অদ্ভুত ছবিগুলো (১৮)

0
359
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (১৭) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

মোস্তফা সাহেব দারুন খুশী হলেন মনে হলো। খুব আগ্রহের সাথে তিনি হাসানকে জানালেন ছেলেটাকে ঠিক কোথায় পাওয়া যাবে। হলুদ রঙের একটা টিনের বাক্স নিয়ে বসে ছেলেটা। নিউমার্কেটের ঠিক পেছনের দিকের গেটে যেখানে ফল বিক্রি করে, তার পাশেই একটা ছোট ছাপড়া মতো  দোকান আছে ওর।

হাসান মনে হলো ত্রিরঞ্জনের মনের কথাটা বলেছে। ভাবছিল ঠিক কোথায় পাওয়া যেতে পারে এই মোয়া। এতো অসাধারণ স্বাদ। মোয়াটা এতই মুড়মুড়ে যেকামড় দিতেই শেষ। নাকি ওর অস্থিরতার জন্যই তাড়াতাড়ি গলাধকরন করলো? এরপর চায়ে চুমুক দিয়ে ত্রিরঞ্জন অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছে মোস্তফা সাহেবের জন্য। সেই অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ হিসাবেই ও প্রশ্ন করলো, আপনি আমাকে খুঁজছিলেন শুনলাম। কেন জানতে পারি?

মোস্তফা সাহেব কোনও ভনিতা করলেন না। চায়ের মগটা টেবিলের উপর রাখলেন। তারপর ত্রিরঞ্জনের পাশের দিকের একটা টু-সিটার সোফার কাপড় সরিয়ে ওখানে বসলেন। আপনারা হয়ত ভাবছেন আমি ছবি সংগ্রহ করি কিংবা হয়ত বিশেষ কিছু পোর্ট্রেট এর ব্যাপারে আগ্রহী। কিন্তু আমি আসলে ছবির তেমন কিছু বুঝি না। তবে আপনার এই ছবিটা দেখে যে কেউ নিঃসন্দেহে বলবে একটা মাষ্টারপিস।

ত্রিরঞ্জন দ্বিধা না করে সরাসরি জানতে চাইলো, তাহলে কি এই ছবিটা বিশেষ কোনও কারণে কিনেছেন? হাসানের ওখানে তো আরও অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি আছে যেগুলোর প্রত্যেকটা এক একটা মাষ্টারপিসের মতনই!

মোস্তফা সাহেব চায়ের মগটা বা হাত দিয়ে নিলেন। তারপর ডান হাত দিয়ে মুড়ির মোয়ায় একটা কাঁমড় দিয়ে ধীরে ধীরে মুড়িগুলো গুড়ো করলেন। এই মুহূর্তে কেউ কিছু বললেও তিনি শুনতে পাবেন না। কারণ তার মস্তিস্কের একটা অংশমুড়ি ভাঙ্গার মুড়মুড় শব্দগুলোর কারণে তার স্বাভাবিক শ্রবণ ধারাকে ব্যস্ত রেখেছে। আশেপাশের কোনও কিছুই তিনি এখন শুনতে পাবেন না।

তিনি শুনেছেন, মিসোফোনিয়া (misophonia) কিংবা অটিসম না থাকলে আশেপাশের কেউ এই  মুড়মুড় শব্দ শুনতে পাবে না।  কিংবা সামান্য কিছু শব্দ পেলেও বিরক্ত হবে না। তিনি শুনেছেন, যাদের মিসোফোনিয়া থাকে তারা নাকি খাবার খাওয়ার কিংবা কিছু  চিবানোর শব্দ কিংবা চামচের শব্দ এসব শুনলে প্রচন্ড রেগে যায়। তাদের মস্তিস্কের ভেতর এক ধরনের উত্তাপ তৈরি হয় সেই শব্দের অনুরণন। এটা নাকি মস্তিস্কের জটিল অসুখ। কিন্তু সামনের দুজনের দৃষ্টি বলে দিচ্ছে এদের এ ধরনের কোনও সমস্যা হয়ত নেই। মোস্তফা সাহেব ক্ষমা প্রার্থনা সুচক দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

হাসান চায়ের মগে চুমুক দিয়ে বললো , আপনি ধীরে সুস্থে খেয়ে নিন। আমাদের কোনও তাড়া নেই। ত্রিরঞ্জনের দিকে তাকিয়ে মাথাটা সামান্য একটু কাত করলো সম্মতি সুচকভাবে।

ত্রিরঞ্জন একটু অপ্রস্তুত বোধ করলো ওর নিজের আচরনের জন্য। সম্ভবত ওর প্রশ্ন করার গতিটা একটু বেপরোয়া ছিলো কিংবা অসহিষ্ণু ছিলো। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো ও। কিন্তু ওর মনের ভেতর এক ধরনের অজানা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করছে। এজন্যই সম্ভবত নিজের অজান্তেই ওভাবে প্রশ্ন করা হয়ে গেছে। মোস্তফা সাহেবের দিকে তাকিয়ে এবার ত্রিরঞ্জন খুব স্বাভাবিক কন্ঠে বললো , আমি খুবই দুঃখিত। আপনি খেয়ে নিন আগে।

তিনি বুঝতে পারছেন ওদের হয়ত কোনও তাড়া আছে। মুড়ির মোয়াটা শেষ করে, মগ থেকে এক চুমুক চা নিলেন মুখের ভেতর। উষ্ণতা ছড়িয়ে বাদামী রঙ এর চা শরীরের অনু পরমাণুতে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দিলো।

সামান্য হেসে মোস্তফা সাহেব বললেন, না-না ! আপনি কেন দুঃখিত হবেন? সত্যি বলতে কি, এই ছবিটা কেনার কারণ আসলে আমার এক বন্ধু। খুব স্বাভাবিক কন্ঠেই তিনি বললেন, আচ্ছা! আপনি কিভাবে চেনেন মেয়েটাকে?

