মনুষ্যত্বের লড়াই (৫)

0
210
Print Friendly, PDF & Email

মনুষ্যত্বের লড়াই (৪) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

জুঁই এখন যদি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভাল না করতে পারে তাহলে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারবে না। আব্বাও রাজি হয়ে গেলেন। এরপর জুঁই খুলনা মহিলা কলেজে ভর্তি হয়ে গেল। আব্বা প্রতি দিন নিজেই ওকে কলেজে নামিয়ে তারপর অফিসে যেতেন। আবার কলেজ শেষ হলে জুঁইকে নিয়ে বাসায় আসতেন ।

খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জুঁই সব টিচারের প্রিয় ছাত্রী হয়ে গেল।। সেই সাথে ওর আবার নতুন কিছু বান্ধবী হলো। সব কিছু মিলিয়ে কলেজের সময়টা খুব ভাল গেলো।কিন্ত এই ভাল সময়টা খুব বেশী দিন ওর কাছে থাকলো না। তাই আবার সেই খালুর সাথে জুঁইয়ের অন্য আর একটা খালার বাসায় দেখা হয়ে গেল।। কতটা ভয়ংকর, কুৎসিত মানুষের চেহারা হতে পারে জুঁই আবার নতুন করে আবার উপলব্ধি করেছিল।

এখনও সেই রাতের কথা মনে হলে ভয়ে ওর শরীরের সব লোমগুলি দাঁড়িয়ে যায়।জুঁইয়ের খালাতো ভাইয়ের জন্মদিন উপলক্ষে খালা সবাইকে দাওয়াত দিলে খুব অনিচ্ছা স্বত্ত্বে লিপু আর জুঁইকে খালার বাসায় যেতে হয়েছিল।শিপুর জ্বর হওয়ার কারনে আম্মা আর শিপু যেতে পারলো না।

ওই খালার বাসায় গিয়েই জুঁই খালুকে দেখেই মনে মনে খুব ভয় পেয়ে গেল। নিজেই নিজেকে বোঝালো, যে কোনও ভাবে ওই খালুর থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। একটু রাত হয়ে গেলে ওই খালু বললেন, আমি জুঁইদেরকে ওদের বাসায় দিয়ে আসি।

সবাই খুব খুশী হল কারন বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। কথাটা শুনেই জুঁইয়ের মনে নানা ধরনের অশুভ চিন্তা কাজ করতে শুরু করলো। ও বার বার খালাকে বললো, আমরা একাই যেতে পারবো। কিন্ত কেউ ওদের কথা শুনলো না। একরকম জোর করেই খালা, সেই খালুর সাথে ওদের বাসায় যেতে বাধ্য করলেন।

তারপর যখন খালু তার মোটর সাইকেলে জুঁইদের উঠে বসতে বললেন তখন লিপুকে মাঝখানে দিয়ে জুঁই পিছনে বসলো। কিন্ত খারাপ মানুষ কোনও পরিস্থিতিতেই তার খারাপ চিন্তা থেকে মনে হয় বের হয়ে আসতে পারে না। তাই একটু নির্জন এবং অন্ধকার রাস্তা দেখেই মোটর সাইকেল দাঁড় করিয়ে সে জুঁই এর দিকে হাত বাড়িয়েছিল। জুঁই এক সেকেন্ডও দেরী না করেই বিনা দ্বিধায় এলোপাথাড়ীভাবে সেফটিপিন মারতে থাকলো।

লিপুকিছুতেই বুঝতে পারছিল না খালু কেন অন্ধকারে মোটর সাইকেল থামিয়ে আপুকে ধরার চেষ্টা করছে? কিন্ত ছোট লিপু এটা বুঝতে পেরেছিল যে কাজটা নোংরা। তাই জুঁই যখন খালুর দিকে সেফটিপিন মারছিল, লিপু চিৎকার করে বলছিল আপু আরও মারো, আরও মারো। সেই সাথে ও চিৎকার করছিল, কে আছেন? প্লিজ আমাদের সাহায্য করেন। এরইমধ্যে খালি একটা রিক্সা এসে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, আপা তাড়াতাড়ি উঠে পড়েন।

