অদ্ভুত ছবিগুলো (১৪)

0
357
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (১৩) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

আচ্ছা, মাহেরা ! তুমি তখন বলছিলে Psychosis না কি যেন একটা নাম? ওপাশের ঘর থেকে ওসমান সাহেব জানতে চাইলেন।

আপনি Schizoid Psychosis এর কথা বলছেন স্যার?

হ্যাঁ, ওটার কথাই। ওই যে বেলজিয়ামের যে ঘটনাটা বলছিলে। কথা বলতে বলতে ওসমান সাহেব একে একে ফাইল খুলছেন আর ভেতরের তথ্য দেখে আবার রেখে দিচ্ছেন। কারণ উনি যা খুঁজছেন সেটা এখনও চোখে পড়েনি।

স্যার, Schizoid Psychosis আসলে একধরনের মানষিক অসুখ। ওই আর্টিকেলেই পড়েছিলাম, এই রোগে মানুষ তার আশেপাশের সামাজিক সম্পর্কগুলোর ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সম্পূর্ণ একা থাকার একধরনের প্রবনতা তৈরি হয়। তখন তার ভেতর কোনও রকম আবেগ কিংবা সহমর্মিতা কাজ করে না।

একই সাথে এরা তখন নিজেদের ভেতর একধরনের ফ্যান্টাসি ধরনের দুনিয়া তৈরি করে নেয়। প্রায়োজনে এরা তখন ধংসাত্বক কিংবা খুব খারাপ কাজ প্রকাশ্যে ও গোপনে করে থাকে। সামাজিক দৃষ্টিকোন থেকে যে কাজগুলো খারাপ সেগুলোর দিকে তখন এদের অবচেতন মনেই আকর্ষন তৈরি হয়। এর কোনটাই তখন এদের কাছে খারাপ বলে মনে হয় না। স্বাভাবিক যুক্তি তর্কের বাইরে চলে যায় এদের চিন্তাধারা এবং মস্তিস্কেরযৌক্তিক অংশ।

তাহলে তো মনে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই এই অসুখে ভুগছে। ওসমান সাহেব ওপাশের ঘর থেকে বললেন হাতের শেষ ফাইলগুলো রেখে। কথা বলতে বলতে এবার তিনি একদম নিচের সারির ফাইলগুলোর দিকে নজর দিলেন।

এটা ডাক্তাররাই ভালো বলতে পারবেন, তবে আমারও তাই মনে হয় স্যার। যেভাবে অবলীলায় চুরি, ঘুষ, খুন এর মতো  খারাপ কাজগুলো হয়ে যাচ্ছে তাতে তো এমনই মনে হয়। আমার কাছে আর্টিকেলটার কপিটা আছে। আপনি যদি পড়তে চান আমি পাঠিয়ে দেবো।

স্যার ! আমার তো মনে হয়, এই রুম দুটোকে আমরা ছোট একটা লাইব্রেরি বানাতে পারি। আমাদের উপরের সব অফিসরুমেই বিভিন্ন ধরনের জার্নাল, বই, এনসাইক্লোপেডিয়া এসব আছে। তবে সবগুলোই এতো বেশি এলোমেলো ভাবে রাখা যে প্রয়োজনের সময় আপনি খুঁজে পাবেন না।

আইডিয়া ভালো। দেখো যদি সময় বের করতে পারো কাজটা শুরু করেদিও। অবশ্য তার আগে এখান থেকে সব ফাইলগুলো কম্পিউটারাইজড করতে হবে। আপাতত যে তথ্য আমরা খুঁজছি সেটা আগে বের করি। আমাদের আরও কয়েকটা সাপ্লায়ার আছে যারা হয়ত SPECT সাপ্লাই দেয়। কিন্তু নতুন করে আলোচনা করে মডেলগুলোর দাম, আমাদের কমিশন, টার্মস এন্ড কন্ডিশনস সব ঠিক করতে এক সপ্তাহের বেশি লেগে যাবে। এতো সময় হাতে নেই।

ঠিক আছে স্যার। আমি সময় করে এটা নিয়ে আপনার সাথে বসবো। আগে একটা প্ল্যান দাঁড় করাবো। তারপর আপনার অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু করবো। কথা বলতে বলতে কখন যে এপাশের বুকশেলফের সবগুলো ফাইল দেখা হয়ে গেল টেরই পেল না মাহেরা।

