মনুষ্যত্বের লড়াই (৯)

0
321
Print Friendly, PDF & Email

মনুষ্যত্বের লড়াই (৮) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

রিমু বললো আমি তিন মগ বানিয়ে আনছি আব্বু। ও রোমেলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললো, তুমি কি আম্মুর সাথে একটু কথা বলবে? আমার মনে হয় আম্মুর মন খুব খারাপ, ওর চেহারা দেখে ওকে খুব ক্লান্ত আর হতাশ লাগছে আব্বু!

রোমেল পিছন থেকে জুঁইয়ের কাঁদে হাত রাখলেই জুঁই রোমেলকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।

রোমেল ওকে বাচ্চাদের মত বুকে জড়িয়ে রাখলো এবং কিছুক্ষন কান্না করতে দিলো। তারপর বুক থেকে সরিয়ে সোজা করে দাড়ঁ করিয়ে জুঁইয়ের চোখ মুছিয়ে বললো, কি হয়েছে? বাংলাদেশে থেকে ফোন এসেছিল?

জুঁই কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চাদের মত ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো, মেয়েটা মারা গেছে। খারাপ মানুষদের জিতিয়ে নিজেকে পরাজিতদের দলে ফেলে চলে গেল। কেন বার বার খারাপদের জয় হয় বলো আমাকে?

রোমেল বললো, কোন মেয়ে জুঁই? এই নাও পানি খাও। তারপর আমাকে খুলে বলো।

জুঁই এতোক্ষনে নিজেকে আত্মস্থ করে বললো, তুমি চিনবে না। আমার এক ফুফাতো ভাই থাকেন পিরোজপুরে। ভাই ওখানে সরকারী চাকরী করেন আর ভাবী একটা প্রাইমারী স্কুলে চাকরী করেন। উনাদের একটা মেয়ে এবং ছেলে। মেয়েটা ক্লাস ৫ এ বৃত্তি পেয়েছিল। তখন ভাই আর ভাবী আমাদের খুলনার বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। ওর নাম ছিল সোহা, দেখতে খুবই মিষ্টি ছিল মেয়েটা। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম বড় হয়ে তুমি কি হবে সোহা?

সোহা বলেছিল, ফুপু, আমি ডাক্তার হতে চাই তাহলে আমি অনেক মানুষকে সেবা করতে পারবো।

আমি বলেছিলাম তাই বুঝি। অন্য পেশার মানুষ কি মানুষের সেবা করে না সোহা?

সোহা তখন খুব গম্ভীরভাবে বলেছিল, ফুপু! সবাই সেবা করে কিন্ত একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয় তার কাছে তখন সবকিছু গুরুত্বহীন মনে হয়। ফুপু, সুস্থ হওয়ার জন্য মানুষ প্রতিদিন ইন্ডিয়া, বিদেশের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। জমিজমা সব বিক্রি করে চিকিৎসা করে। আমি এই অসহায় মানুষের সেবা করতে চাই।

ওই ছোট মেয়ের উওর শুনে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। কারন এতো যুক্তি দিয়ে কেউ আমাকে কোনও দিন বলে নি সে বড় হয়ে কি হতে চায়। আমি ভাবীকে বলেছিলাম, ভাবী ওকে খুব ভাল শিক্ষক দিবেন এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর ঢাকায় কোচিং করতে পাঠাবেন তাহলে ঢাকা মেডিক্যালে চান্স পাবে।

সেই সোহা যখন কলেজ শুরু করে তখন থেকে কিছু ছেলে কলেজে যাওয়ার পথে ওকে খুব বিরক্ত করছিল। ভাইয়া অন্যদের কাছে বিষয়টা বলে সমাধান করতে চেষ্টা করেছিলেন। আম্মার সাথে কথা হলেই আমি সব সময় সোহার কথা জানতে চাইতাম।

গতমাসে ভাইয়া খুলনায় অফিসের কাজে আমাদের বাসায় আসেন। তখন আব্বাকে সব খুলে বলেছিলেন। সবকিছু শুনে আব্বা বললেন, এলাকার অন্যদের সাথে কথা বলতে। আব্বার কথামতো ভাইয়া উনাদের এলাকার লোকদের সাথে কথাও বলেছিলেন। এরপর গতকাল সোহা যখন কলেজ থেকে বাসায় ফিরছিল তখন কিছু ছেলে ওর গায়ের থেকে ওড়না টেনে রেখে দেয়। অপমানে, কষ্টে আর লজ্জায় সোহা কাঁদতে কাঁদতে ওড়না ছাড়াই বাড়ী ফিরে আসে।

