মাত্র দুইটি অক্ষর

0
1121
মাত্র দুইটি অক্ষর
Print Friendly, PDF & Email

মেয়ে – মাত্র দুইটি অক্ষর । কিন্তু এই অক্ষর দুটোর আবার দুই রকম মানে আছে । কারো কারো কাছে মেয়ে মানেই খারাপ, হিংসুটে, আত্মকেন্দ্রিক আবার অন্যদিকে কিছু মানুষের কাছে মেয়ে মানে ভালবাসা, মায়া-মমতা, প্রেম-ভালবাসা । প্রথম যখন ছেলে সন্তান হয়, বাবা ছেলে খুব খুশি হন । নিজেকে অনেক বড় কিছু মনে করেন, ভাবেন আর চিন্তা কি ! আমার উওরাধিকার চলে এসেছে । যে বড় হয়ে আমার নাম উজ্জল করবে, বুড়ো বয়সে আমার সব চিন্তা সে নিয়ে আমাকে নিশ্চিন্ত করবে । কিন্ত তখন বিধাতা হাসেন কারন এই ছেলে বড় হয়ে একজন মেয়ের সাথে তার জীবন সাজাবে । তারপর ওই বাবা নিজেই উপলব্ধি করেন একটা মেয়ে তার বাড়িতে থাকলে কত ভাল হতো । বাড়িটা ভরা ভরা লাগতো । সে যখন অফিসে যেতো, তখন তার চশমা, কলম আগিয়ে দিতো ।

একদিন তার সেই স্বপ্ন পুরন করে ঝকঝকে দিনের আলো নিয়ে তার ঘরে আসে ফুটফুটে একটা ফুলের মতন মেয়ে । মেয়ে বড় হয় আর মা আড় চোখে দেখে আর ভাবে কিভাবে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তাকে বড় করবে, স্কুলে পাঠাবে? মেয়ে স্কুল শুরু করে । মা তাকে নিজে স্কুলে নিয়ে যায়, পাড়ার বখাটে ছেলেদের নজরের থেকে লুকিয়ে । বাবা অফিস থেকে এসে মেয়েকে বাসায় রেখে যায় । মেয়ে বড় হতে থাকে এইভাবে । একদিন সে স্কুল শেষ করে কলেজ জীবনে পা দেয় । চোখ ভরা থাকে তার রঙ্গিন স্বপ্নের ফুলঝুরি । বাসায় আসতে থাকে বিয়ের প্রস্তাব । বাবা-মা একমনে চান মেয়েও ছেলেদের মত পড়া শুনা শেষ করুক তারপর বিশ্ববিদ্যালয় যাক তাহলে নিজের পায়ে একদিন দাড়াতে পারবে । কিন্তু লোভনীয় পাত্রের হাতছানি আর আত্মীয়দের চাপে পড়ে একদিন বাবা নরম হয়ে যান । মাকে বোঝান, ছেলে ভাল, পরিবার ভাল তাই বিয়ে হয়ে গেলে তারা মেয়েকে পড়াবে । নিজের পায়ে দাঁড়াতে দিবে । মা মেয়েকে বোঝান, একসময় মেয়েও সবার কথায় রাজী হয়ে যায় । তারপর ঘটা করে বাবা-মা, ভাই তার বিয়ে দেয় । মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে অচেনা-অজানা একজন মানুষের হাত ধরে অজানা এক বাড়িতে আসে । যে বাড়ির ঘরগুলি তার অচেনা, আসবাব পত্র তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে । সেখানে নতুন নতুন মুখ, তাদের চোখ ভরা কিছু আশা । সব ভাল কাজ এই মেয়েকেই করতে হবে ।
বাড়ির মানুষগুলি ভুলে যায়, এ কোনও রোবট অথবা দম দেওয়া পুতুল না যে চাবি ঘুরালেই সব ভাল কাজগুলি বের হবে । তাই চা ভাল না হলে কিংবা ভাত পুড়ে গেলে বাসায় এটম বোমার মত কথা পড়তে থাকে । স্বামীর সাথে সিনামা দেখতে গেলে বেহায়াপনা হয়ে যায় । দেরি করে সকালে ঘুম থেকে উঠলে, তাকে রাজরানী শুনতে হয় । ভয়ে, আতংকে তার দিন কাটে তাই সে একদিন তার সেই পুরানো সম্পর্কের কাছে যায়, তাদেরকে বলে তার এই কষ্টগুলির কথা । মা বলেন, এটাই জীবনরে মা! কি আর করা, মেনে নাও । খালা, চাচী, ফুপু বলেন, তুই কিছু বলিস না কেন? একদিন মুখের উপর শুনিয়ে দিবি, দেখবি সবার কথা বন্ধ হয়ে গেছে । মা বলেন, না রে মা এই রকম বলিস না, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে ।

