অদ্ভুত ছবিগুলো (১২)

0
414
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (১১) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

নতুন শোরুমের জন্য একজন লোক ওর এমনিতেই দরকার হবে। বেতন বলতে আপাতত শুধু হাতখরচের টাকাটা দিতে পারে, আর এখানেই খাওয়া, থাকার ব্যবস্থা। ওর অফিস রুমের লাগোয়া বড় একটা রুম আছে। ছবির গোডাউন হিসাবে ব্যবহার করবে বলে ঠিক করেছিল। এটারই এক পাশে ছেলেটার জন্য থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। 

প্রথমদিকে একটু ভয়েই ছিলো। চেনাজানা নেই এমন একজনকে রেখে দিলো। কিন্তু এতদিনে বুঝে গেছে ছেলেটা অসম্ভব সৎ আর কর্মী ধরনের। ভাবছে ব্যবসাটা আর একটু দাঁড়িয়ে গেলে ছেলেটাকে ভদ্রসম্মত বেতন দেবে। ওর খুবই খারাপ লাগে বেতন না দিতে পেরে। এই জন্য সবসময় খেয়াল রাখে ছেলেটার নুন্যতম প্রয়োজনগুলোর দিকে।

ছেলেটাকে খাবারের কথা বলে হাসান ফিরতেই ত্রিরঞ্জন জানতে চাইলো। তুই কি জানিস কেন ওই ভদ্রলোক শুধু একটা ছবির ব্যাপারে এতো আগ্রহী হলেন?

সেটা জানি না। তবে মনে হলো ওই একটা ছবিই উনি খুব পছন্দ করেছেন। অনেকক্ষণ ধরে শোরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন আর ওই একটা ছবিই দেখছিলেন। ছেলেটাকে পাঠিয়েছিলাম একটু বাইরে। ও ফিরে আসার সময় ভদ্রলোককে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভেতরে এসে দেখতে বলে। অনেকক্ষণ ধরে ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি একটু ব্যস্ত ছিলাম হিসাবপত্র নিয়ে। ছেলেটা এসে জানাতেই বাইরে যেয়ে দেখি উনি দাঁড়িয়ে ছবিটার সামনে।

এটা ঠিক যে ছবিটা দারুন আঁকা হয়েছে। আমি নিজেও বেশ অবাক যে কিভাবে এটা সম্ভব বিশেষ করে ওই বয়সে। তারপর তো বহুদিন ওটা ষ্টোররুমেই পড়ে ছিলো। তুই চাইলি বলেই তো পাঠিয়ে দিলাম। যেহেতু অনেক আগের আঁকা, ক্যানভাসের উপর তো ধুলার পাহাড় ছিলো।

হ্যাঁ তা ছিলো। প্রথমদিকে আমারতো এতো পুঁজি ছিলো না। তাই যেসব ছবি বিভিন্ন জায়গা থেকে এনেছিলাম তার বেশিরভাগই পুরনো। সৌভাগ্যক্রমে কিছু ছবি অবশ্য নতুনও পেয়েছিলাম। পুরনো ছবি হলে আমি সবসময় ওগুলো পরিস্কার করে নেই। আমাদের দেশে তো পেইন্টিং রেষ্টোরেশানের তেমন ভালো কোনও ব্যবস্থা নেই। জাদুঘরগুলো যে পদ্ধতি ব্যবহার করে পুরনো ছবির রেষ্টোরেশান করে তাতে খরচ অনেক বেশি।

তাহলে তুই কিভাবে রেষ্টোরেশান করিস? অ্যাক্রিলিক আর ওয়েল পেইন্টিং গুলোতো খুব সেনিসিটিভ। পরিস্কার করার সময় ছবি নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে খুব সফিস্টিকেটেড পদ্ধতি ব্যবহার না করলে।

