মনুষ্যত্বের লড়াই (৭)

0
278
Print Friendly, PDF & Email

মনুষ্যত্বের লড়াই (৬) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

আম্মার ব্যাংকের সহকর্মী সুফিয়া আন্টির বোনের ছেলে রোমেল সেই সময় ঢাকা থেকে বেড়াতে এসেছিল। সুফিয়া আন্টি তাকে নিয়ে জুঁইদের বাড়ি বেড়াতে এলেন। রোমেলের সাথে আন্টি জুঁইকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। রোমেল তখন মাত্র কম্পিউটার সাইন্সে পড়াশুনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগ দিয়েছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে টুকটাক কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে জুঁই সব কিছুতেই বলেছিল আমি জানি না। তারপর ও নিজের ঘরে চলে যায়।

পরের দিন আম্মা খুব খুশী মনে বাসায় এসে আব্বাকে বললেন, সুফিয়া আপার বোনের ছেলে রোমেল জুঁইকে খুব পছন্দ করেছে।

আব্বা বললেন, এখনও পড়াশুনাই তো ওর শেষ হয়নি! আম্মা বলেছিলেন, ছেলে পড়াশুনা করাবে। আর জুঁইকে নিয়ে এতো সমস্যা হচ্ছে ঠিক এই সময় যদি কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে বিয়ে দিতে পারি তাহলে মেয়েটার পড়াশুনায় আর কোনও বাঁধা থাকবে না। আব্বা এই কথা শুনে একটু রাজী হলেন। আম্মা তখন আব্বাকে বললেন তুমি ওর সাথে কথা বলো। কারন আমি বললে ও রাজী হবে না। জুঁইয়ের তো ধারনা আম্মা ওর শত্রু।

আব্বা রাতে খাওয়ার পর টিভির ঘরে এসে বসলে জুঁই বুঝতে পেরেছিল আব্বা ওকে কিছু বলতে চায়।

আব্বা, লিপু এবং শিপুকে ঘুমাতে যেতে বললো। ওরা চলে গেলে আব্বা রোমেলের কথা বললেন। জুঁই কোনও কথা বললো না কারন আম্মা যখন আব্বার সাথে কথা বলছিলেন তখন ও সব শুনেছিল। তাই ও চুপ করে রইল। আব্বা বললেন, আমরা তোমাকে জোর করবো না। কিন্ত আমি চাই তুমি একবার চিন্তা করো। চাইলে রোমেলের সাথে কথা বল।

জুঁই বললো, আমার কোনও আপত্তি নেই আব্বা। আপনারা কথা বলেন। আব্বা মনে হয় জুঁই এর চাপা কষ্টটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই বললেন ঠিক আছে কাল তুমি নিজেই রোমেলের সাথে কথা বলো। ওকে বোঝার চেষ্টা করো, ও তোমাকে একটু জানুক।

জুঁই রাতে অনেক কাঁদলো, মনে হল কেন ওর জীবনটা এই রকম? আসলেই সাথী ঠিক কথা বলেছিল, ও মেয়েটাই ভাল না। আব্বা-আম্মাকে কোনও দিন ও শান্তি দিতে পারেনি। এই জন্য মনে হয় মেয়ে হলে মানুষের মন খারাপ হয়ে যায়! জুঁই নিজেই চিন্তা করে বের করার চেষ্টা করলো ওর দোষ কি? ওতো তেমন সুন্দরীও না। কারন কোনও দিন ওকে কেউ সুন্দরী বলেনি। তাহলে? শুধু মাত্র মেয়ে মানুষের শরীর আছে এই জন্য? কোনও উওর খুঁজে পেলো না। সারারাত চোখ দিয়ে পানি পড়লো। ফজরের আযান দিলে চিন্তা করেছিল আর নামাজ পড়বে না। আল্লাহকে ডাকবে না। কারন আল্লাহ তো ওর ডাক শোনেন না। কিন্ত অভ্যাস, তাই নামাজের সময় আর বিছানায় থাকতে পারলো না। উঠে নামাজ পড়া শেষ করে দেখে আম্মা দাঁড়িয়ে আছেন। দোয়া পড়ে জুঁইয়ের মাথায় ফু ফু বলে ফু দিলেন। আর বললেন আল্লাহ এইবার আমার মেয়েটাকে রহমত করো।

