অদ্ভুত ছবিগুলো (২০)

0
359
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (১৯) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

বৃষ্টির দমকটা এখন নেই বললেই চলে কিন্তু আকাশ থমকে আছে কালো মেঘের আস্তর বুকে নিয়ে। কালো মেঘগুলো কোথাও অট্রালিকার মতো  আকার নিয়েছে, আবার কোথাও পিরামিড হয়ে মাথা উঁচু করে আছে। আকাশের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায় ধীরে ধীরে অট্রালিকা ভেঙ্গে একটা বেশ বড় ষ্টেডিয়ামে পরিনত হয়েছে। ঠিক তখনই অট্রালিকার পেছেন আটকে থাকা সুর্যের আলোটা হামাগুড়ি দিয়ে মেঘের দেশ পার হয়ে পৃথিবীতে চলে এসেছে।

মেঘের বুকের ভেতর জমে থাকা পানির ভারে একসময় সেই ষ্টেডিয়ামের আকারটাও মিলিয়ে যায়। তখন ভেজা মেঘ উড়ন্ত শাড়ির মতো  ভাসতে থাকে। আর শাড়ির আঁচল থেকে মুক্তির উল্লাসে কয়েক পর্দা ঝকঝকে রোদ্দূর হাসতে হাসতে এগিয়ে আসে পৃথিবীর দিকে। মেঘের ভেজা পানির সীমানা অতিক্রম করতেই রোদ্দূরের অনু পরমাণু গুলো খোলা আকাশের ক্যানভাসে সাত রঙ এর ছবি আঁকে। ছবি আঁকা শেষ হলে রংধনু হয়ে অনেক সময় নিয়ে খেলা করে দৃষ্টিসীমার বাইরে হারিয়ে যাওয়ার আগে। এরপর ভেজা রোদ্দূর বাতাসে ছড়িয়ে দেয় গুমোট একটা ভাব।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যার আগমন ঘনিয়ে আসছে। এমন একটা সময়ে কিছুই ভাললাগে না। রংধনু দেখে কিছুটা আনন্দের ভাব চলে আসে তবে তা সীমিত সময়ের জন্য. কারণ রংধনুর স্থায়িত্ব বেশিক্ষন থাকে না। ছাদের যে অংশে কৃষ্ণচুড়ার বড় ডালটা নিচু হয়ে এসেছে সেই দিকে চিলেকোঠার দেয়াল ঘেঁষে অনেকগুলো ফুলের টব।গোলাপ, বেলী, হাসনাহেনা, কাঠমালতী, অলকানন্দা, গাঁদা আরও কয়েক ধরনের ফুলের গাছ। মায়ের গাছের শখ খুবই। মা গাছগুলো আনিয়েছেন বিভিন্ন জায়গা থেকে। শুধু অলকানন্দা গাছটা দোতালার বারান্দায় লাগানো কিন্তু খুব সুন্দর করে চালনির মতো  করে বানানো কঞ্চির গা বেয়ে গাছটা ছাদের এই পাশে চলে এসেছে।

রজনীগন্ধা আর অলকানন্দা ফুল ওর খুব প্রিয়। অলকানন্দা ফুলটা অবশ্য আগে চিনতা না। এটা ব্রাজিলিয়ান গোল্ডেন ট্রাম্পেট (Golden Trumpet) নামেই বেশি পরিচিত। আগের দিনের রাজাদের সংবাদ প্রচারকারীরা ঠিক যেমন চোঙ্গা ব্যবহার করতেন এর ফুলগুলো দেখতে ঠিক সেইরকম। ট্রাম্পেট এর মতো  দেখতে বলেই এর এই রকম নাম। অনেকেই নাকি এই ফুলকে স্বর্ণঘন্টা বলে। মার কাছ থেকে বিভিন্ন ফুলের সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছে সে।

অলকানন্দার মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে টেনে নিয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে ছাদে বসে রংধনুটা দেখলো ঢেউ। তারপর রংধনুটা বাতাসে মিলিয়ে যেতেই কিছুক্ষনের ভেতর কেমন অন্ধকার একটা ভাব আসতে শুরু করলো। সাত রঙ এর খেলা দেখতে দেখতে ভাবছিল, ত্রিরঞ্জন নামটাই রঙ এর খেলা। তিন রঙ এর সমষ্টি। কি সুন্দর ওর নামটা। আজ এই প্রথম ত্রিরঞ্জন ওর সাথে অনেকক্ষণ গল্প করেছে। নিজের খুব একান্ত অভিজ্ঞতার কথা বলেছে।

