একজন অভ্র এবং জনৈক পিতা (প্রথম অধ্যায়)

0
673
একজন অভ্র এবং জনৈক পিতা - আবুল ফাতাহ
একজন অভ্র এবং জনৈক পিতা - আবুল ফাতাহ
Print Friendly, PDF & Email

বাসাটার সামনে এসেই থমকে গেলাম। কীভাবে ঢোকা উচিৎ বুঝতে পারছি না। আমার পায়ে বার্মিজ সেন্ডেল। কালো রঙের। বহুল ব্যবহারে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। তলার খাঁজকাটা অংশটুকু পীচ ঢালা পথের অত্যাচারে টাইলস করা মেঝের মতই মসৃণ। বৃষ্টির দিনে হাঁটতে গেলে সীমান্তের “নো ম্যানস ল্যান্ড“-এ হাঁটার মত অনুভূতি চলে আসে। বুড়ো আঙ্গুলে দেহের সব ভার চাপিয়ে দিয়ে পা টিপে টিপে এগোতে হয়। যেন এক্ষুণি বিএসএফ গুলী শুরু করবে!
আমি জহির সাহেবের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পাচ্ছি বাড়িতে ঢোকার দরজার পাশেই একটা জুতোর র‍্যাক রাখা। আমি পড়ে গেলাম ঝামেলায়। আমার সেন্ডেল ওই র‍্যাকে শোভা পায় কিনা বুঝতে পারছি না। না পাবারই কথা। এইমুহুর্তে র‍্যাকে যে জুতোগুলো দেখতে পাচ্ছি, আমার তো ধারণা এগুলো বেঁচেই আমার বার্মিজ সেন্ডেলের একটা ফ্যাক্টরি দেয়া সম্ভব! এদিকে এত ধনী মানুষের বাড়ির বাইরে সেন্ডেল রেখে গেলেও খারাপ দেখায়। শিষ্টাচার বহির্ভূত। তাছাড়া আমার পর কেউ এসে ছাল ওঠা কুকুরের মত সেন্ডেল জোড়া দেখে ভেবে বসতে পারে এগুলো বোধহয় জহির সাহেবই পায়ে দেন! ভদ্রলোক আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন, তাকে এভাবে অপমান করাটা ঠিক হবে না বোধহয়।
র‍্যাকে সেন্ডেল রাখার ক্ষেত্রে আরেকটা ছোট্ট সমস্যাও আছে। বারান্দার মেঝেতে মসৃণ টাইলস লাগানো। অনেক দামী টাইলস, দেখেই বোঝা যায়। এমন সুন্দর টাইলস মাড়িয়ে জুতো রাখার র‍্যাকের কাছে যেতেও মায়া লাগে। জুতোর র‍্যাকটা বাইরে রাখা উচিৎ ছিল। তবে আমার বুদ্ধিতে তো আর বড়লোকরা চলেন না। তারা চলেন তাদের বুদ্ধিতে। আরেকটা কাজ অবশ্য করা যায়, এবং আমি সেটাই করলাম। সেন্ডেল পায়ে দিয়েই সোজা ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়লাম।
কেন করলাম কাজটা?
দেখবেন, মাঝে মধ্যে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কাজ করতে ইচ্ছে করে। উদাহরণ দেয়া যাক। ধরুন, আপনি দশতলা বিল্ডিং এর ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন। একেবারে রেলিং ঘেষে। একবার নীচে উঁকি দিন। কি মনে হচ্ছে না, লাফ দিতে পারলে মন্দ হয় না?!
কিংবা ধরা যাক, আপনি বাসে বসে আছেন। আপনার সামনের সিটে যে বসেছে তার মাথায় একটা চকচকে টাক। বিশাল। সিটের উপর দিয়ে শুধু টাকটাই দেখা যাচ্ছে। জানালার কাচে রোদ প্রতিফলিত হয়ে সেই টাকে পড়ছে, সেখান থেকে আবার প্রতিফলিত হয়ে আপনার মুখ আলোকিত হচ্ছে! কি ইচ্ছে করবে না, টাকে মোলায়েম করে হাত বুলিয়ে দিতে?!
কিন্তু এরকম করা হয় না কখনও। কারণ এই কাজগুলো করতে প্রচন্ড সাহসের দরকার হয়। সাহসও না ঠিক, দুঃসাহস। এরকম দুঃসাহস সাধারণত মানুষকে দেয়া হয় না। তাহলে পুরো পৃথিবীটা উলট-পালট হয়ে যেত। তৈরি হত প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা।
যেমন ধরা যাক, আপনি আর আপনার স্ত্রী রাতের বেলা ছাদে হাঁটাহাঁটি করছেন। আকাশে গোল একটা চাঁদ। চাঁদের আশেপাশে উজ্জ্বল চন্দ্রবলয়। মোটামুটি রোমান্টিক একটা পরিবেশ। আপনি চন্দ্রবলয়ের দিকে তাকিয়ে চন্দ্রগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। উচ্চস্বরে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করছেন। হঠাৎই লক্ষ্য করলেন আপনার স্ত্রীর কোনও সাড়াশব্দ নেই। খোঁজ নিতেই জানা গেল আপনার স্ত্রী ছাদ থেকে লাফ দিয়েছে। হয়ত চাঁদের অসহ্য সৌন্দর্য কিংবা আপনার কবিতা সহ্য করতে পারেনি!
রাস্তায় বেরোলেই দেখা যেত অদ্ভুত সব ঘটনা। কেউ কারও টাকে তবলা বাজাচ্ছে তো আবার কেউ কারো পশ্চাৎদেশে লাথি কষাচ্ছে। অথবা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মক্ষীরানী টাইপের কোনো মেয়েকে টুক করে চুমু খেয়ে বসল এক পাংকু ছোকরা। ইচ্ছে হয়েছে, খেয়েছে!
তবে এমন কোনও ব্যাপার চালু থাকলে সবচাইতে বিপদে পড়ত এদেশের রাজনীতিবিদরা। রাস্তায় বের হলেই আমজনতার চড়-চাপড় খেয়ে নিশ্চিত হাসপাতালের পথ ধরতে হত। ভয়াবহ পরিস্থিতি!
আমিও ঠিক তেমনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন সেন্ডেল বিষয়ক জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন হঠাৎ করেই মনে হল সেন্ডেল পায়ে ঢুকে পড়লে কেমন হয়? একাজেও যথেষ্ট দুঃসাহসের প্রয়োজন আছে, তবে দুঃসাহস দেখাবার একটা সুযোগ আছে বটে। এমন সুযোগ ভবিষ্যতে আসার সম্ভবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। যতদূর বুঝতে পারছি জহির সাহেব আমাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনও কাজে ডেকেছেন। আমার মত “অগুরুত্বপূর্ণ” মানুষের ডাক যখন পড়ে তখন ধরে নিতে হয় কারণটা গুরুত্বপূর্ণ।
জহির সাহেব হলেন আমার ছাত্রী আফরীনের বাবার বন্ধু। কাল যখন আফরীনদের বাড়িতে গিয়েছিলাম তখন আফরীনের বাবা আশফাক সাহেব আমাকে জহির সাহেবের ঠিকানা দিয়ে বললেন আমি যেন আজ তার সাথে সাথে দেখা করি। খুবই নাকি জরুরি।
বুঝতে পারছি না আমার কাছে ভদ্রলোকের কী এমন জরুরি কাজ থাকতে পারে। সমস্যা নেই, কিছুক্ষণ পরই জানতে পারব। এখনই অত উতলা হবার কিছু নেই। শেখ সাদী বলেছেন, ‘যে ব্যাপারটা তুমি কিছুক্ষণ পর এমনিতেই জানতে পারবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন করা বোকামি।
ধারণা করছি আমি এই মুহুর্তে জহির সাহেবের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। এতই গুরুত্বপূর্ণ যে চল্লিশ টাকা দামের বার্মিজ সেন্ডেল পায়ে দিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়লেও আমাকে কিছু বলা যাবে না। তবে উল্টোটা হবার সম্ভবনাও যে একেবারেই নেই তাও কিন্তু না। ধনী মানুষদের আশেপাশে “দুধের মাছির” অভাব থাকে না। ধনীরা ইশারা করা মাত্রই এরা জান হাজির করে ফেলার একটা ভঙ্গি নেয়। সেই হিসেবে বলা যায় না, আমার বেয়াদবি দেখে পাছায় লাথি মেরে বেরও করে দেয়া হতে পারে। অদ্ভুত ইচ্ছে তো শুধু আমার একারই হয় না, জহির সাহেবেরও হতে পারে!