অন্ধকার চিরে আলোর হালকা একটা রেখা অনেকক্ষণ ধরে টের পাচ্ছে সে। বিছানার এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত টানটান করে রাখা তার পরিশ্রমের ফসল। প্রত্যেকটা পদক্ষেপের আগে তাকে চুলচেরা হিসাব করতে হয়েছে। তারও অনেক আগে সম্পূর্ণ নকশা মাথায় এঁকে নিয়েছে সে। পদক্ষেপগুলো নেওয়ার আগে বারবার মাথায় সংরক্ষিত নকশার পুংখানুপুংখ পর্যালোচনা করেছে। কোথাও একচিলতে ভুল পায়নি। ধীরে ধীরে সে প্রতিটা পদক্ষেপ মেপে মেপে নিয়েছে। এই মুহূর্তে বিছানার উষ্ণতায় বসে শেষ পদক্ষেপটি নিলো সে। বাইরে থেকে আসা আলোর রেখা তাকে ক্ষ্যান্ত করতে পারেনি।

আত্মবিশ্বাসের অনুভূতি নিয়ে চঞ্চল চোখে আবার সে খুব ভালো করে দেখলো তার শিল্পসৃষ্টি। সন্তুষ্ট হয়ে এবার সে তার পেটটা টেনে উঁচু করলো নরম বিছানার উষ্ণতা থেকে। তারপর ছোট্ট চোখ মেলে কটমট করে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ বাইরের আলোর দিকে।

দক্ষ নৈপুন্যের সাথে পায়ের উপর ভর দিয়ে সমস্ট শরীর হালকা করে ফেললো সে, তারপর বয়নাঙ্গের শেষ উত্তাপ ঠান্ডা হতে দিলো। দ্রুত নিজের শিল্পকর্মের দিকে একবার তাকিয়ে শরীরটা সামনে বাড়তে দিলো সুদক্ষ খেলোয়াড়ের মতো । সামনের সরু পদক্ষেপ আলোর সীমানায় রেখে ধীর লয়ে জ্যামিতিক ছন্দে এগিয়ে নিয়ে আসলো সম্পূর্ণ শরীরটা।

ওদিকের বুকশেলফের দিকে পা বাড়াতে যেয়েও কি মনে করে ছোট বেডসাইড টেবিলের মতো  ক্যাবিনেটের দিকে তাকালো মাহেরা। এই মুহূর্তে ওর দিকে তাকিয়ে আছে ড্রয়ারের ফাঁক দিয়ে। মুখ দিয়ে চিৎকার বের হতে যেয়েও থেমে গেল গলার কন্ঠনালীর ঠিক নিচে এসে। উপরের নগ্ন বালবের থেকে একটা আলোর রেখা তীর্যকভাবে এসে পড়েছে ড্রয়ারের ঠিক মুখে। আলোর রেখা অনুসরণ করে তাকাতেই মাহেরার মস্তিস্কের নিউরনের উপর স্বতঃস্ফুর্ত এবং  সহজাত অভ্যাসে একটা চাপ পড়ে। চিৎকার থেমে গেলেও মাহেরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। নিজের অজান্তেই ওর শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের একটা শ্রোত বয়ে যায়। । 
এতো বিশাল আকৃতির মাকড়সা ও আগে কখনও দেখেনি। কিভাবে ওর দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে আছে। এখানে এই সাইড টেবিলটা বড়ই বেমানান, তারপরও এটাকে এখানে রাখা হয়েছে কেন? মাহেরা অনুভব করছে তার হৃদস্পন্দনের হার এখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি কারণ ওর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেছে।