ত্রিরঞ্জন এই প্রথম একটু থমকে গেল! ওর সমস্ত শরীর কেঁপে উঠলো। প্রশ্নের ধরনটাই বলে দিচ্ছে মেয়েটা বাস্তবের কেউ। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব? যাকে কোনওদিন দেখেনি তাকে কিভাবে ও দেখলো। তাও একটা অবিশ্বাস্য ঘোরের ভেতর! ওর মাথার ভেতর ঝড়ের বেগে চিন্তা চলছে। কি বলবে ভদ্রলোককে ও?

মেয়েটাকে যে ও কোনওদিন দেখেনি এটা কি উনি বিশ্বাস করবেন? কিভাবেই বা করবেন! এতো জীবন্ত একটা ছবি দেখলে কেউ কখনই বিশ্বাস করবে না যে ও মেয়েটাকে কখনও দেখেনি। অসম্ভব একটা ঘটনা। কিন্তু কি বলবে ও? কিভাবে ব্যাপারটা অন্যদেরকে বোঝাবে ত্রিরঞ্জন? ঢেউ এর ব্যাপার আলাদা। ও জানে ঢেউ ওকে বুঝবে। কিভাবে এটা জানে বলতে পারবে না।

ত্রিরঞ্জন সিদ্বান্ত নিলো, আগে ওকে জানতে হবে মোস্তফা সাহেব কি বাস্তবে এই মেয়েকে চেনেন? এটা তো অসম্ভব একটা ব্যাপার। উনি হয়ত এমনিতেই জানতে চেয়েছেন যে ছবির সাবজেক্টকে আমি কতোটা চিনি। এতো বছর ধরে ওর কাছে ব্যাপারটা একটা বিস্ময় ছিলো যে কিভাবে ঘোরের ভেতর একটা মানুষকে সে ওভাবে দেখলো।

এটা কি ওর জীবনের অন্য কোনও বাস্তবতার অংশ ছিলো? কোনও অজানা অংশ ছিলো ওর জীবনের? কেন যেন ওর মন বলছে হয়ত মেয়েটা বাস্তবের কেউ এবং মোস্তফা সাহেব মেয়েটাকে চেনেন। তা-না হলে এতো ভালো ভালো ছবি থাকতে তিনি কেন শুধু ওই একটা ছবিই কিনবেন হাসানের কাছ থেকে? তার উপর আবার ওর সাথে দেখা করতে চাইবেন।

একটু কেশে নিলো ত্রিরঞ্জন। তারপর স্পষ্ট কন্ঠে মোস্তফা সাহেবের দিকে তাকিয়ে একটু ঘুরিয়ে প্রশ্নটা করলো। জানতে চাইলো, আপনি কি এমন কারো ছবি আগে কোথাও দেখেছেন?

ঠিক এই রকম সুন্দর ও জীবন্ত ধরনের পেইন্টিং দেখিনি। তবে আমার এক বন্ধুর ডেস্কে এই মেয়েটার একটা ছবি দেখেছিলাম কয়েক বছর আগে। ছোট একটা ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা ছিলো ছবিটা। বেশ পুরনো, একটু রঙ উঠা ঝাপসা।

শেষ চুমুকটা দিয়ে খালি চায়ের মগটা টেবিলের উপর রাখলেন মোস্তফা সাহেব। তারপর একটু বাম দিকে ঘুরে বসলেন হাসানের দিকে। হাসান বসে আছে ত্রিরঞ্জনের ডান দিকে, অবাক হয়ে শুনছে দুজনের কথা। ওর দিকে তাকিয়ে মোস্তফা সাহেব বললেন, সেদিন যখন সোবহানবাগ মার্কেটে একটা সুটকেস খুঁজছিলাম তখন হঠাৎ করেই ছবিটা দেখলাম আপনার শোরুমের দেয়ালে।

……    চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (১৯) »

জন্ম ২৪ শে মে যশোর। শৈশব, বাল্যকাল ও তারুন্যের একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লেখার মধ্যমে। স্কুল ম্যাগাজিন অগ্রজ, যশোর শিশুসাহিত্য কেন্দ্রের কিশোরমেলা, কলেজের ক্র্যাচ এবং দেশের বিভিন্ন দৈনিকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত কবিতা ও গল্প। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন “সময়” সংকলন এবং নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিমানের পাইলট ও ক্যাপ্টেনদের ককপিট ইন্সট্রুমেন্টেশান প্রশিক্ষক ও পরবর্তীতে জার্মানী থেকে ইনফরমেশন ও কমুউনিকেশন্স এ উচ্চশিক্ষা গ্রহনের পর আই.বি.এম ও বিভিন্ন গ্লোবাল কোম্পানিতে আই টি স্পেশিয়ালিষ্ট হিসাবে কর্মরত। পেশাগত কারনে দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে বিরত থাকার পর আবার সাহিত্যের অঙ্গনে প্রত্যাবর্তন কবিতা,গল্প, উপন্যাস ও গবেষনা ভিত্তিক প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রবাস জীবনে বিভিন্ন ব্লগে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করেন।

ব্যক্তিজীবনে ভীষন বন্ধুভাবাপন্ন, অত্যন্ত সদালাপী এবং আড্ডাপরায়ণ। বর্তমানে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সন্তানকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের মিডল্যান্ডের মার্সটন গ্রিনে।

Comments

comments