জীবনের রংগুলো

0
538
আলী আহসান এর ছোট গল্প জীবনের রংগুলো
আলী আহসান এর ছোট গল্প জীবনের রংগুলো
Print Friendly, PDF & Email

মৃদু ঘড়ঘড় একটা শব্দ পিছন পিছন আসছে। কখনও আবার শব্দটা অন্যরকম রুপ নিচ্ছে, তখন মনে হচ্ছ অনেক দুরে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে আর আশেপাশে গিজগিজ করছে গ্যালারীর দর্শকদের হৈ চৈ। মাঝেমাঝে খুব কাছে থেকে কেউ মনে হয় টুংটাং করে কাচের প্লেটের উপর কিছু বাজাচ্ছে। সবকিছু মিলেয়ে একটা আনন্দময় উৎসবের অনুভুতি সৃষ্টি হচ্ছে। এই অনুভুতির জন্য দীর্ঘ দশ বছর অপেক্ষা করেছে সে।

 

এই দীর্ঘ দশ বছরের প্রতিটা রাত সে পার করেছে নির্ঘুম ভাবে শহরের অলিতে গলিতে হেঁটে হেঁটে। ঘন্টার পর ঘন্টা হেঁটেছে ক্লান্তির অনুভুতিগুলোকে বুকের অনেক গভীর উপত্যাকায় কবর দিয়ে। কখনও আলোকিত প্রশস্ত রাস্তা আবার কখনও নিঝুম আঁধারের গলি, এমন হাজারো রাস্তায় সে হেঁটেছে। তারপর যখন সমস্ত পৃথিবীর মানুষ ঘুমের অরণ্য থেকে ফিরে এসেছে তখন সে হারিয়ে গেছে ঘুমের অরন্যে। দীর্ঘ দশ বছর পর আজ তার সেই আনন্দময় দিন যার জন্য অজস্র রাত্রি নির্ঘুম কাটিয়েছে সে।

 

চেক-ইন, সিকিউরিটি পর্ব সেরে অনেক আগেই সে ডিপারচার গেটের দিকে যাওয়ার করিডরে চলে এসেছে। রোমের দা ভিঞ্চি এয়ারপোর্টটা অনেক ব্যাস্ত, কত দেশের মানুষ এখান দিয়ে বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে আসছে প্রতিদিন কিন্তু এই প্রথম সে রোম এয়ারপোর্টে এসেছে। বিভিন্ন দেশের ভাষায় কি যেন বলছে লাউড স্পিকারে, কিন্ত বাংলা আর অল্প কিছু ইংরেজি ছাড়া আর কোনও ভাষায় দখল নেই তার। এই দশ বছরে খুব অল্প কিছু ইতালীয়ান শিখেছে সে, অতি সাধারন কিছু কথা সে বলতে পারে ইতালীয়ানে। কিন্তু লাউড স্পিকার থেকে আসা কথাগুলোর সবটুকু বোঝার মতন ভাষা জ্ঞান তার নেই। অনেকক্ষন চেষ্টা করেও সে বুঝতে পারেনি সব কথার মানে। এখন তাকে অপেক্ষা করতে হবে দেশী চেহারার কারও জন্য। সাথে যারা ছিল কিভাবে যেন তাদেরকে হারিয়ে ফেলেছে আসবার সময়। সিকিউরিটির গেট থেকে বের হওয়ার সময়ও ওরা সাথে ছিল কিন্তু কিছুদুর যাওয়ার পরই খেয়াল করেছে তাদের কেউ আর ওর সাথে নেই।

 

চেক-ইন করার সময় পাসপোর্ট আর টিকিট জমা দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে। অনেক কষ্টে কাউন্টারের মেয়েটার কথার জবাব দিয়েছে ভুলভাল ইংরেজি দিয়ে। বোর্ডিং কার্ড দেওয়ার সময় কি যেন বলল মেয়েটা কিন্তু পুরোটা সে বোঝেনি। শুধু বুঝতে পেরেছে টার্মিনাল ৩ এর জি-১১ থেকে তার প্লেনটা ছাড়বে। আসবার আগে তার রুমমেটরা খুব ভালভাবে সব বুঝিয়ে দিয়েছে তারপরও সবকিছু কেমন ওলট পালট লাগছে। সাথের ওরাও বাংলাদেশ যাবে তাহলে ওদেরও তো ১১ নম্বর গেটে যাওয়ার কথা! কিন্তু ওদেরকে দেখতে পাচ্ছে না কেন? সে কি ভুল দিকে চলে এসেছে?

