মনুষ্যত্বের লড়াই (৩)

0
284
Print Friendly, PDF & Email

মনুষ্যত্বের লড়াই (২) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

মিতু বললো, আগে কখনও ঢাকা স্টেডিয়ামে গিয়েছিস?

জুঁই বলেছিলো, না কেন ?

তখন মিতু বললো, এই সেফটি পিন তোকে অক্ষত এবং সন্মানের সাথে আবার হোষ্টেলে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে।

জুঁই জানতে চাইলো, কিভাবে?

মিতু বললো, বাস থেকে নামার আগেই দুই হাতের মধ্যে এই দুই সেফটি পিন বের করে এইভাবে ধরে রাখবি তারপর বাস থেকে নামবি।

জুঁই জানতে চাইলো, তাহলে কি হবে?

মিতু বললো, আমি হাতে সেফটি পিন ধরছি এইবার তুই আমার কাছে এসে আমার শরীরে হাত দেওয়ার চেষ্টা কর?

জুঁই কাছে যাওয়ার আগেই সেফটিপিন ওর হাতে ফুটে গেলো। জুঁইউফ বলে চিৎকার করে উঠলো।

মিতু হেসে বললো, কি কেমন লাগে? আমাকে কি এখন ছুঁয়ে দেখতে মন চায়?

জুঁই হেসে বলেছিল, না আপা। আপনি যতই সুন্দরী হন না কেন আমি আপনাকে চাই না, চাই না।

জুঁইয়ের বাংলা সিনেমার মত অভিনয় দেখে সবাই হো হো করে হেসে দিয়েছিল।

বাসে উঠার পর থেকে জুঁই খুব উত্তেজিত হয়ে আছে। এই প্রথম ও ঢাকা স্টেডিয়ামে যাচ্ছে। ওদের প্যারেড দেখতে আব্বাও খুলনা থেকে আসবেন। জুঁইয়ের চোখ আনন্দে চকচক করছে। হঠাৎ দেখলো মিস দে, ওদের ডিসপ্লের টিচার।

তিনি বললেন, কি মেয়েরা রেডি? আমরা এখন বাস থেকে নীচে নামবো। মনে আছেতো আমাদের কি করতে হবে?

সবাই একসাথে বললো, জ্বী মনে আছে।

বাস থেকে নামার পরই জুঁই কথা হারিয়ে ফেললো। জুঁই কোনও দিন দেখেনি এতো লোক একসাথে হুমড়ি দিয়ে মেয়েদের গায়ের উপর পড়ার জন্য চেষ্টা করছে। মেয়েদের শরীরকে ছোঁয়ার সে-কি চেষ্টা তাদের। এই গুলি কোনটাই দেখেনি সে।তাই এইসব দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেলো। একদল ছেলেকে দেখলো ওর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ও মিতুর সেই সেফটিপিনের কথা ভুলে গেল। ভয়ে ওর পা দুটি বরফের মত জমে গেল এবং ও নড়াচড়া করতে ভুলে গেলো। নিজের অজান্তেই চোখ বন্ধ করে ফেললো। হঠাৎ অনুভব করলো মিস দে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন আর তার দুই হাত বাতাসে এলো পাথাড়ী ঘোরাচ্ছেন আর সব ছেলেরা পিছনে সরে যাচ্ছে আর বলছে আরে! এই মেয়েদের শরীরে কি কাঁটা নাকি? এদের কাছে গেলেই কি যেন ফুটতে থাকে?

মিস দে মাঠের মধ্যে জুঁইকে নিয়ে এলেন। ওকে পানি খেতে দিলেন। তারপর জুঁই একটু ঠান্ডা হলেই মিস দে হেসে বললেন, প্রথম এসেছো তাই ভয়ে জমে গিয়েছিল। কিন্ত মেয়ে! সব সময় একটা কথা মনে রাখবে। তোমার ভয় আর অন্যায়কারীর জয়। তুমি যদি কখনও জীবনের কোনও মোড়ে আটকে যাও এবং তুমি যদি সঠিক থাকো তাহলে ভয় পাবে না। মনের ভয়কে মনের ভিতর থেকে কোনও ভাবেই বের হতে দিবে না। সব সময় মনে রাখবে, যে অন্যায় করে সে খুবই দুর্বল থাকে। একমাত্র তুমিই পারো তোমার দুর্বলতা দেখিয়েঅন্যায়কারীকেসাহসী বানাতে। তুমি কি সেটা চাও?

