অদ্ভুত ছবিগুলো (১৬)

0
316
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (১৫) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

এই বৃষ্টির ভেতর হেঁটে হেঁটে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। যদিও হাসানের এখান থেকে মিনিট দশ-বারো হাঁটলেই ভদ্রলোকের বাসা। বৃষ্টি না থাকলে হয়ত হেঁটেই যাওয়া যেতো। কিছুক্ষণ হলো দুই বন্ধু মার্কেটের নিচের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কোনও রিক্সা এখন যাবে না। কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করেছিল হাসান। কিন্তু হাত নেড়ে না করে দিয়েছে তারা। দূপুরের এই সময়টায় এমনিতেই রিক্সা পাওয়া চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো  একটা ব্যাপার। তার উপর আবার লাগাতার বৃষ্টি। বেশিরভাগ রাস্তায় পানি জমে গেছে এরই মধ্যে।

আইসক্রিম আর বাংলাদেশের রাস্তার মধ্যে হাসান কোনও পার্থক্য দেখতে পায় না। দুটোই সময়ের সাথে সাথে গলে গলে খুলে পড়ে। ইউরোপের অনেক দেশেই বছরের বেশিরভাগ সময়ে বরফ আর বৃষ্টি থাকে। তারপরও তো ওদের রাস্তা এইভাবে আইসক্রিমের মতো  খুলে পড়ে না! আর এখানে রাস্তাতো দূরের কথা, একটা ব্রিজ উদ্বোধনের আগেই বাতাস লেগে বাঁকা হয়ে যায়। সারা ঢাকা শহর অ্যাপার্টমেন্টে ভরে গেছে। কনস্ট্রাকশানের কাজের কারণে প্রত্যেকটা রাস্তাভাঙ্গা। একটু বৃষ্টি হলেই থৈ থৈ পানি।  কি অদ্ভুত ব্যাপার!

ওদেরকে অবাক করে দিয়ে একটা সিএনজি এসে থামলো ঠিক ওদের সামনে। অন্য কেউ এগিয়ে আসবার আগেইহাসান হাত উঁচু করে ইশারা করলো। ড্রাইভার মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দিলো। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, একটা সিএনজি পাওয়া গেল। ত্রিরঞ্জন আগে উঠলোওটায় তারপর হাতের সিগারেটটা ফেলে হাসান উঠে পড়লো। ড্রাইভারকে ঠিকানাটা জানিয়ে হেলান দিয়ে বসলো হাসান।

হঠাৎ করেই মাথাটা আবার এলোমেলো লাগছে ত্রিরঞ্জনের কিন্তু খুব ক্ষনিকের জন্য। হাসানের সাথে অনর্গল কথা বলার জন্যই হয়ত মাথায় ঢুকতে যেয়েও কিছু কিছু ভাবনা বাইরে থেকেই চলে যাচ্ছে। একটু হলেও অস্বস্তি হচ্ছে। ঢেউ এর কথা ভাবলো। একমাত্র ঢেউ আর ও নিজে ছাড়া ওর এই অভিজ্ঞতার কথা এখনও পর্যন্ত অন্য আর কেউ জানে না। মামাকে ভয়ে বলা হয়নি কখনও। ওকে নিয়ে মামা বেশি সংবেদনশীল।

কি-রে চুপ হয়ে গেলি কেন তুই? জানতে চাইলো হাসান।

ভাবছিলাম কেন উনি আমার সাথে দেখা করতে চান। যদি ছবিএঁকে দিতে বলেন তাহলেই তো বিপদ। তুই তো জানিস যে, আমি তো ওভাবে কোনওদিন ছবি আঁকিনি। এইসব ভাবছিলাম। ওর ভাবনার সবটা হাসানকে বলা হলো না। হাসান হয়ত অবিশ্বাস করবে না ওর কথা কিন্তু তবু ঠিক সাহস হয়না। কিসের যেন একটা দ্বিধা কাজ করে। অনেকবার বলতে যেয়েও বলতে পারেনি ওর ওই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা।