তবে ভদ্রলোক যেহেতু নিজেই আমাকে ডেকেছেন তখন আশা করা যেতে পারে আমার “পাগলামী” সম্পর্কে তিনি সম্যক জ্ঞাত। মাঝে মধ্যে পাগলামি করারও দরকার আছে। তাতে অন্তত সেন্ডেল পায়ে ধনী মানুষের বাড়ির ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়া যায়।
আমি সেন্ডেল পায়ে দিয়েই বিশাল ড্রয়িংরুমটা পর্যবেক্ষণে লেগে পড়লাম। খুবই পরিপাটি করে সাজানো। একটু বেশি মাত্রায়ই যেন। যেখানে যেটা থাকার কথা ঠিক সেখানেই আছে সেই জিনিষটা। ঝাড়বাতি, দামী পার্শিয়ান কার্পেট, ম্যান্টেল পিস, মায় সোফাটা পর্যন্ত।
নব দম্পতির প্রথম ঝগড়াটাই বোধহয় ফার্নিচার সাজানো নিয়েই হয়। মানুষ খুবই সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে তুচ্ছ এই ব্যাপারটা নিয়ে। এখন এটাও একটা ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়িতে ক’জন লোক আসবে। গম্ভীর মুখে মাপাজোকা করবে, এরপর ফার্নিচারগুলো সেটিং করে দিয়ে যাবে। যাবার সময় নোটের একটা তোড়া সাথে করে নিয়ে যাবে। ফেলো কড়ি মাখো তেল।
জহির সাহেবের ড্রয়িংরুমটা দেখতে দেখতেই আমি একটা ব্যাপার আবিষ্কার করে ফেললাম। অশেষ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা থাকলেই যে ব্যাপারটা ধরে ফেলা যাবে তা কিন্তু না। এক্ষেত্রে আরেকটা জিনিসের দরকার আছে। অনুভূতি। এই অনুভূতির সংজ্ঞা আমার ঠিক জানা নেই। মাঝে মধ্যে সংজ্ঞাহীন অনেক ঘটনা আমাদের সাথে ঘটে।
জহির সাহেবকে চমকে দেবার মত একটা অস্ত্র হাতে পেয়ে মনে মনে খুশি হয়ে উঠলাম। অবশ্য ধনীদের খুব সহজেই অভিভূত করে ফেলা যায়। নয়ত মানুষজন ধনীদের আলতু ফালতু জিনিস গছিয়ে দিয়ে ব্যবসা করতে পারত না। রাস্তা থেকে খানিকটা কাঁচা গোবর তুলে নিয়ে গিয়ে ধনীদের সামনে রেখে যদি বলা যায়, স্যার, এই গোবর হল রাজা বিক্রমাদিত্যের পোষা গরুর বংশধরের। এই গোবর ড্রয়িংরুমের দেয়ালে লেপে দেয়াটা এখন আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কালই অমুক সাহেব আমার কাছ থেকে এক কেজি গোবর কিনেছেন। তমুক সাহেব তো দুই কেজির অর্ডার করেছেন। দেখেছেন, কী আভিজাত্য!
হুমম, তা কেজি কত?
স্যার, মাত্র দু লাখ টাকা।
ওকে তিন কেজি দিয়ে যাও। আর মৌর্য আমলের গরুর বংশধরের গোবর পেলে অমুক তমুকের কাছে না গিয়ে আগে আমার কাছে আসবে, ঠিক আছে? আভিজাত্যে আমিও কম যাই না, হু!
কথাগুলো কল্পনা করে বেশ বিনোদিত হচ্ছিলাম এমন সময় রুমে জহির সাহেব প্রবেশ করলেন। আমি যারপরনাই অবাক হয়ে গেলাম তাকে দেখে। আমি কখনও জহির সাহেবকে দেখিনি তবু নিশ্চিত হয়ে গেলাম ইনিই জহির সাহেব, সেই সংজ্ঞাহীন অনুভূতির জোরে।
লোকটার পরনের কাপড় চোপড় দেখে অবশ্য জহির সাহেবের চাইতে জহির সাহেবের খানসামা জাতীয় কেউ বলেই ভ্রম হয়। একটা কম দামী পাতলা ফতুয়া আর লুঙ্গি পরা ভদ্রলোক। লুঙ্গিটাও বিপদজনক অবস্থানে। হালকা করে টান দিলেই খুলে আসবে। মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে। এই বাড়িতে সাফাইয়ের কাজের জন্য লোকের দরকার নেই। জহির সাহেব পুরো বাড়িতে একটা চক্কর দিলেই সে কাজ হয়ে যাবে।
জহির সাহেবের এই রুপ কল্পনা করিনি। তবে বড়লোক হলেই যে সারাদিন স্লিপিং গাউন পরে বসে থাকতে হবে এমনও তো কোনও কথা নেই। তাই বলে ভদ্রলোক আরেকটু দামী পোশাক পড়তে পারলেন না?
এই পোশাকেও জহির সাহেবকে চিনে ফেলার কারণ হল ভদ্রলোকের চেহারায় সত্যিকারের একটা আভিজাত্য আছে। টাকায় ও জিনিস মিলবে না। চুলগুলো এলোমেলো। জায়গায় জায়গায় পাঁক ধরেছে তাতে। মুখে চাপ দাড়ি। সেখানেও রুপোলী ছোপ। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। যদিও বয়স হয়েছে, তবুও মনে হয় না সহসা চশমার আশ্রয়ে যেতে হবে ও দুটোকে।
‘আপনিই অভ্র?’ আমার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন জহির খান।
‘জী।’ আমি উত্তর দিলাম। এই ফাঁকে লক্ষ্য করেছি ভদ্রলোক আমার পায়ের দিকে একপলক তাকিয়েছেন। আমার পায়ের বহুল ব্যবহৃত সেন্ডেল দেখেও তার মধ্যে কোনও ভাবান্তর ঘটল না। বিন্দুমাত্রও না। ব্যাপারটা এমন নয় যে নিকট ভবিষ্যতে আমি তার কোনও একটা উপকার করতে যাচ্ছি বলে তিনি আমার “বদতমিজি” সহ্য করে নিচ্ছেন। সেক্ষেত্রে তার চোখে বিরক্তির ছাপ পড়ত। কিন্তু তার চোখেও ফুটে ওঠেনি কোনও বিস্ময়, রাগ কিংবা অপমান। যেন ড্রয়িংরুম বানানোই হয়েছে সেন্ডেল পায়ে ঢুকে পড়ার জন্য।
আমি ভদ্রলোককে পছন্দ করে ফেললাম। একজন মানুষকে পছন্দ কিংবা অপছন্দ করতে হাজার বছর কিংবা শত কারণ লাগে না, কয়েকটা মুহুর্ত এবং একটা কারণই যথেষ্ট। জহির সাহেবকে ভাল লাগার জন্য প্রয়োজনীয় মুহুর্ত এবং কারণ আমি পেয়ে গেছি।
‘আপনি আশফাকের মেয়েকে পড়ান, তাই না? ’ জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।
‘আসলে ঠিক পড়াই না। অনেক সময় লাগবে আসল ব্যাপার খুলে বলতে। সংক্ষেপে, আমি আফরীনের সঙ্গী বলতে পারেন। কিছুদিন আগে ওর মানসিক কিছু সমস্যা হয়েছিল। আমি সমস্যাটা সমাধান করে দেই। আশফাক সাহেব আর ছাড়েননি আমাকে। তখন থেকেই আমি ওকে সঙ্গ দেই। মাঝে মধ্যে পড়া টড়াও দেখিয়ে দেই। সেই হিসেবে অবশ্য বলা যায় টিউটর।’
আমি চাইলে সহজেই বলতে পারতাম, জী আমি আফরীনের টিউটর। কিন্তু ভদ্রলোকের প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের জন্য খানিক ঘোরপ্যাঁচের মধ্যে গেলাম। কী আশ্চর্য! আমার এই কথাগুলোও ভদ্রলোক খুব স্বাভাবিকভাবেই নিলেন। কোনও প্রশ্ন, এমন কি কপালটাও কুঁচকে উঠল না তাঁর। হতে পারে ব্যাপারটা তাঁর জানা নয়ত অনুভূতিগুলো কার্য ক্ষমতা হারিয়েছে। খুব নিঃসঙ্গ মানুষের অনুভূতি শক্তি সাধারণত লোপ পায়। আবার হঠাৎ করে তীক্ষ্ণও হয়ে যেতে পারে। জহির সাহেবের বোধহয় প্রথমটাই হয়েছে।
আমিও এত সহজে হাল ছাড়ার বান্দা না। তাঁর চোখে বিস্ময়ের রেখা দেখতেই হবে আমাকে। আমি আশপাশটা দেখতে দেখতে, যেন নিতান্তই কথার কথা, এমন ভঙ্গিতে বললাম, ‘আপনার স্ত্রী কতদিন হল মারা গেছেন, স্যার?’
