মনুষ্যত্বের লড়াই (৮)

0
322
Print Friendly, PDF & Email

মনুষ্যত্বের লড়াই (৭) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

সুফিয়া খালা খুব মজা করে হেসে বললেন মিয়া বিবি রাজী! তো ক্যায়া ক্যারে কাজি? খালা রোমেলের আম্মাকে ফোনে জানালে উনি খুব খুশী হলেন। উনি জানালেন, পরশুর প্লেনে উনি খুলনায় আসবেন এবং জুঁইকে আংটি পরাবেন। তারপর খুব তাড়াতাড়ি বিয়ের কাজ শেষ করতে চান। কারন রোমেলের হাতে খুব বেশী সময়ও নেই।

জুঁই বাসায় এসে নিজের ঘরে চলে গেল। জুঁইয়ের আব্বা জুঁইয়ের ঘরের দিকে যেতে চাইলে জুঁইয়ের আম্মা বললেন, মেয়েটাকে কিছুক্ষন একা থাকতে দাও। ওর নিজের সাথে নিজেকে একটু বোঝাপড়া করতে দাও। ওর উপর দিয়ে একটার পর একটা ঝড় যাচ্ছে। আর সেইসব থেকে বের হওয়ার আগেই এখন বিয়ে নিয়ে কথা হচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া ওর জন্য অনেক কঠিন এবং কষ্টের ব্যাপার। ওর এখন নিজেকে বড় একা মনে হচ্ছে। ও আমাদের ভুল বুঝতেছে। মনে করছে, আমরা কেউ ওকে বুঝতে পারছি না। আমরা কেউ ওর পাশে নেই, ওকে বোঝা মনে করছি। কিন্ত একদিন এই খারাপ সময় চলে যাবে। ও একদিন আমার মত মা হবে। সেই দিন বুঝবে একজন মাকে কত ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হয়। মেয়ের ভবিষ্যৎ এর কথা চিন্তা করে অনেক কিছু বুঝেও না বোঝার অভিনয় করতে হয়।

জুঁই নিজের ঘরে এসে কাপড় বদলে প্রথমেই নামাজ পড়ে সৃষ্টি কর্তার কাছে শক্তি চাইলো এবং বললো যেটা ওর জন্য ভাল ও নিজেই যেন সেই পথে যায়। জুঁই দরজার কাছে এসে বললো, আমি রাতে খাবো না। আমি ঘুমাতে গেলাম, আমাকে কেউ ডাকবে না। জুঁই ঘরের আলো বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো। রোমেলের কথা মনে হল। সুফিয়া আন্টি যখন প্রথম জুঁইয়ের সাথে রোমেলের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তখন ওর রোমেলকে দেখে খুব ভাল লেগেছিল। কিন্ত সেটা ছিল একটা ছেলেকে দেখে ভাললাগা যাকে বলা যায় “বাহ! খুব সুন্দর, হ্যান্ডস্যাম তো ছেলেটা” কথাটা মনে মনে বলে নিজেই হেসে দিল। আসলেই রোমেল খুব লম্বা এবং একহারা পেটানো শরীর। কোথাও কোন মেদ নেই। গায়ের রং শ্যামলা এবং মাথা ভর্তি কালো চুল কিন্ত সব চুলগুলি শজারুর কাটার মত সোজা। শজারুর কাটা মনে করেই আবার হেসে দিলো। হঠাৎ মনে হল যাদের চুল সোজা শজারুর কাটার মত তাদের নাকি অনেক জিদ এবং রাগ থাকে। রোমেলের কি অনেক রাগ আছে? ও রাগী মানুষ ভয় পায়।