আমিতো সৃষ্টি কর্তার কাছে কোন অন্যায় করিনি তাহলে তোর কেন এমন হবে? মেয়েটা দোটানা মন নিয়ে ফিরে আসে, বুঝতে পারে না কি করবে তাই সে তার প্রিয় মানুষটিকে সব খুলে বলে । প্রিয় মানুষটি যদি ভাল হয় তাহলে তার হাত ধরে বলে, চিন্তা করোনা, আমি কথা বলবো সবার সাথে । আর প্রিয় মানুষটা যদি অন্য রকম হয়, তাহলে বলে উঠেন, তোমরা মেয়েরা সব সময় ছোট ছোট ব্যাপারগুলি নিয়ে ঝামেলা কর । এই জন্য বিয়ে করা ঠিক না, আমি এই জন্য বিয়ে করতে চাইতাম না । মেয়েটার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে । সে ভয়ে চুপ হয়ে যায় । আর প্রিয় মানুষটা ভাল হলে সে পরিবারের সবার সামনে সমস্যাগুলি নিয়ে কথা বলে । তখন বাড়ীতে আর এটম বোমা না, একেবারে নিউক্লিয়ার বোমা পড়ার মতো অবস্থা হয় ।

সবায় তার দিকে রাগী চোখে তাকায় কারন সে এই বাড়ীর ছেলে হয়ে কিভাবে একটা মেয়ের পক্ষে কথা বলছে? কখন তাদের ছেলেটা কিংবা ভাইটা এতো পর হয়ে গেল? আগে জানলে তো এই রকম মেয়ে তারা ঘরেই আনতেন না । শুরু হয় মেয়ের বাড়ীর কোন খালা-ফুপু তাদের শ্বশুরবাড়িতে কি করেছিল তার খোঁজ । মেয়েটির জীবেন আসে আরও এক ভয়ংকর অধ্যায় । এই সব দেখে মেয়েটি আবার চুপ করে যায়, স্বামীর কাছে বলা বন্ধ করে দেয় । এরপর আবার সে খুঁজে বের করে তার ছোটবেলার কোনও বান্ধবিকে এবং তার কাছে সে সব কষ্টের কথা বলে হালকা হতে চায় । কোনও সাহায্য বা কোনও সমাধানের আশায় নয় । কিন্ত এতদিন যে কথাগুলি শুধু নিজের ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে ছিল তা এখন বের হয়ে আকাশে-বাতাসে ছড়াতে থাকে কারণ প্রিয় বান্ধবী টেলিফোলের মাধ্যমে তার সবকথা রাত শেষ হবার আগেই অন্যদেরকে বলে দেয়।
বান্ধবীর মায়ের সাথে যখন শপিং মলে মেয়ের মায়ের দেখা হয় তখন তিনি জিজ্ঞাসা করেন, কেমন আছে আপনার মেয়ে? মেয়ের শ্বশুর বাড়ীর লোকেরা নাকি ভালনা? তাই তো একটু খোঁজ খবর নিয়ে তারপর মেয়ে বিয়ে দেওয়া উচিত ছিল, সাথে থাকে নানা রকম উপদেশ বাণী । বান্ধবীরা ফোন করে জিজ্ঞাসা করে, কিরে তোর শ্বশুর বাড়ীর লোকরা নাকি ভাল না? তুই চুপ করে থাকিস কেন? কিছু বলিস না কেন? মেয়ে লজ্জা-ঘৃনায় চুপ করে যায় । এর মধ্যে তার কোল জুড়ে আসে নবাগত শিশু । যে শিশু তার মাকে দেখে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে । সেই শিশুর মুখের হাসি দেখে মেয়েটা সব ভুলে যায় । আস্তে আস্তে মেয়ে ক্ষমতা পেতে থাকে কারন বাড়ীর ক্ষমতা ধর মানুষগুলি তখন ক্ষমতাহীন হতে শুরু করেছেন । তাদের নির্ভরতা বেড়ে গেছে এই মেয়েটির উপর ।

