অদ্ভুত ছবিগুলো (১৩)

0
337
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (১২) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

তিনতালা ভবনের পুরোটাই এখন অফিস। বাইরে গাড়ি রাখা একটা সমস্যা ছিলো কারণ রাস্তাটা খুব একটা চওড়া না। ধানমন্ডি লেকের পশ্চিম পাশে সাতমসজিদ রোডের সমান্তরাল ভাবে এই রাস্তাটা। এই রাস্তার তিনদিকেই লেকটা ছড়িয়ে আছে। এই ভবনটার খুব কাছেই ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালেরঅফিস। তাই ভবনের সামনে গাড়ির জন্য জায়গা পাওয়া খুব মুশকিল।

এজন্যই নিচতলার অনেকখানি জায়গাকে পার্কিং বানানো হয়েছে। পার্কিং এর পাশ দিয়ে লিফট উঠে গেছে তিনতলা পর্যন্ত। লিফটের পাশাপাশি সিড়িও আছে। সিঁড়িটা  দোতলা পর্যন্ত উঠে থেমে গেছে। এই জন্য তিনতালায় যেতে লিফট নিতে হয়। একসময় এই ভবন দোতলা পর্যন্ত ছিলো। তিনতালাটা নতুন সংযোজন, সাথে লিফট আর নিচের এই পার্কিং এর ব্যবস্থা।

সিঁড়িটা যেখান থেকে উপরেউঠে গেছে, তার ঠিক আগেই হাতের বাম দিকে একটা ছোট্ট দরজা। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে এই দরজা খোলা হয় না। সবসময় তালা দেওয়া থাকে এখানে।

লিফটে ঢুকেই G লেখা বোতামে চাপ দিলো মাহেরা। ওর পিছনে ওসমান সাহেব দৃঢ় পায়ে এসে দাঁড়ালেন। তার হাতে একটা ফাইল। ভাবছেন, এবার সম্ভবত সময় এসেছে সবকিছু কম্পিউটারাইজড করার। পুরনো ফাইলগুলো সব কম্পিউটারে ভরে ফেললে হয়ত দুই একটা আঙ্গুলের চাপ দিলেই তার যে তথ্য দরকার সেটা পেয়ে যেতেন।

অফিসে কম্পিউটার যে নেই তা-না। তবে সেগুলোর ব্যবহার ইদানিংশুরু হয়েছে। শুধুমাত্র কোটেশান, টেন্ডার, করেসপন্ডেন্স এসবের কাজে ব্যবহার হয়। মাহেরার উদ্যোগে ইন্টারনেটএর সংযোগ নেওয়া হয়েছে যদিও তিনি নিজে কখনও ব্যবহার করেননি।

সম্ভবত ওসমান সাহেবের মনের কথা বুঝতে পেরেই মাহেরা বললো , স্যার! আপনি রাজি থাকলে আর্কাইভের পুরনো সব ফাইল কম্পিউটারাইজড করে ফেলতে পারি আমরা। আমার পরিচিত কয়েকজন আছে, যদিও সবাই এখন ইউনিভার্সিটির ছাত্র কিন্তু দারুন ওদের কাজ। খুব অল্প খরচেই কিন্তু আমরা সব ডকুমেন্ট এর ডিজিটাল আর্কাইভ করতে পারি।

আমিও তাই ভাবছিলাম। ঠিক আছে, তোমার সাথে এটা নিয়ে পরে আলোচনা করবো। আপাতত পুরনো ফাইল ঘেঁটেই ওই কোম্পানির ডিটেইলস বের করতে হবে। কথা শেষ করেই ওসমান সাহেব হাতের ফাইলটা খুললেন লিফটটের স্বল্প আলোয়।

লিফটের ভেতর উপরের দিকে দুইটা ফ্যান বরাবরের মতনই ঝড়ের গতিতে বাতাস দিচ্ছে। কিন্তু ফ্যানের ব্যস্ত পাখাগুলো থেকে বিশুদ্ধ বাতাস দুই ফুট নিচে নামার আগেই উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আর চামড়ার নিচে সেই উত্তাপের অসহ্য অনুভূতিকে বহুগুন বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যই সম্ভবত লিফটটা কচ্ছপের গতির চেয়েও ধীরে নামছে নিচে।

অপেক্ষার সময়গুলো কি সবসময় খুব দীর্ঘ হয়? খুব মন দিয়ে মাহেরা কিছুক্ষণ ফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দের উৎস খোঁজার চেষ্টা করলো কিন্তু ব্যার্থ হলো। যতবার লিফট দিয়ে উপরে কিংবা নিচে নামবে ততবারই মাহেরা এই খেলাটা মনে মনে খেলতে থাকে। প্রতিবারই সে উৎস খুঁজে পেতে ব্যার্থ হয়।

