অদ্ভুত ছবিগুলো (১৭)

0
420
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (১৬) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

ত্রিরঞ্জনকে একটু অন্যমনস্ক মনে হলো। পরিবেশ হালকা করার জন্য মোস্তফা সাহেব একটু কেশে বললেন, আমি খুবই দুঃখিত আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। আসলে ছবিটা দেখে আমার খুব ইচ্ছা ছিলো যদি শিল্পীর সাথে একবার দেখা করতে পারতাম। এতো নিঁখুত  আর জীবন্ত একটা ছবি। আপনার বন্ধুর ওখানে অবশ্য অনেক সুন্দর কিছু ছবির কালেকশান আছে। কিন্তু এই ছবিটা অন্য সবগুলো থেকে আলাদা। এজন্যই আসলে জানতে চেয়েছিলাম ছবির শিল্পীকে উনি চেনেন কিনা। হাসানকে দেখিয়ে বললেন তিনি।

ত্রিরঞ্জন সামান্য শুধু একটু হাসল। মোস্তফা সাহেব কি শুধুই দেখা করার জন্য ওকে খুঁজছিল? ঠিক বুঝতে পারছে না ও।

আপনাদেরকে চা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কিছু দিয়ে আপ্যায়ন করতে পারছি না। ঘরে তেমন কোনও খাবার দাবার নেই। আমি একা মানুষ, এক বেলা একটু রাঁধতে পারলেই আমার হয়ে যায়। সাধারনত আমি রাতেই সামান্য কিছু রাঁধি। সেটাও বাসি খাবার হয়ে যায় পরের দিন। এ কথা বলেই তিনি হাসলেন।

ত্রিরঞ্জন সাথে সাথেই বললো , আমাদের কিছুই লাগবে না। আসবার আগে আমরা দূপুরের খাবার খেয়েই এসেছি। একদম ব্যস্ত হবেন না, প্লিজ। শুধু চা হলেই চলবে। আর যে লাগাতার বৃষ্টি হচ্ছে তাতে গরম চা এর চেয়ে আরামদায়ক আর কিছুই নেই।

ব্যস্ত হচ্ছি না। আপনারা একটু বসুন, আমি চা করে নিয়ে আসি।

হাসান যেমন বলেছিল তেমনটাই মনে হলো ত্রিরঞ্জনের কাছে। পুরো বাড়িটাই নিঝুমপুরী মনে হচ্ছে। কোথাও কেউ নেই। রাস্তাটা একটু ভেতরের দিকে হওয়ার কারণে আশেপাশে কোনও গাড়ির শব্দও নেই। ত্রিরঞ্জন এই প্রথম ভালো করে ঘরের ভেতরটা দেখলো।

অনেকটা ইংরেজী ইউ এর মতো  করে সোফা সেটটা সাজানো ঘরের এক প্রান্তে। ওরা যেটাতে বসেছে সেটা হালকা ক্রিম রঙ এর একটা ত্রি-সিটার সোফা। অন্য দুইটা সম্ভবত টু-সিটার কারণ আকারে এটার চেয়ে একটু ছোট কিন্তু বড় কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। অন্যপ্রান্তে দুইটা মেহগনি কাঠের চেয়ার, পাশাপাশি রাখা। চেয়ারের উপর ক্রিম রঙ এর কুশন রাখা বসার জন্য। পাশে একটা বেশ লম্বা এবং চওড়া বুকশেলফে অসংখ্য বই। ওদের সোফার সামনে একটা ছোট সাইজের নিচু টেবিল। তার উপর অনেকগুলো ম্যাগাজিন রাখা যেগুলোর বেশিরভাগই ইংরেজী। কিছু দৈনিক বাংলা পত্রিকাও আছে তার ভেতর।

টেবিলের নিচে একটা ছোট মতো  তাক আছে, সেখানে অনেক ধরনের শো পিস রাখা যদিও বেশ ময়লা হয়ে আছে। হাসান ম্যাগাজিনগুলো থেকে একটা তুলে নিয়ে বললো , বেশ চুপচাপ বাসাটা, তাই না?

হাসানের প্রশ্নটা আসলে ছিলো নিজের সাথে কথা বলার মতো । বাসাটা যে যথেষ্ঠ রকমের চুপচাপ সেটা এ বাড়িতে পা দিলে যে কেউ বুঝবে। হাসান এই নিরবতা ভঙ্গ করার জন্যই প্রশ্নটা করেছে। ত্রিরঞ্জন মাথা নেড়ে জানালো, হ্যাঁ। আচ্ছা! উনি কি একা থাকেন এই বাড়িতে? আর কেউ থাকেন না?

একাই থাকেন, তাই তো বললেন। উনি সাধারণত ইংল্যান্ডেই থাকেন, দুই তিন বছরে একবার নাকি আসেন দেশে। এর বেশি উনার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না। সকালে যখন এসেছিলাম টাকা নিতে, তখন বলেছিলেন এসব কথা। এর বেশি কিছুই আমার জানা নেই। আসলে উনি তোর সাথে দেখা হওয়ার ব্যাপারেই মনে হলো বেশি আগ্রহী। আর আমিও উনাকে তেমন কিছুই জিজ্ঞাসা করিনি।