মেয়েটির ভাগ্য ভাল হলে, প্রতিদিনের এই মানসিক যুদ্ধের পরও যদি তার মানুসিকতা ভাল হয় তাহলে মেয়েটি তার ক্ষমতা দিয়ে সবাইকে বেধে রাখে, সে হয়ে যায় ঘরের খুঁটি । যার উপর নির্ভর করে বাড়ীটা দাঁড়িয়ে থাকে । তখন দেখা যায়, ঈদ, পুঁজা, ক্রিসমাসে সব ভাই-বোন এক সাথে হয়, তাদের ছেলে-মেয়েরা অনেক আনন্দের সাথে ঈদ করে । এটা ওই বাচ্চাদের সারা জীবনের একটা আনন্দের স্মৃতি হয়ে থাকে যাকে আমরা বলি নানা-বাড়ী – দাদা-বাড়ীর আনন্দের স্মৃতি । কিন্ত সমস্যা হয় তখন, যখন মেয়েটির মানসিক জোর বেশি থাকে না । আর তার সাথে যোগ হয় আশে-পাশের খারাপ মানুষের পরামর্শ । তখন তার সেই মনুষত্ব মরে যায় তাই সে এই নতুন ক্ষমতার প্রয়োগ শুরু করে সব বন্ধন গুলিকে নিজের অজান্তেই কাঁচি দিয়ে কেটে তার প্রিয় মানুষটার হাত ধরে বের হয়ে নিজের সাম্রাজ্য বানাতে চায় ।

