অদ্ভুত ছবিগুলো (২১)

0
386
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (২০) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

 

ঢেউ খুব লজ্জা পেল। মাহেরা আপু কি বুঝতে পেরেছে ওর ভেতর ত্রিরঞ্জনকে নিয়ে আজকাল অজানা কিছু অনুভূতি খেলা করে? কি যে বলো না আপু তুমি!

তুমি কিন্তু লজ্জা পাচ্ছ ত্রিরঞ্জনের কথা বলায়। শোনো মেয়ে, আমার কাছে কিছু লুকাতে পারবে না। তোমার বয়স কবে পার করে এসেছি বাচ্চু! হাসতে হাসতে মাহেরা বললো  ঢেউকে।

ধুর আপু! তুমি আবার আমাকে নিয়ে টানাটানি শুরু করলে কেন? ত্রিরঞ্জনদা খুব ভালো মানুষ, ভাইয়ার সব বন্ধুদের মধ্যে এই একজনই একটু অন্যরকম।

হুম! আমি কিন্তু গন্ধ পাচ্ছি ঢেউ! বলেই ফিক করে হেসে ফেললো মাহেরা। তোমার ভাবভঙ্গিই বলে দিচ্ছে কাহিনি কি। বলতে না চাইলে কিছু তো আর করার নেই, কিন্তু আমাকে বিশ্বাস করতে পারো।

বেশ অপ্রস্তুত বোধ করছে ঢেউ। কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো। সেরকম কিছু হলে অবশ্যই তুমিই প্রথমে জানবে আপু! স্বাভাবিক কন্ঠে বললো কথাটা। ভাবলো আপুকে কিভাবে বলবে? ও নিজেই তো জানে না। শুধু অনুভব করে কিছু একটা ঘটে ওর ভেতর। ডায়রির কথাটা মাথার ভেতর ঘুরছে। কার ডায়রি ওটা? ত্রিরঞ্জনের ডায়রি? কিন্তু ও যতদূর জানে ত্রিরঞ্জনদা কখনও ডায়রি লেখে না।

কথায় কথায় সন্ধ্যা পার হয়ে গেল। দুজনের কেউই টের পেল না কোথা দিয়ে সময় চলে গেল। কতদিন পর মাহেরা আপুর সাথে দেখা। কথাই যেন শেষ হতে চায় না দুজনের। ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে মাহেরা আপু যখন চাকরি খুঁজছিল তখনই একদিন ভাইয়াকে বলেছিল ঢেউ। তারপর ত্রিরঞ্জনদা একদিন ওকে বললো, পারলে মাহেরা আপুর একটা বায়োডাটা পাঠিয়ে দিতে। এর এক সপ্তাহের ভেতর মাহেরা আপুর চাকরি হয়ে গেল মামার ওখানে। কিভাবে যে ত্রিরঞ্জনদাকে ধন্যবাদ দেবে বুঝে পায়নি ঢেউ।

তোমার ট্রিট আসলে ভাইয়া আর ত্রিরঞ্জনদাকে দেওয়া উচিৎ। চলো, একদিন সবাই মিলে একটা ভালো রেষ্টুরেন্টে যেয়ে খেয়ে আসি।

এটা একটা দারুন আইডিয়া দিয়েছো তুমি ঢেউ। মুকুলের সাথে কথা বলে একটা দিন ঠিক করে আমাকে জানিও। ভালো কথা, হাসানকেও জানিও।

এর মধ্যে মা বাবা দুজনেই চলে এসেছে। উঠে যেয়ে দরজা খুলে দিলো ঢেউ। কি ব্যাপার, আজকে তোমরা দুজন একসাথে যে? আমি তো ভাবলাম বাবার আসতে অনেক দেরি হবে। যাক ভালই হলো, দেখো কে এসেছে?

ঘরে ঢুকেই আফরোজা বেগম দেখলেন মাহেরা এসেছে। ইস! কতদিন যে তোমাকে দেখিনা। আজই তো তোমার মা-র সাথে কথা হলো, কই বলেনি তো যে তুমি আসবে? তোমার খালুর কাছে শুনলাম আপা পায়ে ব্যাথা পেয়েছে। তোমার খালু ফোন করলেন তোমাদের বাসায় থাকতেই। তখন কথা হলো আপার সাথে। এটা শুনেআজই ভাবছিলাম একবার যাবো।

মা তো জানে না যে আমি আসবো। আজকে একটু তাড়াতাড়িই স্যার বেরিয়ে গেলেন, তেমন কাজও ছিলো না। তাই ভাবলাম চলে আসি।  অনেকদিন তোমাদের সাথে দেখা হয় না। মা বার বার অবশ্য বলছিল তোমাকে জানাতে। কিন্তু খালু কিভাবে জানেন মায়ের পায়ে ব্যাথা?

