মনুষ্যত্বের লড়াই (২)

0
442
Print Friendly, PDF & Email

মনুষ্যত্বের লড়াই (১) পড়ুন এখানে ক্লিক করে

জুঁই ফোনটা হাতে নিয়েই বাংলাদেশের নাম্বার দেখতে পেলো। হ্যালো বলতেই অপর প্রান্ত থেকে আম্মা কথা বলে উঠলেন । জুঁই খবরটা শুনে হু হা ছাড়া আর কোনও কথা বলতে পারলো না। ঘরে হিটিংটা চালু আছে তারপরও ওর হাত পা কেমন জানি ঠান্ডায় জমে যেতে চাইছে। ফোনটা রেখে চায়ের মগটা হাতে নিয়ে লিভিং রুমের কাঁচের দরজা দিয়ে বাইরে বাগানটার দিকে তাকিয়ে তাকালো।

যখন ওয়েষ্ট ভার্জিনিয়ায় অনেক তুষারপাত হয় তখন স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়। কারন স্কুলের বাসগুলি পাহাড়ী এলাকায় আসতে পারে না। জুঁইদের বাসাটা পাহাড়ের একটু উপরে তাই তুষারপাত হলে খুবই অসুবিধা হয়। নিজেকেই শোভেল নিয়ে বাড়ির সামনের রাস্তার বরফ পরিষ্কার করতে হয়। ধবধবে সাদা তুষারের অনেক ঘন আস্তর পড়ায় গাছগুলিকে কেমন যেন মোমের তৈরি কোনওভাস্কর্য লাগছে। ফোনটা টেবিলে রেখে চায়ের মগটা হাতে নিয়ে কখন যে দরজার কাছে এসে দাড়িয়েছে, নিজেও টের পায়নি। বাইরের এই যে অপার্থিব সৌন্দর্য্য তার কোনও কিছুই জুঁইয়ের চোখ দেখতে পারছিল না। মন কিছুই অনুভব করতে পারছিল না। কারন জুঁইয়ের শরীর তখন ওয়েষ্ট ভার্জিনিয়াতে থাকলেওওর মন চলে গিয়েছিলদূরে বহু দূরে, যেখানে ওর শৈশব, কৈশোর কেটেছিল। সেই প্রিয় জন্মভুমি বাংলাদেশের ছোট একটা জেলা খুলনায়।

হঠাৎ করেই অতীতের সব দিনগুলি, সময়গুলি জুঁইকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেলো সেই ফেলে আসা জায়গায়। আমেরিকায় আসার পর থেকে যেটা জুঁই খুব সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিল। মনের অতি গভীরে লুকানো সেই কষ্ট, সংগ্রাম আর বিনা অপরাধে দিনের পর দিন যে শাস্তি বয়ে বেড়িয়েছিল। সেই দিনগুলি আবার চোখের সামনে ভেসে উঠলো।এতোটা বছর ধরে কোনও দিন এইগুলিকে ও মনের ভিতর থেকে বের হতে দেয়নি। তাই যখনই কেউ ওকে জিজ্ঞাসা করতো আপনি কোন স্কুলে পড়াশুনা করেছেন? জুঁই খুব সুন্দর করে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতো। কারন ও জানে এই একটা উওরের সাথে সাথে ওর অনেক স্মৃতি মনে পড়ে যাবে।

যার খারাপ প্রভাব রোমেল থেকে শুরু করে সংসারের সব মানুষের উপর, এমনকি অন্যসব কিছুর উপর পড়বে। বর্তমানের এই সুন্দর সময়টাকে ওই কালো অধ্যায়ের কথা মনে করে নষ্ট করতে চায় না। জীবন ওকে সুযোগ দিয়েছে আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করতে, ও নির্দ্বিধায় সেই সুযোগ হাতে তুলে নিয়েছে। পিছনের সবকিছুকে পিছনে রেখেই শুধু নয়, বাংলাদেশকেও পিছনে ছেড়ে আজ ও এই দূর দেশে চলে এসেছে। কারো প্রতি এখন আর ওর কোনও রাগ নেই।