জুঁই আবার চিন্তায় পড়ে গেল, দুই চোখের মাঝে ভুরু দুইটি একটু কুচকে গেল। খুব চিন্তার বিষয়তো, এখন কি করে ও বুঝবে, রোমেল কেমন রাগী? রাগী মানুষ জুঁই একদম পছন্দ করে না। কারন রাগ হলো মানুষের ধ্বংসের চাবি-কাঠি। আবার অন্য মন বললো, জুঁই রাগ তো তোমারও আছে। রোমেল অনেক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ। জুঁইকে সে কোনও প্রশ্ন করেনি বরং বন্ধুর মত গল্প করেছে। যেটা জুঁইকে মুগ্ধ করেছিল এবং কেমন জানি মনের মধ্যে একটা ভাললাগার আবেশ তৈরি করেছে। নিজের মনেই গুন গুন করে গান গেয়ে উঠলো, “প্রান চায় চক্ষু নাহি চায়, মরি একি তোর দুস্তর লজ্জা। সুন্দর এসে ফিরে যায়, তবে কার লাগি মিথ্যা এ সজ্জা”।

জুঁইয়ের গুন গুন গান শুনে ওর আব্বা-আম্মাও হেসে দিলেন এবং বুঝে গেলেন জুঁইয়ের মনের কথা। একদিন পরেই রোমেলের আম্মা আংটি পরিয়ে দিলেন এবং জুঁয়ের সাথে নিজে অনেক কথা বললেন। জুঁইকে অভয় দিয়ে বললেন, রোমেলের আব্বা, রোমেলের বয়স যখন ৫ বছর তখন মারা গিয়েছিলেন। সেই থেকে রোমেল আমার বন্ধু, ছেলে এবং আমার একমাত্র অবলম্বন। এখন রোমেলের জীবনে তুমি নতুন একজন মানুষ। তাই ও তোমাকে বেশী সময় দিতে চাইবে। মাঝে মাঝে আশেপাশের মানুষরা এটা নিয়ে কথা বলবে অথবা আমি নিজেও হয়তো না বুঝেই তোমাকে কষ্ট দিয়ে কিছু বলে ফেলতে পারি তুমি কিছু মনে করবে না জুঁই। আর যদি আমার উপর রাগ হও সেটা আমাকে বলবে অথবা তোমার আম্মার উপর যখন রাগ হয়ে তার সাথে কথা বল না ঠিক সেই রকম আমার সাথে কথা বলবে না। তাহলে আমি বুঝতে পারবো তুমি রাগ হয়েছো মা।

জুঁই এতো অবাক হল, আম্মার উপর রাগ হলে যে ও কথা বলে না এটা উনি জানলেন কেমন করে?

রোমেলের আম্মা হেসে বললেন, মেয়ে এতো অবাক হতে হবে না। আমিও একসময় তোমার বয়সী ছিলাম, বলেই উনি হেসে দিলেন। সেই সাথে জুঁইও হেসে দিলো। রোমেল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো, আম্মু তোমরা কি একদল হয়ে গেলে?

রোমেলের আম্মু বললো, আমরা সব সময় এক দলে ছিলাম রে বাবা, এখন জুঁই আমাদের দলে এসে যোগ দিলো। জুঁইয়ের মা-ছেলের এই হাসিখুশী সম্পর্ক দেখে খুব ভাল লাগলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ওদের বিয়ে হয়ে গেল কারন রোমেল ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য একটা স্বকর্লারশীপ পেয়েছে তাই বিয়ে করে একসাথে জুঁই এবং ওর আমেরিকার ভিসা করিয়ে রোমেল যেতে চায়। জুঁইয়ের বিএ অনার্স পরীক্ষা শেষ হলে ও আমেরিকায় রোমেলের কাছে চলে যাবে।