হাসান একটু হাসল। অ্যান্টিক ছবি রেষ্টোরেশানের ব্যাপারটা অবশ্য অন্যরকম কারণ সেখানে ছবি বেশি ঝকঝকে হলে সমস্যা। আবার ওরিজিনাল পেইন্টিং এর রঙ সঠিকভাবে ফুটিয়ে আনতে না পারলেও সমস্যা। তুই আমার পদ্ধতি শুনলে অবাক হয়ে যাবি। একটা পুরনো ভ্যাকুউম ক্লিনার পেয়েছিলাম এক ক্রেতার বাসায় ছবি দিতে যেয়ে। মেশিনটা সম্ভবত বাইরে থেকে আনানো কারণ আমাদের এখানে তো এসব খুব একটা পাওয়া যায় না। আর যেগুলো পাওয়া যায় তার দাম দিয়ে একশো হাসানকে কেনা যাবে।

ভ্যাকুউম ক্লিনার? এটা দিয়ে ছবি পরিস্কার হয় নাকি? ইন্টারেষ্টিং তো। একটু খুলে বলতো কিভাবে একটা ভ্যাকুউম ক্লিনার দিয়ে তুই ছবির রেষ্টোরেশান করিস! খুবই ইন্টারেষ্টিং ব্যাপার!

হয় বন্ধু! খুব ভালভাবেই হয়। অবশ্য অনেক এক্সপেরিমেন্ট করতে হয়েছে আগে। প্রথমে ভ্যাকুউম ক্লিনার দিয়ে ছবির সারফেসের সাথে একটু দূরত্ব রেখে ভ্যাকুউম করতে হয়। এভাবে বেশিরভাগ ধুলা চলে যায়। একটা গাড়ির গ্যারেজ থেকে এয়ার ব্লোয়ার আনিয়েছিলাম। এরপর ওটা দিয়ে কিছুক্ষণ বাতাস মারলেই সব ফকফকা বন্ধু।

গাড়ির এয়ার ব্লোয়ার কেন? ওটা তো মটর দিয়ে চলে, তাই না?

হ্যাঁ। মিরপুরে বাসার কাছেই বেশ অনেকগুলো গ্যারেজ আছে। ওদেরকেই তো দেখি গাড়ির এয়ার ফিল্টার পরিস্কার করছে ব্লোয়ার দিয়ে। তখনই আইডিয়াটা মাথায় আসে। একজনের কাছ থেকে একটা ধার নিলাম একদিনের জন্য। আগে পরীক্ষা করে দেখলাম। এটাতে দারুন কাজ হয়। শুধু সাবধান থাকতে হয় ছবির খুব কাছে যেন এয়ার প্রেসার দেওয়া না হয়, তাহলে ক্যানভাস ছিঁড়ে যেতে পারে।

ভালোই বুদ্ধি বের করেছিস। তারপরও হালকা একটা ময়লা থেকেই যায় যদি ছবি বেশি পুরনো হয় আর অনেক ময়লা লেগে থাকে।

তা ঠিক, হালকা একটা ময়লা তো থাকেই। তবে ওই হালকা ময়লার জন্য ছবির উপর একটা পুরনো ভাব থাকে। একটু অ্যান্টিক ভাব আর কি।

তুই তো পেইন্টিং রেস্টোরেশানের কাজও নিতে পারিস। এখনতো অনেক রকম আধুনিক পদ্ধতি বের হয়েছে, মেশিনও পাওয়া যায়।

আগে ব্যবসাটা একটু জমে উঠুক! মাথায় অবশ্য প্ল্যানটা আছে। এই প্রসঙ্গে তোকে একটা মজার ঘটনা বলি। তুই কি স্প্যানিশ আর্টিষ্ট গার্সিয়া মার্টিনেজ এর নাম শুনেছিস?

যিশুখ্রিষ্টের Ecce Homo (Behold The Man) ছবিটা যে এঁকেছিলেন?