আজ বিকালে নাকি তোমাদের ওদিকে অফিসের কাজ ছিলো। তাই দেখা করে এসেছে। ওখান যেয়েই দেখে আপার এই অবস্থা।

ও! তাই তো বলি, তুমি কিভাবে জানো। দরজার কাছে জুতা, স্যান্ডেল সব ঠিক করে খালু এসে ঢুকলেন ড্রয়িং রুমে। সালাম দিলো মাহেরা। আপনি নাকি আজকে আমাদের বাসায় গিয়েছিলেন খালু?

হ্যাঁ! আপার পায়ের তো দেখলাম খুব খারাপ অবস্থা! ভাগ্যিস ওদিকে আজ অফিসের কাজ ছিলো। একটা ফোন করে জানাবে না? তোমরা যে কেন এমন করো? খুব বিরক্ত মনে হলো মকবুল সাহেবকে।

খালু বরাবরই এমন। একটু এদিক ওদিক হলেই হলো। লজ্জিত মুখে মাহেরা বললো, ইচ্ছা করেই আপনাদের খবরটা দেয়নি। শুধু শুধু টেনশন করবেন তাই। আর তেমন কিছু তো হয়নি!

আরে! টেনশনতো করবই! এমন একটা খবরে টেনশন করবো না? এটা কি বলো? ওভাবে উঁচু টুলের উপর দাঁড়িয়ে কেউ মাকড়সার জাল পরিস্কার করে নাকি? জীবনে এই প্রথম শুনলাম এটা। ভাগ্যিস পা ভাঙেনি। যাইহোক, আর কখনও এমন করবে না।

মাহেরাকে বকা দিতে দিতে বললেন, তুমি গল্প করো। ফ্রেশ হয়ে নিয়ে আসছি, তারপর একসাথে খাবো। বাসায় ফোন করে জানিয়ে দাও যে তুমি খেয়ে যাবে। আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসবে।

জ্বী, খালু। আমি এখনি ফোন করে দিচ্ছি। ফোন নিয়ে বসলো মাহেরা মা-কে জানাতে। মা হয়ত একটু চিন্তা করবেন। কারণ রাত অনেক হয়ে যাবে ফিরতে ফিরতে।

তোমরা গল্প করো। বললেন আফরোজা বেগম। আমিও ফ্রেশ হয়ে আসি।সারাদিন টিপটিপ বৃষ্টি গেল। ঠান্ডা তো পড়েইনি বরং কেমন একটা গুমোট হয়ে আছে বাতাস। ঢেউকে বলে গেলেন টেবিলে খাবার দিতে। মুকুল আসতে এখনও অনেক দেরি।পরীক্ষা শেষ। সুতারাং ছেলেটা বন্ধুবান্ধবের সাথে আড্ডা মেরেই যাচ্ছে। এখনও চাকরি বাকরি খোঁজার দিকে কোনও আগ্রহ নেই। মাষ্টার্সটা করবে কি-না তাও বোঝা যাচ্ছে না।

ভাইয়া এলে তারপর টেবিলে খাবার দেই মা?

তাহলে মাহেরার অনেক দেরি হয়ে যাবে। তোমার ভাইয়া এতো তাড়াতাড়ি আসবে বলে মনে হয়?

তা অবশ্য ঠিক বলেছো। টিভিটা ছেড়ে দিয়ে মাহেরাকে বললো ঢেউ, তুমি একটু টিভি দেখো। আমি টেবিলে খাবার দিয়ে আসি।

টিভি দেখব না এখন। চলো, তোমার সাথে আমিও আসি। আজ রান্না কি তা-তো বললে না? মাহেরা উঠলো সোফা থেকে।

তুমি তো জানই আপু! বৃষ্টি হলেই ভাইয়া আর বাবার প্রিয় খাবার হচ্ছে খিঁচুড়ী আর খাসির মাংস ভুনা। এখন পটল ভাজি করবো আর সাথে থাকবে আমের আচার।

ওরে বাবা! এতো দেখি বিশাল আয়োজন! এতো কিছু তুমিই করলে?

খাসির মাংসটা বুয়া রেঁধে দিয়ে গেছে। সকালে মা বলে গিয়েছিল। খিঁচুড়ীটা আমিই করেছিলাম তুমি আসার কিছুক্ষণ আগে। তুমি কি পটল ভাঁজি পছন্দ করো?