 

হাতের ছোট সুটকেসটা কিনেছে সে খুব ভাল একটা দোকান থেকে তারপরও চাকাগুলো থেকে একটা ঘড়ঘড় শব্দটা আসছে। যখন কার্পেটের উপর দিয়ে হাঁটে তখন ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকার মতন শব্দ হয় আর মার্বেলের ফ্লোরের উপর দিয়ে হাঁটার সময় ঘড়ঘড়। এই শব্দটা অবশ্য ওর কাছে ভাললাগছে, নিজের একজন সংগী মনে হচ্ছে শব্দটাকে। এয়ারপোর্টে অজস্র মানুষের কথা, রেষ্টুরেন্টের কাঁটা চামচের টুংটাং শব্দ সবই ওর কাছে ভাললাগছে। এয়ারপোর্টের এই পুরো পরিবেশটাই একটা আনন্দের অনুভুতি ছড়িয়ে দিচ্ছে তার ভেতর। বাংলাদেশ, তার প্রিয় দেশে যাচ্ছে সে আজ দীর্ঘ দশ বছর পরে।

 

রমিজ ভাই ! ওই রমিজ ভাই!

 

খেয়াল করল কে যেন ওর নাম ধরে ডাকছে। শব্দের উৎস লক্ষ্য করে তাকাতেই দেখতে পেল ওর হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে। মনে হল নতুন জীবন ফিরে পেল রমিজ। ওরা মোট ছয়জন বাংলাদেশ যাবে একই ফ্লাইটে। এবার আর ওদেরকে হারানো চলবে না। একা একা বাংলাদেশ যাওয়ার ফ্লাইটের গেট খুঁজে পাওয়া মুসকিল হয়ে যাবে ওর জন্য। ওদের সাথে সাথে হাঁটতে থাকল রমিজ। সাথের ওরা আগেও একবার এই এয়ারপোর্ট থেকে বাংলাদেশে গেছে। ওদের মধ্যে দুজন আছে খুব শিক্ষিত, ইতালীয়ার ভাষাটাও চোস্ত বলতে পারে। রমিজ অবশ্য ইতালীয়ার শেখার মতন সুযোগ পাইনি। এবার দেশ থেকে ফিরে আসার পর অবশ্যই ও একটা কোর্সে ভর্তি হবে।

 

বোর্ডিং শুরু হতে এখনও অনেক দেরি। করিডরের বিশাল ডিসপ্লে বোর্ডের সামনে অনেক ভিড়। সবাই উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখছে বিশাল টিভির মতন ডিসপ্লে বোর্ডের উপর লেখা ফ্লাইট নাম্বার গুলো। কোন ফ্লাইট কোন গেট থেকে কখন ছাড়বে। রমিজের ডিসপ্লে দেখার দরকার নেই, কারন সে প্লেনের টাইম আর গেট নম্বর জানে। সাথের ওরাও দাঁড়ায়নি এখানে।

 

ওদের অনেক পিছনে দুজন কর্মরত পোলিজিয়া (Polizia) সাথে ভয়ঙ্কর চেহারার একটা কাল কুকুর। রমিজের ভয় করছে, কারন এই দশ বছর প্রায়দিনই এই পোলিজিয়ার তাড়া খেয়ে বেঁচে থেকেছে সে। রমিজের সাথের ওরাও একই ভাবে জীবন পার করেছে ইতালীর রোম শহরে কিন্তু ওদের ভাগ্যটা সুপ্রসন্ন ছিল তাই ওর মতন দীর্ঘ দশবছর অপেক্ষা করতে হয়নি। পোলিজিয়া দেখলেই রমিজের হাত-পা কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যায়।

 

ডিসপ্লে বোর্ডের ভীড়ের আড়ালে পোলিজিয়া দুজনকে আর দেখা যাচ্ছে না। রমিজ একটু পিছিয়ে পড়েছিল অন্যমনস্কভাবে পিছনের দিকে তাকানোর জন্য। দ্রুত হেঁটে আবার সঙ্গীদের কাছে চলে এলো রমিজ। বাঁকটা ঘুরতেই সামনে বড় অক্ষরে লেখা সাইনবোর্ড চোখে পড়ল G11-14 করিডোরের শেষ মাথায় হাতের ডান দিকে। কর্নারে বেশ অনেকগুলো রেষ্টুরেন্ট, ডিউটি-ফ্রি শপ, ষ্টারবাকস এর কফির দোকান আর একটা বই এর দোকান।