লিফট কোম্পানিকে খবর দিয়েছিল বেশ কয়েকবার। প্রত্যেকবারই ওরা ঠিক করে দিয়ে যাবার পর বেশ কিছুদিন যাবৎ ভালো থাকে তারপর আবার একই শব্দ। ওদের এক টেকনিশিয়ান জানিয়েছে যে কোনও একটা গিয়ারের বেল্ট নাকি ঢিলা হয়ে গেছে। ওটা পাল্টাতে হবে কিন্তু খরচ পড়বে অনেক। ভাবতে ভাবতেই টের পেল লিফট নিচতলায় পৌঁছে গেছে।

লিফট থামার পর দরজা খুলতে অনেক সময় লাগে। যতটা ধীরে নামছিল তারচেয়ে আরও ধীর গতিতে লিফটের দরজাটা খুলছে। লিফটের দরজা খুলতেই ওসমান সাহেব বাইরে পা রাখলেন। পিছন পিছন মাহেরা বেরিয়ে এসে পিছনে দাঁড়ালো। দুজনেই সম্ভবত নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার মতো  আনন্দ অনুভব করলো। ওসমান সাহেব একটু সরে দাঁড়ালেন মাহেরাকে সামনে যাওয়ার পথ করে দিতে।  যাও সিঁড়ির নিচের দরজাটা খুলে দিতে বলো।

সিকিউরিটির একটা ছোট ঘর আছে নিচতলায়। এখান থেকেঅফিসে কারা আসছেযাচ্ছে, সেটা মনিটর করে একটা ছেলে। ওর কাছেই দরজাটার চাবি থাকে। চাবি নিয়ে এসে মাহেরা দরজাটা খুলল। তারপর অন্ধকারের ভেতর বাম হাত বাড়িয়ে দিলো ভিতরের দেওয়ালে লাগানো সুইচ খুঁজতে। অনেকগুলো সুইচের ভেতর থেকে শেষের দুইটা সুইচ টিপে দিলো মাহেরা। কারণ এর আগেও দুই একবার ও এখানে এসেছে এবং জানে সুইচ দুইটা ঠিক কোথায়।

উঁচু ছাদ থেকে ঝুলছে দুইটা মিটিমিটে বাল্ব। আলোর বন্যা বয়ে না গেলেও প্রয়োজন মতো  পর্যাপ্ত আলো দিচ্ছে তারা। বারো বাই বারো ফুটের দুইটা রুম ভেতরে আর রুম দুটোর পশ্চিম পাশের দেয়ালে সেঁটে আছে তিন বাই তিনের দুইটা জানালা। আর্কাইভটা যতটা ছোট বলে মনে হয় আসলে ততটা ছোট নয়।

জানালার নিচে দেয়াল ঘেঁষে মেহেগনি কাঠের নিচু বুকশেলফ। এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত বিস্তৃত। দুই পাশের দেয়ালে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু বুকশেলফ। প্রথম রুমের ঠিক মাঝখানে একটা টেবিলের উপর কিছু ফাইল পড়ে আছে। একপাশে কয়েকটা ফোল্ডিং চেয়ার রাখা আছে। খুব দামী একটা টেবিলল্যাম্প রাখা আছে টেবিলে, দেখেই বোঝা যায় অনেক আগের ওটা।

অ্যান্টিক জিনিসের একটা অন্যরকম জৌলুস থাকে। কিছু অ্যান্টিক জিনিস থাকে যেগুলোর সাথে অনেক ইতিহাস আর স্মৃতিও জড়িয়ে থাকে। সেগুলোর কিছু হয় মজার, কিছু হয় স্মৃতিবেদনা দায়ক।

ওসমান সাহেব টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে দিলেন। তারপর টেবিলের উপর পড়ে থাকা ফাইলগুলোর পাশে তার হাতের ফাইলটা রাখলেন। উল্টেপাল্টে দেখে নিলেন ওখানে পড়ে থাকা ফাইলগুলো। একটা ফাইল খুলতেই দেখতে পেলেন অনেকগুলো রসিদ, হিসাবপত্র লেখা কিছু কাগজ। একটা ফাইলের ভেতর দেখলেনকয়েকটা কাগজের উপর হাতে আঁকা নকশা।

মাহেরা কোথা থেকে একটা পরিস্কার কাপড় এনে দুইটা চেয়ার মুছে টেবিলের পাশে এনে রাখলোো। তারপরজানতে চাইলো, আমরা ঠিক কি ধরনের ফাইল খুঁজছি স্যার?     