জুঁই এবং লিপু লাফ দিয়ে উঠে পড়লে রিক্সাওয়ালা খালুর দিকে তাকিয়ে বললো, আপনি আমার পিছনে আসলে আমি সামনের দোকানদারদের বলে দিবো আপনি এই আপার সাথে কি করতে চেষ্টা করেছিলেন। আমারবাড়ী এখানে তাই সবাই আমাকে চেনে, কথাটা বলেইরিক্সাওয়ালা অনেক জোরে রিক্সা চালিয়ে জুঁই আর লিপুকে নিয়ে আলোর কাছে চলে এলো।আরও কিছুদুর যাবার পর যখন শহরের মধ্যে চলে এলো, তখন রিক্সাওয়ালা বললো, আপা কই বাসা? কই যাবো?

জুঁই লজ্জায় ঘৃনায় কথা বলতে পারছিল না। চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়ছিল। মনে হচ্ছিল মেয়েরা কি শুধু ভোগের বস্তু? সৃষ্টিকর্তা কি মেয়েদেরকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন শুধুমাত্র পুরুষরা যেন তাদের ভোগ করতে পারে ? ও রিক্সায়ালার প্রশ্নের জবাব দিতে পারলো না। লিপু বললো, টুট পাড়ায় যাবেন। রিক্সওয়ালা বাসার সামনে নামিয়ে দিলে জুঁই জিজ্ঞাসা করলো ভাই কত ভাড়া দিবো?

রিক্সাওয়ালা বললো, আপা! আমি যেখান থেকে আপনাকে উঠিয়েছি ওখানেই আমার বাড়ী। আমি রিক্সা জমা দিয়ে বাড়ী যেতে চেয়েছিলাম কিন্ত আপনাদের দেখেই বুঝেছিলাম আপনারা বিপদে পড়েছেন তাই রিক্সা জমা নাদিয়ে আপনাদের নিয়ে এসেছি। আমাকে কোনও ভাড়া দিতে হবে না আপা। আমারও বোন আছে। আপনার জায়গায় যদি সে হতো আপা, তাহলে কি আমি ভাড়া নিতাম?

আপা আপনি বাসায় যান আর সব বেটা মানুষদের থেকে সাবধান থাকবেন। ওরা শকুন। ওরা রাজাকারের বাচ্চা! তাই মেয়ে মানুষ দেখলে ভুলে যায় যে এরা মানুষ! এই কথাগুলি বলেই রিক্সাওয়ালা জোরে রিক্সা চালিয়েচোখের আড়ালে চলে গেল। জুঁই পাথরের মত রিক্সাওয়ালার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ত্থাকলো।

লিপু বাসায় গিয়ে সোজা আব্বাকে সব কথা খুলে বললো। আব্বা তখনই খালুকে মারতে যাবেন কিন্ত আম্মা বাধা দিলেন এবং বোঝালেন, চিৎকার করো না। লোক জানাজানি হলে আমাদের মেয়ের বদনাম হবে। আব্বা বললেন, ঠিক আছে তাহলে তোমার বোনকে বলি?

আম্মা বললেন, তুমি কি মনে করো ও তোমার কথা বিশ্বাস করবে? ও তখন আরও নোংরা কথা বলবে এবং মাঝখান থেকে ওর সংসারটা ভেঙ্গে যাবে। আমাদের মেয়ের আর বিয়ে হবে না। আব্বা এই কথা শুনে চুপ হয়ে গেলেন। জুঁই সবই দেখলো, শুনলো কিন্তু কিছুই বললো না। কারন ও জানে বলে কোনও লাভ হবে না। সেইদিন থেকে নিজেই নিজের সাথে প্রতিজ্ঞা করলো, ওর সামনে যখনই কোনও অন্যায় হবে ও প্রতিবাদ করবে। যে ভাবেই হোক ওকে ভাল রেজাল্ট করতে হবে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়াশুনা করতেই হবে। তা-না হলে ও অসহায় মানুষদের পাশে কিভাবে দাঁড়াবে?