 

হাতে ওদের অনেক সময় এখনও। ওরা সবাই একটা রেষ্টুরেন্টে ঢুকল কিছু খেয়ে নেওয়ার জন্য। অনেক ভোরে বের হয়েছে, উত্তেজনায় আর শেষ মুহুর্তে সবকিছু গোছানোর ব্যাস্ততায় ঠিক মতন খাওয়া হয়নি। এখন সবারই খুব ক্ষিধা পেয়েছে। একটা খালি টেবিল দেখে সবাই ওটা দখল করল তারপর খাবার এনে বসল। রমিজ তার হাতের কেবিন সুটকেসটা পাশে রেখে দিল। অল্পকিছু কাষ্টমার এই রেষ্টুরেন্টে এখন, হয়ত এই গেটের দিকে তেমন ফ্লাইট নেই এসময়ে।

 

বোর্ডিং হয়ে যাওয়ার পর প্লেন এখন রানওয়েতে অপেক্ষা করছে টেকঅফের জন্য। ওদের সিটগুলো এক জায়গায় পড়েনি, রমিজের সিট পড়েছে জানালার পাশে। ওর পাশের সিটে আইলের দিকে একজন বয়স্ক মতন জার্মান ভদ্রলোক। রমিজের সাথে বেশ কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করেছেন তিনি, রমিজ তার সামান্য ইংরেজি জ্ঞান দিয়ে কিছুদুর কথা বলেছে। এরপর আর ভদ্রলোকের সাথে কথা আগায়নি। ভাষা একটা বড় ব্যাপার।

 

জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে রমিজ। দশ বছর আগে রমিজ এক দালালের মাধ্যমে তুরস্ক আসে তারপর গ্রীস হয়ে ইতালীতে ঢোকে। এদেশে তার প্রবেশ অবৈধ, তাই পুলিশের তাড়া খেয়েই কেটেছে বেশিরভাগ সময়। আরেক দালালের মাধ্যমে ইতালীতে বৈধভাবে থাকার একটা ব্যাবস্থা করেছে। ইতালীতে কৃষিকাজের জন্য এক ধরনের পার্মিট দেওয়া হয়। কতৃপক্ষ জানে যে অবৈধ ইমিগ্রান্টদের খুঁজে পাওয়া খুব মুসকিল। তাছাড়া ওদের অনেক মাঠকর্মী দরকার কৃষিকাজের জন্য। প্রায় দশহাজার ইউরোর মাধ্যমে সেই পার্মিট দালালদের মাধ্যমে কেনা যায়। এজন্য তাকে রাতের পর রাত কাজ করতে হয়েছে, রোমের রাস্তায় রাস্তায় ফেরী করতে হয়েছে দালালের টাকা দেওয়ার জন্য। এই পার্মিটেই রমিজের ইতালীতে থাকার ব্যাবস্থা হয়েছে আর তাই ইতালীর বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না তার। দীর্ঘ দশ বছর পার হয়ে গেছে তার ইতালীর আজীবন বাসিন্দা হওয়ার কাগজ পেতে। এই দশ বছরে তাকে অনেক কিছু হারাতে হয়েছে।

 

এই দশ বছরে কত কিছু বদলে গেছে। ইতালী এসে পৌছাবার পর জানতে পারে মা অসুস্থ কিন্তু দেশে ফিরে যাওয়ার কোনও পথ তার ছিল না কারন এদেশে তখনও সে অবৈধ। এত টাকা খরচ করে এই পরিমান অমানষিক কষ্ট সহ্য করে থাকার পর যদি দেশে ফিরে যেত তাহলে আর কোনও দিন হয়ত ওর এদেশে আসা হত না। বছর খানিক অসুস্থ থাকার পর মা মারা যান কিন্তু রমিজের দেশে যাওয়ার কোনও উপায় ছিল না। মাকে বাঁচানোর সব চেষ্টা ওরা করেছে, বড়ভাইকে দিয়ে মা-কে ইন্ডিয়া পাঠিয়েছে। চিকিৎসার জন্য যত টাকা লাগে সব সে ব্যাবস্থা করেছে কিন্ত মা-কে বাঁচাতে পারেনি। বুকের ভেতরটা তার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে কিন্তু নিরুপায় হয়ে সব সহ্য করেছে।