সম্পুর্ণ ব্যর্থ হলাম। ভদ্রলোক স্বাভাবিকভাবেই বললেন, ‘মাস দুয়েক হবে,’ এরপর বিরতি দিয়ে বললেন, ‘নিশ্চয়ই আশফাকের কাছ থেকে জেনেছেন?’
‘জী না, উনি খুবই ব্যস্ত মানুষ, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছুই বলেন না। আমাকে শুধু আপনার বাসার ঠিকানা দিয়ে আসতে বলেছিলেন। নাথিং মোর।’
‘তাহলে আপনি কীভাবে জানলেন আমি বিপত্নীক?’
আমার উদ্দেশ্য সফল। ভদ্রলোকের চেহারায় যথেষ্ট পরিমাণে কৌতুহল এবং বিস্ময় খেলা করছে।
আমি হেসে বললাম, ‘আপনার ড্রয়িং দেখে।’
জহির সাহেব এক পলকে ড্রয়িং রুমটা দেখে নিলেন। ব্যাপারটা আন্দাজ করতে চেষ্টা করছেন। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক তাকিয়ে বললেন। ‘কই, শাহনাজের মালা পড়ানো ছবি-টবি তো কোথাও ঝোলানো নেই।’
আমি আবার হেসে বললাম, ‘মালা ঝোলানো ছবি দেখে বুঝতে পারাটা তো খুবই স্থুল ব্যাপার। যে কেউ পারবে। এর মধ্যে অন্য ব্যাপার আছে।’
‘তারমানে আপনি নিজেকে “যে কেউ” থেকেও বড় কিছু ভাবেন?’
‘বড় ভাবি না, আলাদা ভাবি। দুটোর মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট। আমরা সবাই আসলে আলাদা। সবারই এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে যেটা তাকে “যে কেউ” থেকে আলাদা করে দেয়। ধরে নিন পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আমার একটা বৈশিষ্ট্য।’
‘আর কী কী বৈশিষ্ট্য আছে আপনার মধ্যে?’
জহির সাহেব মজা পেতে শুরু করেছেন আমার সাথে কথা বলে। এ ব্যাপারটাই চাইছিলাম আমি। বললাম, ‘আছে, আরো কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। ধীরে ধীরে হয়ত দেখতে পাবেন। ’
‘আমি কিছু ব্যাপার ধরতে পারছি। ’
জহির সাহেব ভেবেছিলেন বোধহয়, আমি জিজ্ঞেস করব,কী ব্যাপার। কিন্তু আমি চুপ রইলাম।
সশব্দে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক। ‘আপনার সবচাইতে বড় বৈশিষ্ট্যটা কী, জানেন?’
‘জী না, জানি না।’
‘আপনি খুবই আনপ্রেডিক্টেবল। আপনাকে বোঝা খুব কম মানুষের পক্ষেই সম্ভব। আপনি শুধু বিভ্রান্তি তৈরি করতেই ভালবাসেন তা না, আপনি নিজেই একটা বিভ্রান্তি, হা হা হা! ’
আমিও হেসে ফেললাম। নাহ, যা ভেবেছিলাম, তা নয়। ভদ্রলোকের অনুভূতিশক্তি লোপ পায়নি। তীক্ষ্ণ হয়েছে। তবে সেটা পরিমিত। অকারণ আবেগ নেই ভদ্রলোকের মধ্যে। আমার ভাললাগা আরো খানিক বাড়ল। বললাম, ‘আমি কীভাবে আপনার স্ত্রীর মৃত্যুর কথা জানতে পারলাম সেটা কি বলব? ’
‘আমি আগ্রহবোধ করছি, কিন্তু আপনি নিজে থেকে না বললে যে আপনাকে দিয়ে বলানো যাবে না সেটাও ভালমতই জানি। ’
আমি একটা হাসি দিয়ে বললাম, ‘আপনার ড্রয়িংরুমের জিনিসপত্র মাত্রাতিরিক্ত রকমের গোছানো হলেও তাতে মমতার স্পষ্ট অভাবে দেখা যাচ্ছে। যতই কাজের লোক থাকুক, বাড়ির মেয়েরা গোছানো জিনিসও আবার গোছায়। মমতার ছাপটা তাতেই পড়ে। এখানে সেটা অনুপস্থিত।’
জহির সাহেব আবার চোখ ঘুরিয়ে তাকালেন পুরো ড্রয়িংরুমে। বোধহয় মমতা খুঁজে বেড়াচ্ছেন! বললেন, ‘আশ্চর্যের ব্যাপার, এইমাত্র ব্যাপারটা আমিও লক্ষ্য করলাম।’
আমি তৃতীয়বারের মত হেসে বললাম, ‘আপনি আসলে এমন কিছুই লক্ষ্য করেননি।’
‘মানে? কীভাবে বলছেন এ কথা? ’
‘এটা আসলে চোখে পড়ার কিংবা লক্ষ্য করার মত কোনও বিষয় না। আপনার মধ্যে এই ক্ষমতা থাকলে আমি বলার আগেই বুঝতে পারতেন ব্যাপারটা। ’
‘কিন্তু সব জিনিস যে সবার চোখে পড়বে এমন তো কোনও কথা নেই। অনেক ব্যাপার আছে না, কেউ ধরিয়ে না দিলে বোঝা যায় না? ’
‘হুম, তবে এটা তেমন কোনও ব্যাপার না। আগেই বলেছি, এটা হল একটা অনুভূতি। আর অনুভূতি কখনও তৈরী করা যায় না। ’
‘তাহলে আমার কেন মনে হচ্ছে আমি রুমের প্রতিটা জিনিসে মমতার অভাব স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি?’
‘স্যার একটা গল্প বলি। অনেক কাল আগে একবার এক ভাষ্কর, নাম জানি না, একটা মার্বেল পাথর নির্মিত ভাষ্কর্য তৈরী করে। অনেক বড় ভাষ্কর্য। মাটি থেকে ভাষ্কর্যের মাথা দেখতে চাইলে টুপি খুলে পড়ে যায় আরকি!