ভাবী স্কুল শেষ করে সোহার ছোট ভাইকে নিয়ে যখন বাসায় ফিরে আসেন তখন দেখেন সোহার ঘরের দরজা বন্ধ। উনি সামান্য ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে যায়। উনি দেখেন সোহা বিছানায় শুয়ে আছে। ভাবী ওকে আর ডাকেন নি কারণ উনি মনে করেছিলেন রাতে পড়বে তাই হয়তো ঘুমাচ্ছে! কিন্ত মাগরিবের আযান দেয়ার পরও যখন উঠেনি তখন ওকে ডাকেন। কিন্তু অনেক ডাক দেয়ার পরও যখন কোনও সাড়া শব্দ পাননি তখন ভয় পেয়ে ভাবী ওর শরীরে হাত দিয়ে দেখেন সোহার পুরো শরীর বরফের মত ঠান্ডা হয়ে আছে এবং ওর মুখ দিয়ে সাদা সাদা ফেনার মত বের হয়ে আছে। ভাবী ভয় পেয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলে ভাইয়াও দৌঁড়ে আসেন। দ্রুত তিনি তার ছেলেকে পাঠান ডাক্তার আনতে। সোহার ভাই তাড়াতাড়ি ডাক্তারকে ডেকে আনে। ডাক্তার গায়ে হাত দিয়ে বলেন, দুই ঘন্টা আগেই ও চলে গেছে।

ভাবী টেবিলের উপর সোহার লেখা শেষ চিঠি পায়। চিঠিতে সোহা লিখেছিল,


 

আম্মু,

আমি জানি তোমরা কেউ কিছু করতে পারবে না। আমারও অন্য মেয়েদের মত সব স্বপ্নকে মেরে ফেলতে হবে এবং এতো কিছুর পরও সবাই আমাকেই দোষ দিবে। কারন আজ যখন ছেলেগুলি আমার ওড়না ধরে টান দিয়েছিল তখন রাস্তায় এবং দোকানে আরো অনেক লোক ছিল। অথচ ওরা মাত্র চারজন ছেলে ছিল। তারপরেও আম্মু ওরাই জিতে গেল। কেউ কোনও প্রতিবাদ করলো না। আম্মু আমি জুঁই ফুপুর মত সংগ্রামী আর সাহসী মেয়ে না। শুধুমাত্র মেয়ে হওয়ার জন্য এই অপমান আমি সহ্য করতে পারছি না আম্মু। তাই আমি তোমাদের সবাইকে মুক্তি দিয়ে চলে গেলাম। যাওয়ার আগে চিঠি লিখে রেখে গেলাম তা-না হলে এখন প্রতিবেশী, আত্বীয় থেকে শুরু করে সবাই তোমার মেয়েকে নিয়ে আরও নোংরা কথা বলবে। আমাকে ক্ষমা করে দিও। আর দোয়া করো, কারো যেন মেয়ে না হয়। কারন মেয়েরা মানুষ না । মেয়েরা শুধুই মেয়ে।

সোহা


 

ভাবী চিঠিটা হাতে নিয়ে পাথরের মত বসেছিলেন। ভাইয়া খুনলায় আম্মাকে ফোন করেছিলেন কারন এই ভাইয়াটা আমাদের বাসায় থেকে ১ বছর পড়াশুনা করেছিলেন তাই আমাদের খুব ভালবাসতেন।

জুঁই তখন বলল, রোমেল আমি প্রথম যখন তোমার উপর রাগ হয়েছিলাম, তুমি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলে। কেন আমি এতো স্বার্থপর হয়ে গেছি। আব্বা-আম্মা এমনকি তোমার আম্মার কথা ভেবেও আমি বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাইনি। রোমেল, কারনটা ছিলো শুধুই আমার রিমু। আমাদের রিমুকে আমার পাওয়া যন্ত্রনা, কষ্ট আর অপমান দিতে চাইনি। রিমুর জন্য, ওর সন্মানের জন্য আমি সবার সাথে লড়াই করতে পারি। সবাইকে ছেড়ে একা হয়ে যেতে পারি। তুমি ভেবেছো আমি আমার অতীত ভুলে গিয়েছি? না, আমি কিছুই ভুলি নাই। সব দগ দগে ঘাঁ এর মত তাকিয়ে থাকে আমার আমির দিকে। কারন আজও আমি সেই মানুষদের সব জায়গায় ঘুরে বেড়াতে দেখি। আর সেই সাথে দেখি নিজেকে বাঁচিয়ে চলা মানুষরা তাদের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে এবং পরে মেয়েটার দোষ দিচ্ছে। তুমি আমাকে ক্ষমা করো রোমেল। তুমি আমার জীবনে প্রথম পুরুষ যাকে আমি মানুষ মনে করি এবং মানুষ হিসাবে সন্মান করি। তুমি আমাকে ভুল বুঝ না। বলেই আবার কেঁদে ফেললো জুঁই।

