মনুষ্যত্বের লড়াই (৬)

0
226
Print Friendly, PDF & Email

মনুষ্যত্বের লড়াই (৫) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

জুঁই আবার একা হয়ে গেল। এরই মধ্যে কেয়া নামে ওর নতুন এক বান্ধবী হল। কেয়া নিজেও খুব ভাল ছাত্রী। দুর্ভাগ্যক্রমে কেয়াও ঢাকায় কোন আত্মীয়ের বাসায় থেকে কোচিং করতে পারেনি। এই কারনে ও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পায়নি। তাই বি এল কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হল। জুঁই শুধুমাত্র প্রাইমারীতে ছেলে এবং মেয়েদের সাথে পড়াশুনা করেছিল। তারপর সব সময় মেয়েদের স্কুলে এবং কলেজে পড়াশুনা করায় প্রথম দিকে ওর সাথে ছেলেরা কথা বলতে আসলে ওর ভাল লাগতো না। কারন তাদের কথা বলার বিষয় ছিল খুবই কম এবং সব থেকে বড় সমস্যা ছিল একটু হেসে কথা বললেই ওরা মনে করতো যে এই মেয়ে তার প্রেমে পড়ে গিয়েছে। জুঁই কিছুতেই বুঝতে পারতো না প্রেম কি এতো সস্তা কোনও জিনিস! একটা ছেলের সাথে হেসে কথা বললেই প্রেম হয়ে যাবে?

জুঁইয়ের কলেজে যেতে একদম ভাল লাগতো না। এমনকি স্যারদের বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেকচারও ওর কাছে কোনও আগ্রহ তৈরি করতো না। কলেজে যাওয়াটা ওর জন্য শাস্তি স্বরুপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দেখতে দেখতে জুঁইদের প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা এসে গেল এবং কেয়া সব নোট ছেলেদের কাছ থেকে যোগাড় করে জুঁইকে দিলো।জুঁই নিজে কোনও নোট করলো না। কেয়ার দেওয়া নোটই ও পড়লো। জুঁইয়ের কিছুই ভাল লাগতো না। শুধু কান্না পেতো আর ভাবতো জীবনে অনেক বড় কিছু হবার স্বপ্ন দেখেছিল কিন্ত কিছুই হল না। এখন শুধু কোনও রকম অনার্স পাশ করা।যে স্বপ্নপূরণ হবে না সেই স্বপ্ন কেন দেখে মন?জুঁই আবার হতাশায় ডুবে গিয়েছিল।

প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা খুব ভাল ভাবে শেষ হল এবং সেই সাথে সাবসিডি পরীক্ষাও খুব ভাল হল। দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস শুরু হলেই আবার জুঁই সমস্যায় জড়িয়ে গেল। কেয়াকে হঠাৎ করে ওর পরিবার বিয়ে দিয়ে দিলো এবং সেই সাথে কলেজ বন্ধ করে দিলো।কেন এটা করা হলো ওর অন্যান্য বান্ধবীরাও কারনটা খুঁজে পেলো না। এমনকি কেয়ার বিয়েতে বান্ধবীদেরদাওয়াত দেওয়া হল না। জুঁই কলেজে গেলে সবাই ওর কাছে জানতে চাইলো, কেয়ার কেন হঠাৎ করে বিয়ে হয়ে গেল? ও কি কিছু জানে?

জুঁই বলেছিল, না তো, আমি কিছু জানি না। এরমধ্যে এক ছাত্র নেতা জুঁইকে ক্লাস থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে গেলো এবং জানতে চাইলো কেন তুমি আমার এবং কেয়ার সম্পর্কের কথা কেয়াদের বাসায় জানিয়েছিলে? জুঁই খুবই অবাক হল। কারন কেয়ার সম্পর্ক ছিল অন্য একটা ছেলের সাথে। যেটা জুঁই ছাড়া আর কেউ জানতো না।

