। সে আসছে…

কিন্তু যমুনায় এসে যখন বায়োজিদকে ফোন দেয়, বায়োজিদ জানায় সে চলে গেছে। তখন প্রচন্ড জ্বর গায়ে নিয়ে ফ্যাকাশে মূখে রিহানী শুধু এটুকুই বলতে পেরেছিল, ওহ, চলে গেছেন!

 

আরও জানুন » কীর্তিনাশা: গল্প-৪ »

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো তা আমাদেরকে অবশ্যই জানাবেন। আপনার মতামত আমাদের কাছে খুবই মূল্যবান। আপনি যদি আপনার নিজের লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ বা অন্য যেকোনো বিষয় বাঙালিয়ানা Magazine এ প্রকাশ করতে চান, তবে আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে আপনার লেখা প্রকাশে সচেষ্ট হব । আগ্রহীদের এই ইমেইল ঠিকানায় bangalianamagazine@gmail.com যোগাযোগের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হল । Copy করা কোন লেখা পাঠাবেন না। দয়া করে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আপনার পাঠানো লেখাটি অনলাইনে আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। যদি অনলাইনে আগে অন্য কোথাও আপনার লেখাটি প্রকাশিত হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সেটা প্রকাশ করতে পারব না। আমরা অরাজনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক এবং নিরপেক্ষ।
বিঃ দ্রঃ লেখাটি কোনরকম পরিমার্জন ব্যতিরেকে সম্পুর্ণ লেখকের ভাষায় প্রকাশিত হল। লেখকের মতামত, চরিত্র এবং শব্দ-চয়ন সম্পুর্ণই লেখকের নিজস্ব । বাঙালিয়ানা Magazine প্রকাশিত কোন লেখা, ছবি, মন্তব্যের দায়দায়িত্ব বাঙালিয়ানা Magazine কর্তৃপক্ষ বহন করবে না।

ফয়সল সাইফ ১৯৯০ সালের ১৫ই সেপ্টম্বর জন্ম গ্রহণ করেন হবিগঞ্জের ছোট এক শহর, শায়েস্তাগঞ্জে। বর্তমানে বাস করছেন সেখানেই। হিসাববিজ্ঞানে বিবিএ পড়ছেন শেষ বর্ষে। ছোটবেলা থেকেই তিনি পাঠ্যের বাইরে প্রচুর বই পড়তে ভালবাসতেন। রাশিয়ান সাহিত্য তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। যদিও তিনি জার্মান, আমেরিকান ও ব্রিটিশ সাহিত্যেকে সমান শ্রদ্ধা করেন। মূলত এভাবেই লেখালেখির ক্ষেত্রে তাঁদের সাহিত্যের মিশ্রণে প্রবলভাবে আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে অগ্রজ লেখক শাখাওয়াৎ নয়নের উৎসাহ অনুপ্রেরণায় তিনি দেশীয় ধরণটি রপ্ত করতে শুরু করেন। ক্যানভাসে আঁধার তাঁর লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস। যদিও তিনি বইটি লিখেছেন ১৮-৩০ বছর বয়সীদের কথা মাথায় রেখে, তবুও তিনি আশা করেন বড়রাও সেটাকে গ্রহণ করবে।

Comments

comments