 

ফ্লাইটটা ফ্রাঙ্কফুর্ট হয়ে তারপর বাংলাদেশ যাবে। শুনেছে ফ্রাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্টটা নাকি অনেক বড়। রমিজ বেশ টেনশানে আছে, কারন প্লেন থেকে নামতে হবে তারপর আবার এক ঘন্টার মধ্যে হাজির হতে হবে সঠিক গেটে। ওর সঙ্গীরা প্লেনের সামনের দিকে সিট পেয়েছে। আশেপাশে দেশী লোকজন আরও অনেকেই আছে যারা সম্ভবত বাংলাদেশ যাবে কিন্তু এদের কাউকেই সে চেনে না।

 

প্লেন থেকে নামার পর সে কয়েকজনের পিছন পিছন এসেছে কিছুদুর কিন্তু তারা কেউই বাংলাদেশে যাবে না। কি বিপদ! সাথের ওরা অনেক আগেই নেমে গেছে, ওদেরকেও খুঁজে পাচ্ছে না। ইনফরমেশনে জিজ্ঞাসা করেছিল তার অল্পবিস্তর জানা ইংরেজি জ্ঞান দিয়ে। তাদের দেখানো পথ ধরেই রমিজ চলে এসেছে টার্মিনাল দুই এ। টিকেটে লেখা ফ্লাইট নম্বর দেখে ডিসপ্লেতে নজর বুলিয়েছে কত নম্বর গেট থেকে ছাড়বে কিন্তু রমিজ বুঝতে পারছে না। কি করবে সে এখন। হাতে আর বেশী সময় নেই। ফ্লাইট মিস হয়ে গেলে সমস্যায় পড়ে যাবে সে।

 

D15 এর লাউঞ্জে বসে আছে হাসান, লাবন্য আর লিয়ানা। ওদের ফ্লাইট ডিলে ঘোষণা করা হয়েছে, এগারটার ফ্লাইট ছাড়বে সোয়া বারটায়। ছোট্ট লিয়ানাকে কোলে নিয়ে বসে আছে হাসান বিরক্ত মুখে। মেয়েটা ঘুমুতে পারছে না কিন্তু তার ঘুম পেয়েছে। ফ্লাইট ডিলে হওয়ার মতন বিরক্তিকর ব্যাপার পৃথিবীতে আর নেই। যদি আগে ভাগে আস, তাহলে ডিলে হবেই। আর যদি কোনও কারনে তোমার দেরি হয় তাহলে অবশ্যই ওইদিন ফ্লাইট ঠিক সময় মতন ছাড়বে এবং তখন নির্ঘাত অস্থিরতা নিয়ে সিকিউরিটি পার হতে হবে। সেই সিকিউরিটির লাইনে ওই দিন দেখা যাবে সর্বোচ্চ ভীড়। অবধারিতভাবে ওইদিনই ভুলক্রমে লিকুইড জিনিসগুলো এলোমেলো অবস্থায় থাকবে এবং সিকিউরিটির অফিসারের কাছে ডাক পড়বে ব্যাগের মালিকের। তখন আবার সবকিছু গুছিয়ে, নতুন করে স্ক্যান করবে এবং সিকিউরিটি সেরে দৌড়াতে দৌড়াতে ফ্লাইটের দিকে যেতে হবে।

 

ওর পাশে এসে এক ভদ্রলোক দাঁড়ালেন। জুলাই মাসের এই প্রচন্ড গরমেও ভদ্রলোক টাই-কোটপ্যান্ট, ভেতরে সোয়েটার আবার ভারী একটা ওভারকোট পরা। দরদর করে ঘামছেন তিনি, হাতের সুটকেসটা শক্ত করে দুহাতে ধরা। তার চোখেমুখ আতংক ভর করেছে মনে হয়।

 

ভাই, আপনি কি বাংলাদেশী। বাংলায় জানতে চাইলেন তিনি, কথায় একটু আঞ্চলিক টান।

 

ভদ্রলোককে দেখে হাসানের সব বিরক্তি চলে গেছে, এখন ওর ভেতর এক ধরনের দুষ্টুমির ভাব চলে এসেছে। সে নিজে অতটা লম্বা চওড়া ধরনের মানুষ নয় কিন্তু এই ভদ্রলোকের উচ্চতা ওর চেয়েও অনেক কম। হাসির কারন হচ্ছে ভদ্রলোকের ছোট শরীর ঢেকে দেওয়া ওই লম্বা ওভারকোটটা, রীতিমতন তাঁর পা ছুঁয়ে গেছে। এটার জন্য তাকে অনেকটা ক্লাউনের মতন দেখাচ্ছে। হাসানের দুষ্টুমি করার ইচ্ছাটা আরও দৃঢ হল।

 

ভদ্রলোককে বিভ্রান্ত করার জন্য চোস্ত জার্মান ভাষায় হাসান বলল, আমাকে দেখে কোন দেশী মনে হয় আপনার?