বিয়ের পর পরই রোমেল কাগজ পত্র নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে গেল তারপর ও আমেরিকায় চলে গেল। জুঁই খুব কাঁদলো কারন ও ভাল করে রোমেলকে চিনতে, বুঝতেই পারলো না। জুঁই একটা বিষয় লক্ষ করে খুব অবাক হল। রোমেল চলে যাবে, অনেক দূরে তারপরও ওকে বিরক্ত করেনি। শুধু চলে যাওয়ার আগে বলেছিল, জুঁই, তুমি এবং আমি কেউ কাউকে চিনতাম না। তাই আমি হঠাৎ করে ছেলে হিসাবে অথবা স্বামী হিসাবে অধিকার খাটালে তোমার কাছে ভাল লাগবে না। স্বামী-স্ত্রী, বন্ধু যে কোন সম্পর্কের ভিত্তি শুধু মাত্র ভালবাসার উপরে স্থাপন করলে সেই সম্পর্কে যতই ঝড়, দুঃখ-কষ্ট এমনকি তৃতীয় ব্যক্তি আসার চেষ্টা করলেও কোনও লাভ হয় না। কারন ভালবাসা তখন অনেক গভীরে গিয়ে শক্ত এবং মজবুত একটা ভিত করে ফেলে। যেটা কোনও ভাবেই ভেঙ্গে যায় না। আমি যেহেতু আমার সারাটা জীবন শুধু মাত্র তোমার সাথে কাটাতে চাই, তোমাকে নিয়েই আমার স্বপ্ন বুনতে চাই তাই আমি তোমাকে মানসিক এবং শারীরিক ভাবে প্রস্তুত হবার সময় দিতে চাই। জোর করে অথবা আবেগের বশে ফেলে হয়তো আমি তোমাকে পেতে পারি। কিন্ত জুঁই সেটা হবে একতরফা পাওয়া। আমি সেটা চাই না। তাই তোমাকে বন্ধু করে রেখে গেলাম।

আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো, বাংলাদেশ থেকে যে জুঁই যাবে সে শুধু আমার বন্ধুই না, সে হবে আমার প্রেমিকা, আমার সঙ্গি এবং আমার স্ত্রী। সেই জুঁই তখন নিজেকে উজাড় করে তার সারাজীবনের যে আমিত্ব তার ভালবাসার মানুষ তার স্বামীকে দিতে পারবে। সেটা হবে আমার সব থেকে বড় পাওয়া।

জুঁই সন্মোহিত হয়ে রোমেলের কথা শুনছিল। সারাজীবন ও ছেলেদেরকে অপছন্দ করে এসেছে। সারাজীবন মনে করেছে, ছেলেরা সব সময় মেয়েদের ভোগের বস্তু মনে করে আর আজ সৃষ্টিকর্তা ওকে এটা কি দেখালেন। জুঁই সত্যি রোমেলের প্রেমে পড়ে গেল। কিন্ত একটু দেরী হয়ে গেল তাই রোমেলকে আর একা পেলো না। এয়ারপোর্টে জুঁই নিজের অজান্তেই কেঁদে দিলো। রোমেল ওর খুব কাছে এসে কানে কানে বললো, শেষ পর্যন্ত জুঁইও প্রেমে পড়ে গেল। বলেই হেসে দিলো রোমেল। জুঁই নিজেও লজ্জা পেয়ে গেলো।

রোমেল ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললো, জীবনটা খুব ছোট জুঁই। জীবনকে ভালবাসা দাও দেখবে জীবনও তোমাকে ভালবাসা ফিরিয়ে দিবে। তারপর রোমেল সিকিউরিটি পার হয়ে চলে গেল।