খুব অবাক লাগছে ভাবতে ব্যাপারটা, ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না নিজের কাছেই। ত্রিরঞ্জনের অসহায় অবস্থাটা খুব ভালোকরেই অনুভব করতে পারছে। কারণ ও নিজেই অদ্ভুত এক নিয়ন্ত্রণহীন অনুভূতির অস্তিত্ব নিয়ে বসে আছে। কেন ত্রিরঞ্জনকে ওর এতো ভাললাগে তা ও নিজেও বুঝতে পারে না। অনেক ভেবে দেখেছে, এই ভাললাগা অনুভূতির কথা, এদের উৎস, কারণ, কিন্তু এইগুলোর কোনওকিছুই ওর কাছে স্পষ্ট নয়। শুধু জানে, নিয়ন্ত্রণহীন ঝর্নার মতো  ভাললাগার স্পর্শ নিয়ে অনুভূতিগুলো ওর সমস্ত স্বত্তায় ঝিরিঝিরি করে বয়ে চলছে অনুক্ষণ। এই ভাবনাকে ওর থামাতে ইচ্ছা হয় না। একটা অনুভূতি থেকে আরও অজস্র অজানা অনুভূতি এসে হাজির হয়।

ত্রিরঞ্জনের অদ্ভুত ওই অভিজ্ঞতার কথা ভাবলো ও। এমন অদ্ভুত ঘটনা কখনও শোনেনি ঢেউ। সারাটা দূপুর এটা নিয়ে ভেবেছে কিন্তু কোনও উপযুক্ত ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি। ত্রিরঞ্জনকে অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। ওর নিজেরই খুব এলোমেলো লাগছে. তাহলে ত্রিরঞ্জনের কেমন লাগছে অনুভব করতে পারছে ও।

কলিং বেলের আওয়াজ আসছে। তাড়াতাড়ি নিচে যেয়ে দরজা খুলল। মাহেরা আপু দাড়িয়ে আছে দরজায়। আরে! তুমি এতদিন পর যে।

হ্যাঁ! অনেকদিন হয়ে গেল এদিকে আসা হয়নি। তোমারও তো কোনও খবর নেই ঢেউ। আমি অবশ্য প্রায়ই ভাবতাম আসবো একবার কিন্তু সময় পাই না একদম।

তুমি চাকরিতে জয়েন করার পর থেকেই তো ব্যস্ত। তোমার চাকরি কেমন চলছে আপু?

খুব ভালো চলছে। কত কি যে শিখছি! আজ একটা দারুন ঘটনা ঘটেছে অফিসে।

তাই? মাহেরাকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসতে বসতে বললো  ঢেউ। তুমি রাতে খেয়ে যাবে কিন্তু আজকে। কতদিন পরে তুমি এলে আমাদের বাসায়। বড় খালার সাথেও অনেকদিন দেখা হয় না। যাবো যাবো করেও কেন যেন সময় হয়ে উঠে না।

হাতের ব্যাগটা রেখে সোফায় হেলান দিয়ে বসলো মাহেরা। মা ভালো আছে, কিন্তু কয়েকদিন হলো পায়ে একটু ব্যাথা। ডাক্তার দেখিয়েছি সেদিন। এখন রেষ্টে থাকতে হবে কয়েকদিন। সময় পেলে একবার যেও।

ঠিক আছে, দেখি কালই একবার যাবো আপু। তুমি অফিসের কি যেন একটা ঘটনার কথা বলছিলে?

এজন্যই তো চলে এলাম। আজকে আমাদের এক ক্লায়েন্টের নতুন একধরনের মেশিন এর কোটেশান দিতে যেয়ে একটা ঘটনা ঘটেছে। ঢেউকে সবকিছু খুলে বললো  মাহেরা। ফাইলটা খুঁজতে যেয়ে কিভাবে ডায়রিটা পেল।

অদ্ভুত ব্যাপার তো! ডায়রিটা যে ওখানে ছিলো এটা জানতো না মামা?

