জীবন থেকে নেয়া (চলচ্চিত্র পর্যালোচনা)

0
625
Print Friendly, PDF & Email

জীবন থেকে নেয়া

পরিচালনায় ও প্রোযজনায়ঃ জহির রায়হান

রচয়িতা (কাহিনি ও চিত্র নাট্য ):  আমজাদ  হোসেন  ও জহির রায়হান

অভিনয়েঃ  রাজ্জাক, সূচন্দা, আনওয়ার হোসেন, শওকত আকবর , রোজী সামাদ, খান আতাউর রহমান, রওশন জামিল, বেবি জামান প্রমুখ ।

সুরকারঃ  খান আতাউর রহমান

চিত্র গ্রহণঃ আফজাল চৌধুরী

সম্পাদনায়ঃ মলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

মুক্তির সাল: ১৯৭০ এর ১০ই এপ্রিল (বাংলা ভাষায়)

আমি আজকে  “জীবন থেকে নেয়া”  চলচ্চিত্র নিয়ে কিছু বলবো তবে এ  চলচ্চিত্র টি নিয়ে কিছু বলার আগে এ লেখার পিছনের কিছু কথা বলা দরকার । মুভি দেখা আমার অত্যন্ত পছন্দের একটি বিষয়, আর কিছু থাক বা না থাক ভালো কিছু মুভি হলে আমার সময় কাটানোর জন্য আর কিছু লাগেনা । সে যাইহোক, এই ম্যাগাজিনের এর প্রতিষ্ঠাতা (ওয়াহিদুজ্জামান শাওন) একদিন বলল তুমিতো মুভি দেখো আর মুভির গ্রুপে মুভি সম্পর্কে পোস্টও করো (বাস্তবে আসলে তেমন কিছু না), আমাদের ম্যগাজিনে এর চলচ্চিত্র পর্যালোচনা (Movie Review) বিভাগের জন্য কিছু লিখো মুভি নিয়ে, যেহেতু ব্যপারটা মুভি নিয়ে আমি আর না বললাম না আর এ জন্যই শুধুমাত্র বাঙালিয়ানার জন্যই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস ।

চলচ্চিত্রের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে পরিচালক জহির রায়হান যে কতো পরিমাণের দূরদর্শীতার অধিকারী ছিলেন তা একটু পরই বুঝতে পারবেন । ১৯৬৯ এর গণভ্যুথান, পরবর্তী ১৯৭১ সালে (যদিও চলচ্চিত্র টি মুক্তি পায় ১৯৭০ এর ১০ই এপ্রিলে তারপরও জহির রায়হান জানতেন তৎকালীন পরাধীন পূর্ব বাংলা একদিন স্বাধীন হবেই তাই উনার মনের কথা আগেই প্রকাশ করে গিয়েছেন, অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে) যুদ্ধে জয় লাভের মাধ্যমে পরাধীন মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ লাভ । সামাজিক এ চলচ্চিত্রে  তৎকালীন  পূর্ব বাংলার  (১৯৫৬ সালের ২৩ শে মার্চে পূর্ব পাকিস্তানের নাম পরিবর্তন করে পূর্ব বাংলা রাখা হয়) উপর পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক স্বৈর স্বাশনের (জোর করে অধিকার থেকে বঞ্ছিত ও ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখার কৌশল) চিত্র রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে । মূলত এ চলচ্চিত্রে ২ (দুই) টি প্রেক্ষাপট প্যারালাল ভাবে তুলে ধরা হয়েছে, একটি হচ্ছে তৎকালীন পূর্ব  বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরেকটি হচ্ছে একটি পরিবারের আভ্যন্তরীন পরিস্থিতি  কিন্তু বিষয় বস্তু এক ও অভিন্ন্য ।

আক্ষরিক কাহিনী সংক্ষেপ /রিভিউঃ চলচ্চিত্রে একটি পরিবারের বড় বোন রওশন জামিল তার স্বামী খান আতাউর রহমান যিনি সব সময় দজ্জাল বউ এর রোষানলে সর্ব সময় পিষ্ট থাকেন, দুই ভাই শওকত আকবর , রাজ্জাক তারাও না পারতে বড় বোনের ধারে যায়না। দুই ভাইয়ের স্ত্রী যথা ক্রমে রোজী সামাদ ও সূচন্দা এ ছারা রয়েছেন বিপ্লবী নেতা  (রোজী সামাদ ও সূচন্দার ভাই ) আনওয়ার হোসেন  ও বাড়ির কাজের লোক । গল্পের পরিবারে রওশন জামিল সংসারের সর্বসর্বা অর্থাৎ স্বৈরাচারী নারীর ভূমিকা পালন করেন, যিনি পরিবারের সকল ক্ষেত্রে আধিপত্ব বিস্তার করে থাকেন, সংসারের চাবির গোছা মুষ্টি বদ্ধ করে রাখেন, এমন পরিস্থিতিতে আসেন সংসারের প্রথম বউ শওকত আকবর এর স্ত্রী রোজী সামাদ, দজ্জাল বোনের অত্যাচার আগের থেকে বেশি হতে থাকে আর এই পরিস্থিতি কে মোকাবেলা করার জন্য রাজ্জাক বিয়ে করে রোজী সামাদের ছোট বোন সূচন্দাকে। পরিবারের পরিস্থিতি বোনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের রূপ নেয় এবং একসময় দজ্জাল বোন সবার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। অপর দিকে তৎকালীন পূর্ব  বাংলার পরিস্থিতি  ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকে, একসময়  কাহিনীটিতে জনসাধারণের মনে বিপ্লবী মনোভাব উদয়, আন্দোলন, স্বৈরাচার সরকার কর্তৃক আন্দোলন দমনের চেষ্টা ও নেতাদের জেলে প্রেরণের মতো বিষয় গুলো ঘটতে থাকে  । চলচ্চিত্রে প্রতিটা চরিত্র কে এতো শক্তিশালী কিছু ক্ষেত্রে দুর্মর করে তোলা হয়েছে যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রেরণা জোগাতে ভুমিকা রাখে ।

