অদ্ভুত ছবিগুলো (১১)

0
299
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
আলী আহসান রচিত অদ্ভুত ছবিগুলো উপন্যাস
Print Friendly, PDF & Email

অদ্ভুত ছবিগুলো (১০) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

ঢেউ এর কাছে শুনলাম তুই নাকি আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিস! গতকাল শুনলাম মুকুলের কাছে। কেন রে?

বলছি, আগে একটু চা খাই তোর সাথে বসে। চা চলবে তো এখন?

তা দিতে পারিস! যদিও ঢেউ এর সাথে বসে এরই মধ্যে দুই মগ খাওয়া হয়ে গেছে কিন্তু তবুও ইচ্ছা হচ্ছে। 

উঠে যেয়ে ওর অফিসের কোনায় দাঁড়িয়ে দুই মগ চা বানালো হাসান, কথা বলতে বলতে। 

তোর ব্যবসা কেমন চলছে রে? শোরুমটা তো বেশ সুন্দর করেই সাজিয়েছিস!

ব্যবসা খুব একটা খারাপ যাচ্ছে না। বেশ কিছুনিয়মিত ক্রেতা আছে। এছাড়া মাঝে মাঝেই সৈখিন ক্রেতারা আসেই। ছবির ব্যবসার জন্য এই জায়গাটা মনে হয় ভালো। 

এই মার্কেটটা বেশ চালু। ছবি কেমন পাচ্ছিস?

তুই তো সেই কবে কয়েকটা ছবি পাঠিয়ে দিয়ে চুপ হয়ে গেলি। নতুন কোনও ছবি এঁকেছিস? 

না-রে! নতুন আর তেমন আঁকা হয়নি। তুই তো আমার সমস্যাটা জানিস। নিয়মিত আঁকা আমাকে দিয়ে মনে হয় কখনই হবে না। 

তা আর বলতে! তবে তোদের ইউনিভার্সিটির কয়েকজনের কাছ থেকে ভালো ছবি পাই নিয়মিত। ছেলেগুলো ভালই আঁকে, আমারতো তা-ই মনে হয়। দেখা যাক কতদূর যাওয়া যায়। 

চেষ্টা চালিয়ে যা, দেখিস একসময় খুব ভালোই চালু হয়ে যাবে। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। 

কথা বলতে বলতে ড্রয়ার থেকে গোল্ডলিফের প্যাকেটটা বের করলো হাসান। তারপর আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল সে। জানালাটা সামান্য খোলা রেখেছে যেন ধোঁয়াটা বের হয়ে যায়। পুরোটা খুলে দিতে পারলে ভালো হতো কিন্তু বৃষ্টির ছাঁট আসছে। 

তারপর চিবুকটা সামান্য উঁচু করে ঠোঁট গোল করে জিহ্বার সামনের অংশ দিয়ে খুব মৃদু একটা ধাক্কা দিলো ধোঁয়া বের করার সময়। এটা তার অভ্যাস। খুব সুন্দর তিনটা ধোঁয়ার বলয় বেরিয়ে গেল।

প্রথম বলয়টা একটু পরেই আকৃতি বড় হয়ে পরের বলয়টাকে নিজের পেটের ভেতর টেনে নিলো। এই ভাবে ভেতরের দ্বিতীয় বলয়টা পরের বলয়টাকে টেনে নিলো নিজের ভেতরে। হালকা নীলচে ধোঁয়ার তিনটা বলয় কিছুক্ষণের মধ্যেই বাতাসের প্রভাবে তাদের আকৃতি হারিয়ে ফেললো। তারপর সাপের মতো এঁকেবেঁকে চললো জানালার দিকে। জানালার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে মিশে গেল বৃষ্টির সাথে। 

খুব মন দিয়ে হাসানের ধোঁয়ার বলয়গুলো লক্ষ্য করছিল ত্রিরঞ্জন। হাসানেরপ্রিয় একটা অভ্যাস। বলয়গুলো কি সুন্দর ভাবে একটার ভেতর অন্যটা ঢুকে পড়ে। ত্রিরঞ্জন প্রায়ই ভাবে কিভাবে যে এটা করে হাসান! বলয়গুলোর নৃত্য দেখতে দেখতে Sting এর Windmills of your mind গানটার কথাগুলো মনে পড়লো। 

Round, like a circle in a circle

like a wheel within a wheel.

Never ending or beginning,

On an ever spinning wheel. 

ধোঁয়ার বলয়গুলো যেন ঠিক ওই গানটার মতো Wheel within a Wheel, Circle in a Circle. 

ধোঁয়াটা চোখের সামনে থেকে সরে যেতেই হাসান বললো, তোর ওই লাল কোট পরা মেয়েটার ছবিটা বিক্রি হয়ে গেছে। সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার হলো যিনি ওটা কিনেছেন তিনি অনেক দাম দিয়েই কিনেছেন এবং দামটা উনি নিজে থেকেই বলেছেন। ত্রিরঞ্জনকে সব কিছু বললো হাসান। এই তো আজ সকালেই উনার বাসা থেকে বাকি টাকাগুলো নিয়ে এলাম। 

কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না উনি কেন আমার সাথে দেখা করতে চান! তোর এখানে তো অনেক ছবি আছে, ওগুলো দেখেছেন উনি? 