 

ভ্যাবাচ্যাকে খেয়ে গেলেন ভদ্রলোক, চোখ পিটপিট করে বোঝার চেষ্টা করছেন তিনি ভুল শুনেছেন কিনা। সামনে বসা ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছ না বাংলাদেশী, অনেকটা তুর্কিদের মতন লাগছে। তবু হয়ত ছেলেটা ওকে সাহায্য করতে পারবে গেটটা কোথায় দেখিয়ে দিতে পারবে। তাই বোর্ডিং কার্ডটা বাড়িয়ে ধরে তিনি তাকিয়ে থাকলেন হাসানের দিকে, ইশারা করলেন কার্ডটার দিকে। বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বোঝানের চেষ্টা করলেন যে তিনি জানতে চান তার ফ্লাইটের গেটটা কোন দিকে।

 

হাসান দেখল বাংলাদেশ যাওয়ার বোর্ডিং কার্ড, বিমানের যাত্রী। হাসানের ফ্লাইটের নম্বর। হাসানের দুষ্টুমির ইচ্ছাটা আরও তীব্র হয়ে গেল। এই কঠিন মার্কা আব্দুলের সাথে ভালই সময়টা পার কথা যাবে। লাবন্যকে বলল হাসান তার অভিসন্ধির কথা কিন্তু লাবন্য কড়া চোখে তাকিয়ে থাকল। নিচু কন্ঠে জার্মান ভাষায় বলল, এটা উচিত হবে না। একজন মুরব্বীর সাথে এটা করা উচিত না, তাছাড়া অচেনা একজন মানুষ।

 

কিন্তু হাসান সময়টা একটু আনন্দে কাটানোর সুযোগটা হারাতে চায় না। বোর্ডিং কার্ডটা মন দিয়ে অনেক্ষন দেখল হাসান। ও বুঝে গেলে যে ভদ্রলোক ভয় পেয়েছেন যে তার ফ্লাইট মিস হয়ে গেল কিনা। তারমানে ফ্লাইট যে ডিলে হয়েছে সেটা উনি যানেন না।

 

এবার পরিস্কার বাংলায় হাসান বলল, আপনি এখানে বসেন। তারপর হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিয়ে বলল, আপনার ফ্লাইটতো আরও দশ মিনিট আগে ছিল।

 

হাসানের দিকে তাকিয়ে অনেকটা আতংকিত গলায় ভদ্রলোক বললেন, ভাই, আমি কি ফ্লাইটটা মিস করেছি? এখুনি মনে হয় কেঁদে ফেলবে রমিজ। এখন তার কি হবে? নতুন করে আবার কোথা থেকে টিকিট পাবে সে? ওর সাথের ওরা কোথায় হারিয়ে গেল ও জানে না। এদের কাউকেই আগে থেকে চিনত না সে, এয়ারপোর্টে আসার সময় ট্রেনেই পরিচয়। তখন থেকেই ওদের সাথে লেপ্টে আছে রমিজ। কিন্তু ওর ভাগ্য মনে হয় খারাপ, ওদেরকে আবার হারিয়ে ফেলেছে সে।

 

ভদ্রলোকের অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে হাসান বলল, এক কাজ করেন – আপনি এখানে বসেন। আমি দেখি আপনার জন্য কিছু করতে পারি কি-না। আমরাও বাংলাদেশে যাব কিন্তু আমাদের ফ্লাইট আরও এক ঘন্টা পরে। আপনার জন্য আমাদের ফ্লাইটে একটা ব্যাবস্থা করে দেব।

 

ভদ্রলোক মনে হল দেহে প্রান ফিরে পেলেন। ভাই, কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব। আপনি একজন ফেরেস্তা। সয়ং আল্লাহ আপনাকে পাঠিয়েছে আমার জন্য। হাতটা বাড়িয়ে দিলেন তিনি হাসানের দিকে, আমার নাম রমিজ। আনন্দের অতিশয্যে রমিজ সাহেবের চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করল। এত অল্পে কোনও মানুষ এতটা আনন্দিত হতে পারে?