আমিওতাই ভাবছিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো ভদ্রলোককে এটা বোঝানো মুশকিল হবে। আমার নিজের উপরই রাগ হচ্ছে। কেন যে বলতে গেলাম যে শিল্পীকে আমি চিনি। যাই হোক চল তো আগে,  দেখা যাক কি বলেন উনি। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করা যাবে। দরকার হলে উনাকে অন্য শিল্পীর কাছে নিয়ে যাবো যদি ছবি আঁকিয়ে নিতে চান।

বোকার মতো  কথা বলছিস তুই! অন্য কাউকে দিয়ে ছবি আঁকাতে চাইলে উনি তো আর আমাকে খুঁজতেন না।

হু, সেটাও ঠিক। কিন্তু উনি যদি উনার নিজের কোনও পোট্রেট তোকে দিয়েই আঁকাতে চান তাহলেই সমস্যা।

বৃষ্টির ভেতর সিএনজির দুই পাশের পর্দা না থাকলে ভিজে কাক হয়ে যাওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না। কিন্তু এই সিএনজিটার দুইপাশে খুব সুন্দর পর্দা দেওয়া। একফোঁটা বৃষ্টি ভেতরে আসার উপায় নেই।

সাতাশ নম্বরের মাথায় এসে বায়ে বাঁক নিতেই হাসান বলে দিলো কোন গলিতে ঢুকতে হবে, তারপর কোথায় থামতে হবে। ঢাকা শহরে সিএনজি, রিকসা যারা চালায় এদের প্রত্যেককে এক একজন চলমান স্যাটন্যাভ মনে হয়। ঠিকানা দিয়ে দিলেই এরা পথ ভুল না করে খুব সহজেই সঠিক বাসাটার সামনে এসে হাজির হয়।

সিএনজিটা এসে দাঁড়ালো বাড়িটার সামনে। ভদ্রলোকের বাসাতেই থাকার কথা, তেমনটাই বলেছিলেন। হাসান ভাড়া দেওয়ার আগেই ত্রিরঞ্জন পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে ভাড়াটা দিয়ে দিলো ড্রাইভারকে। এই একটা ব্যাপারে ত্রিরঞ্জনের সাথে কেউই পেরে উঠেনা। রিকসা, সিএনজির ভাড়া, রেষ্টুরেন্টের বিল সবসময় ওকেই দিতে হবে। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই কাজটা করে ত্রিরঞ্জন।

হাসানের মনে পড়লো ইউনিভার্সিটির দিনগুলো। সেসময় প্রতিটা টাকা হিসাব করে খরচ করতে হতো। ওর নিজের অবস্থা বরাবরই টানাপোড়েনের ভেতর কেটেছে। টিউশানির কয়েকটা টাকাই ওর সম্বল ছিলো। কিন্তু তবুও ও নিজে কখনও কার্পন্য করতো না বিল দেওয়ার সময়। অথচ দেখতো বাড়ি থেকে ভালো হাত খরচ পেয়েও ওদের অনেক বন্ধু-বান্ধব পকেটে হাতই দিতো না। আর ত্রিরঞ্জন কোনওদিনই টাকার হিসাব করেনি। কখনও ভাবেনি কে দিলো আর কে দিলো না। আর এটা নিয়ে কখনও গর্বও করেনি ত্রিরঞ্জন। এখন এটা হাসানের অভ্যাস হয়ে গেছে। জানে বললেও কাজ হয় না। তাই এখন আর ভাড়া দেওয়া নিয়ে কোনও যুদ্ধে যায় না হাসান।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বেলটা টিপতেই দোতালার বারান্দায় দেখা গেল ভদ্রলোককে। দূর থেকে ওদের দিকে হাত উঁচু করলেন।

একটু স্বস্তি পেল হাসান। এই বৃষ্টি টপকে ত্রিরঞ্জনকে সাথে নিয়ে এসে যদি দেখতে হতো উনি বাসায় নেই তাহলে খুব খারাপ লাগতো। আসলে এতো দাম দিয়ে ছবিটা কেনার জন্যই হয়ত হাসান এক ধরনের মানবিক দায়িত্ব অনুভব করছে ত্রিরঞ্জনের সাথে উনার দেখা করিয়ে দেওয়ার জন্য। তাছাড়া এই ছবিটার প্রতি চুম্বকের মতো  এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়ে আছে হাসানের মনে।