জুঁই ওর শ্বাশুমার সাথে বাসায় ফিরে এলো। পরের দিন জুঁই আবার রাজশাহী চলে গেল পরীক্ষার জন্য কিন্ত যাওয়ার পর জানতে পারলো একটা রাজনৈতিক দলের হরতালের কারনে ওদের পরীক্ষা হবে না। সব মেয়েরা হল ছেড়ে চলে যাচ্ছে আর যাদের বাড়ী দূরে তারা যেতে পারছে না। কারন শিক্ষকরা বলছেন ওরা হরতাল তুলে নিলেই পরীক্ষা হবে। জুঁই অবাক হয়ে ভাবছিল, পৃথিবীর কোনও দেশে কি ছাত্র রাজনীতির কারনে পরীক্ষা বন্ধ হবার রেকর্ড আছে? এটা ওকে জানতেই হবে। মাত্র কয়েক জন ছাত্রের জন্য কত ছেলে-মেয়ে জিম্মি হয়ে আছে। একটা পরীক্ষা পিছানো মানেই অনেক গুলি দিন পিছনে চলে যাওয়া। সব ছেলেমেয়ে এমনকি স্যাররাও হতাশ হয়ে যাচ্ছেন কিন্ত কারো সাহস নেই এই সব ছাত্র নেতাদের বিরুদ্ধে কথা বলা। জুঁই রাজশাহী থাকলে ওর মাও চিন্তা করেন তাই ও শুধু ঢাকা এবং রাজশাহী যাওয়া-আসা করতে থাকে। অবশেষে ৬ পার্ট পরীক্ষা ১০ মাসে শেষ হল।

জুঁই যেদিন সব পরীক্ষা শেষ করে রাজশাহী থেকে বাসে উঠেছিল সেদিন ওর মনে হয়েছিল জীবন হল গাড়ীর চাকার মত, কখনও চাকা রাস্তার সাথে ঘষা খেয়ে ক্ষয় হয়ে যায়। আবার সেই ক্ষয়ে যাওয়া অংশ একসময় রাস্তা থেকে উপরে উঠে আসে। জীবনটাও ঠিক সেই রকম, কখনও খুব খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হয়। তারপর একসময় সে ওই খারাপ সময়ের থেকে বের হয়ে আসে। এই খারাপ সময়টা যে ঠান্ডা মাথায় পার করতে পারে সে-ই জীবনে জয়ী একজন মানুষ হয়। সমস্যা হয় তখনই, যখন ওই খারাপ সময়ের আঘাতটা তার মনের গভীরে দাগ কেটে রেখে যায় ক্ষয়ে যাওয়া গাড়ির চাকার মতন। গাড়ির ক্ষয়ে যাওয়া চাকা যেমন পাল্টে নতুন চাকা লাগানো হয়। ঠিক সেই ভাবে মানুষ যদি তার কষ্টের দাগগুলি মুছে ফেলতে পারতো, তাহলে সে অনায়াসে সামনের পথ চলতে পারতো। অনেকেই সেটা পারে না তখন সে ওই স্মৃতি নিয়ে ক্ষত বিক্ষত মন নিয়ে একবার সামনে যায় আবার পিছনে আসে।

জুঁইয়ের সব কিছু ওর মা গুছিয়ে দিলেন। জুঁই ওর মাকে দেখে আর অবাক হয় যায়। এই পৃথিবীতে আসলেই ভাল মানুষ এখনও আছে তা না হলে পৃথিবী ধবংস হয়ে যেতো। রোমেল চলে গেলে জুঁইয়ের কান্না দেখে উনি হাত ধরে বলেছিলেন, বিয়ের পর মেয়েদের সব থেকে আপন মানুষ হল তার স্বামী এবং ছেলেদের জন্যও তার স্ত্রী। তাই প্রথমেই এই সম্পর্ককে বন্ধুত্বের সম্পর্ক বানিয়ে নিবে তাহলে সব কিছু তাকে বিনা দ্বিধায় বলতে পারবে। আমি তোমার মা, আমি কখনও বলবো না, যে আমি তোমার আম্মার মত! কারন এই পৃথিবীতে কেউ নিজের আম্মার মত হতে পারে না। আবার এটাও বলবো না তুমি আমার মেয়ের মত কারন মেয়ে হলে তুমি রোমেলের বউ হতে না। আমি বলবো, জুঁই আমি তোমার মা, আমি তোমার বন্ধু হতে চাই। তুমি কি তোমার এই মাকে বন্ধু বানাবে?