আম্মার জন্য জুঁইয়ের খুব কষ্ট হয়। আগে আম্মার উপর খুব রাগ হতো। আম্মাকে শত্রু মনে হত। কিন্ত এখন আর রাগ হয় না। খুব কষ্ট হয়। আম্মা নিজেও জুঁইয়ের চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারেন না। জুঁই মন স্থির করে ফেলেছে। রোমেল যদি ওকে পছন্দ করে, তাহলে ও রোমেলকে বিয়ে করবে। আম্মা-আব্বাকে শান্তি দেওয়ার জন্য ও কি এইটুকু করতে পারবে না? একটা মেয়েকে নিয়ে তারা অনেক যন্ত্রনা সহ্য করেছেন, আর না। এইবার আব্বা-আম্মাকে একটু শান্তি দিবে। বিছানায় শুঁয়েই জুঁই এইবার সত্যি ঘুমিয়ে গেল। যখন ঘুম থেকে উঠলো তখন দেখলো বাসায় কেউ নেই। বুয়া বললো, তোমাকে খালাম্মা ডাকতে নিষেধ করেছিলেন। তুমি নাকি কাল সারারাত ঘুমাওনি ?

জুঁই ভীষন অবাক হল, ও সারা রাত ঘুমায়নি আম্মা জানলেন কি করে? কিন্ত ওর এটা নিয়ে চিন্তা করতে ভাল লাগছে না। ও শুধু ভাবছে এই রোমেলটা যদি ওকে দেখে না বলে দেয় তাহলে ও বেঁচে যায়। তারপর আবার মনে হল, লাভ কি? কাউকে না কাউকে তো বিয়ে করতেই হবে! দুপুরে ভাত খেতে খেতে ভাবছিল, কেন মেয়েদের জীবনটা এমন? বিয়ে করতেই হবে? ছেলেদেরকে জুঁইয়ের ভাল লাগে না। মনে হয় এরা আগে ছেলে তারপর মানুষ। তাই মানুষের কষ্ট বোঝে না, স্বার্থপরের মত শুধুই নিজের স্বার্থটাই বোঝে। জুঁই এখনও পর্যন্ত মনের মত কোন ছেলে পায়নি। কোন ছেলেকেই মানুষ হিসাবে আকর্ষনীয় মনে হয় না। এইসব কথা চিন্তা করে নিজেই হেসে দিলো। কারন ওতো ছেলেদের সাথে মেশা অথবা তাদেরকে বন্ধু হিসাবে কখনও চিন্তাই করেনি। তাই দুই একজন খারাপ ছেলেদের দিয়ে সবাইকে বিচার করাটা মনে হয় ঠিক হচ্ছে না।

আম্মা ব্যাংক থেকে এসে বলেছিলেন, আজ তোমাকে সুফিয়া আন্টি বেড়াতে যেতে বলেছেন। লিপু, শিপু জানতে চেয়েছিল আমরাও যাবো আম্মা?

আম্মা বললেন, আমরা সবাই যাবো।

জুঁইয়ের আম্মা সবাইকে নিয়ে সুফিয়া আন্টির বাড়ীতে বেড়াতে গেলেন। আন্টি জুঁইকে নিয়ে ছাদে গেলেন, ওখানে রোমেল বসে বই পড়ছিল। আন্টি বললেন, তোমরা কথা বল। আমি চা এবং নাস্তা উপরে পাঠিয়ে দিবো। রোমেল খুব স্বাভাবিক ভাবে জুঁইকে বসতে বললো। জুঁই কোনও কথা না বলে চুপ করে বসে নিজের নখ খোটাখুটি করতে থাকলো। রোমেল খুব সাধারন ভাবে জানতে চাইলো, রাজশাহী কেমন? আমি কখনও যায়নি। ভাবছি এইবার যাবো।

জুঁই বললো শহরটা কেমন আমি ঠিক জানি না। কারন আমি কখনও বাইরে যাইনি।

রোমেল বললো, কেন যাও নি? তোমার বন্ধুদের সাথে তো যেতে পারো?