‘সত্যিই?! ’
‘না স্যার, মজা করলাম। তবে অনেক বড় ছিল ভাষ্কর্যটা। তো ভাষ্কর্য উদ্বোধনের দিন দেশের হোমড়া চোমড়াদের আমন্ত্রণ জানানো হল। সবাই তারিফ করতে লাগল ভাষ্কর্যটার। এর মধ্যে এক হোমড়া গোঁ ধরে বসল। তার দাবী ভাষ্কর্যের নাকটা বড় হয়েছে। নাকটা একটু ছোট করলেই একেবারে “খাপের খাপ, মন্তাজের বাপ”! একটা আঞ্চলিক প্রবাদ, স্যার। মানে হল পারফেক্ট। যাইহোক, সেই ভাষ্কর বার বার বলতে লাগল, না, এভাবেই ঠিক আছে। কিন্তু ক্ষমতাবানদের ব্যাপার স্যাপার তো জানেনই। এরা যা বলবে সেটাই করাটা যেন অধঃস্তনদের অবশ্য কর্তব্য। তো সেই ভাষ্কর্য শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্বেও মই বেয়ে উঠে গেল ভাষ্কর্যের নাকের ডগায়। এরপর হাতুড়ি দিয়ে খানিক খুটখাট করে নেমে এল। এরপর ভাষ্কর্য দেখে সেই হোমড়া খুশিতে মিহিদানা হয়ে জানাল, এবার ঠিক আছে।
মজার ব্যাপারটা কি জানেন, স্যার? ভাষ্কর কিন্তু মূর্তিটার নাকে একটা টোকাও দেয়নি। যেমন ছিল তেমনি আছে। হাতের ফাঁকে কায়দা করে কিছু মার্বেল পাথর নিয়ে গিয়েছিল সেটাই হাতুড়ি দিয়ে ভেঙ্গে নীচে গুড়ো ফেলেছে। ’
‘হুম, বেশ মজার ছিল গল্পটা। কিন্তু আমার সাথে এর কী সম্পর্ক? ’
‘আপনি তখন জানতে চাইলেন না, আপনার কেন মনে হচ্ছে আপনিও আমার মত মমতার অভাব দেখতে পাচ্ছেন রুমের সর্বত্র? এটা স্যার, আপনার বিভ্রান্তি। আমার কথাগুলো আপনার মনে একটা প্রভাব ফেলেছে। এজন্য আপনার মন আপনার চোখকে এমন কিছু দেখিয়ে আপনাকে মানসিক প্রশান্তি দিতে চাইছে।
‘কেন? আমার মন আমাকে এমন কিছু কেন দেখাবে? ’কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চাইলেন জহির সাহেব।
‘এর পেছনেও কারণ আছে। আপনি সবসময় প্রাচুর্য আর ক্ষমতার মধ্যে বড় হয়েছেন। যখন যা চেয়েছেন, তাই পেয়েছেন। আপনাকে কখনও কারো কাছে ছোট হতে হয়নি। আপনার অবচেতন মনও ওভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত। আপনাকে সব সময় সেটাই দেখায় যা আপনি দেখতে চান। আর আমার কথায় আপনার মনের মধ্যে এই ব্যাপারটা দেখার একটা আকাঙ্ক্ষা তৈরী হয়েছিল। আশা করি বোঝাতে পেরেছি?’
‘পেরেছেন, খুব ভাল মতই পেরেছেন।’ গম্ভীর হয়ে গেলেন ভদ্রলোক।
আমি খানিকটা ভড়কে গেলাম। ভদ্রলোককে কি একটু বেশি অপমান করা হয়ে গেল? যদিও সুক্ষ্মভাবে, কিন্তু সেটা ধরতে পারার মত ক্ষমতা জহির সাহেবের আছে।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘আমি কি তোমাকে তুমি করে বলতে পারি?’
‘বলেই তো ফেলেছেন,’ মুচকি হেসে বললাম। ‘না হলে আমিই বলতে বলতাম। অস্বস্তি হচ্ছিল। ’
জহির সাহেবও পাল্টা হাসি দিয়ে সোফার দিকে ইশারা করলেন, ‘চলো, কথা বলি। ’
“সেটাই তো করছি” বলতে গিয়েও বললাম না। এই মানুষটার সাথে সস্তা রসিকতা যায় না। ইনি সূক্ষ্ম আবেগের মানুষ। তাঁর সাথে সবকিছুই সুক্ষ্মভাবে করতে হবে, অপমানও!
জহির সাহেবের পিছু পিছু সোফায় গিয়ে বসলাম। ভদ্রলোক আমাকে তুমি করে বলা শুরু করেছেন। শুনতে বেশ লাগছে। মমতার টান আছে তাঁর এই সম্বোধনের মধ্যে।
‘আমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে, পারবে? ’সোফায় বসে বললেন তিনি।
‘শোনার পর বলতে পারব।’
‘বলছি, ’ বলেই চুপ হয়ে গেলেন তিনি। চুপ করেছেন তো করেছেনই। আমার ঘুম পেয়ে গেল! অনেক কষ্টে হাই চেপে রেখেছি, এমন সময় আমাকে চমকে দিয়ে বললেন, ‘আমার মেয়েকে খুঁজে বের করতে পারবে?’
‘কেন পারব না?’ আমি একগাল হেসে বললাম। সম্ভবত আফরীনের মত উনার মেয়েকেও সঙ্গ দিতে হবে আমার। লুকোচুরিও খেলতে হতে পারে। অন্তত ভদ্রলোকের কথায় তো সেটাই মনে হচ্ছে। পেশাদার সঙ্গী। অভিনব পেশা! ‘বয়স কত আপনার মেয়ের?’ জানতে চাইলাম।
জহির সাহেব আমার দিকে কেমন কেমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘বিশ।’
আমি বিষম খেলাম। গোটা দুয়েক শব্দ বাগে আনার চেষ্টা চালাচ্ছি কিছু একটা বলার জন্য।
‘আসলে আমারই দোষ। আচমকা এভাবে বলাটা ঠিক হয়নি। শুরু থেকে না বললে কিছু বুঝবে না। এই কাহিনীর শুরু আজ থেকে বিশ বছর আগে।’ বলেই আবার চুপ হয়ে গেলেন জহির সাহেব।
আমি বসে বসে চিন্তা করতে লাগলাম, সব কাহিনীর শুরুই কি “আজ থেকে বিশ বছর আগে”-ই হয়ে থাকে!
জহির সাহেব এবার অবশ্য বেশি বিরতি নিলেন না। বলতে শুরু করলেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ, ছোটবেলা থেকেই আমি “সব পাওয়াদের” দলে। কিছু চাইবার আগেই বাবা সেটা নিয়ে বসে থাকতেন। বললে বিশ্বাস করবে, বারো বছর বয়সে আমার নিজের গাড়ি ছিল?’
‘জী, করব, কারণ আমার নিজেরও ছিল।’
জহির সাহেব অবিশ্বাসে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকাতেই মুচকি হেসে বললাম, ‘খেলনা গাড়ি, স্যার! ’
জহির সাহেব যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। ভদ্রলোক আসলেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীকে সহ্য করতে পারেন না, এইমাত্র নিশ্চিত হলাম।
‘খেলনা গাড়ি আমাকে কখনই আকর্ষণ করেনি। আদিখ্যেতা মনে হত। ’ জহির সাহেব বলতে লাগলেন, ‘আমার কাছে আকর্ষনীয় ছিল নিষিদ্ধ সব বস্তু। জানো, আমি কত বছর বয়সে ড্রিংক করেছিলাম? ’
‘জানি না। ’
‘এগারো বছর বয়সে। ’ কথাটা বলেই জহির সাহেব এমন ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকালেন, যেন তিনি এইমাত্র অতি মহৎ কোনও কাজের বর্ণনা দিয়েছেন। আমি চুপ করে রইলাম।
‘তো যাই হোক, কথাগুলো বললাম যেন তুমি আমার আমার সম্পর্কে একটা ধারণা পাও। ’
‘সেটা আমি ইতোমধ্যেই পেয়ে গেছি। ’
‘হুম, তাও ঠিক। ও আচ্ছা, আরেকটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি। আমার মা ছোটবেলাতেই মারা যান, আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে। জন্মের পরই মাকে হারানোর কষ্টের সাথে কোনও কিছুরই তুলনা হয় না। ’একটু বিরতি দিয়ে বললেন, ‘জন্মের পর মারা যাওয়া আর আর জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাবার মধ্যে একটা সুক্ষ্ম পার্থক্য আছে, সেটা কি কখনও লক্ষ্য করেছো? ’
‘জী করেছি। মা’র মৃত্যু দিবস আর জন্মদিন একই দিনে হওয়ায় একজন মানুষ কখনই আনন্দ নিয়ে তার জন্মদিন পালন করতে পারবে না। ’
‘হুম, আমিও জীবনে কোনওদিন জন্মদিন পালন করিনি। বলা ভাল, করতে পারিনি। আমার না দেখা মা’টাকে খুব ভালবাসতাম আমি। আমার জন্মদিন, আইমিন মা’র মৃত্যু দিবসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তাম। মা নিজেও খুব নামাজী ছিলেন। ’
‘এখনও কাজটা করেন? ’
‘এখন প্রতিদিনই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি আমি। তো যা বলছিলাম, আমি মানুষটা ছোটবেলা থেকেই শাসনহীন বড় হয়েছি। তবে মজার ব্যাপার হল পড়াশোনার প্রতি আমার অনেক আগ্রহ ছিল। সব সময় ক্লাসে ফার্স্ট হতাম। আমাকে কখনও পড়তে বসতে বলেনি কেউ। অবশ্য বলার মত ছিলই বা কে?