কিন্ত এই নেতা কি বলছে এইগুলি? তারপরও জুঁই ওর অবাক হওয়াটাকে লুকিয়ে ফেললো এবং বললো সত্যি আমি জানতাম না আপনার সাথে কেয়ার কোন সম্পর্ক ছিল।উনি কিছুতেই বিশ্বাস করলেন না, উল্টো জুঁইকে হুমকি দিলেন। কিভাবে তুমি এই কলেজে থাকো আমি সেটা দেখে নিবো।তুমি এখনও আমার ক্ষমতা দেখোনি। এইবার তুমি বুঝবে ছাত্র নেতাদের ক্ষমতা কত? কেউ তোমাকে বাঁচাতে পারবে না।জুঁই বারবার বললো, ভাইয়া শুনুন! আপনি ভুল বুঝেছেন। সত্যিই আমি কিছুই জানি না।সেই নেতা তার দলবল নিয়ে চলে গিয়েছিল। তারপরের দিন যখন জুঁই কলেজের সামনে রিক্সা দিয়ে নামছিল, তখন এক ছেলে শিস দিয়ে উঠলো। অন্য আর একটা ছেলে গান গেয়ে উঠলো। ক্লাসে যাওয়ার পর দেখলো কোনও মেয়ে ওর সাথে কথা বলছে না। ছেলেরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছে আর আড় চোখে ওকে দেখছে।

জুঁই ক্লাস শেষ করে বের হলে জামান স্যার জুঁইকে বললেন, জুঁই একটু অফিসে এসে আমার সাথে দেখা করো।

জুঁই অফিসে স্যারের সাথে দেখা করতে গেলে স্যার বললেন, তুমিতো খুব ভাল মেয়ে তাহলে কিভাবে এতো বড় ভুল করলে? জুঁই বললো, স্যার! আমি সত্যিই কিছু জানি না।উনি শুধু শুধু আমাকে ভুল বুঝেছেন।

জামান স্যার বললেন, ওরা তোমাকে এখানে সন্মানের সাথে পড়তে দিবে না। আমি চিনি ওদেরকে। তুমি ভাল মেয়ে তাই আমি তোমাকে শুধু এইটুকু সাহায্য করতে পারি। তুমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলী হয়ে চলে যাও। ওখানে আমার পরিচিত স্যার আছেন। উনার সাথে গিয়ে দেখা করে আমার চিঠি দিবে। আমি কাল তোমাকে চিঠি লিখে দিবো। স্যার তোমাকে সাহায্য করবেন। আর এখন কোনও কথার উওর দিতে যাবে না।এরা এখানকার নেতাদের ছায়াতলে থাকে। তাই কাউকেই সন্মান করে না এবং কারো কোনও কথাই এরা শুনবে না।

জুঁই স্যারকে ধন্যবাদ দিয়ে অফিস রুম থেকে বের হয়ে এলো। একটা ছেলে বলে উঠেছিল, কি আপা? স্যারের কাছে নালিশ করলেন? এখনও তো কিছুই করি নি! তাই এতো নালিশ!

জুঁই সত্যি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। অথচ মাত্র একটা ছেলেখোঁচা মেরে কথা বলছে এবং তারসাথে আরও ৩জন দাঁড়িয়ে হাসছে।আর সেটা ১০০ জন ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। জুঁই যখন অসহায়ের মত ওদের দিকে তাকালো তখন সবাই চোখ ফিরিয়ে নিলো। জুঁই মাথা নীচু করে হেঁটে গেট দিয়ে বের হয়েই রিক্সা নিলো। রাতে আব্বাকে সব খুলে বলেছিল। আম্মা আবার ভয় পেয়ে গেলেন। কান্না শুরু করলেন। বিলাপের মত বকতে থাকলেন, আল্লাহ আমাকে মেয়ে কেন দিলেন যার মান ইজ্জত আমি রক্ষা করতে পারবো না?

আব্বা রেগে গেলেন। আব্বা জুঁই এর দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিক আছে কাল আমি তোমার সাথে ওই স্যারের কাছে যাবো।

আব্বা এবং জুঁই রিক্সা থেকে নামলেই পাশে থেকে একটা ছেলে বলে উঠলো উনি কি আমার শ্বশুর হবেন? অন্যজন বললো এই আস্তে বল, উনি অনেক বড় অফিসার!