ঠিক ধরেছিস। তুই মনে হয় জানিস যে, এই ছবিটা গির্জার জন্য অনেক গুরুত্ব বহন করে। ক্রুশবিদ্ধ করার আগে যিশুখ্রিষ্টকে ক্রুদ্ধ জনতার সামনে আনা হয় মাথায় কাঁটার মুকুট পরিয়ে। তার আগে উনাকে ভয়ংকর ভাবে চাবুক দিয়ে মারা হয়। সমস্ত শরীরে চাবুকের দগদগে ঘা আর গলায় মোটা দড়ি দেওয়া হয়। ক্রিশ্চিয়ান আর্টের বেশিরভাগই যিশুখ্রিষ্ট ও তাঁর জীবনকে কেন্দ্র করে আঁকা। ফ্রেসকো (Fresco) হচ্ছে মুরাল পেইন্টিংএর একটা পদ্ধতি। এই ফ্রেসকো  পদ্ধতিতে লাইম প্লাষ্টার, বালি আর পানি ব্যবহার করা হয়।

এতো কিছু আমি জানি না রে! এইসব তোর বিষয়বস্তু। আমি মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কিছু ফ্রেসকোর ব্যাপারে পড়েছি। কিন্তু কিভাবে এই ফ্রেসকো বানায় জানি না। Ecc Homo নিয়ে কি হয়েছে সেটাই শুনি।

খুব মজার কাহিনী। উত্তর-পুর্ব স্পেনের একটা গ্রামের গির্জার দেয়ালে প্রফেসরগার্সিয়া মার্টিনেজ যিশুখ্রিষ্টের একটা ফ্রেসকো পেইন্টিং বানিয়েছিলেন। প্রতিবছর ওই গির্জায় অনেক টুরিষ্ট আসে ছবিটা দেখার জন্য। বছর দুয়েক আগে গির্জার এক বয়স্কা মহিলা ফাদারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পেইন্টিংটা রেস্টোরেশানের কাজ করেন।

শতবছরের ধুলোময়লা আর আদ্রতার কারণে অরিজিনাল ফ্রেসকোর  এর অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। মহিলা তার ব্রাশ, রঙ, ইত্যাদি সরঞ্জাম নিয়ে ছবিটার ক্ষয়ে যাওয়া অংশ ঠিকঠাক করেন। এরপরের ঘটনা, সারা দুনিয়ায় হৈ চৈপড়ে যায়। কারণ অরিজিনাল পেইন্টিং এর পরিবর্তে এখন সেটাকে মনে হয় একটা বানরের মাথায় কাঁটার মালা। এখন এটা আর পেইন্টিং নেই। মনে হয় বাচ্চাদের ক্রেয়নদিয়ে করা আঁকিবুকি। ধর্মীয় অনুভূতির কোথায় যেয়ে লেগেছে বুঝতে পারছিস?

হা হা হা ! আসল পেইন্টিং এর এই অবস্থা? এরপর তো মহিলার জীবন ভয়াবহ হয়ে যাওয়ার কথা। মিষ্টার বিন এর একটা মুভি দেখেছিলাম। সেখানে এইভাবে একটা অরিজিনাল পেইন্টিং এর বারোটা বাজিয়ে দেয় মিষ্টার বিন।

মিষ্টার বিনের মুভিটা আসলে বানানো হয় ওই ঘটনার পরেই। সমস্ত বিশ্বের সাংবাদিক, ক্রিটিক, কোর্ট সবাই হামলে পড়ে ওই মহিলার উপর। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, আগে চার্চটা প্রদর্শন করা যেতো বিনামুল্যে আর এখন সেখানে টিকিট চালু করা হয়েছে।

বিনামুল্যের যেখানে ঢোকা যায় সেখানে কেন পয়সা দিয়ে ঢুকতে যাবে? তাও আবার গ্রামের ওই ছোট গির্জায়? কেন, বিশেষ কোনও পরিবর্তন এনেছে ওরা?