সেই থেকে জুঁই রাজশাহী থেকে সব সময় ঢাকায় ওর মায়ের কাছে চলে আসতো। রোমেল প্রতিদিন ইমেইল করতো। জুঁই সাথে সাথেই উওর দিতো। প্রতিটি ইমেইল ছিল পরিচ্ছন্ন ভাষায় ভরপুর। কেউ যদি ওই ইমেইল পড়ে তাহলে তার কাছে মনে হবে এরা দুইজন খুবই ভাল বন্ধু। জুঁই এখন রোমেলকে খুব ভাল একজন মানুষ হিসাবে চিন্তা করা শুরু করলো। এর আগে জুঁই ছেলেদেরকে কখনও মানুষ ভাবতো না। এমনকি রোমেলকে বিয়ের সময়ও তার মনে হয়েছিল ও একটা ছেলেকে বিয়ে করছে। জুঁই বুঝতে পারলো, ওর সব চিন্তা-চেতনা রোমেল ভুল প্রমান করে দিচ্ছে। নিজের অজান্তেই রোমেলকে খুব ভাল একজন মানুষ মনে করে ওর প্রেমে পড়ে গেল। রোমেলকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দিনকে দিন তীব্র হতে থাকলো। একসময় সেই বহু কাঙ্খিত দিনটি এসে গেলো।

জুঁইকে প্লেনে তুলে দিতে, আব্বা-আম্মা শিপু এবং লিপুও ঢাকাতে এলো। শিপু এবং লিপুর আপুর জন্য যতটুকু না মন খারাপ হলো। তার থেকে তাদের কি কি লাগবে সেই লিষ্ট অনেক লম্বা হলো। এটা নিয়ে সবাই অনেক মজা করলো। জুঁই এবং জুঁইয়ের আম্মা দুইজনেই রোমালের আম্মুকে জুঁইয়ের সাথে যেতে বললেন কিন্ত উনি সবাইকে বোঝালেন এই সময়টা শুধুই ওদের। সময় চলে গেলে আর ফিরে আছে না। এখনকার মধুর সম্পর্ক ওদেরকে সারাজীবন ভালবাসার বন্ধনে বেঁধে রাখবে। কিন্ত এই নাজুক সময়ের সামান্য ভুল ওদের সম্পর্কের ভিতকে মুজবত করবে না। হয়তো ওদের বেঁধে রাখবে কিন্ত সেটার মধ্যে থাকবে সমঝোতা আর নিজেদের ত্যাগ। এটা আমি আমার নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছি। রোমেলের আব্বা যদি আমাকে সত্যিকার ভালবাসার বন্ধনে বেঁধে রেখে না যেতো তাহলে হয়তো আমার জন্য তার স্মৃতি এবং রোমেলকে নিয়ে আনন্দের সাথে একা পথ চলা এতো সহজ হতো না।

রোমেলের আব্বা মারা গেলে তার অনেক বন্ধুরা আমাকে পছন্দ করেছিল। কিন্ত আমরা কেউ রোমেলের আব্বার জায়গায় অন্য কাউকে চিন্তা করতে পারিনি। এমনকি আমার আব্বা-আম্মাও চিন্তা করেন নি। ভালবাসার শক্তি বড় অদ্ভুত। আমি চাই, আমার বউ মা, আমার বন্ধু জুঁই সেটা অনুভব করুক। রোমেল নিজেকে উজাড় করে ভালবাসা দিয়ে জুঁইয়ের মন থেকে সব ভয় দূর করে দিক।

এয়ারপোর্টে নেমেই রোমেলকে দেখে জুঁই নিজের অজান্তেই খুশীতে ওকে জড়িয়ে ধরে। কিছুক্ষন পরেও লজ্জা পেয়ে ছেড়ে দেয়। রোমেল ওকে হালকা করার জন্য বলে, তুমি লজ্জা পেও না। এটা ফ্রি দেশ তাই কারো সময় নেই কে কি করছে সেটা দেখার। তুমি চাইলে আমি তোমাকে কোলে করে বাসায় নিয়ে যেতে পারি। জুঁই রোমেলের পিঠে একটা কিল দেয়। শুরু হয় বন্ধুত্বের থেকে ভালবাসা।