মুগ্ধ হয়ে ত্রিরঞ্জন দেখছে বাড়িটার সামনের খোলা অংশটা। কি সুন্দরভাবে সারিসারি গাছ লাগানো সুরকি বিছানো লাল রঙের রাস্তাটার পাশে। সুরকির ঠিক পাশ ঘেষে তিন কোনা পাথরের সারি রাস্তাটার পাশে। সাদা রঙ করা। দেখলেই মনে হয় যেন পুরনো কোনও রোমান নগরীর রাস্তা। হাসানের কাছে শুনেছে ভদ্রলোক নাকি একাই থাকেন ইংল্যান্ডে আর এখানে মাঝে মাঝে আসেন। এতবড় বাড়িতে কেউ থাকে না অথচ কি সুন্দর ভাবে সবকিছু গুছিয়ে রাখা। কোথাও কোনও জঙ্গল বা আগাছা চোখে পড়লো না। এমনকি লাল রঙের রাস্তাটার উপরও কোনও গাছের পাতা পড়ে নেই। ধবধবে সাদা রঙ করা বাড়িটার, যেন এই মুহূর্তে কেউ এসে সব পরিস্কার করে গেছে।

বৃষ্টির তোড়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুজনে ভিজে গেল। গেটের উচ্চতা ওদের বুক বরাবর কিন্তু ভেতর থেকে বন্ধ তাই চাইলেও ঢুকতে পারছেনা। ওদেরকে বেশিক্ষন ভিজতে হলো না। খুব দ্রুত ভদ্রলোক চলে এলেন গেটের কাছে। ওদেরকে একটা ছাতা ধরিয়ে দিয়ে লজ্জিত মুখে বললেন, আমি খুবই লজ্জিত যে একটাই অতিরিক্ত ছাতা আছে। খুব দ্রুত ভেতরে চলে যান, আমি গেটটা বন্ধ করে আসছি।

ওরা দুজন ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। ত্রিরঞ্জনের মনে হলো ও যেন সত্যিই কোনও রোমান নগরীর ছোট একটা রাস্তায় হাঁটছে। শুধু পার্থক্য ওরা হাঁটছে একটা সুরকী বিছানো রাস্তায় আর রোমানরা ব্যবহার করতো পাথর।

হাসান, তোর কাছে কি মনে হচ্ছে যে আমরা একটা রোমান শহরে চলে এসেছি? ছাতাটা একটু উঁচু করে ধরে আছে ত্রিরঞ্জন আর ওর ঠিক পাশে পাশে হাঁটছে হাসান।

মাথাটা ঝাঁকিয়ে হাসান বললো , হঠাৎ তোর রোমান শহরের কথা মনে হলো কেন? আমি তো আগেও একবার এসেছিলাম, কই আমারতো এসব মনে হয়নি!

কেন মনে হলো বলতে পারবা না। কিন্তু বাড়িটার সামনে এসেই আমার এটা মনে হয়েছে। আমিতো আর রোমান সভ্যতার কোনও শহরে যায়নি! হতে পারে কোনও বইয়ে পড়েছি ঠিক এমন কোনও বর্ণনা। বলতে বলতে ছাতাটা বন্ধ করে বারান্দার পিলারের পাশে রাখা গোলাকৃতি একটা হুকের সাথে ঝুলিয়ে দিলো ত্রিরঞ্জন।

ছাতার শেষপ্রান্ত থেকে ঝরে পড়া পানি একটা বড় মাটির হাড়ির ভেতর পড়ছে। বাহ! দারুন একটা ব্যবস্থা তো। এমন জিনিস সে আগে কখনও দেখেনি। ত্রিরঞ্জন খুব অবাক হয়ে জিনিসটা দেখছে। ইশারায় হাসানকে দেখালো ছাতা রাখার ব্যবস্থাটা।

একটু পরেই ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন ওদের পাশে। ত্রিরঞ্জনের বিস্ময় দেখে বললেন, এটা আমার বাবা বানিয়েছিলেন। ছাতা রাখার রিংটা অনেক আগের কিন্তু হাঁড়িটা নতুন। আগের হাঁড়িটা ছিলো মাটির এবং ভেঙ্গে গিয়েছিল। আমার নিজেরও জিনিসটা খুব পছন্দ। বাড়ির ভেতর ছাতা থেকে ঝরে পড়া পানি পড়ে না।