যে কোনও ধরনের স্ট্রেস কিংবা ভীতি মানুষের নার্ভাস সিষ্টেমের উপর এমনভাবে প্রভাব ফেলে যে তখন শ্বাসঃপ্রস্বাস অতি দ্রুত হয় এবং প্রতিবার শরীর খুব কম অক্সিজেন নিতে পারে। বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে মাহেরা তার শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়িয়ে নিলো। খেয়াল রাখলো যেন খুব বেশি মাত্রায় অক্সিজেন শরীরে প্রবেশ না করে। তাহলে রক্তে কার্বন-ডাই-অক্সাইড এর মাত্রা অনেক নেমে যাবে যা ওর ভীতি বাড়িয়ে দেবে। কয়েকবার বড় করে শ্বাস নেওয়ার জন্য ওর মস্তিস্কের নিউরনে যে ভীতি ক্ষনিকের জন্য বাসা বেধেছিল সেটা আস্তে আস্তে সরে গেল।

ড্রয়ারের উপরের ফাঁকটায় আলোর রেখায় দাঁড়িয়ে মাকড়সাটা নিশ্চিত অনুভব করলো তার চুড়ান্ত সর্বনাশ। এখানে আর এক মুহুর্ত অপেক্ষা করা মানেই ভবিষ্যতের অজস্র শিল্পকর্মের অন্তিম সমাপ্তি। ক্রুর চোখে তাকিয়ে থাকলো সে কিছুক্ষণ মাহেরার দিকে। তারপর সড়সড় করে নেমে গেল ড্রয়ারের মেহগনী কাঠের পুরু তক্তা বেয়ে। ঠান্ডা মেঝের পরিবর্তে উষ্ণ কার্পেটের উপর পড়লো এক এক করে তার আটটা পা। তার মস্তিস্কের ছোট্ট ডিস্কে সংরক্ষিত স্মৃতি থেকে তথ্য বিশ্লেষন করে সে জানে এই মুহূর্তে তাকে এখান থেকে পালাতে হবে।বিপদ ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই মাকড়শাটা মাহেরার বাম পাশের বুকশেলফের পিছনে আত্মগোপন করলো।

মাকড়সাটা চলে যাওয়ার পর আরও কিছুক্ষণ মাহেরা স্থির দাঁড়িয়ে থাকলো। বড় করে শ্বাসটানার জন্য মাহেরার হৃদস্পন্দন এখন স্বাভাবিক মাত্রার সীমারেখায়। দুপা এগিয়ে টান দিয়ে উপরের ড্রয়ারটা খুলল মাহেরা। সেখানে অল্প কিছু ফাইল পড়ে আছে যেগুলো ফিতা দিয়ে বাধা। সম্ভবত দলিল জাতীয় কিছু। দেখে তাই মনে হচ্ছে। প্রথমটার ফিতা খুলতেই বুঝতে পারল ঠিকই ধরেছে ও। ওগুলো জায়গায় রেখে, নিচের ড্রয়ারের দিকে মনযোগ দিলো মাহেরা যেখান থেকে মাকড়সাটা নেমে গেছে। 

……    চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (১৫) »

জন্ম ২৪ শে মে যশোর। শৈশব, বাল্যকাল ও তারুন্যের একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লেখার মধ্যমে। স্কুল ম্যাগাজিন অগ্রজ, যশোর শিশুসাহিত্য কেন্দ্রের কিশোরমেলা, কলেজের ক্র্যাচ এবং দেশের বিভিন্ন দৈনিকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত কবিতা ও গল্প। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন “সময়” সংকলন এবং নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিমানের পাইলট ও ক্যাপ্টেনদের ককপিট ইন্সট্রুমেন্টেশান প্রশিক্ষক ও পরবর্তীতে জার্মানী থেকে ইনফরমেশন ও কমুউনিকেশন্স এ উচ্চশিক্ষা গ্রহনের পর আই.বি.এম ও বিভিন্ন গ্লোবাল কোম্পানিতে আই টি স্পেশিয়ালিষ্ট হিসাবে কর্মরত। পেশাগত কারনে দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে বিরত থাকার পর আবার সাহিত্যের অঙ্গনে প্রত্যাবর্তন কবিতা,গল্প, উপন্যাস ও গবেষনা ভিত্তিক প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রবাস জীবনে বিভিন্ন ব্লগে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করেন।

ব্যক্তিজীবনে ভীষন বন্ধুভাবাপন্ন, অত্যন্ত সদালাপী এবং আড্ডাপরায়ণ। বর্তমানে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সন্তানকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের মিডল্যান্ডের মার্সটন গ্রিনে।

Comments

comments