খুবই ভালো লাগে কিন্তু বিঁচিগুলো মুখে পড়লেই কেমন যেন লাগে। বলেই ফিক করে হেসে ফেললো মাহেরা।

না-না, আমি ওইভাবে পটল ভাঁজি করি না আপু। ভেতরের বিঁচিগুলো ফেলে দেবে আগে। তারপর লবন, হলুদ আর সামান্য একটু ঝালের গুড়া দিয়ে মেখে রেখে দেবে অন্তত আধাঘন্টা আগে। এরপর গরম তেলের উপর ছেড়ে দেবে, ব্যাস। দারুন লাগে খিঁচুড়ী দিয়ে খেতে। ভাইয়ার তো খুবই প্রিয় এই পটল ভাঁজি।

ভালো কথা, মূকুল কি চাকরি খুঁজছে নাকি মাষ্টার্স করতে চায়? স্যার বলছিলেন যে ত্রিরঞ্জনকে বাইরে পাঠিয়ে দেবেন মাষ্টার্স এর জন্য। কিন্তু ত্রিরঞ্জন মনে হয় যেতে চায় না দেশের বাইরে।

ভাইয়ার কথা আর বলো না আপু। সেদিন তিনি ঘোষণা দিলেন অনেক পড়াশুনা হয়েছে জীবনে। এখন নাকি তার রিলাক্স করার সময়।

টেবিলে গরম খিঁচুড়ী, খাসির ভোনা মাংস আর পটল ভাঁজি দেখেই মনটা নিমেষে ভালো হয়ে গেল মকবুল সাহেবের। সারাদিন অনেক বৃষ্টি হয়েছে আজ, এজন্যই মনে হয় মনটা একটু বিক্ষিপ্ত ছিলো তার।

কলিং বেলের আওয়াজ হতেই তিনি দরজা খুলে দিলেন। মুকুল চলে এসেছে, সাথে ত্রিরঞ্জন। যাক, তোমরা চলে এসেছো? ভালই হলো। সবাই একসাথে খাওয়া যাবে আজ।

সালাম দিয়ে ত্রিরঞ্জন একটু হাসল। অনেকদিন আপনাদের সাথে একসাথে গল্প করা হয় না, তাই চলে আসলাম।

তুই চলে আসলি নাকি তোকে কান ধরে টেনে আনতে হলো এখন? মূকুল ফোঁড়ন কাটল।

লজ্জিত হেসে ত্রিরঞ্জন বললো, আসলে আজকেই অনেকক্ষণ ঢেউ এর সাথে গল্প করেছি। এই জন্য ভাবলাম আবার আসবো? তাই এখন আসতে চাচ্ছিলাম না। তাছাড়া মামা অপেক্ষা করবে হয়ত আমার জন্য।

কোনও ব্যাপার না। তোমার মামাকে ফোন করে দাও তাহলেই হবে। চলে আসো, আমরা এইমাত্র টেবিলে বসবো বসবো করছিলাম।

……….. চলবে

আরও জানুন » ভালবাসি নিভৃতে »

জন্ম ২৪ শে মে যশোর। শৈশব, বাল্যকাল ও তারুন্যের একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লেখার মধ্যমে। স্কুল ম্যাগাজিন অগ্রজ, যশোর শিশুসাহিত্য কেন্দ্রের কিশোরমেলা, কলেজের ক্র্যাচ এবং দেশের বিভিন্ন দৈনিকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত কবিতা ও গল্প। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন “সময়” সংকলন এবং নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিমানের পাইলট ও ক্যাপ্টেনদের ককপিট ইন্সট্রুমেন্টেশান প্রশিক্ষক ও পরবর্তীতে জার্মানী থেকে ইনফরমেশন ও কমুউনিকেশন্স এ উচ্চশিক্ষা গ্রহনের পর আই.বি.এম ও বিভিন্ন গ্লোবাল কোম্পানিতে আই টি স্পেশিয়ালিষ্ট হিসাবে কর্মরত। পেশাগত কারনে দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে বিরত থাকার পর আবার সাহিত্যের অঙ্গনে প্রত্যাবর্তন কবিতা,গল্প, উপন্যাস ও গবেষনা ভিত্তিক প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রবাস জীবনে বিভিন্ন ব্লগে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করেন।

ব্যক্তিজীবনে ভীষন বন্ধুভাবাপন্ন, অত্যন্ত সদালাপী এবং আড্ডাপরায়ণ। বর্তমানে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সন্তানকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের মিডল্যান্ডের মার্সটন গ্রিনে।

Comments

comments