আব্বা সরাসরি জামান স্যারের অফিসে গেলেন এবং স্যার খুব সন্মানের সাথে আব্বার সাথে কথা বলে চিঠি লিখে দিলেন।আব্বা জুঁইকে নিয়ে বাসায় চলে এলেন। পরের দিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আব্বা একাই রাজশাহী চলে গেলেন। এবং সমস্ত ব্যবস্থা করে ফিরলেন। এই সময়টা জুঁই কলেজে যেতে পারলো না। বাসায় ওর ক্লাসের বান্ধবীরা এসে বলেছিল, ওরা কলেজে ওর সাথে কথা বলেনি কারন ওই নেতা যদি পরে ওদের কোন ক্ষতি করে? ওরা বুঝতে পারছে জুঁই এর সাথে যেটা হয়েছে সেটা ঠিক হয়নি কিন্ত ওদেরও তো হাত-পা বাঁধা।জুঁই কিছুই বললো না।

ওদের মধ্যে ওর স্কুলের এক বান্ধবী ছিল সাথী। ও সবার সামনে জুঁইকে বলে উঠলো, এই জুঁই তোর সমস্যাটা কি রে? সেই ছোট বেলায়ও ছেলেরা তোকে বিরক্ত করতো। এখনও তাই করে। তুইতো এমন কোনও সুন্দরীও না! তোর একটু বেশী অহংকার তাই ছেলেরা তোকে বিরক্ত করে। কি জানি! বুঝি না!

অন্য সব বান্ধবীরা চুপ করে থাকলো। জুঁই বললো, কিছু মনে করিস না তোরা, আমার খুব মাথা ব্যথা করছে।পরে একদিন তোদের সাথে আড্ডা দিবো। ওর বান্ধবীরা সবাই মনে হয় সেদিন অপমানিত হয়েছিল কিন্ত সৌভাগ্যক্রমে কেউ কিছু বলেনি এবং সবাই চলে গিয়েছিল।

আব্বা রাজশাহী থেকে ফিরে এসে জুঁইকে বললেন, জুঁই এটাই তোমার শেষ সুযোগ। ক্লাসের বাইরে কারো সাথে বান্ধবী-বন্ধু বানাবে না। কারন পুরো বিশ্ববিদ্যালয়বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেরছাত্র নেতাদের আস্তানা। তাই ওখানে যদি তুমি কোনও বিপদে পড়ো আর কেউ তোমাকে সাহায্য করতে পারবে না। জুঁই চুপ করে থাকলো কারন জুঁই নিজেই এখন অনেক ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে।

আম্মা এইবার জুঁই এর বিয়ের চিন্তা শুরু করলেন। জুঁই রাজশাহীতে চলে গেল এবং প্রথমে একটা বড় আপার কাছে গিয়ে উঠলো। তারপর সিট পেয়ে গেলে নিজের মত নিজে থাকতো। মাথায় চপচপ করে তেল দিয়ে সব থেকে খারাপ কামিজটা পড়ে ক্লাসে যেতো। ও কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিল এই জন্য অন্য ছেলেমেয়েরা ওর সাথে কথা বলতো না।ক্লাস বন্ধ থাকলেই ও খুলনায় চলে যেতো।

আরও জানুন » মনুষ্যত্বের লড়াই (৭) »

রোকসানা হাবীব লুবনা
অনুসরণ করুন

রোকসানা হাবীব লুবনা

লেখালেখি বলতে যা বোঝায় সেটা কখনই আমি লিখি না। তবে ছোটবেলা থেকেই প্রচুর সাহিত্য, জীবন ধর্মী লেখার নিয়মিত পাঠিকা। বেগম, দেশ এমন অনেক পত্রিকার একনিষ্ঠ পাঠিকা। প্রবাস জীবনে চারিপাশের মানুষদের দেখে, নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখে অনেক অনুভূতি হয়। সেগুলো মাঝে মাঝেই ইচ্চা হয় অন্যদের সাথে শেয়ার করি যেন তারা আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু নিতে পারে। যদি আমার একটা অভিজ্ঞতা অন্য কারো কাজে লাগে, এই ভেবেই লেখা। ইতিহাসের উপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাশ করার পর কিছুদিন বেসরকারী চাকরিতে ছিলাম। এরপর ফ্যাশন টেকনোলজীর উপর ডিপ্লোমা এবং বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের কেক এবং বেকিং নিয়ে পড়াশুনা করি। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের ক্যান্সার নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যেই এই কেক এর পেছনে কাজ করে যাওয়া। জীবনবোধ থেকে লিখতে চাই আমার অনুভূতিগুলো।
রোকসানা হাবীব লুবনা
অনুসরণ করুন

Latest posts by রোকসানা হাবীব লুবনা (see all)

Comments

comments