জুঁই বলেছিল না, আমি সেটা চাই না মিস দে।

জুঁইয়ের চোখে এমন কিছু ছিল যে মিস দে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন আর বলেন নিজের শক্তিকে নতুন করে আবিষ্কার কর। দেখবে, তুমি অনেক শক্তিশালী একজন মানুষ। যাও তোমার গ্রুপে গিয়ে দাঁড়াও। তোমার ক্যাপ্টেন তোমাকে খুঁজছে।

জুঁই চলে গেল, তারপর প্যারেড শুরু হলো। এরপর ডিসপ্লের সময় যখন ভারত্বেশ্বরী হোমসের নাম ঘোষনা করা হল, পুরো স্টেডিয়াম তখন দর্শকদেরহাততালী এবংভারত্বেশ্বরী হোমস! ভারত্বেশ্বরী হোমস!চিৎকারে ভরে গেলো।

জুঁইদের ডিসপ্লে খুব সুন্দর ভাবে শেষ হল। ওরা লাইন দিয়ে স্টেডিয়াম থেকে বের হয়ে আসার সময় মিস দে ওর পাশে এসে বললেন, মনে আছে আমি কি বলেছিলাম? এইবার তোমাকে প্রমান করতে হবে কে সাহসী? তুমি নাকি ওই নোংরা ছেলেগুলি যারা তোমার শরীরকে ছোঁয়ার জন্য লালা ফেলছে ।

জুঁই হাতের মধ্যে সেফটিপিন নিয়ে বের হয়ে এলো। কিছু ছেলে গেটের বাইরে ঠিক ওর পিছন থেকে ওর পশ্চাতে হাত দেওয়ার চেষ্টা করলো। জুঁই পিছনে না তাকিয়েই ওর সেফটিপিন এলোপাথাড়ী ভাবে ছেলেগুলির শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ফুঁটিয়ে দিলো। জুঁইয়ের পিছন ফিরে তাকানোর কোনও ইচ্ছাই হল না। ওর সমস্ত আক্রোশ আজ এই ছেলেগুলিকে ক্ষত বিক্ষত করছে। তাদের আহ! উফ! ও মাগো! গেলাম গো! এই চিৎকারের সাথে শান্ত হলো জুঁই। বাসে বসে এই প্রথম ওকে ভারত্বেশ্বরীতে ভর্তি করানোর জন্য ওর আব্বা-আম্মাকে ক্ষমা করে দিলো। মুখে ফুটে উঠলো প্রশান্তির একটা মিষ্টি হাসি।

সেইদিন থেকে জুঁই শিখে গেল কিভাবে নিজের মুখের হাসি, প্রশান্তি অন্যের কাছ থেকে আদায় করে নিতে হয়।ও যে রুমে থাকতো, ওর মাথার কাছেই একটা জানালা ছিল। সেটা দিয়ে জুঁই বাইরে তাকিয়ে থাকতো আর ভাবতো কবে পুকুর পাড়ের কৃষ্ণচুড়া গাছে ফুল ফুটবে। ওর এক বান্ধবী ওকে বলেছিল, ওই কৃষ্ণচুড়া গাছ যখন আগুনের মত লাল হয়ে যাবে তখন আমাদেরছয় সপ্তাহের গ্রীষ্মকালীন ছুটি হবে। তাই যখনই জুঁই একা থাকতো রুমে তখনই জানালা দিয়ে বাইরে উকিঁ দিয়ে দেখতো গাছে কোনও কড়ি হয়েছেকিনা! ফুল ফুটতে আর কত দেরী?

এরই মধ্যে জুঁয়ের অনেক বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। হোষ্টেলের মেয়েরা সবাই একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসতো। ওদের সবাইকে কিছু কাজ ভাগ করে দেওয়া হত। যে টিম ভাল কাজ করতো সেই টিমকে পুরষ্কার দেওয়া হত। বাথরুম থেকে শুরু করে অফিসের বারান্দা পর্যন্ত পুরোটাই ভারত্বেশ্বরী হোমসের মেয়েরা পরিষ্কার রাখতো।

আরও জানুন » মনুষ্যত্বের লড়াই (৪) »

লেখালেখি বলতে যা বোঝায় সেটা কখনই আমি লিখি না। তবে ছোটবেলা থেকেই প্রচুর সাহিত্য, জীবন ধর্মী লেখার নিয়মিত পাঠিকা। বেগম, দেশ এমন অনেক পত্রিকার একনিষ্ঠ পাঠিকা। প্রবাস জীবনে চারিপাশের মানুষদের দেখে, নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখে অনেক অনুভূতি হয়। সেগুলো মাঝে মাঝেই ইচ্চা হয় অন্যদের সাথে শেয়ার করি যেন তারা আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু নিতে পারে। যদি আমার একটা অভিজ্ঞতা অন্য কারো কাজে লাগে, এই ভেবেই লেখা। ইতিহাসের উপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাশ করার পর কিছুদিন বেসরকারী চাকরিতে ছিলাম। এরপর ফ্যাশন টেকনোলজীর উপর ডিপ্লোমা এবং বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের কেক এবং বেকিং নিয়ে পড়াশুনা করি। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের ক্যান্সার নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যেই এই কেক এর পেছনে কাজ করে যাওয়া। জীবনবোধ থেকে লিখতে চাই আমার অনুভূতিগুলো।

Comments

comments