অনেক বছর আগের কথা,জুঁই যখন ক্লাস ৬ এ পড়ে তখন হঠাৎ করে অন্য পাড়ার কিছু ছেলে ওকে স্কুলে যাওয়ার পথে এবং স্কুল শেষ হলে ওর রিক্সার পিছন পিছন আসা শুরু করে। তারপর তারা রিক্সার মধ্যে ওর দিকে চিঠি ছুড়ে মারা শুরু করে। ওরা কেন এমন করছে জুঁই সেটাই ধরতে পারছিল না। ওরা কি চায় সেটাও বুঝতে পারতো না।

স্কুলে ওর সাথে ওর ক্লাসের মেয়েরা মেলামেশা করা বন্ধ করে দিলো। ওর সব থেকে প্রিয় বান্ধবী রনিও ওর সাথে কথা বলতে চাইছিল না। জুঁই যখন জিজ্ঞাসা করলো তার অপরাধ কি?

রনি বললো, আমি জানি না জুঁই। আম্মা বলেছে তুই ভাল মেয়ে না, তাই তোর পিছনে পিছনে খারাপ ছেলেরা তোর বাসা পর্যন্ত যায়। তোর সাথে কথা বললে একদিন ওরা আমাকেও তোর মত খারাপ মেয়ে মনে করবে। আমার পিছন পিছন আমার বাসায় যাবে। আজে বাজে কথা বলবে। আমি খুব ভয় পাই। তুই অন্য মেয়েদের সাথে কথা বল।

জুঁই কথা হারিয়ে ফেলেছিল। ওর আর কোনও মেয়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করলো না। বাসায় ফিরে আম্মাকে জিজ্ঞাসা করলো, আম্মা খারাপ মেয়ে কি? ছেলেরা কিভাবে বোঝে যে ও খারাপ মেয়ে?

আম্মা বললেন এটা তোমাকে কে বলেছে? কি হয়েছে? তখন জুঁই আম্মাকে সব বলেছিল। আম্মা শুনে ভীষন গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন। পরের দিন জুঁইয়ের আম্মা ওকে স্কুলে নিয়ে গেলেন এবং স্কুল ছুটি হলে সাথে করে বাসায় নিয়ে আসলেন। ওই দিন আর ছেলেগুলি জুঁইদের রিক্সার পিছনে আসলো না। জুঁইয়ের আম্মা এরপর থেকে ওকে স্কুলে দিতে এবং স্কুল থেকে নিয়ে আসতে শুরু করেন। এক সপ্তাহ খুব ভালই গেলো। ছেলেগুলি আর ওর পিছু নিলো না। কিন্ত যখন ওরা বুঝে গেলো জুঁই এর আম্মা এখন থেকে ওকে নিয়ে আসা যাওয়া করবেন তখন তারা আবার জুঁইদের পিছু নেওয়া শুরু করে দিলো। জুঁই এর আম্মাকে শ্বাশুড়িআম্মা বলে জোরে জোরে ডাকা শুরু করলো। আত্বীয় স্বজনদের কানে গেলে তারা সবাই বললো, জুঁইতো অনেক বড় হয়ে গেছে। ও কি সেলোয়ার-কামিজ পড়ে, নাকি এখনও ফ্রক পরাও? ওড়না কি গায়ে রাখে? আজকাল মেয়েরাতো কাপড়ই পরতে চায় না। ছেলেদের আর দোষ কি? এই ধরনের কথা তারা অনায়াসে বলা শুরু করলো।

পাড়া প্রতিবেশীরা জুঁই আর ওর আম্মার দিকে আড় চোখে তাকানো শুরু করলো। আম্মা কিছুতেই এটা মানতে পারছিলেন না। আব্বার সাথে আম্মা কথা বলে সিদ্বান্ত নিলেন জুঁইকে হোষ্টেলে পাঠানো হবে। ক্লাস ৬ এর পরীক্ষা শেষ হলেই ও ভারত্বেশ্বরী হোমসে পরীক্ষা দেয়। দেয় বলাটা মনে হয় ঠিক হবে না। ওকে দিতে বাধ্য করা হয়। পরীক্ষা পাশ করার পর ওকে আব্বা-আম্মা দুইজনে হোষ্টেলে রেখে চলে আসেন।