 

হাসান নিজের পরিচয় দিয়ে বোর্ডিং কাউন্টারের দিকে গেল। রমিজ সাহেবের বোর্ডিং কার্ডে গেট নাম্বার এবং সময় দুটোই ভুল। হাসান কাউন্টারে কি যেন বলল, ওরা নতুন একটা বোর্ডিং কার্ড ইসু করল সঠিক গেট নাম্বার আর সময় দিয়ে। নতুন কার্ডটা নিয়ে এসে রমিজ সাহেবকে দিল হাসান।

 

কার্ডের দিকে তাকিয়ে রমিজ দেখল। তারপর হাসানের দুই হাত ধরে ওকে ধন্যবাদের বন্যায় ভাসিয়ে দিল। ভদ্রলোকের চোখে পানি, তিনি হাত দিয়ে সেই পানি অনবরত মুছে যাচ্ছেন। দুই হাত তুলে মোনাজাত শুরু করলেন ভদ্রলোক। তারপর আবার হাসানকে ধন্যবাদের বন্যায় ভাসিয়ে দিলেন।

 

আপনি ধন্যবাদ না দিয়ে আপনার কোটটা খুলে বসেন কারন ফ্লাইটের এখনও অনেক দেরী। আপনি তো রীতিমতন ঘামছেন! আরাম করে বসেন, দেখবেন আপনার সব দুশ্চিন্তা দুর হয়ে যাবে।

 

রমিজ একটু লজ্জা পেল হাসানের কথায়। আসলেই তো, এই গরমে সে ওভারকোটটা কেন পরে আছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই হাসানের সাথে খুব ভাব হয়ে গেল তার। ছেলেটা অনেক সুন্দর করে কথা বলে। এই প্রথম কেউ এতটা আন্তরিকভাবে তার সাথে কথা বলছে। কথায় কথায় একসময় হাসান জানতে চাইল কিভাবে সে ইতালীতে আসল।

 

রমিজ তাকে জানাল তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। কিভাবে সে দালালের মাধ্যমে প্রথমে তুরস্ক আসে। বাংলাদেশ থেকে তুরস্কের টুরিষ্ট ভিসা পাওয়া খুব সোজা। ঢাকা থেকে বিমান বাংলাদেশের প্লেনে করে ইস্তাম্বুল তারপর সেখান থেকে ট্রাকে করে ওদেরকে চালান দেওয়া হয় তুরস্কের ইপসালা গ্রামে। ওখানে সীমান্ত রক্ষীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য ওদেরকে সুয়েজের লাইনের মধ্যে নামিয়ে দেওয়া হয়, ভয়ঙ্কর সেই অভিজ্ঞতা। ঘন্টার পর ঘন্টা সুয়েজের ভয়ঙ্কর দুর্গন্ধযুক্ত লাইনে হামাগুড়ি দিয়ে চলা, তারপর Evros নদীতে নামতে হয়। সাথে খাওয়া নেই, পানি নেই, পদে পদে সীমান্তের প্রহরী আর বিকট দর্শন কুকুরের ভয়।

 

অপরিসীম কষ্ট করে নদী পর্যন্ত আসার পর শুরু হয় আর এক নতুন কষ্ট। প্রচন্ড ঠান্ডা পানিতে সাঁতার কাটতে হয় কয়েক মাইল, তারপর ওদের জন্য নৌকা রাখা থাকে জংলের ভেতর। প্রতিবারই দশজনের মধ্যে অন্তত তিন-চারজনের হাইপোথার্মিয়া হয় প্রচন্ড ঠান্ডা পানিতে সাঁতার কাটার জন্য। নৌকায় যাওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকা লটারীতে জিতে যাওয়ার মতন একটা ব্যাপার।

 

নৌকায় ওদের জন্য গরম কাপড়, অসুধ আর খাবার রাখা হয়। সরাসরি গ্রিসে ঢোকার কোনও উপায় নাই। এই জন্যই নৌকায় করে গ্রীসের কিপয় গ্রামের থেকে আরও একটু দুরের জংগলে ওদের নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে প্রায় বিশ-ত্রিশ মাইল যেতে হয়। নৌকার খাবারটাই ওদের পরবর্তী দুইদিনের শেষ খাবার বলা যায় কারন এরপর শুরু হয় মিনিটে মিনিটে লুকোচুরি খেলার মতন অবস্থা। ঘুমানোর সময় আর জায়গা কোনোটাই ওদের নাই। ঘুম আর ক্লান্তিতে সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসে তবু থামার উপায় থাকে না।

 

এত কষ্ট করে এদেশ আসার কারন কি আপনার? যে পরিমান টাকা খরচ করে এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে ইতালী এসেছেন সেই টাকায় তো বাংলাদেশেই তো কিছু একটা করতে পারতেন?