একসময় আমি পড়াশোনা শেষ করে বাবার বিশাল গার্মেন্টস ব্যবসা দেখাশোনা শুরু করলাম। বাবা অবসরে গেলেন। ব্যবসা ভাল বুঝতাম বলে সব দায়িত্ব আমার উপরেই ছেড়ে দিলেন। পূর্ণ স্বাধীনতা পেতেই একেবারে উচ্ছনে চলে গেলাম আমি। অফিসটাকে ক্যাসিনো বানিয়ে ফেলেছিলাম আরকি। জুয়ার আসর বসাতাম “বন্ধু”দের নিয়ে। সেই সাথে সারারাত রঙ্গিন পানির আসর তো চলতই। একদিনের ঘটনা।’ বলেই চুপ হয়ে গেলেন ভদ্রলোক। খানিক বাদে খুক করে কেশে বললেন, ‘দেখো বাবা, তুমি আমার ছেলের বয়সী, কথাগুলো তোমাকে কিভাবে…।’
আমি বললাম, ‘স্যার, আপনি চাইলে রেখে ঢেকেও বলতে পারেন।’
তিনি খানিক ভেবে বললেন, ‘নাহ, কথাগুলো তোমার শোনা প্রয়োজন। ঠিক কী পরিস্থিতিতে ইয়াসমিনের সাথে আমার পরিচয় হয় সেটা জানার প্রয়োজন আছে। ’
‘তাহলে বলুন। ’
‘একদিন রাতেরবেলা। ’শুরু করলেন তিনি। ‘সেদিন আমরা চারজন ছিলাম। পেটে কিছু পড়তেই নেশা চড়ে গেল। এমন সময় এক বন্ধু জামান বলল, দোস্ত একটা মেয়ে টেয়ের ব্যবস্থা করা যায় না?’
‘ “মেয়ে-টেয়ে” নিশ্চয়ই বলেনি?’ মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললাম।
‘বুঝলাম না ঠিক। ’
‘নিশ্চয়ই আরও অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেছিল আপনার বন্ধু। ’
‘হুম, কুৎসিত ভাষা ব্যবহার করেছিল জামান। সেটা বলতে চাচ্ছি না। ’
‘আমিও শুনতে চাচ্ছি না। ’
জহির সাহেব বলতে শুরু করলেন, ‘আমাদের গার্মেন্টসে সারারাত ওভারটাইম করত অনেকে। এদের মধ্যে অনেক মেয়েও থাকত বলাই বাহুল্য। হঠাৎ ভাবলাম, বাইরে থেকে না এনে এদের দিয়েই কাজ চালানো গেলেই তো ভাল। ’
‘একেবারে ফ্রেশ মাল!’
জহির সাহেবের চোখদুটো ছোট ছোট হয়ে গেল।
‘তুমি কি আমাকে অপমান করছ? ’
‘জী না, আমি আপনাদের ওই সময়কার মানসিকতাটা ধরতে চাইছি। ’
জহির সাহেব কিছু না বলে শুরু করলেন, ‘হুম, স্বীকার করছি ওই সময় আমাদের মানসিকতা এমনই নোংরা ছিল। নেশার ঘোরে বিবেকের সর্বস্ব খুইয়ে বসেছিলাম। ম্যানেজারকে ডেকে বললাম, একটা সুন্দর দেখে মেয়েকে নিয়ে আসতে। টাকা পয়সা দিয়ে যেন আগেই ম্যানেজ করে নেয়। পরে ক্যাচাল করবে তা হবে না।
একটু পর ম্যানেজার এসে বলল, স্যার, একটা বড়ই সুন্দরী মেয়ে আছে কিন্তু টাকা পয়সা দিয়ে একে কাত করা যাবে না। অগ্নিকন্যা টাইপ!
বললাম, নিয়ে আসো, পছন্দ হলে দেখা যাবে।
ম্যানেজার একটু পর ইয়াসমিনকে নিয়ে এল।
আমি ইয়াসমিনকে দেখে নেশার ঘোরেও ধাক্কা মত খেলাম। এত রুপ!
আমি নির্বাক হয়ে কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে, জানি না। যখন সংবিত ফিরে পাই ততক্ষণে আমার তিন বন্ধু মেয়েটার উপর চড়াও হয়েছে। দুজন আমার বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিলের উপর ওকে শুইয়ে দু’হাত চেপে ধরেছে, আরেকজন পা। সস্তার সালোয়ার কামিজ এলোমেলো। ওড়নাটা কোথায় যেন।
আমি ইয়াসমিনের দিকে তাকাতেই দেখি ভয়ে থর থর করে কাঁপছে মেয়েটা। কী যেন বলতে চাইছে, একজন মুখ চেপে ধরায় জান্তব গোঙ্গানি বের হচ্ছে শুধু। রেশমের মত চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে, কাঁধে, কপালে, গলায়। চোখে তীব্র আতঙ্ক।’ বলতে বলতে থেমে গেলেন জহির সাহেব। যেন স্পষ্টই তাঁর চোখের সামনে এক অসহায় তরুণীর ভয়ার্ত মুখে প্রতিচ্ছবি কুয়াশার মত ভেসে বেড়াচ্ছে। যেন এই মুহুর্তে সে চোখের আকুতিগুলোও তিনি পড়তে পারছেন তিনি।
‘ইয়াসমিনের চোখে তখন জল টলমল করছিল পদ্মদিঘীর মত।’ বলতে লাগলেন জহির সাহেব। ‘এমন সময় জামান আমার দিকে তাকিয়ে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে হেসে অশ্লীল ভঙ্গিতে কোমর দোলাতে দোলাতে বলল, শুরু কর দোস্ত!
আমি আবার ইয়াসমিনের দিকে তাকালাম। এবার মেয়েটার চোখেমুখে ভীতি সরে গিয়ে অবিশ্বাস জায়গা করে নিল। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না আমি এমন কোনও কাজ করতে পারি।
জানো অভ্র, আমি এখনও মাঝে মধ্যে ধন্দে পড়ে যাই, সেদিন ওর চেহারায় আসলেই অবিশ্বাস ভর করেছিল? ইয়াসমিন কি সত্যিই বিশ্বাস করত, এমন কাজ আমি কিছুতেই করতে পারি না? নাকি ভুল দেখেছিলাম আমি?’