রোমেল সবকিছু শুনে পাথরের মত শক্ত হয়ে জুঁইকে জোরে জড়িয়ে ধরে। রোমেলের মুখের চোয়াল অজানা আক্রোশে শক্ত হয়ে যায়।

রিমু ট্রেতে করে চা এবং বিস্কিট নিয়ে ঘরে প্রবেশ করেই জুঁইয়ের কথাগুলি শুনতে পায়। টেবিলে ট্রেটা রেখে দৌঁড়ে আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বলে আম্মু কেঁদো না। আমি তোমার মত সংগ্রামী হবো। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবো। তুমি কেঁদো না আম্মু।

রোমেল রিমু আর জুঁইকে জড়িয়ে ধরে দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখে তুষারপাত বন্ধ হয়ে মিষ্টি এবং ঝকঝকে রোদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। রোদের সেই ঊষ্ণতায় বরফ গলা শুরু হয়েছে। দূরে ওদের বাগানের পিছনের পাহাড়ে রেইন ডিয়ার বের হয়ে এসে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, পিছনে তার পরিবার। সেখানে ছোট দুইটা বাচ্চাও তাদের মাকে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। রোমেলের মনে হল, রেইন ডিয়ার বলছে আমিও জানি কিভাবে আমার পরিবারকে রক্ষা করতে হয়! রোমেলের মুখের চোয়াল আরও শক্ত হল। আর কোনও সোহাকে হারতে দেওয়া যাবে না। আর কোনও সোহাকে হারিয়ে ফেলা যাবে না। রোমেল মনে মনে বললো, প্রতিবাদের দিন শুরু হল। এখনই শুরু করতে হবে মনুষ্যত্বের লড়াই


রোকসানা হাবীব লুবনা রচিত ‘মনুষ্যত্বের লড়াই’ ছোট গল্পের ৯ম ও শেষ পর্ব প্রকাশিত হল। লেখিকার ভাষ্যমতে এটি তার জানা একটি সত্য ঘটনা। সম্পূর্ণ লেখা জুড়েই লেখিকা চেষ্টা করেছেন সমাজের বাস্তবতাকে তুলে ধরতে ও আমাদের আশে পাশে থাকা কিছু কুলাঙ্গার নরপশুর মুখোশ উন্মোচনের, আমরা যদি প্রত্যেকে প্রত্যেকের জায়গা থেকে অন্যায়কে অন্যায় বলতে শিখি, অন্যায়ের সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ করতে শিখি তবেই একমাত্র সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গঠন হতে পারে। আশা করি তার এই সচেতনতামূলক ছোট গল্পটি পাঠকদের ভালো লেগেছে, আপনাদের অনুভূতি আমাদের সাথে শেয়ার করুন নিচে মন্তব্যের মাধ্যমে। এছাড়াও আপনাদের নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা বা অন্য কারো সাথে ঘটা কোনো ঘটনা নিয়ে আমাদেরকে লিখুন ও অন্যদেরকেও লেখা পাঠাতে বলুন এই ইমেইল ঠিকানায়: bangalianamagazine@gmail.com


রোকসানা হাবীব লুবনা
অনুসরণ করুন

রোকসানা হাবীব লুবনা

লেখালেখি বলতে যা বোঝায় সেটা কখনই আমি লিখি না। তবে ছোটবেলা থেকেই প্রচুর সাহিত্য, জীবন ধর্মী লেখার নিয়মিত পাঠিকা। বেগম, দেশ এমন অনেক পত্রিকার একনিষ্ঠ পাঠিকা। প্রবাস জীবনে চারিপাশের মানুষদের দেখে, নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখে অনেক অনুভূতি হয়। সেগুলো মাঝে মাঝেই ইচ্চা হয় অন্যদের সাথে শেয়ার করি যেন তারা আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু নিতে পারে। যদি আমার একটা অভিজ্ঞতা অন্য কারো কাজে লাগে, এই ভেবেই লেখা। ইতিহাসের উপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাশ করার পর কিছুদিন বেসরকারী চাকরিতে ছিলাম। এরপর ফ্যাশন টেকনোলজীর উপর ডিপ্লোমা এবং বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের কেক এবং বেকিং নিয়ে পড়াশুনা করি। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের ক্যান্সার নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যেই এই কেক এর পেছনে কাজ করে যাওয়া। জীবনবোধ থেকে লিখতে চাই আমার অনুভূতিগুলো।
রোকসানা হাবীব লুবনা
অনুসরণ করুন

Latest posts by রোকসানা হাবীব লুবনা (see all)

Comments

comments