মোস্তফা সাহেব এরই মধ্যে একটা ট্রেতে করে তিন মগ চা নিয়ে এলেন, সাথে কয়েকটা মুড়ির মোয়া। টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বললেন, এই মুহূর্তে ঘরে তেমন কিছু না থাকলেও এই মোয়াগুলো ছিলো। এটা আমার খুব পছন্দের একটা খাবার। এই মোয়াগুলো খেতে দারুন। নিউমার্কেটের পিছনের দিকের গেটে একটা ছেলে বিক্রি করে এই মোয়াগুলো, ওর মা নাকি বানায়। দারুন সুঃস্বাদু হয়। প্লিজ, একটু খেয়ে দেখেন। আমার মনে হয় খুব ভালো লাগবে।

কাঠের ট্রে টা দেখে আবার ত্রিরঞ্জনের মনে হলো রোমান কোনও তৈজসপত্র। কিন্তু এমন মনে হওয়ার কোনও কারণই নেই। এটা ঠিক যে,কাঠের ট্রে-টা একটু অন্যরকম। যেমন এটার পেটের ভেতরটা বেশ গভীর। আর ভেতরে কাঠের উপর খোদাই করা আছে রোমানদের সময়ে ব্যবহৃত সোনার ত্রিফল, কাঠের পিঁপে, খড়মের মতো  ফিতা বাঁধা জুতা, তীর-ধনুক, বাঁশির মতো  কিন্তু বেশ বড় আকারের মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট, যুদ্ধের সময়ে ব্যবহার করা হয় এমন মুখোসের ছবি। দেখেই বোঝা যায় নিঁখুত হাতের কাজ।

মোয়াগুলো দেখেই মনে হলো আসলেই খুব ভালো হবে খেতে। ট্রে থেকে কাঁচের পাত্রটা নিলো ত্রিরঞ্জন। নিজে একটা মোয়া নিয়ে হাসানের দিকে বাড়িয়ে দিলো পাত্রটা। মোয়াটায় একটা কাঁমড় দিলো, ওর কাছে মনে হলো এর চেয়ে অমৃত আর কিছু নেই পৃথিবীতে। মুড়িগুলো একদম মুড়মুড়ে আর সাথের গুড়টা মনে হয় পৃথিবীর সেরা মিহি গুড়। এতো সুন্দর মোয়া আসলেই ত্রিরঞ্জন কখনও খায় নি।

ইউনিভার্সিটিতে থাকার সময় একবার কয়েকজন মিলে ঘুরতে গিয়েছিল ভান্ডারিয়ার দিকে। সদরঘাট থেকে দুইটা কেবিন নিয়ে একটা বড় লঞ্চে করে সোজা বরিশাল। তারপর ঝালকাঠি পার হয়ে ভান্ডারিয়া। ওখানে ওদের এক বন্ধুর মামার বিশাল এক বাংলো বাড়ি ছিলো। বাড়িটা থেকে বেরিয়ে রাস্তার মোড়ে আসলেই একটা দোকান। চা, মুড়ি, চানাচুর, মোয়া, কলা, সিগারেট আর অল্প বিস্তর কিছু দৈনন্দিন জিনিসপত্র পাওয়া যায় দোকানটাতে। সেবারও অসাধারণ কিছু মোয়া খেয়েছিল ও। এখনও মুখে লেগে আছে ওটার স্বাদ। এই মোয়াটা অনেকটাই সেরকম। তবে আরও বেশি সুস্বাদু, আকারে একটু বড় আর খুব বেশি মুড়মুড়ে।

হাসান একটা মোয়া নিয়ে পাত্রটা ট্রে-তে রেখে দিলো। অনেকটা চোখ বন্ধ করেই নিবিষ্ট চিত্তে মুড়ির মোয়ায় কাঁমড় দিলো। মনে হলো মুড়ির দানাগুলো ওর দাঁতের ফাঁকে এসে মিহি হয়ে গেল এক কাঁমড়ে। এতো দারুন মিষ্টি গুড় মনে হয় ঢাকায় পাওয়া অসম্ভব। প্রথম কাঁমড়টা দেবার পর একটু থামলো। তারপর বললো , আপনার এই আবিস্কারের জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমি অবশ্যই এই মোয়া কেনার জন্য নিউমার্কেটে যাবো একবার। আমার বাবার খুব প্রিয় এই মুড়ির মোয়া।

……    চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (১৮) »

জন্ম ২৪ শে মে যশোর। শৈশব, বাল্যকাল ও তারুন্যের একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লেখার মধ্যমে। স্কুল ম্যাগাজিন অগ্রজ, যশোর শিশুসাহিত্য কেন্দ্রের কিশোরমেলা, কলেজের ক্র্যাচ এবং দেশের বিভিন্ন দৈনিকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত কবিতা ও গল্প। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন “সময়” সংকলন এবং নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিমানের পাইলট ও ক্যাপ্টেনদের ককপিট ইন্সট্রুমেন্টেশান প্রশিক্ষক ও পরবর্তীতে জার্মানী থেকে ইনফরমেশন ও কমুউনিকেশন্স এ উচ্চশিক্ষা গ্রহনের পর আই.বি.এম ও বিভিন্ন গ্লোবাল কোম্পানিতে আই টি স্পেশিয়ালিষ্ট হিসাবে কর্মরত। পেশাগত কারনে দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে বিরত থাকার পর আবার সাহিত্যের অঙ্গনে প্রত্যাবর্তন কবিতা,গল্প, উপন্যাস ও গবেষনা ভিত্তিক প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রবাস জীবনে বিভিন্ন ব্লগে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করেন।

ব্যক্তিজীবনে ভীষন বন্ধুভাবাপন্ন, অত্যন্ত সদালাপী এবং আড্ডাপরায়ণ। বর্তমানে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সন্তানকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের মিডল্যান্ডের মার্সটন গ্রিনে।

Comments

comments