জবাব নেই আমার কাছে।
‘সেই দৃষ্টি দেখার সাথে সাথে আমার কী হল বলতে পারব না, নেশা আচমকা কেটে গেল। গর্জে উঠে ওদের বললাম, এক্ষুনি তোরা আমার অফিস ছেড়ে বেরিয়ে যা। আর কোনওদিন যেন না দেখি আমার আশেপাশে।
শুনে জামান খ্যাক খ্যাক করে হেসে খুবই কুৎসিত একটা কথা বলল।
মাথায় ঝাঁ করে রক্ত চড়ে গেল। একটা ফুলদানি ছিল হাতের কাছে, ধাই করে মেরে বসলাম জামানের মাথায়। বেরিয়ে যা শুয়োরের দল, গর্জে উঠলাম।
ফিনকি দিয়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছে জামানের। একজন প্রতিবাদ করতে চাইছিল বোধহয়, আমার রণমূর্তি দেখে ভয় পেয়ে গেল। কিছু না বলেই আহত জামানকে নিয়ে পালিয়ে গেল সুরসুর করে। আমার ক্ষমতা ওরা ভাল করেই জানে।
ওরা পিঠটান দিতেই তাকালাম ইয়াসমিনের দিকে। মেঝে থেকে ওড়না কুড়িয়ে নিয়ে বাড়িয়ে ধরলাম ওর দিকে। খুব ইচ্ছে করছিল অসহায় মেয়েটার গায়ে ওড়নাটা জড়িয়ে দিতে।
দু’চোখ ভরা জল নিয়ে আমার দিকে তাকাল ইয়াসমিন। ফুঁপিয়ে চলেছে একটানা। কাজল দিয়েছিল চোখে, কাজল ধোয়া পানি শুভ্র গালটাকে ইষৎ কৃষ্ণতার ছোঁয়া দিয়ে গেছে। ’ থামলেন জহির সাহেব।
আমি অবাক নয়নে তাকিয়ে আছি আধবুড়ো একজন মানুষের চোখের দিকে।
কী আশ্চর্য!

কী আশ্চর্য! !
আমি তাঁর চোখে অসীম ভালবাসার এক সমুদ্র দেখতে পাচ্ছি!
কার জন্য এই ভালবাসা?
বেশ কিছুটা সময় নিলেন এবার জহির সাহেব। চোখের দৃষ্টি ছাড়িয়ে যাচ্ছে কংক্রিটের দেয়াল, ওপাশের দিগন্তও। পুরোপুরি ঘোরের মধ্যে চলে গেছেন তিনি। চেহারায় হঠাৎ করেই একটা আভা ফুটে উঠেছে। উজ্জল আভাটায় কী যেন একটা মিশে আছে, ধরতে পারছি না।
‘তারপর কী হল স্যার? ’ আমি ভদ্রলোককে পৃথিবীতে ফিরে আসবার আহবান জানালাম।
জহির সাহেব সংবিত ফিরে পেতেই সামান্য কেঁপে উঠলেন। গলা খাকারি দিলেন অস্বস্তি কাটাতে। বললেন, ‘ইয়াসমিনকে বললাম বাসায় চলে যেতে। হাতে কিছু টাকা দিতে গিয়েও দিলাম না। দরিদ্র মানুষের আত্মসম্মানবোধ খুবই তীক্ষ্ম হয়। এদের আত্মসম্মানে আঘাত করলে এরা সবচাইতে আহত হয়। টাকাটাও হয়ত ইয়াসমিনকে আহত করবে, এজন্য দিলাম না। ইয়াসমিন নীরবে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
আমিও দীর্ঘদিন পর সেদিন রাতে বাড়ি ফিরলাম। প্রচন্ড ক্লান্তি ভর করেছিল। বাড়ি ফিরেই ফ্রিজ থেকে হুইস্কির বোতল বের করলাম। কিন্তু কী এক অজ্ঞাত আড়ষ্টতায় গ্লাসটা মুখ পর্যন্ত তুলতে পারলাম না। লালচে পানীয়টাকে ঘৃণ্য একটা বস্তু মনে হচ্ছিল। এই বস্তুটার জন্যই আজ ইয়াসমিনের সর্বনাশের চুড়ান্ত হতে যাচ্ছিল ভাবতেই রক্ত উঠে গেল মাথায়। এক ঝটকায় ছুড়ে ফেলে দিলাম গ্লাসটা। প্রচন্ড মাথাব্যথা নিয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে উঠে আমি উপলব্ধি করলাম, আমি মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেছি।’
কথাটা জহির সাহেব এমন ভাবে বললেন আমি চমকে উঠলাম। তারমানে তখন আমি ভুল পড়িনি তাঁর চোখের ভাষা।
‘বুঝলাম, ওকে আমার খুবই প্রয়োজন। ’ শুরু করলেন জহির সাহেব। ‘আমার ছন্নছাড়া, বেয়াড়া জীবনটাকে ইয়াসমিনই পারবে গুছিয়ে দিতে। আমি এই মেয়েটার কোলে মাথা রেখে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারব।
সিদ্ধান্ত নেয়া হতেই অদ্ভুত এক প্রশান্তি ভর করল আমার গোটা অস্তিত্ব জুড়ে। মুহুর্তেই একটা প্রাণবন্ততা ঘিরে ফেলল আমাকে ছায়ার মত।
সেদিন খুব সকাল সকাল গিয়ে অফিসে হাজির হলাম। তখনও আমার মাথায় ধরেনি এমন একটা ঘটনার পর ইয়াসমিনের কাজে আর না আসার জোর সম্ভবনা আছে। আগেই বলেছি, দরিদ্রদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ প্রবল হয়। ব্যতিক্রম যে নেই তা না, তবে ব্যতিক্রম তো আর দৃষ্টান্ত হতে পারে না।
যাইহোক, ঘটলও তাই। অফিসে গিয়ে শুনি ইয়াসমিন কাজে আসেনি। অভ্র, বলতে পারবে এরপর আমি কী করলাম?’
‘খুব সহজ স্যার। আপনি তাকে ডেকে আনতে লোক পাঠালেন।’
আমার কথা শুনে জহির সাহেবের মুখে যে হাসিটা ফুটল সেটাকে আলেকজান্ডারের বিশ্ব জয় কিংবা নীল আর্মস্ট্রং এর চন্দ্র জয়-পরবর্তী হাসিটার সাথে বদলে নেয়া যাবে সহজেই। জহির সাহেব উজ্জ্বল মুখে বললেন, ‘হয়নি, ঠিকানা নিয়ে আমি নিজেই গেলাম ইয়াসমিনের বাড়িতে। ’
আমি চোখে মুখে প্রবল বিস্ময় ফুটিয়ে তুললাম। যেন এই মাত্র আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ আশ্চর্যের ব্যাপারটা দেখে ফেলেছি। তবে বিস্ময়টা যে কৃত্রিম সেটা উত্তেজিত জহির সাহেবের চোখে ধরা পড়ল না।
আমি আগেই ধরতে করতে পেরেছিলাম জহির সাহেব নিজেই গিয়েছিলেন সেই মেয়েটার বাসায়। কিন্তু জহির সাহেবের আনন্দে উজ্জ্বল মুখটা দেখার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে চাইনি। কখনও সখনও ছোট্ট একটা সত্য গোপন, অকৃত্রিম আনন্দের আগল খুলে দেবার জন্য যথেষ্ট।
জহির সাহেব বললেন, ‘আমাকে দেখে ইয়াসমিনের মুখভঙ্গিটা কেমন হয়েছিল যদি দেখতে! ’ আবার স্মৃতিচারণায় ডুবে গেলেন ভদ্রলোক। বাচ্চাদের আইসক্রিম প্রাপ্তির মত আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠল তাঁর চোখজোড়া।
বললেন, ‘তখনই ওর পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে সব জানতে পারি আমি। ওর বাবা মা ছোটবেলাতেই মারা যায়। বড় হয়েছে মামার কাছে। এখন গার্মেন্টসে কাজ করে পুরো টাকাটাই মামা-মামীকে দিয়ে দিতে হয়। বিনিময়ে পায় একটা মাথা গোজার ঠাঁই আর দু’বেলা ঠাণ্ডা কড়কড়ে ভাত। ও চাইলে একা একা ওর বেতনের টাকা দিয়ে এর চাইতে অনেক ভাল থাকতে পারত। কিন্তু মামা-মামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই কষ্টটুকু সহ্য করে নিয়েছিল। তাছাড়া ওদের শ্রেণীতে একটা মেয়ের একা থাকাটা খুবই বাঁকা চোখে দেখা হয়। তখন তো আরও হত। সেই মেয়ের বিয়ের পথ অনেকটা পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
