মনুষ্যত্বের লড়াই (৪)

0
287
Print Friendly, PDF & Email

মনুষ্যত্বের লড়াই (৩) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

অনেক সময় দেখা যেত মিতুর অথবা নীলিমার ডিউটি শেষ হয়ে গেছে, তখন ওরা এসে জুঁইয়ের ডিউটিতে সাহায্য করতো। আবার একই ভাবে জুঁইয়ের ডিউটি আগে শেষ হয়ে গেলে ও মিতু,সাইদাকে সাহায্য করতে চলে যেতো। এই যে একজন আরেকজনকে সাহায্য করা, টিম হিসাবে কাজ করা – এইগুলি জুঁই ওখান থেকেই শিখেছিল। এতো কিছুর পরেও ওর নিজেকে বন্দি মনে হত। রাতে বিছানায় গেলেই চোখের সামনে ভেসে উঠতো সেই বখাটে ছেলেগুলির মুখ। মনে পড়ে যেতো পাড়া প্রতিবেশীদের হাসাহাসি। তখন একটা অচেনা আক্রোশ ওর ভিতরে তৈরি হত। মনে হত আজ যদি ওই ছেলেগুলি ওই রকম নোংরা কথা না বলতো এবং আত্বীয়-স্বজন পাড়া প্রতিবেশীরা যদি হাসা-হাসি করুনা না করে তাদের নিজেদের মেয়ের কথা চিন্তা করে ওই ছেলেগুলিকে শাস্তি দিতো তাহলে আজ জুঁইকে এই বন্দি জীবন কাটাতে হত না।

ছোটবেলা থেকে জুঁই লেখাপড়ায় ভাল। কিন্ত ভারত্বেশ্বরী হোমসে আসার পর ও কোনও ভাবেই মন দিয়ে লেখাপড়া করতে পারতো না। তাই ওর রেজাল্ট খুবই খারাপ হতো। যারা খুব ভাল ছাত্রী ছিল তারা ওর সাথে মিশতো না। ও বুঝতে পারতো এবং বাথরুমে গোসল করার সময় খুব কান্না করতো। কলের পানি আর চোখের পানি মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতো। অনেক প্রতীক্ষার পর গ্রীষ্মের ছুটি আসলো। ভারত্বেশ্বরীতে আসার পর এই প্রথম জুঁই বাড়ী যাবে। তাই ওর মনে তখন অনেক আনন্দ। মনে হচ্ছে ওর সেই আনন্দ আকাশে বাতাসেও ছড়িয়ে পড়েছে।বাড়ী যাওয়ার আগের দিন জুঁই সারা রাত ঘুমাতে পারলো না। সকাল ৮টা বাজার পর স্কুলের গেট খুলে দেওয়া হল। জুঁইয়ের আব্বা ছিলেন প্রথম ব্যক্তি। তাই টিচার মাইক এ জুঁইয়ের নাম ঘোষনা করলেন এবং বললেন রেডি হয়ে নীচে নেমে আসতে। ওই দিন টিচারের সেই কথা আজও জুঁইয়ের জীবনে সব থেকে মধুর কথা হয়ে মনের ভিতরে গেঁথে আছে। টিচার যখন বলেছিলেন, জুঁই হোসেন! তোমার আব্বা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন। তুমি যত তাড়াতাড়ি পারো নীচে নেমে এসো। আহ সেকি মধুর বানী।

জুঁই ব্যাগ নিয়ে নীচে নেমে এলে আব্বা জড়িয়ে ধরলেন। তারপর আব্বা আর জুঁই হাত ধরাধরি করে গেটের বাইরে পা বাড়ালে জুঁই প্রান ভরে গভীর ভাবে নিশ্বাস নিয়েছিল। বাতাসে সেদিন অন্যরকম গন্ধ ছিল। কৃষ্ণচুড়া গাছগুলির দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল গাছগুলিতে কেউ লাল রং দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিল। স্বাধীনতার স্বাদ যে কি অদ্ভুত, ছোট জুঁই সেই দিন অনুভব করেছিল। আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল, আর কোনও দিন ও পরাধীন হবে না। এবং জীবনে কাউকে পরাধীন রাখবে না। জীবনের রঙ্গে রঙিন হওয়ার অধিকার ছোট বড় সবার আছে। কিন্ত এইসব কোনও কথাই আব্বাকে বলা হল না।