আসুন ভেতরে আসুন। আমি আপনাদের জন্য শুকনো তোয়ালে নিয়ে আসি, মাথাটা একটু মুছে নেবেন। এই বৃষ্টির পানি মাথায় বসে গেলে সর্বনাশ। তখন আবার আমাকে গালি দিবেন হয়ত। বলেই হো হো করে প্রানখোলা হাসি দিলেন তিনি।

ভদ্রলোককে অনুসরণ করে ওরা ড্রয়িং রুমে এসে ঢুকল। ড্রয়িং রুমের দরজাটা বারান্দার সাথেই, দুই দিকের জানালা খুলে দিলে পুরো আকাশটা দেখা যায়। এখন অবশ্য বৃষ্টির ছাঁট আকাশটাকে ঢেকে দিয়েছে। ওদেরকে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে ভদ্রলোক ভেতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষনের ভেতর দুইটা শুকনো তোয়ালে নিয়ে এলেন। মাথা মুছে তোয়ালে দুইটা ফেরত দিলো ওরা। এক হাতে তোয়ালে নিয়ে ভদ্রলোক অন্য হাতটা ত্রিরঞ্জনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

আপনার সাথে এখনও পরিচয় হয়নি। আমি মোস্তফা জামান। হাসানের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, আপনার বন্ধুর কাছে শুধু জেনেছি আপনি অসাধারণ ছবি আঁকেন। আপনার আঁকা ছবিটা অবশ্য সেটা যথেষ্ঠই প্রমান করে। আপনার বন্ধু না বললেও এটা যে কেউ বুঝে নেবে আপনার আঁকার হাত কতোটা অসাধারণ।

ত্রিরঞ্জন একটু লজ্জিত ভাবে হাসল। কি বলবে বুঝতে পারল না। শুধু হাতটা সামান্য ঝাঁকি দিয়ে জানালো ওর নাম। হাসানকে দেখিয়ে মৃদু হেসে বললো , ও সবসময় একটু বাড়িয়ে বলে এই ব্যাপারে। ত্রিরঞ্জনের মাথার ভেতর ঘন্টায় একশ মাইল বেগে এখন চিন্তার ঝড় চলছে। কখনও কাউকে মিথ্যা বলতে ইচ্ছা হয় না। কিন্তু মোস্তফা সাহেবকে ঠিক কি বলবে ও জানে না। ডিপ্লোম্যাটিক পদ্ধতিতে কথা বলবে? কিন্তু ভদ্রলোকের কথা না শুনে কিছুই বলা যাচ্ছে না আসলে তিনি কি চান।

……    চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (১৭) »

জন্ম ২৪ শে মে যশোর। শৈশব, বাল্যকাল ও তারুন্যের একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লেখার মধ্যমে। স্কুল ম্যাগাজিন অগ্রজ, যশোর শিশুসাহিত্য কেন্দ্রের কিশোরমেলা, কলেজের ক্র্যাচ এবং দেশের বিভিন্ন দৈনিকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত কবিতা ও গল্প। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন “সময়” সংকলন এবং নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিমানের পাইলট ও ক্যাপ্টেনদের ককপিট ইন্সট্রুমেন্টেশান প্রশিক্ষক ও পরবর্তীতে জার্মানী থেকে ইনফরমেশন ও কমুউনিকেশন্স এ উচ্চশিক্ষা গ্রহনের পর আই.বি.এম ও বিভিন্ন গ্লোবাল কোম্পানিতে আই টি স্পেশিয়ালিষ্ট হিসাবে কর্মরত। পেশাগত কারনে দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে বিরত থাকার পর আবার সাহিত্যের অঙ্গনে প্রত্যাবর্তন কবিতা,গল্প, উপন্যাস ও গবেষনা ভিত্তিক প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রবাস জীবনে বিভিন্ন ব্লগে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করেন।

ব্যক্তিজীবনে ভীষন বন্ধুভাবাপন্ন, অত্যন্ত সদালাপী এবং আড্ডাপরায়ণ। বর্তমানে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সন্তানকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের মিডল্যান্ডের মার্সটন গ্রিনে।

Comments

comments