আমি নিজেও ঠিক জানি না কি ধরনের ফাইলে তথ্যটা পাব। এক কাজ করি। তুমি ভেতরের রুমটা দেখো আর আমি এই রুমটা দেখি। প্রত্যেক ফাইলের উপর মাসের নাম এবং সাল লেখা থাকার কথা।  বাইশ বছর কিংবা তার চেয়ে আগের যেসব ফাইল আছে সেগুলোর কোনও একটা হতে পারে।

টেবিলের উপর পড়ে থাকা ফাইলগুলোর সবই ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত। সম্ভবত নিচতলাটা যখন পার্কিং বানানো হয় তখনকার ওগুলো। ওসমান সাহেব বাম দিকের দেয়ালের বুকশেলফ থেকে শুরু খোঁজা শুরু করলেন। মোট সাতটা তাক আছে এটার। সবচেয়ে উপরের তাকে এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত কালো রঙের ফোল্ডার সাজানো। বামদিক থেকে প্রথম চারটা ফাইল তুলে নিলেন তিনি। এই ফাইলগুলোর উপরে কিছু লেখা নেই। তারমানে খুলে দেখতে হবে ভেতরে কি আছে।

মাহেরা প্রথমে একবার উপর থেকে নিচের তাকের দিকে খেয়াল করলো। কোনও নাম কিংবা তারিখ চোখে পড়লো না ফাইলগুলোর পাশে। ভেতরের রুমেও একটা টেবিল রাখা আছে কিন্তু আশেপাশে  কোনও চেয়ার নেই। বাইরের রুমটার মতো  একই ভাবে এই রুমটায় তিনিটা বুকশেলফ। বেডসাইড টেবিলের মতো  দেখতে ছোট একটা টেবিল আছে এই রুমে। কিন্তু সেটা ভয়াবহ ধুলায় ঢাকা।

মাঝখানের দরজার দিকে মাথাটা একটু কাত করে মাহেরা জানতে চাইলো, স্যার! কোনও প্যাটার্নে কি ফাইলগুলো রাখা? তাহলে বুঝতে সুবিধা হতো কোথা থেকে শুরু করবো।

তুমি ওইপাশের একদম উপরের তাকের জানালার দিক থেকে শুরু করতে পারো। আগের দিকের ফাইলগুলো উপরের তাকে থাকার কথা কিন্তু ভেতরে না দেখে বলা মুশকিল। একসাথে চার-পাঁচটা করে ফাইল নামিয়ে আনো। দেখা শেষ করে আবার আগের জায়গায় রেখে দাও।

ঠিক আছে স্যার, ওভাবেই দেখছি আমি। একে একে উপরের তাকের সবগুলো ফাইলে খুব দ্রুত চোখ বোলাল মাহেরা কিন্তু SPECT এর উপর কিছুই পেল না। এরপর অন্য তাকের ফাইলগুলোতেও দেখলো। কিন্তু বেশিরভাগ ফাইলই ফার্মা ইকুইপমেন্টের উপর। এর আগে যে কয়েকবার এসেছে এখানে, কখনই ওকে এই ঘরে আসতে হয়নি। প্রথম ঘরটাতে জানালার নিচের বুকশেলফের উপরের তাকে সব ফাইল রেখেছে, তারপর চলে গেছে। 

……………… চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (১৪) »

জন্ম ২৪ শে মে যশোর। শৈশব, বাল্যকাল ও তারুন্যের একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লেখার মধ্যমে। স্কুল ম্যাগাজিন অগ্রজ, যশোর শিশুসাহিত্য কেন্দ্রের কিশোরমেলা, কলেজের ক্র্যাচ এবং দেশের বিভিন্ন দৈনিকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত কবিতা ও গল্প। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন “সময়” সংকলন এবং নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিমানের পাইলট ও ক্যাপ্টেনদের ককপিট ইন্সট্রুমেন্টেশান প্রশিক্ষক ও পরবর্তীতে জার্মানী থেকে ইনফরমেশন ও কমুউনিকেশন্স এ উচ্চশিক্ষা গ্রহনের পর আই.বি.এম ও বিভিন্ন গ্লোবাল কোম্পানিতে আই টি স্পেশিয়ালিষ্ট হিসাবে কর্মরত। পেশাগত কারনে দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে বিরত থাকার পর আবার সাহিত্যের অঙ্গনে প্রত্যাবর্তন কবিতা,গল্প, উপন্যাস ও গবেষনা ভিত্তিক প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রবাস জীবনে বিভিন্ন ব্লগে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করেন।

ব্যক্তিজীবনে ভীষন বন্ধুভাবাপন্ন, অত্যন্ত সদালাপী এবং আড্ডাপরায়ণ। বর্তমানে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সন্তানকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের মিডল্যান্ডের মার্সটন গ্রিনে।

Comments

comments