কিছুদিন পর জুঁই বুঝতে পারে স্কলারশিপের টাকা ছাড়াও সংসার চালানোর জন্য রোমেলকে বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করতে হয় এবং এর জন্য ওর পড়াশুনা পিছিয়ে যাচ্ছে। তখন আশে-পাশের ফ্লাটের মহিলাদের পরামর্শে ও চাইল্ড কেয়ারের কাজ শুরু করে। প্রথম দিকে রোমেল রাজী হচ্ছিল না কারন জুঁই পারবে কিনা, কি করতে গিয়ে কি হয়ে যাবে? পরে যদি কোনও বিপদ হয়?

কিন্ত জুঁই ওকে কথা দিলো, ও অনলাইনে বসে কোর্স করবে। তার আগ পর্যন্ত ওকে যে যা ডলার দিবে ও তাই নিবে। এবং ওদের ফ্লাটের ৪ জন ওকে অনুরোধও করেছে তাদের বাচ্চা রাখতে। জুঁই রোমেলকে বোঝালো ও কাজ করলে রোমেল শুধু পড়াশুনায় মন দিতে পারবে এবং ওর সব কোর্স তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে। রোমেল না না করতে করতেই জুঁইয়ের যুক্তির কাছে হেরে গেল এবং রাজী হয়ে গেল। জুঁইও অনলাইনে চাইল্ড কেয়ারের কোর্স করার পাশাপাশি বাসায় ৪ টা বাচ্চাকে টেককেয়ার করা শুরু করলো।

রোমেল যখন পিএইচডি শেষ করবে ঠিক সেই বছর জুঁইয়ের কোল জুড়ে রিমু এলো। রোমেলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডেকে পাঠালো। কিন্ত এই প্রথম জুঁই কোন ভাবেই মেয়েকে নিয়ে দেশে ফিরে যেতে চাইলো না। রোমেলের সাথে কথা কাটাকাটি হল। জুঁই কথা বন্ধ করে দিলো। রোমেল এই প্রথম জুঁইয়ের এতো রাগ দেখলো এবং ও খুব অবাক হয়ে গেল। মাকে ফোন করলো এবং রোমেলের মা রোমেলকে বোঝালেন জুঁই রেগে গিয়েছে তোমার উপর। নিজের অজান্তেই তুমি ওর অনুভুতিতে আঘাত করেছো । জুঁই এখন আর শুধু জুঁই নেই। ও এখন একজন মা। তাই নিজের অজান্তেই ও রিমুর মধ্যে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে। তাই ও বাংলাদেশে ফিরে আসতে চাইছে না। এতোটা বছর ধরে ও প্রতিদিন ১২ ঘন্টা কাজ করে তোমাকে সাহায্য করেছে। বিনিময়ে কিছুই চায়নি। আজ তোমাকে স্বামী না হয়ে বন্ধু হয়ে সেই ঋন শোধ করতে হবে। তুমি চেষ্টা করো ঠিকই তুমি ওখানে চাকরী পেয়ে যাবে।

রোমেল নিজেও জানে ও চাকরী পাবে কারন ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ওকে চাকরীর প্রস্তাব দিয়েছে কিন্তু ও সেটা জুঁইকে বলেনি কারন দেশে আম্মা একা। ও স্বার্থপর ছেলে না, যে নিজের সুখের কথা চিন্তা করে আমেরিকায় থেকে যাবে।