জুঁই বললো, আমার কোনও বন্ধু নেই। মানে ছেলে বন্ধু। কিছু বান্ধবী আছে কিন্ত ওরা সবাই এখানে পড়ে। ওদের অনার্স শেষ হলে ওরা মাষ্টার্স করতে যাবে। আমি তখন ওদের সাথে বের হতে পারবো।

রোমেল জানতে চাইলো, ছেলেদের সাথে কেন কথা বলো না?

জুঁই এই প্রথম হেসে দিয়ে বললো, কথা বলি না তাই আমাকে নিয়ে এতো সমস্যা! আর কথা বললে কি হত? তারপরও যে কথা হয় না সেটা নয়। কথা হয় অনেকের সাথেই কিন্ত কারো সাথে বেশীক্ষন কথা বলা যায় না!

রোমেল এই কথাটা শুনে খুবই কৌতুহল অনুভব করেছিল। তাই জানতে চেয়েছিল, কেন?

জুঁই বললো, আমি যে সব ছেলেদের চিনি তাদের গভীরতা অনেক কম। তারা রাজনীতি করে কিন্ত কি সেই দলের উদ্দেশ্য সেটাই তারা জানে না। তাই তো নেতারা যা বলে ওরা তাই করে। কোনও গল্পের বই নিয়েও কথা বলা যায় না। যদিওবা দুই একজন বই নিয়ে কথা বলে সেটাও রাজনীতির বই। আমার ভাল লাগে না। খুব এক ঘেয়ে লাগে তাই আমি কারো সাথে মিশি না। আবার খুব হেসে কারো সাথে কয়েকদিন কথা বললেই সে মনে করে, এই মেয়ে মনে হয় আমাকে পছন্দ করে।

রোমেল বললো, তুমি কি জানো আন্টি কেন তোমাকে আমার সাথে কথা বলতে বলেছেন?

জুঁই বললো, হ্যাঁ জানি।

রোমেল বললো, আমাকে কি তোমার একঘেয়ে লাগছে?

জুঁই হেসে দিলো, তারপর খুবই লাজুক ভাবে বললো, না ।

রোমেলও খুব জোরে হেসে বললো যাক বাঁচা গেল।

জুঁই তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো কেন?

রোমেল তখন গভীর ভাবে জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো, আমারতো তোমাকে ভীষন ভাল লেগে গিয়েছে তাই আমাকে যদি তোমার একঘেয়ে লাগতো তাহলে তো তুমি এই বিয়েতে রাজী হতে না।

জুঁই খুবই অবাক হয়ে বললো, আপনি কি সব কিছু জেনে শুনে আমাকে পছন্দ করেছেন? আমাকে কেন দ্বিতীয় বর্ষে উঠেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়েছিল? কেন আমি ভারত্বেশ্বরী হোমসে পড়াশুনা করেছি?

রোমেল হেসে বললো, সব কিছু আমি জানি। আমার কোনও আপত্তি নেই। শুধু একটাই আমার চাওয়া সেটা হল অনার্স শেষ হলে তুমি আর রাজশাহীতে মাষ্টার্স করবে না। যেহেতু আমি ঢাকা থাকবো তাই তুমি ঢাকাতে মাষ্টার্স করলে আমার জন্য খুব ভাল হবে।

জুঁই রোমেলের কথা শুনে খুব অবাক হলো। ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে ওদের বিয়ে হয়ে গেছে।

জুঁই অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো।

রোমেল তটস্ত হয়ে বললো, না না আমি জোর করবো না। তুমি চাইলে রাজশাহীতেই মাষ্টার্স করতে পারো। তখন আমি না হয় ঢাকা–রাজশাহী যাওয়া-আসা করবো।