আব্বা ওকে একটা হোটেলে নিয়ে গিয়ে সকালের নাস্তা খাওয়ালেন। তারপর ওকে নিয়ে ঢাকা-খুলনার বাসে উঠে বসলেন। বাসায় আসার পর আম্মা জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলেন কিন্ত জুঁই শক্ত হয়ে থাকলো।ওর চোখে কোনও পানি নেই। মনে ছিল শুধু কষ্ট আর অভিমান। মনে হয়েছিল, তুমি তো মা, তুমি কিভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে আমাকেই হোষ্টেলে পাঠিয়ে বন্দী জীবন দিলে? শিপু আপু বলেই কেঁদে দিলো এবং লিপু ওর কোলে উঠে ওকে অনেক আদর করলো। রাতে আবার সেই তিন ভাইবোন এক বিছানায় ঘুমাতে গেলে শিপু জুঁইকে এতোদিন কি কি হয়েছিল এবং কে কি বলেছিল সব বললো। জুঁই কোনও উওর দিলো না।এক সময় ছুটি শেষ হয়ে গেল। আব্বা আবার জুঁইকে ভারত্বেশ্বরী হোমসেরেখে এলেন। জুঁই আবার নির্বাক হয়ে আব্বার চলে যাওয়া দেখেছিল। কিন্ত এইবার আর চোখে কোনও পানি ছিল না। শুধু দীর্ঘ নিঃশ্বাস বের হলো। তারপর মিতুকে দেখে জুঁই হাসি দিলো।

ওরা যখন ক্লাস ৮ থেকে ক্লাস ৯ এ উঠলো তখন জুঁই খুবই খারাপ রেজাল্ট করলো। তাই ওকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুযোগ দেওয়া হল না। ওকে কলা বিভাগে দেওয়া হল। জুঁই একা একা অনেক কাঁদলো কারন বিজ্ঞানের প্রতি ছিল ওর অসম্ভব আগ্রহ। জুঁই আব্বাকে চিঠি লিখলোও আর এখানে থাকতে চায় না। কারন ও বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে চায় কিন্ত ও এখানে কোনও ভাবেই পরীক্ষায় ভাল রেজান্ট করতে পারছে না। তাই ওকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনা করার কোনও সুযোগ দেওয়া হবে না। ভারত্বেশ্বরী হোমসে যতটুকু পড়াশুনা করার সময় দেওয়া হত ওই সময়টা ওর জন্য যথেষ্ট ছিল না। কারন ও অসাধারন মেধাবী কোন ছাত্রী ছিল না। কিন্ত ও পড়তে চায়, ভাল রেজান্ট করতে চায়। আব্বা রাজী হয়েছিল কিন্ত আম্মা কোনও ভাবেই ওকে বাড়ি নিয়ে আসতে রাজী হলেন না। ওই প্রথম জুঁই শুরু করলো নিজের স্বপ্ন আর আগ্রহকে গলা টিপে মারতে এবং জীবনের সাথে সমঝোতা করতে।

আব্বা গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি নিয়ে আসলেন জুঁইকে, আম্মার উপর প্রচন্ড অভিমান হলো। আম্মা ওর সাথে কথা বলার চেষ্টা করলেন কিন্তু জুঁই কিছুই বললো না। লিপু স্কুল শুরু করার পর আম্মা নিজেও চাকরীতে যোগ দিলেন কারন জুঁই বাসায় নেই এবং শিপু, লিপুও যখন স্কুলে থাকে তখন আম্মার সময় কাটতো না। তাই আম্মা একটা ব্যাংকে চাকরী শুরু করেন। জুঁই বাসায় এসে আব্বাকে একটা টিচার রেখে দিতে বললেন। কারন অংক নিয়ে ওর খুব সমস্যা হচ্ছিল।

নতুন টিচারেরকাছে পড়াশুনা নিয়ে জুঁই খুব ব্যস্ত হয়ে গেলো। এরমধ্যে দূর সম্পর্কের এক খালু বেড়াতে এলেন ওদের বাসায় এবং একদিন আম্মা-সিপু, লিপু এবং আব্বা সবাই স্কুল, অফিসে গেলে ওই খালু কাজের বুয়াকে নিচের দোকান থেকে তার জন্য সিগারেট এবং শিপুদের জন্য কিছু বিস্কিট কিনতে পাঠালেন। জুঁই ঠিক সেই মুহুর্তে ঘর থেকে বের হলো বুয়াকে এক কাপ চায়ের কথা বলতে। কিন্ত ও বলার আগেই বুয়া সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেলো তাই বলা হলো না। বুয়া এখনই আসবে এই মনে করে ও সদর দরজাটা খোলা রেখে দিয়েছিল।

খালু ওকে ডাক দিলে, ও ড্রইং রুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলো, কিছু লাগবে খালু ?

খালু বললেন এতো দূরে দাঁড়িয়ে থাকলে কি ভাবে বলবো? আগে তো তুমি আমার কাছে আসতে, কোলে বসতে। তোমাকে কত আদর করতাম।এখন এতো দূরে দূরে থাকো কেন?