এটা আমিও ভেবেছি। উনাকে বলেছিলাম অন্য ছবিগুলোর কথা। দেখাতেও চেয়েছিলাম কতগুলো মাষ্টারপিসের মতো কালেকশান। কিন্তু উনার অন্য কোনও ছবির দিকে তেমন আগ্রহ দেখলাম না। উনি আসলে ছবি কেনার জন্য এখানে আসেননি। একটা সুটকেস কিনবেন বলে এখানে এসেছিলেন। উনার পছন্দ মতো  কিছু না পেয়ে দোকানে দোকানে ঘুরছিলেন। হঠাৎ আমার এখানে এসেই উনি দাঁড়িয়ে গেলেন। 

তুই তো উনার বাসা চিনিস! তোর ব্যস্ততা না থাকলে আজ যাওয়া যেতে পারে। তা-না হলে আমাকে ঠিকানাটা লিখে দে, আমি অন্য কোনও একদিন ঘুরে আসবো।  

আজই চল। দেখি বৃষ্টি একটু কমে কি-না। দূপুর তো প্রায় হয়ে এলো। তুই বস, আমি দেখি ছেলেটাকে পাঠিয়ে কিছু খাবার দাবার আনাই। এই মার্কেটের নিচের তলায় বেশ কয়েকটা ভালো খাবারের দোকান আছে। বিশেষ করে সিংগাড়া, স্যান্ডউইচ, পেটিস, খিচুড়ি, তেহারী আর সুস্বাদু কেক। এখানকার সিংগাড়া আর স্যান্ডউইচ ত্রিরঞ্জনের দারুন পছন্দ। ওর মনে আছে, যেদিন শোরুমটা উদ্বোধন করলো সেদিন ত্রিরঞ্জন একাই গোটা দশেক সিংগাড়া সাবাড় করে দিলো। 

সিংগাড়ার সাথে এরা একটা চাটনীর মতো  বানায়। দেখতে অনেকটা আমের আচারের মতো  হয় কিন্তু অসাধারণ স্বাদ। গরম সিংগাড়ার সাথে ছোট ছোট করে কাটা শসা আর এই চাটনী। কোনও তুলনাই নেই এর সাথে আর কোনও খাবারের। 

দোকানের ছেলেটাকে ডেকে তিনজনের জন্য সিংগাড়া আর ক্লাব স্যান্ডউইচ আনতে বলে হাসান ফিরে এলো ওর অফিসরুমে। ছেলেটা শিক্ষিত কিন্তু ঢাকায় এসে চাকরীতে তেমন সুবিধা করতে পারেনি। কয়েকদিন না খাওয়া অবস্থায় ঘুরে ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল মতিঝিলের এক রাস্তায়। হাসান সেই সময় ওখান দিয়েই যাচ্ছিল প্রিন্টিং কোম্পানীর কাছ থেকে ওর লেটারহেড প্যাডের ডিজাইন নিয়ে আসার জন্য। 

ছেলেটাকে ওই অবস্থায় পড়ে যেতে দেখে তাড়াতাড়ি রিকসা থেকে নেমে যায় হাসান। তারপর চোখে মুখে একটু পানির ছিটা দিতেই জ্ঞান ফিরে। সবকিছু শুনে হাসান সিদ্বান্ত নেয় ছেলেটার অন্তত থাকা আর খাওয়ার একটা ব্যবস্থা তো করতে পারবে। ওর নিজেরই এখন অবস্থা ভালো না। ব্যবসার পিছনে বেশ অনেকটাই খরচ হয়ে গেছে।

………………..চলবে

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (১২) »

জন্ম ২৪ শে মে যশোর। শৈশব, বাল্যকাল ও তারুন্যের একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লেখার মধ্যমে। স্কুল ম্যাগাজিন অগ্রজ, যশোর শিশুসাহিত্য কেন্দ্রের কিশোরমেলা, কলেজের ক্র্যাচ এবং দেশের বিভিন্ন দৈনিকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত কবিতা ও গল্প। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন “সময়” সংকলন এবং নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিমানের পাইলট ও ক্যাপ্টেনদের ককপিট ইন্সট্রুমেন্টেশান প্রশিক্ষক ও পরবর্তীতে জার্মানী থেকে ইনফরমেশন ও কমুউনিকেশন্স এ উচ্চশিক্ষা গ্রহনের পর আই.বি.এম ও বিভিন্ন গ্লোবাল কোম্পানিতে আই টি স্পেশিয়ালিষ্ট হিসাবে কর্মরত। পেশাগত কারনে দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে বিরত থাকার পর আবার সাহিত্যের অঙ্গনে প্রত্যাবর্তন কবিতা,গল্প, উপন্যাস ও গবেষনা ভিত্তিক প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রবাস জীবনে বিভিন্ন ব্লগে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করেন।

ব্যক্তিজীবনে ভীষন বন্ধুভাবাপন্ন, অত্যন্ত সদালাপী এবং আড্ডাপরায়ণ। বর্তমানে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সন্তানকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের মিডল্যান্ডের মার্সটন গ্রিনে।

Comments

comments