আজও জুঁই সেই দিনটা দিব্য চোখে দেখতে পায় এবং ভয়ে কুঁকড়ে যায়। ওর আব্বা-আম্মা ওকে রেখে গেট দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছেন। আম্মা পিছন ফিরে তাকাচ্ছেন আর চোখের পানি মুছছিলেন। জুঁই অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আর ভাবছিল, আম্মা কাদঁছেন তারপরও কেন ওকে এই হোষ্টেলে রেখে যাচ্ছেন? ওর অপরাধ কি? ও কিভাবে আম্মা-আব্বা শিপু, লিপুকে ছাড়া থাকবে?

আম্মাকে ছাড়া জুঁই কোনও দিন ওর নানা বাড়ীতেও থাকেনি। ও একা একটা বেডে কোনও দিন ঘুমায়নি। ওর খুব ভুতের ভয় ছিল। তাই রাতে ওরা তিন ভাইবোন একসাথে অনেক বড় একটা বিছানায় ঘুমাতো।

জুঁই কতক্ষন দাঁড়িয়ে ছিল ওর মনে নেই। এটা মনে আছে আব্বা-আম্মাকে ও আর দেখতে পারছিল না। তারা ওর চোখের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল, তারপরও জুঁই গেটের দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে ছিল। ওর মন বলছিল আম্মা ফিরে আসবেন এবং জুঁইকে এখান থেকে নিয়ে যাবেন। আম্মা তার একটা মাত্র মেয়েকে কোনও দিন এতো দূরে হোষ্টেলে রেখে খুলনায় চলে যেতে পারবেন না।

কিন্ত জুঁইয়ের ইচ্ছা পুরন হল না বরং উল্টোটাই ঘটে গেল। আম্মা চলে গেলেন এবং ক্লাস ৭ এর একমেয়ে তাকে খুব কর্কশ ভাষায় বললো, চলো তোমার রুম দেখিয়ে দেই এবং তোমার জিনিস কোথায় রাখতে হবে সেটাও দেখিয়ে দিবো। আজই তোমাকে সব বুঝে নিতে হবে কারন কাল থেকে ২৬শে মার্চের প্যারেড এর জন্য আমাদের প্রতিদিন দুই ঘন্টা করে প্রাকটিস করতে হবে। তখন আমি তোমাকে কোনও সময় দিতে পারবো না। তারপর জুঁইকে ১নাম্বার রুমে ১০ নাম্বার বেড দেখিয়ে দিলো। সাধারন ড্রেস এবং সেই সাথে দুই সেট ফরমাল ড্রেস পেলো ও। কিভাবে ড্রেস পরতে হয় সেটা ওই মেয়ে তাকে শিখিয়ে দিলো। খাবার ঘন্টা পড়লো, জুঁইকে নিয়ে মেয়েটা খেতে গেলো।

কিভাবে খাবার নিতে হয় সবকিছু ওকে বুঝিয়ে দিলো। জুঁয়ের গলা দিয়ে ওই দিন কোনও ভাবেই ভাত নীচে থামতে চাইলো না। বারবার চোখের পানিতে ভাতগুলি ঝাপসা লাগছিল।মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে খাবার শেষ করে সবাই লাইন দিয়ে বের হয়ে এলো। এতক্ষন পরে মনে হয় মেয়েটার ওর জন্য মায়া লেগেছিল। তাই তখন খুবই মায়া ভরা গলায় বলেছিল, কেঁদো না। আমি এখানে এসেছিলাম ক্লাস ৪ এ আর এখন এই জায়গা আমার নিজের মনে হয়।বাড়ী গেলে কিছুদিন পর আমার দম বন্ধ হয়ে যায়। সবকিছু অন্য রকম লাগে। আমার নাম ছায়া। আমার মা মারা যাবার পর আমার বাবা আমাকে ভারত্বেশ্বরী হোমসে ভর্তি করে দেন। তখন থেকে এই টিচাররাই আমার মা-বাবাএবং আমার ক্লাসমেটরা আমার ভাই-বোন বন্ধু, বড় আপুরা অভিবাবক। কিছুদিন পর তোমারওএই হোষ্টেলের সবকিছুর প্রতি মায়া লেগে যাবে। এখন বিশ্রাম নাও, কান্নাকাটি করো না। এসো, তোমাকে আমাদের ক্লাসের মেয়েদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।