কেন জানি কথা গুলি জুঁইয়ের কাছে অন্য রকম মনে হয়েছিল। নিজের অজান্তেই ওর শরীর সর্তক হয়ে গেল। তাই ঠিক ঘরের ভিতরে না গিয়ে দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকলো।খালু জুঁয়ের কাছে এসে ওর দিকে হাত বাড়ালে, জুঁই বললো, আপনি বলেন আমি শুনতে পারছি আপনার কথা। কিন্ত তারপরও খালু ওকে হাত ধরে কাছে তার নিজের বুকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। জুঁই অনেক জোরে উনাকে ধাক্কা দিয়েই সদর দরজার দিকে দৌঁড় দিয়ে বের হয়ে গেলো। এরমধ্যে বুয়া দোকান থেকে ফিরে জুঁইকে সিঁড়িতে বসে থাকতে দেখেই বুঝে গেল কিছু হয়েছে। জুঁই আর ঘরের মধ্যে যেতে সাহস পাচ্ছিল না। খালু নিজেই রেডি হয়ে বের হয়ে চলে গেলেন। জুঁই উনাকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেই বুয়ার পিছনে লুকিয়ে থাকলো।

আম্মা ব্যাংক থেকে বাসায় ফিরে এলে বুয়া আম্মাকে সব খুলে বললো। আম্মা শুধু বললেন কাউকে কিছু বলো না। তাহলে জুঁইকেই সবাই খারাপ বলবে এবং আমার ওই বোনের সংসারটা ভেঙ্গে যেতে পারে। জুঁই এর খুব রাগ হলো আম্মার উপর। কিন্ত কিছুই বলতে পারলো না। আব্বাও কিছুই জানতে পারলেন না। এর মধ্যে জুঁইয়ের ছুটি শেষ হয়ে গেলো। জুঁই প্রথম বারের মত খুব খুশী মনে হোষ্টেলে ফিরে এলো। ওর মনে হলো, ও সুরক্ষিত জায়গায় ফিরে এসেছে। এখানে কেউ ওকে নোংরা দৃষ্টিতে দেখবে না। এখানে ও একজন মানুষ, কোনও মেয়ে মানুষ না।

মাধ্যমিক পরীক্ষা হয়ে গেলে জুঁই আব্বার সাথে বাসায় চলে এলো। রেজাল্ট বের হওয়ার আগে ও সারাদিন গল্পের বই পড়তো। সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন পড়ার সময় নিজেকে দিপাবলী মনে হত। তারপরও ভয় লাগতো ওই খালু যদি আবার আসে ও কি করবে? তখন ওর মাথায় আসলো ঢাকা স্টেডিয়ামের কথা। ও এতোই ভয় পেয়েছিলো যে ও তখন থেকে বড় বড় দুইটা সেফটিপিন কামিজের নীচের ঝুলের দিকে রাখা শুরু করলো। কারন ও বুঝে গিয়েছিল আম্মা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন না। তার কাছে মেয়ের থেকেও বড় তার বোনের সংসার এবং সমাজ। তাই তার রক্ষাকারী একমাত্র সে নিজে এবং সৃষ্টিকর্তা। রাগে, অভিমানে এবং দুঃখে ও আম্মার সাথে এই বিষয় নিয়ে কোনও কথা বলতো না।ওই ঘটনার পর থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বের হওয়ার আগ পর্যন্ত জুঁই সারাক্ষন গল্পের বই পড়তো। সেই সময়নিজের ঘর আর বই গুলিকে নিয়ে ওর পৃথিবী গড়ে তুলেছিল।

তিন মাস পরে মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলে দেখা গেল জুঁই কলা বিভাগ থেকে খুব কম নাম্বার নিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেছে। সবার খুবই মন খারাপ হলো। আব্বার সব থেকে বেশী মন খারাপ হলো। এই সুযোগে জুঁই আব্বাকে বোঝালো ভারত্বেশ্বরী হোমস খুব ভাল কিন্ত জুঁয়ের জন্য না।

আরও জানুন » মনুষ্যত্বের লড়াই (৫) »

রোকসানা হাবীব লুবনা
অনুসরণ করুন

রোকসানা হাবীব লুবনা

লেখালেখি বলতে যা বোঝায় সেটা কখনই আমি লিখি না। তবে ছোটবেলা থেকেই প্রচুর সাহিত্য, জীবন ধর্মী লেখার নিয়মিত পাঠিকা। বেগম, দেশ এমন অনেক পত্রিকার একনিষ্ঠ পাঠিকা। প্রবাস জীবনে চারিপাশের মানুষদের দেখে, নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখে অনেক অনুভূতি হয়। সেগুলো মাঝে মাঝেই ইচ্চা হয় অন্যদের সাথে শেয়ার করি যেন তারা আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু নিতে পারে। যদি আমার একটা অভিজ্ঞতা অন্য কারো কাজে লাগে, এই ভেবেই লেখা। ইতিহাসের উপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাশ করার পর কিছুদিন বেসরকারী চাকরিতে ছিলাম। এরপর ফ্যাশন টেকনোলজীর উপর ডিপ্লোমা এবং বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের কেক এবং বেকিং নিয়ে পড়াশুনা করি। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের ক্যান্সার নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যেই এই কেক এর পেছনে কাজ করে যাওয়া। জীবনবোধ থেকে লিখতে চাই আমার অনুভূতিগুলো।
রোকসানা হাবীব লুবনা
অনুসরণ করুন

Latest posts by রোকসানা হাবীব লুবনা (see all)

Comments

comments