ওহ, আমি বোধহয় মুল প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়েছি, তাই না? আচ্ছা মুল কথায় আসি। চাকরিটা ছাড়লে মামা- মামীর পক্ষ থেকে বেশ বড় একটা ঝড় আসার সমূহ সম্ভবনা ছিল তাই আমি গিয়ে অনুরোধ করতেই ইয়াসমিন রাজি হয়ে যায় কাজে আসতে। তাছাড়া স্বয়ং আমার উপস্থিতিও ওকে অভিভূত করে ফেলেছিল বেশ খানিকটা। অবশ্য আমি যে ওদের ওখানে গিয়েছি সেটা আমার ড্রাইভার ছাড়া কেউ জানত না। গাড়ি ওদের বস্তি থেকে কিছুটা দূরে দাঁড় করিয়ে রেখে ড্রাইভারকে পাঠিয়েছিলাম ওকে ডেকে আনতে। যাইহোক, ইয়াসমিন পরদিন থেকে কাজে তো এল কিন্তু ওর কাজের ধরণ ধারণ পাল্টে গেল সম্পুর্ণ। ইয়াসমিন মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিল, তাই ওকে আমি আমার প্রাইভেট সেক্রেটারী বানিয়ে ফেললাম অফিসের সবার ভ্রুকুটিকে তুড়ি মেরে। যদিও কেউ প্রকাশ্যে ট্যাঁ ফো করবার সাহসও পায়নি।
ইয়াসমিন খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারত। তাছাড়া লেখালেখিরও অভ্যাস ছিল ছোটবেলায়। কাজটার জন্য একেবারে অযোগ্য বলা যাবে না। তবে ইয়াসমিন শুধু নামেই আমার পিএস হল। ওর আসল ও একমাত্র কাজ ছিল আমাকে সঙ্গ দেয়া। সারাদিন আমার চেম্বারে বসে টুকটুক করে গল্প করতাম আমরা। কী ছিল না আমাদের আলাপের বিষয়বস্তু? সবকিছু নিয়েই গল্প হত আমাদের। মাঝে মধ্যে ইয়াসমিনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম শহর ভ্রমণে, কিংবা রেস্টুরেন্টের আলো আঁধারির উদ্দেশ্যে।
অভ্র, তোমাকে আমি বোঝাতে পারব না, ইয়াসমিনকে সেই প্রহর শেষের রাঙা আলোয় কিংবা বৈদ্যুতিক বাতির আঁধো আলোতে কেমন অদ্ভুত মায়াবী দেখাত। আটপৌরে পোশাকেই যাকে পরীর রুপে দেখা যেত সেখানে লাল একটা শিফনের শাড়িতে কেমন দেখাতে পারে? ’ এটুকু বলেই থতমত খেয়ে গেলেন জহির সাহেব।
আমিও খানিক লজ্জা পেলাম। প্রায় বাবার বয়সী একজনের মুখে তাঁর প্রথম প্রেয়সীর বর্ণনা শোনাটা খুব সুখকর কিছু না!
সামলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন জহির সাহেব, ‘যাইহোক, ইয়াসমিন হয়ত ভেবেছিল গোটা ব্যাপারটা খেয়ালী কর্তার উদ্ভট এক খেয়াল, কিংবা সেদিন রাতে ওর প্রতি অন্যায়ের কিঞ্চিত ক্ষতিপূরণ। মাঝে মধ্যে যে আপত্তি জানায়নি তা নয়। বেশ কয়েকবারই লোকলজ্জার অজুহাত তুলেছিল, কিন্তু এটাও সে জানত “লোক”কে লজ্জা করবার মত মানুষ আমি ছিলাম না। তাছাড়া ভদ্রতাজনক একটা দুরত্ব বজায় রেখে চলতাম আমি। সবচাইতে বড় কথা, “লম্পট” বসের পরিবর্তনগুলো উপলব্ধি করতে পারছিল ও ভালমতই। ওর সাথে দেখা হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত মদ ছুঁয়েও দেখিনি আমি। হয়ত এই ব্যাপারগুলোই আমার প্রতি ওর বিশ্বাসকে জাগিয়ে তুলেছিল অনেক উঁচুতে। কিন্তু ইয়াসমিন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি তার বস আসলে তার প্রেমে গলা পর্যন্ত ডুবে আছে! নাকি বুঝেছিল? জানা হয়নি।
এরপর একদিন রাতের বেলা অফিস ছুটি হবার পর আমি ইয়াসমিনকে জানালাম আমার সেই সেদিনের অনুভূতি, বাড়ি ফেরার পরের অনুশোচনা, সকালের সেই সংকল্প, ভালবাসার টুকরো কথাগুলো। সরাসরিই বললাম আমি ওকে বিয়ে করতে চাই।
এরপরের কয়েকটা মুহূর্ত সারাটা জীবন অনেক অনেক রঙিন হয়ে থাকবে আমার জন্য। এই ক’টা মুহূর্ত’র কথা ভেবেই হাজার বছর কাটিয়ে দেয়া যায়।
ইয়াসমিন আমার ডাকে সব কিছু একপাশে রেখে সাড়া দিল। সে রাতেই আমি আমার এক পরিচিত কাজীকে ডেকে অফিসেই বিয়ে করে ফেললাম ইয়াসমিনকে। সেরাতেই…’ বলতে শুরু করেও বেশ দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে থেমে গেলেন জহির সাহেব। এই একটা দীর্ঘশ্বাসই আমাকে বলে গেল অনেক কিছু। প্রলম্বিত এই শ্বাসেই লুকিয়ে ছিল অন্য অনেক কিছুর ছোঁয়া। শংকা, লজ্জা, ভীতি, ভালবাসা, প্রেম এবং সবশেষে চুড়ান্ত তৃপ্তি!
এরপর আচমকাই সে রাতের অধ্যায় বন্ধ রেখে সম্পুর্ণ অন্য সুরে বলতে লাগলেন জহির সাহেব, যাইহোক, আমাদের বিয়ের পরদিন ঘুরে বেড়ালাম সকাল থেকে সন্ধ্যা। প্ল্যান করলাম, খুব শিঘ্রই বাবাকে জানিয়ে দেব আমাদের বিয়ের ব্যাপার। আমার বিশ্বাস ছিল, আর যাইহোক, আমার কথা অন্তত ফেলতে পারবেন না তিনি। এক সময় না এক সময় ইয়াসমিনকে অবশ্যই মেনে নিতেন, এবং সেটা মন থেকেই। কিন্তু আচমকা আমার সমস্ত রঙিন কল্পনাকে এক লহমায় ধূসরতায় ডুবিয়ে হারিয়ে গেল ইয়াসমিন। চিরতরে। ’
একবারে ক্লাইমেক্সে এসে গল্প আচমকা থামিয়ে দেবার মত গুণ আছে জহির সাহেবের। এটা একটা গুণই। সবার থাকে না। গল্প বলতে পারা যেমন একটা শিল্প, গল্প জায়গা মত থামিয়ে দেয়া তার চাইতে বড় শিল্প। আমি দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগলাম। এক পর্যায়ে প্রবল অস্বস্তি নিয়ে প্রশ্ন করলাম। ‘উনি কি স্যার, মারা গিয়েছেন?’
কথা না বলে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন জহির সাহেব।
আমি আরো অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেলাম। যদিও আমার কোনও প্রেয়সী নেই এরপরও জহির সাহেবের মানসিক অবস্থা বুঝতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হতে হল না। কৌতুহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্যার উনি কীভাবে মারা গেলেন? ’
‘জানি না। ’
এবার আমি ধন্দে পড়ে গেলাম। হঠাৎ করেই মনে হচ্ছে আমি বুঝি আকুল পাথারে পড়ে গিয়েছি। এই জায়গায় এসে মনে হচ্ছে আমি এতক্ষন ধরে জহির সাহেবের কাহিনির মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারিনি। ভদ্রলোক যাকে এতটা ভালবাসতেন তার মৃত্যু কীভাবে হল সে খবর তিনি রাখবেন না? নাকি পুরো ব্যাপারটাই ছিল ইয়াসমিনকে বাগে এনে ভোগ করবার একটা কূটকৌশল মাত্র? তাহলে জহির সাহেবের চোখেমুখে যে ভালবাসার ছাপ দেখেছি একটু আগে, সেটা মিথ্যে?