রোমেলের আম্মা কিভাবে জানি ব্যাপারটা ধরে ফেলেছিলেন তাই বললেন, রোমেল তুমি আমার কথা চিন্তা করো না। আমি জানি তুমি স্বার্থপর ছেলে না এবং জুঁইও স্বার্থপর মেয়ে না। আমি জুঁইয়ের জায়গায় থাকলে তোমার আব্বাকে একই কথা বলতাম। তুমি আমার কথা ভেবো না। আমি রিমুকে দেখতে এই বছরই তোমাদের কাছে আসবো।

রোমেলের আম্মার কথার কারনে রোমেল চাকরীটা নিয়ে নিলো এবং জুঁই সেই থেকে মায়ের কাছে চিরঋনী হয়ে গেল। এরপর অনেক দিন উনি এসে রোমেলদের সাথে ছিলেন। রিমু প্রিস্কুল শুরু করলে রোমেল ওকে বিশ্ববিদ্যালয়ে Women’s World নামে নতুন একটা বিষয়ের উপর পড়াশুনা করতে বললো। জুঁই প্রথমে ভয় পেয়েছিল, এতো বছর গ্যাপের পর ও কি আবার পড়াশুনা করতে পারবে নাকি কোন সমস্যা হবে? কিন্ত রোমেল ওকে সাহায্য করলো। জুঁই অল্প অল্প করে ক্রেডিট নিতো। তারপর ওর পড়াশুনা শেষ হলে কোল জুড়ে এলো জেয়ন এবং জিসান।রিমু এখন ১৫ বছরে পা দিয়েছে। এখনও বাংলাদেশে গেলে রিমুকে চোখের আড়াল করে না এবং কারো সাথেই বাইরে যেতে দেয় না।

হঠাৎ করে রিমু এসে পিছন থেকে দুই হাত দিয়ে আম্মু বলে জুঁইকে জড়িয়ে ধরলো। জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে রিমু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো আম্মু, তুমি কান্না করছো কেন?

জুঁই চোখ মুছেই বললো কই নাতো! চায়ের মগটা মুখের কাছে নিয়ে খেতে গেলেই রিমু মগটা টেনে নিয়ে বললো। আম্মু, ওটা খেও না। তুমি লক্ষ করো নি তোমার চোখের পানি চায়ের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। মগটা দাও আমি নতুন করে বানিয়ে দেই।

রোমেল পিছন থেকে এসে রিমুকে বললো শুধু আম্মুকেই দিবে? আমাকে দিবে না মা?

আরও জানুন » মনুষ্যত্বের লড়াই (৯) »

 

রোকসানা হাবীব লুবনা
অনুসরণ করুন

রোকসানা হাবীব লুবনা

লেখালেখি বলতে যা বোঝায় সেটা কখনই আমি লিখি না। তবে ছোটবেলা থেকেই প্রচুর সাহিত্য, জীবন ধর্মী লেখার নিয়মিত পাঠিকা। বেগম, দেশ এমন অনেক পত্রিকার একনিষ্ঠ পাঠিকা। প্রবাস জীবনে চারিপাশের মানুষদের দেখে, নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখে অনেক অনুভূতি হয়। সেগুলো মাঝে মাঝেই ইচ্চা হয় অন্যদের সাথে শেয়ার করি যেন তারা আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু নিতে পারে। যদি আমার একটা অভিজ্ঞতা অন্য কারো কাজে লাগে, এই ভেবেই লেখা। ইতিহাসের উপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাশ করার পর কিছুদিন বেসরকারী চাকরিতে ছিলাম। এরপর ফ্যাশন টেকনোলজীর উপর ডিপ্লোমা এবং বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের কেক এবং বেকিং নিয়ে পড়াশুনা করি। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের ক্যান্সার নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যেই এই কেক এর পেছনে কাজ করে যাওয়া। জীবনবোধ থেকে লিখতে চাই আমার অনুভূতিগুলো।
রোকসানা হাবীব লুবনা
অনুসরণ করুন

Latest posts by রোকসানা হাবীব লুবনা (see all)

Comments

comments