যে একঘন্টা বিশ্রামের সময় পেলো সেই সময় ক্লাসের বাকী মেয়েরা এসে পরিচিত হলো। আবার ঘন্টা পড়লেই ছায়া ওকে ড্রিলের ড্রেস পরতে বললো, তারপর একসাথে ওরা মাঠে গেলো। টানা দুই ঘন্টা ওরা প্যারেড করলো। নতুন জুতার কারনে জুঁয়ের পা থেকে রক্ত বের হয়ে গেল। কিন্ত সব ক্লাসমেট ওর পায়ের রক্ত মুছে ঔষধ লাগিয়ে দিলো। এখনও ওর মনে আছে আইভী ওর জুতাটা ভিজিয়ে দিলো। সেই প্রথম জুঁই জানলো নতুন জুতা ভিজে গেলে সাইজে একটু বড় হয়।

 

ওই রাতে এতো ক্লান্ত ছিল তারপরও ওর চোখে ঘুম এলো না। শুধু ওর ছোট ভাইদের কথা মনে হচ্ছিল। চোখের পানিতে বালিশ ভিজে গিয়েছিল। এরপর সেই ২৬শে মার্চ এলো। সকাল ৫টার মধ্যে সব মেয়েরা বাসে উঠে গেল। ৮টা বাস মেয়েদেরকে নিয়ে ঢাকা স্টেডিয়ামের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলো। ড্রিল এবং ডিসপ্লের ড্রেস ছিল অন্যরকম সুন্দর এবং ওই ড্রেসে মেয়েদেরকে অনেক বেশী স্মার্ট লাগতো। জুঁই নিজেই ওকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল।হঠাৎ মিতু এসে ওকে বড় দুইটি সেফটি পিন সুন্দর করে বেল্টে এমনভাবে লাগিয়ে দিলো যে সেফটি পিন দুইটি বাইরের থেকে কোনও ভাবেই দেখা যাচ্ছিল না। জুঁই অবাক হয়ে বললো তুই আমাকে এই সেফটিপিন লাগিয়ে দিলি কেন?

আরও জানুন » মনুষ্যত্বের লড়াই (৩) »

লেখালেখি বলতে যা বোঝায় সেটা কখনই আমি লিখি না। তবে ছোটবেলা থেকেই প্রচুর সাহিত্য, জীবন ধর্মী লেখার নিয়মিত পাঠিকা। বেগম, দেশ এমন অনেক পত্রিকার একনিষ্ঠ পাঠিকা। প্রবাস জীবনে চারিপাশের মানুষদের দেখে, নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখে অনেক অনুভূতি হয়। সেগুলো মাঝে মাঝেই ইচ্চা হয় অন্যদের সাথে শেয়ার করি যেন তারা আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু নিতে পারে। যদি আমার একটা অভিজ্ঞতা অন্য কারো কাজে লাগে, এই ভেবেই লেখা। ইতিহাসের উপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাশ করার পর কিছুদিন বেসরকারী চাকরিতে ছিলাম। এরপর ফ্যাশন টেকনোলজীর উপর ডিপ্লোমা এবং বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের কেক এবং বেকিং নিয়ে পড়াশুনা করি। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের ক্যান্সার নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যেই এই কেক এর পেছনে কাজ করে যাওয়া। জীবনবোধ থেকে লিখতে চাই আমার অনুভূতিগুলো।

Comments

comments