জুঁই সব ভুলে শুধু পড়াশুনায় মন দিলো। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হলো। জুঁইয়ের পরীক্ষা খুবই ভাল হল। তাই ও খুব খুশী হল। ওর সব বান্ধবীরা ঢাকা চলে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোচিং করতে কিন্ত ও কবে যাবে কোথায় কোচিং করবে কেউ কিছু বলছে না। একদিন সকালে আব্বাকে বলতে শুনলো, কোনও আত্মীয় জুঁইকে তার বাসায় রেখে কোচিং করতে দিতে রাজী হচ্ছে না। “তারা বলছে, যে মেয়ে নিজের আব্বা আম্মার কাছেই থাকতে পারেনি। ছেলেরা পিছনে লেগে গিয়েছিল, তাই তারা নিজের মেয়েকেই হোষ্টেলে পাঠিয়েছিল আর এখন তাদের মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোচিং এর জন্য তারা রেখে কি বিপদে পড়বে?” এবংআরও বলছে শুধু কোচিং করলেই তো হল না। এরপর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়ে যদি ভর্তি হয়ে যায় তখন তো সাথে সাথে হলে সিট পাবে না। এবং এই সিট না পাওয়া পর্যন্ত তাদেরকেই তখন জুঁইকে বাসায় রাখতে হবে। তাদের সবার একটা সন্মান আছে। তাই তারা নতুন করে কোনও ঝামেলায় যেতে চায় না।

আম্মা কান্না শুরু করলেন আর বললেন, আমি এটাই ভেবেছিলাম। তোমরাতো বোঝনা আমাদের এই সমাজ শুধু মেয়েদেরকেই সবকিছুতেই দোষ দেয়।জুঁই মনে করে আম্মা তাকে ভালবাসে না। আম্মা তার কষ্ট বোঝে না। আম্মা বোনের সংসার বাঁচাতে চায়। মেয়ে তার কাছে বড় না। আমার নিজের পেটের মেয়ের চেয়ে কি আমার বোন বড় হবে?

জুঁই সব শুনলো, খুবই কান্না পেলো কিন্ত কেন জানি চোখ থেকে কোন পানি বের হলো না। ও নিজের ঘর থেকে বের হয়ে এসে আম্মাকে বললো, আম্মা মন খারাপ করো না। আমি খুলনা বি এল কলেজেই অনার্সে ভর্তি হবো। খুব স্বাভাবিক ভাবে প্লেট নিয়ে ও নাস্তা করতে বসে গেলো। কোথাও ভর্তি পরীক্ষার কোচিং নেই তাই ওর কোন পড়াশুনাও ছিল না। আবার গল্পের বইকে সাথী বানিয়ে ফেললো। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলে দেখা গেল জুঁই ওদের কলেজের মধ্যে খুবই ভাল রেজাল্ট করেছে। তারপরও জুঁই একাই বি এল কলেজে ভর্তি হল আর অন্য সব বান্ধবীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব ভাল ভাল বিষয়ে সুযোগ পেয়ে ঢাকা চলে গেল।

আরও জানুন » মনুষ্যত্বের লড়াই (৬) »

রোকসানা হাবীব লুবনা
অনুসরণ করুন

রোকসানা হাবীব লুবনা

লেখালেখি বলতে যা বোঝায় সেটা কখনই আমি লিখি না। তবে ছোটবেলা থেকেই প্রচুর সাহিত্য, জীবন ধর্মী লেখার নিয়মিত পাঠিকা। বেগম, দেশ এমন অনেক পত্রিকার একনিষ্ঠ পাঠিকা। প্রবাস জীবনে চারিপাশের মানুষদের দেখে, নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখে অনেক অনুভূতি হয়। সেগুলো মাঝে মাঝেই ইচ্চা হয় অন্যদের সাথে শেয়ার করি যেন তারা আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু নিতে পারে। যদি আমার একটা অভিজ্ঞতা অন্য কারো কাজে লাগে, এই ভেবেই লেখা। ইতিহাসের উপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাশ করার পর কিছুদিন বেসরকারী চাকরিতে ছিলাম। এরপর ফ্যাশন টেকনোলজীর উপর ডিপ্লোমা এবং বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের কেক এবং বেকিং নিয়ে পড়াশুনা করি। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের ক্যান্সার নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যেই এই কেক এর পেছনে কাজ করে যাওয়া। জীবনবোধ থেকে লিখতে চাই আমার অনুভূতিগুলো।
রোকসানা হাবীব লুবনা
অনুসরণ করুন

Latest posts by রোকসানা হাবীব লুবনা (see all)

Comments

comments