 

আপনি কি মনে করছেন এদেশে আসার আগে বাংলাদেশে টিকে থাকার চেষ্টা করিনি? বিভিন্ন ধরনের চেষ্টা করেছি, চাকরি খোঁজা থেকে শুরু করে, দোকান-ব্যাবসা সব কিন্তু যেখানেই যাই ঘুষ আর না হলে পাড়ার মাস্তানদের টাকা। শেষ পর্যন্ত অনেক টাকা খরচ করে কন্ট্রাকটারির একটা লাইসেন্স জোগাড় করেছিলাম। প্রত্যেক টেবিলে নির্দিষ্ট পরিমান টাকার ঘুষ না দিলে এই লাইসেন্স পাওয়া যায় না। তারপর টেন্ডারে কাজও পেলাম, ইট সাপ্লাই এর। কিন্তু সরকারী দলের গুন্ডা আর অফিসারদের পেট ভরাতে যেয়ে লাভের কিছুই নেই। দেনা হয়ে গেল অনেক। আপনার যদি খুটির জোর থাকে তাহলে টিকে যাবেন ওখানে।

 

কিপয় থেকে পরে কিভাবে আপনারা ইতালী আসলেন? হাসান খুব লজ্জিত হল তার আচরনের জন্য। তার ধারনাও ছিল না মানুষ কি ভয়ঙ্করভাবে জীবন পার করছে। জীবনের আরও কতগুলো রং আছে তা হাসানের মতন হয়ত আরও অনেকেরই জানা নেই। কি আশ্চর্য জীবনের বিভিন্ন রং গুলো। একজন মানুষের জীবনের রং অন্যজনের রং এর সাথে একদম মেলে না।

 

রমিজ এতক্ষনে অনেক সহজ হয়ে গেছে হাসানের সাথে। কিপয় থেকে, কিভাবে তারা পায়ে হেঁটে অনেক দুরের একটা শহরে আসে, তারপর সবজি সাপ্লায়ের গাড়িতে করে ঘন্টার পর ঘন্টা যাত্রা, আবার পায়ে হাঁটা। এভাবে এগার দিনের মাথায় ওরা রোমে এসে পৌঁছায়। ঘুম বলতে নৌকা আর সাপ্লায়ের গাড়িতে অল্প সময়ের জন্য একটু ঘুম।

 

তারপর রোমের পোলিজিয়ার তাড়া খাওয়া, রাত জেগে রোমের কিছু পতিতা অধ্যুষিত এলাকায় ফেরী করে বেড়ানো, দিনের বেলা যখন সবাই জেগে তখন কোনও এক বাড়ির বেইসমেন্টে তালা বন্ধ অবস্থায় ঘুমানো। দিনের বেলা টুরিষ্ট এলাকায় পোলিজিয়ার জন্য ফেরি করা যায় না ভালমতন। রাতের বেলা টাকাও একটু বেশী পাওয়া যায়। এভাবেই কেটেছে রমিজের দীর্ঘ দশ বছরের জীবন।

 

হাসানের সাথে সাথে লাবন্যও শুনছিল রমিজের গল্প। কথা বলতে বলতে রমিজ এখন অনেক প্রানবন্ত হয়ে উঠেছে। হাসানদের পাশে আরও কয়েকটা বাংলাদেশী ফ্যামিলি ছিল, তারাও নিঃসব্দে রুদ্ধশাসে রমিজের গল্প শুনে গেল। প্রত্যেকের চোখে পানি, এরা কেউ জীবনের এই ভয়ঙ্কর রুপ দেখেনি। তাদের জানা নেই জীবন কারও কারও জন্য কতটা ভয়ঙ্কর। জীবনের যে অন্য কতগুলো রুপ আর রং আছে তা এদের কেউই জানে না।

 