ডায়রিটা দেখে স্যার মনে হলো দারুন চমকে গেছেন। এরপর উনাকে আর কোনও কিছুতেই মন বসাতে দেখিনি। কেমন যেন ক্ষণে ক্ষণে  অমনোযোগী হয়ে যাচ্ছিলেন।

তুমি কি জানো এটা কার ডায়রি?

আমি তো খুলিনি ওটা। স্যারকে দেখালাম, তারপর থেকেই উনি কেমন যেন হয়ে গেছেন। সম্ভবত স্যারের পুরনো কোনও ডায়রি। দেখে তো তাই মনে হলো। খালা-খালু কোথায়? এখনও আসেনি অফিস থেকে?

এখনও দেরি আছে আপু। বাবা আসতে অনেক দেরি, আর মা চলে আসবেন ঘন্টা খানেকের মধ্যে।

তোমার একটা ট্রিট পাওনা হয়ে আছে আমার কাছে।

কিসের ট্রিট আপু?

কেন? এই যে চাকরিটা, এটা তো তুমি না থাকলে পেতাম না!

কি যে বলো না আপু! আমি তো কিছুই করিনি। ভাইয়াকে বলেছিলাম কথায় কথায়, পরে ভাইয়া মনে হয় ত্রিরঞ্জনদা কে বলেছিল।

এই, ত্রিরঞ্জনের খবর কি? ইস! কি দারুন ছবি যে আঁকে না। আমি যদি এমন ছবি আঁকতে পারতাম! একটা জিনিসই আমি বুঝি না, ও কেন ছবি আঁকে না সবসময়?

ঢেউ এখনও ত্রিরঞ্জনের ওই অদ্ভুত ঘটনার কথা মাথা থেকে বের করতে পারেনি। একটু ভেবে ও বললো , আসলে আপু ত্রিরঞ্জনদার ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। অন্য দশজন শিল্পীর মতো  নিজের ইচ্ছায় কখনও ছবি আঁকতে পারেনি। এটা বিশ্বাস করা যদিও বেশ কষ্টসাধ্য কিন্তু এটাই ওর জন্য বাস্তবতা। ও নিজেও কিন্তু ব্যাপারটা বোঝে না।

মাহেরা খুব গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো ঢেউ এর দিকে। ত্রিরঞ্জনের কথা বলার সময় ঢেউ এর মুখের উপর এক ধরনের ছায়া দেখলো মনে হলো। আগ্রহী হয়ে একটু ঝুঁকল ঢেউ এর দিকে, তারপর বললো “আচ্ছা! তুমি কি ত্রিরঞ্জনক পছন্দ করো নাকি?”

……….. চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (২১) »

জন্ম ২৪ শে মে যশোর। শৈশব, বাল্যকাল ও তারুন্যের একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লেখার মধ্যমে। স্কুল ম্যাগাজিন অগ্রজ, যশোর শিশুসাহিত্য কেন্দ্রের কিশোরমেলা, কলেজের ক্র্যাচ এবং দেশের বিভিন্ন দৈনিকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত কবিতা ও গল্প। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন “সময়” সংকলন এবং নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিমানের পাইলট ও ক্যাপ্টেনদের ককপিট ইন্সট্রুমেন্টেশান প্রশিক্ষক ও পরবর্তীতে জার্মানী থেকে ইনফরমেশন ও কমুউনিকেশন্স এ উচ্চশিক্ষা গ্রহনের পর আই.বি.এম ও বিভিন্ন গ্লোবাল কোম্পানিতে আই টি স্পেশিয়ালিষ্ট হিসাবে কর্মরত। পেশাগত কারনে দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে বিরত থাকার পর আবার সাহিত্যের অঙ্গনে প্রত্যাবর্তন কবিতা,গল্প, উপন্যাস ও গবেষনা ভিত্তিক প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রবাস জীবনে বিভিন্ন ব্লগে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করেন।

ব্যক্তিজীবনে ভীষন বন্ধুভাবাপন্ন, অত্যন্ত সদালাপী এবং আড্ডাপরায়ণ। বর্তমানে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সন্তানকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের মিডল্যান্ডের মার্সটন গ্রিনে।

Comments

comments