চলচ্চিত্রটির শ্লোগান হচ্ছে-

“একটি দেশ

একটি সংসার

একটি চাবির গোছা

একটি আন্দোলন

একটি চলচ্চিত্র……”

বিশ্লেষণঃ

বোঝার সুবিধার্থে গল্পের চরিত্র গুলোকে দুটি ভাগে পর্যালোচনা করা যায় , এক (১) পরিবারের দিক দিয়ে, দুই (২) তৎকালীন পূর্ব বাঙলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচারে।

পরিবারের বড় বোনকে স্বৈরাচার কর্তী যা পশ্চিম পাকিস্তানের  রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের ছায়ায় নির্মিত হয় । পরিবারের নির্যাতিত স্বামী খান আতাউর রহমান, নতুন বউ রোজী সামাদ, শওকত আকবর এরা পরিবারে চরম ভাবে  নির্যাতিত কিন্তু এরা পরিস্থিতির পরিবর্তন চায়। রাজ্জাক ও সূচন্দা প্রতিবাদী চরিত্র । বউয়ের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে বাড়ির ছাদে  “এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে” শিরোনামে একটি গান ও গাওয়া হয় , যদিও গানের একপর্যায় হারমোনিয়াম রেখেই কর্তাকে পালাতে হয় ।

অপরদিকে,

আনওয়ার হোসেন প্রতিবাদী, পূর্ব বাঙলা স্বাধীন হবে এমন বাস্তববাদী রাজনৈতিক নেতা আর রাজ্জাক হচ্ছে আনওয়ার হোসেনের আদর্শে গড়া প্রতিবাদী ছাত্র আন্দোলনের প্রতীক ।

ট্রিভিয়াঃ

১) এ চলচ্চিত্রে চিত্রায়িত “আমার সোনার বাঙলা” গানটি পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

২) প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারী এলে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” যে গানটা আমরা শুনি এটা কিন্তু “জীবন থেকে নেয়া”  চলচ্চিত্রের খান আতাউর রহমানের দেয়া কম্পোজিশনটাই শুনি ।

৩) মুক্তির প্রথম দিনেই এ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয় ।

৪) চলচ্চিত্রের নির্মাণের সময় এফডিসির ২নং ফ্লরে আর্মি এসে শুটিং বন্ধ করে দেয় এবং জহির রায়হান ও রাজ্জাক কে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ।

৫) চলচ্চিত্রে ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুথানের কিছু তথ্য চিত্র দেখানো হয়েছে । 

৬) এ খাঁচা ভাঙ্গবো আমি কেমন করে গানটি সম্ভবত জহির রায়হানের বাসার ছাদে চিত্রায়িত হয়ে ছিল ।

৭) এটি জহির রায়হান নির্মিত শেষ কাহিনী ও চিত্র নাট্য ।

তথ্য সূত্রঃ বিভিন্ন ব্লগ, নির্ভরশীল ওয়েব, পত্রিকা এবং উইকির সাহায্য নেয়া হয়েছে ।

পুনশ্চঃ ভুল মানুষই করে আমিও এর উর্ধ্বে নই তাই আমার লেখার ভুলগুলোকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে শুধরানোর সুযোগ দিবেন আর লেখাটি পড়ে আপনার ভালো লাগলেই এই খুদ্র প্রচেষ্টা সার্থক হবে আর লেখাটি ধৈর্য সহকারে পড়ার জন্য ধন্যবাদ । আপনার সুচিন্তিত মতামত একান্ত কাম্য ।

আরও জানুন » চিড়ার চপ (রেসিপি) »

আমি আবদুর রাকিব তবে ফেসবুকে Silver Rain নামে পরিচিত। খুব সাদাসিধে জীবন যাপন করি। মিরপুর কলেজ থেকে একাউন্টিং এ অনার্স করেছি। বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ঘুম আর মুভি দেখা আমার পছন্দের বিষয়। মাঝে মাঝে টুক টাক লেখার চেষ্টা করি।

Comments

comments