সুফিয়া আন্টি এসে চা নাস্তা দিয়ে গেলেন। এবং ওদের দুইজনের গল্প করা দেখা মিষ্টি করে হাসি দিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে জুঁই এবং রোমেলের গল্প জমে উঠলো।

জুঁই রোমেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিচে নামতে গেলে রোমেলেও ওর সাথে নীচে নেমে আসলো। জুঁইয়ের আম্মাকে সালাম দিয়ে রোমেল শিপু এবং লিপুর সাথে ওদের স্কুল নিয়ে, সামনের বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা নিয়ে কথা বলা শুরু করে দিয়েছিল এবং আড় চোখে জুঁইকে দেখছিল। জুঁইরা বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার সময় রোমেল বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখছিল।

রোমেলের কাছে জুঁইকে খুব সাদা মনের একটা মানুষ মনে হয়েছিল। কোনও মেয়ে মনে হয়নি, শুধুমাত্র মনুষ্যত্বে ভরা একজন অসাধারন মায়াময় মানুষ মনে হয়েছিল। কিন্ত মেয়ে হিসাবে জুঁই খুব আকর্ষনীয়ও। একবার ওকে দেখলেই আবার দেখতে মন চায়। গায়ের রংটা খুবই সুন্দর। না ফর্সা না শ্যামলা। বড় বড় চোখ দিয়ে যখন তাকায় তখন মনে হয় ওর চোখও কথা বলছে। ওর চেহারায় এমন কিছু আছে যা মনকে শান্তি দেয়। মানুষ যে এতো প্রান খুলে হাসতে পারে রোমেল এই প্রথম দেখলো। রোমেল নিজেও খুব হাসিখুশী মানুষ কিন্ত জুঁইয়ের মত এতো প্রানখুলে মনে হয় হাসতে জানে না। জুঁই সব কিছু সাদা মনে দেখে তাই সব সময় নিজের অজান্তেই বিপদে পড়ে যায়।

সুফিয়া খালা জানতে চাইলেন কি বল এখন? কেমন লাগলো? রোমেল এক কথায় বললো, প্রথম দিনই তো বলেছি, বিয়ে করলে এই মেয়েকেই করবো। তুমি আম্মাকে জানাতে পারো খালা। আমার হাতে বেশী সময় নেই, তুমি তো জানো?

আরও জানুন » মনুষ্যত্বের লড়াই (৮) »

রোকসানা হাবীব লুবনা
অনুসরণ করুন

রোকসানা হাবীব লুবনা

লেখালেখি বলতে যা বোঝায় সেটা কখনই আমি লিখি না। তবে ছোটবেলা থেকেই প্রচুর সাহিত্য, জীবন ধর্মী লেখার নিয়মিত পাঠিকা। বেগম, দেশ এমন অনেক পত্রিকার একনিষ্ঠ পাঠিকা। প্রবাস জীবনে চারিপাশের মানুষদের দেখে, নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখে অনেক অনুভূতি হয়। সেগুলো মাঝে মাঝেই ইচ্চা হয় অন্যদের সাথে শেয়ার করি যেন তারা আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু নিতে পারে। যদি আমার একটা অভিজ্ঞতা অন্য কারো কাজে লাগে, এই ভেবেই লেখা। ইতিহাসের উপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাশ করার পর কিছুদিন বেসরকারী চাকরিতে ছিলাম। এরপর ফ্যাশন টেকনোলজীর উপর ডিপ্লোমা এবং বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের কেক এবং বেকিং নিয়ে পড়াশুনা করি। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের ক্যান্সার নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যেই এই কেক এর পেছনে কাজ করে যাওয়া। জীবনবোধ থেকে লিখতে চাই আমার অনুভূতিগুলো।
রোকসানা হাবীব লুবনা
অনুসরণ করুন

Latest posts by রোকসানা হাবীব লুবনা (see all)

Comments

comments