অথচ এই ভয়ঙ্কর জীবনে থেকেও রমিজের এই প্রানবন্ত চেহারা ওদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। নিজেদের প্রতি প্রত্যেকেই এক ধরনের সুক্ষ তীরস্কার অনুভব করছে যে, কত অল্পতেই তারা অভিযোগ করে, মন খারাপ করে। রমিজের মতন আরও অনেক রমিজ বেঁচে আছে ইতালীর বিভিন্ন শহরে। শুধু ইতালী নয়, ইউরোপের বিভিন্ন শহরে এমন লক্ষ্য রমিজ বেঁচে আছে ভয়ঙ্কর জীবনকে কাঁধে নিয়ে। অথচ কি সুন্দর প্রানবন্ত হাসি তাদের। রমিজের প্রতি হাসান এক ধরনের শ্রদ্ধা অনুভব করল। নিজেকে মানুষ হিসাবে খুব খুদ্র মনে হল। হাসান কখনও কাঁদেনি কিন্তু আজ প্রথম তার চোখে পানি। ছোট্ট লিয়ানা অবাক হয়ে দেখছে তার বাবার ভেজা চোখ। লাবন্য কথা হারিয়ে ফেলেছে। শুধু অবাক দৃষ্টিতে দেখছে রমিজ নামের মানুষটার দিকে।

 

………………………………….

 

৮ই জুন ২০১৮

আলী আহসান।

 

আরও জানুন » একটি অসমাপ্ত প্রাক প্রেমের গল্প »

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো তা আমাদেরকে অবশ্যই জানাবেন। আপনার মতামত আমাদের কাছে খুবই মূল্যবান। আপনি যদি আপনার নিজের লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ বা অন্য যেকোনো বিষয় বাঙালিয়ানা Magazine এ প্রকাশ করতে চান, তবে আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে আপনার লেখা প্রকাশে সচেষ্ট হব । আগ্রহীদের এই ইমেইল ঠিকানায় bangalianamagazine@gmail.com যোগাযোগের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হল । Copy করা কোন লেখা পাঠাবেন না। দয়া করে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আপনার পাঠানো লেখাটি অনলাইনে আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। যদি অনলাইনে আগে অন্য কোথাও আপনার লেখাটি প্রকাশিত হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সেটা প্রকাশ করতে পারব না। আমরা অরাজনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক এবং নিরপেক্ষ।
বিঃ দ্রঃ লেখাটি কোনরকম পরিমার্জন ব্যতিরেকে সম্পুর্ণ লেখকের ভাষায় প্রকাশিত হল। লেখকের মতামত, চরিত্র এবং শব্দ-চয়ন সম্পুর্ণই লেখকের নিজস্ব । বাঙালিয়ানা Magazine প্রকাশিত কোন লেখা, ছবি, মন্তব্যের দায়দায়িত্ব বাঙালিয়ানা Magazine কর্তৃপক্ষ বহন করবে না।

জন্ম ২৪ শে মে যশোর। শৈশব, বাল্যকাল ও তারুন্যের একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লেখার মধ্যমে। স্কুল ম্যাগাজিন অগ্রজ, যশোর শিশুসাহিত্য কেন্দ্রের কিশোরমেলা, কলেজের ক্র্যাচ এবং দেশের বিভিন্ন দৈনিকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত কবিতা ও গল্প। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন “সময়” সংকলন এবং নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিমানের পাইলট ও ক্যাপ্টেনদের ককপিট ইন্সট্রুমেন্টেশান প্রশিক্ষক ও পরবর্তীতে জার্মানী থেকে ইনফরমেশন ও কমুউনিকেশন্স এ উচ্চশিক্ষা গ্রহনের পর আই.বি.এম ও বিভিন্ন গ্লোবাল কোম্পানিতে আই টি স্পেশিয়ালিষ্ট হিসাবে কর্মরত। পেশাগত কারনে দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে বিরত থাকার পর আবার সাহিত্যের অঙ্গনে প্রত্যাবর্তন কবিতা,গল্প, উপন্যাস ও গবেষনা ভিত্তিক প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের প্রবাস জীবনে বিভিন্ন ব্লগে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করেন।

ব্যক্তিজীবনে ভীষন বন্ধুভাবাপন্ন, অত্যন্ত সদালাপী এবং আড্ডাপরায়ণ। বর্তমানে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সন্তানকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের মিডল্যান্ডের মার্সটন গ্রিনে।

Comments

comments