বিশেষ কারণ? এর চেয়ে ভয়াবহ বিশেষ কারণ আর কি থাকতে পারে? আমার এখানে কয়েক ধরনের ম্যাগাজিন আসে। তারই একটায় ফ্রান্সের এক জার্নালিষ্ট এই ঘটনার উপর একটা বিস্তারিত বর্ণনা ছাপে। এরপর সাড়া পড়ে যায় সারা বিশ্বে। বিবিসি থেকেও বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়া হয় এই ছবির উপর।

বলিস কি? এতো বড় ঘটনা অথচ একবারও জানতে পারলাম না?

তোর জানার কথাও না, কারণ তুই তো এইসব পত্রিকা-ম্যাগাজিন থেকে বরাবরই দূরে থাকিস। আমি নিজেও জানতাম না। পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ চোখে পড়লো। এই ঘটনার বিবরনের সাথে ওরিজিনাল আর নতুন ছবিটাও দিয়েছিল।

ওই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর টুরিষ্টের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে গেছে ওই গির্জায়। এরই মধ্যে বেরিয়ে গেছে নানা রকমের স্যুভেনির, অরিজিনাল আর রেস্টোরেটেড পেইন্টিং এর কপি। কেউ কেউ আবার ওই মহিলার ছবিও বিক্রি করছে সেই পেইন্টিং এর সাথে সাথে। শুনলে অবাক হবি যে একটা সুভেনির বেরিয়েছে ওই মহিলা আসল ছবিটাকে রঙ-ব্রাশ দিয়ে কিভাবে কুৎসিত বানাচ্ছে।

হা হা হা ! হাসতে হাসতে ত্রিরঞ্জনের কাশি উঠে গেল। এই প্রথম মনে হলো জীবনটা মনে হয় অনেক হাসির আর মজার। হাসি থামতেই ত্রিরঞ্জন জানতে চাইলো, ওই মহিলার কি অবস্থা? কোনও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তার বিরুদ্ধে?

ঘটনা প্রথমে জানাজানি হওয়ার পরে সে ভীষণ ভয়েই ছিলো। প্রথমে বেচারা মানসিক ভারসাম্য হারানোর মতো  একটা ভাব ধরে ছিলো। কিন্তু টুরিষ্ট বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন সে রয়ালটি মানি চেয়ে বসে আছে গির্জার কাছে। মহিলার উকিল গির্জার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়ে বসে আছে। হা হা হা। মজার না ঘটনাটা?

………………..চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (১৩) »

জন্ম ২৪ শে মে যশোর। শৈশব, বাল্যকাল ও তারুন্যের একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লেখার মধ্যমে। স্কুল ম্যাগাজিন অগ্রজ, যশোর শিশুসাহিত্য কেন্দ্রের কিশোরমেলা, কলেজের ক্র্যাচ এবং দেশের বিভিন্ন দৈনিকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত কবিতা ও গল্প। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন “সময়” সংকলন এবং নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিমানের পাইলট ও ক্যাপ্টেনদের ককপিট ইন্সট্রুমেন্টেশান প্রশিক্ষক ও পরবর্তীতে জার্মানী থেকে ইনফরমেশন ও কমুউনিকেশন্স এ উচ্চশিক্ষা গ্রহনের পর আই.বি.এম ও বিভিন্ন গ্লোবাল কোম্পানিতে আই টি স্পেশিয়ালিষ্ট হিসাবে কর্মরত। পেশাগত কারনে দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে বিরত থাকার পর আবার সাহিত্যের অঙ্গনে প্রত্যাবর্তন কবিতা,গল্প, উপন্যাস ও গবেষনা ভিত্তিক প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রবাস জীবনে বিভিন্ন ব্লগে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করেন।

ব্যক্তিজীবনে ভীষন বন্ধুভাবাপন্ন, অত্যন্ত সদালাপী এবং আড্ডাপরায়ণ। বর্তমানে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সন্তানকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের মিডল্যান্ডের মার্সটন গ্রিনে।

Comments

comments