স্বামী বেচারা তার হাত ধরে বের হয়ে আসে ঠিকই কিন্ত মনে কোন সুখ পায় না । তাই অফিসে তার কাজ ভাল হয় না, সে নিজেকে খন্ডিত মানুষ মনে করতে থাকে । কারো সাথে তার কষ্টের কথা বলতে পারে না। কারন যাকেই সে বলবে সেই তাকে খারাপ বলবে । এই সমাজের মানুষগুলি মাথা উঁচু করে আছে অন্যের কষ্ট উপভোগ করার জন্য । তাই এক সময় তার এই ভারী কষ্ট আক্রোশে পরিনত হয় । তার কাছে তখন মনে হয়, মেয়ে মানেই খারাপ, নিষ্ঠুর । কারণ বউ যে তার একজন মেয়ে । আর মেয়েটি তখন সমাজের খাতায় নাম লেখায়, খারাপ বউ, ভাবি, ননদ, মামী, ফুফু, খালা হিসাবে । এই সমাজের কেউকি তখন ভেবে দেখে এই খারাপের পেছনে কি অবস্থা দায়ী ছিল? পাঠকের কাছে এই প্রশ্ন রেখে গেলাম ।
এটা আমাদের সমাজের ৮৫% মেয়ের জীবন, আর বাকী ১৫% মেয়ে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায় । আবার সোনার চামচ মুখে নিয়ে মাটির নিচে যায় । কিন্তু আমরা কি পারি না, এই ৮৫% ভাগ মেয়েকে ১৫% ভাগের মধ্যে আনতে? মানুষকে সৃষ্টিকর্তা অনেক ক্ষমতা দিয়েছেন তাই তো মানুষ কত বড় বড় জিনিস আবিষ্কার করছেন । নতুন নতুন যুদ্ধ অস্ত্র বানিয়ে দেশ দখল করছে কিন্তু নিজের ছোট সাম্রাজ্য যে ভাঙ্গন ধরছে সেটা কি সে বুঝতে পারছে? পরিবার খন্ড খন্ড হয়ে গেলে আগামী প্রজন্মকে মানুষের প্রতি মায়া, বন্ধন কে শিখাবে? দাদী-নানীর কাছ থেকেই বাচ্চারা সব থেকে বেশী শেখে এবং সারা জীবন সেই স্মৃতি নিয়ে থাকে । ছেলে এবং মেয়ে এরা একে অন্যের পরিপূরক । একজন অন্যকে ছাড়া অচল । কোনও মানুষ যেমন একা কিছু গড়তে পারে না ঠিক তেমনি একা কিছু ভাঙতেও পারে না । এই সহজ কথাটি কবে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ বুঝবে? প্রকৃতির কি নির্মম পরিহাস, একজন মা পারে একটা ভাল জাতি দিতে আর এই মা হওয়ার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা শুধু মাত্র একটা মেয়েকেই দিয়েছেন । তাই আমাদের সবার উচিৎ ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে, মানুষকে আগে মানুষ হিসাবে দেখা । পরিবার যখন নিজেই তাদের মেয়েদেরকে সন্মান করবে এবং তাদের ছেলেদেরকে সন্মান করতে শেখাবে তখনই এই সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে থাকবে । আর তখনই এই সমাজে অপরাধীর সংখ্যা কমতে শুরু করবে । সবাইকে মনে রাখতে হবে আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত আর তাই একটা সুস্থ জাতির জন্য একজন সুস্থ মা প্রয়োজন । তাই আমাদের সবাইকে মেয়েদের সন্মান করা উচিৎ । তাহলেই একদিন প্রতিটি ঘর হয়ে উঠবে স্বর্গ এবং দেশ পাবে ভাল এক জাতি ।

আরও জানুন » জীবন চক্র »

বাঙালিয়ানা Magazine এ লিখতে চান ?
বাঙালিয়ানা Magazine এর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম! আপনি যদি বাঙালিয়ানা Magazine এ আপনার কোন লেখা প্রকাশ করতে চান তাহলে তা unicode Bangla font দিয়ে লিখে তার সাথে প্রয়োজনীয় সকল ছবি সহ আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। মানসম্মত লেখা অবশ্যই প্রকাশিত হবে। আমাদেরকে লেখা পাঠাতে ইমেইল করুন এই ঠিকানায় bangalianamagazine@gmail.com
বিঃ দ্রঃ Copy করা কোন লেখা পাঠাবেন না।

লেখালেখি বলতে যা বোঝায় সেটা কখনই আমি লিখি না। তবে ছোটবেলা থেকেই প্রচুর সাহিত্য, জীবন ধর্মী লেখার নিয়মিত পাঠিকা। বেগম, দেশ এমন অনেক পত্রিকার একনিষ্ঠ পাঠিকা। প্রবাস জীবনে চারিপাশের মানুষদের দেখে, নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখে অনেক অনুভূতি হয়। সেগুলো মাঝে মাঝেই ইচ্চা হয় অন্যদের সাথে শেয়ার করি যেন তারা আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু নিতে পারে। যদি আমার একটা অভিজ্ঞতা অন্য কারো কাজে লাগে, এই ভেবেই লেখা। ইতিহাসের উপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাশ করার পর কিছুদিন বেসরকারী চাকরিতে ছিলাম। এরপর ফ্যাশন টেকনোলজীর উপর ডিপ্লোমা এবং বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের কেক এবং বেকিং নিয়ে পড়াশুনা করি। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের ক্যান্সার নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যেই এই কেক এর পেছনে কাজ করে যাওয়া। জীবনবোধ থেকে লিখতে চাই আমার অনুভূতিগুলো।

Comments

comments