জহির সাহেব আমার চিন্তাধারা বুঝতে পেরেই হয়ত খেই ধরলেন। সাথে সাথেই কিছু প্রশ্নের জবাব এবং নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়াল।
‘আমি পরদিন অফিসে গেলাম সকাল সকাল। ইয়াসমিনের সাথে কথা হয়েছে, আজ সেও তাড়াতাড়ি অফিসে আসবে। এরপর আমরা দুজন মিলে কক্সবাজার যাব বেড়াতে। ’
‘হানিমুনে যেমন হয়!’
‘সরি? ’
‘সমরেশ মজুমদারের একটা উপন্যাসের নাম। ’
‘ও তাই বলো! আমি আবার…!
তো, কথা ছিল ইয়াসমিন ওর মামাকে বলে আসবে অফিসের কাজে ও কয়েকদিন বাড়ি ফিরতে পারবে না। ইয়াসমিন আমার পিএস হবার পর থেকে মোটা অংকের বেতন দিতাম ওকে। টাকা পেয়ে ওর মামা-মামীও ওকে তোয়াজ করতে শুরু করেছিল। সুতরাং কয়েকদিন বাড়ি না গেলেও কিছু বলার মত সাহস হারিয়ে ফেলেছিল মামা-মামী।
আমি ব্যাগ ট্যাগ গুছিয়ে অফিসে চলে এলাম। মনটা একেবারে পালকের মত হালকা মনে হচ্ছিল। আমরা ঠিক করেছিলাম বাসে যাব। চাইলে প্লেনেও যাওয়া যেত অবশ্য, কিন্তু দীর্ঘ পথ ইয়াসমিনের গা ঘেষে বসে থাকতে পারার আনন্দ আমাকে শিহরিত করে তুলছিল। প্লেনে সেই শিহরণ কোথায়?
আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম ইয়াসমিনের জন্য। সকাল গড়িয়ে দুপুর হল, ইয়াসমিন এল না। আস্তে আস্তে সময় গড়াচ্ছে সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বুকের ধুকপুকানি বাড়ল। কুডাক ডাকতে লাগল মন। আশংকায় আমার বুক শুকিয়ে যাচ্ছিল ক্রমশই। কেবলই মনে হতে লাগল ইয়াসমিন বোধহয় আসার পথে এক্সিডেন্ট করেছে। নয়ত এইদিনটাতে দেরী করার কোনও কারণই থাকতে পারে না। একসময় আর অপেক্ষা করা সম্ভব হল না আমার পক্ষে। গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেলাম।
ওর বাড়িতে পৌছে আমি স্রেফ হতভম্ব। ওদের বাড়ি সম্পুর্ণ খালি। আদৌ কেউ বাস করত ভাবতেও বেগ পেতে হচ্ছিল। দম বন্ধ হয়ে গেল আমার। আশেপাশে উদভ্রান্তের মত খোঁজ নিলাম। সবাই যেন আমার কথাতেই জানতে পারল ইয়াসমিনের পুরো পরিবারের উধাও হয়ে যাবার খবর। কারো কাছেই কোনও হদিস পেলাম না ওর। বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে ইয়াসমিন।’
‘একজন জলজ্যান্ত মানুষ পরিবারসহ রাতারাতি কীভাবে হারিয়ে যায়?’ কন্ঠের বিস্ময়টুকু চাপা দেবার কোনও চেষ্টাই করলাম না।
আমার প্রশ্ন বোধহয় জহির সাহেব শুনতে পাননি কিংবা জবাব এখনই দেবার ইচ্ছে নেই। বলতে লাগলেন, ‘এরপর আমার মাথায় কুৎসিত একটা চিন্তা খেলে গেল। বিয়ের দিন আমি ইয়াসমিনকে হাজার বিশেক টাকা দিয়েছিলাম ভাল একটা বাসা ভাড়া এবং আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র কেনার জন্য। জানতাম ইয়াসমিনরা মোটামুটি মানের বড়লোক হলেও আমার বাবা এই বিয়ে খুশি মনে মেনে নিতেন না, অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে, সেখানে ওরা তো হতদরিদ্র। তাই কিছু টাকা দিয়েছিলাম, যেন আর যাইহোক, “বস্তির মানুষ” তকমাটা লাগাতে না পারেন বাবা। তখন বিশ হাজার টাকা মানে অনেক কিছু। আমার হঠাৎ করেই মনে হতে লাগল দরিদ্র ইয়াসমিন এত টাকার লোভ সামলাতে পারেনি। টাকা নিয়ে পরিবার সমেত পালিয়ে গেছে। এক পর্যায়ে এই চিন্তাটাই গেড়ে বসল মাথায়।
আমি পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে গেলাম মানসিকতায়। উদভ্রান্তের মত জীবন যাপন করতে লাগলাম। অফিসে গেলাম না, খেলাম না। ঘুমালেই দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠতাম। বিচ্ছিরি সব দুঃস্বপ্ন। একবার দেখলাম, ইয়াসমিন একগাদা নোংরা আঁশটে পাঁচশ টাকার নোট উন্মাদিনীর মত কচকচিয়ে খাচ্ছে। মুখ বেয়ে লালা গড়াচ্ছে।
সারাটা দিন ঘরে বসে কাটাতে লাগলাম। শুধু একটা কাজ করতাম। প্রতিদিন লোক মারফত খবর নিতাম ইয়াসমিনের। কিন্তু দুর্জ্ঞেয় এক রহস্যের মতই অজানাই রয়ে গেল ইয়াসমিনের অন্তর্ধান রহস্য।
ক’দিন পর কে জানে, আয়নায় নিজেকে দেখে চমকে উঠলাম। এ কী হাল হয়েছে আমার!
তবে একটা কথা ঠিক, অনেক চেষ্টা করেও ওই সময়টায় মদ ছুঁতে পারিনি আমি। মনে হত দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে ভ্রুকুটি করছে ইয়াসমিন।
পরদিন থেকে অফিসে যেতে লাগলাম। ডুবে গেলাম কাজে। আরো এক সপ্তাহ পর আমি ভুলে গেলাম ইয়াসমিনকে।’
‘ভুলে গেলেন? ’
জহির সাহেব আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমি উত্তর পেয়ে গেলাম।
‘আমার এই অবস্থা বাবার নজরে পড়লেও তিনি মাথা ঘামাননি আমাকে নিয়ে। কখনও ঘামাতেন না। মাথা না ঘামালেও পৃথিবীতে একটা মানুষকেই আমি ভয় পেতাম। আমার চরিত্রের বেয়াড়া স্বভাবটাও পেয়েছি বাবার কাছ থেকেই, ভয় না পেয়ে উপায় আছে!
বাবা ইয়াসমিন হারিয়ে যাবার দু’সপ্তাহ পর বললেন, তার এক বন্ধুর মেয়ে আছে খুব সুন্দরী, আমি দেখব কিনা।
এরকম কথাবার্তা বহু আগে থেকেই বলে আসছিলেন বাবা, আমি আমল দেইনি। এবার দিলাম। ভাল মতই দিলাম। এতটাই ভাল মত দিলাম, মেয়ে না দেখেই বিয়েতে রাজী হয়ে গেলাম। বিয়ে হয়ে যায় আমার আর শাহনাজের। বাবা ভুল বলেননি। সত্যিই রূপবতী ছিল শাহনাজ।
বলতে গেলে ইয়াসমিনের প্রতি রাগ, অভিমান, ক্ষোভ থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া। বলতে বাধা নেই, ওকে আমি ঘৃণাও করতে শুরু করেছিলাম।’
‘এখন করেন না? ’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘উঁহু।’
‘স্যার একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
‘শিওর।’
‘স্যার, আপনার বাবাই কি ইয়াসমিন ম্যাডামকে মেরে ফেলেছিলেন?’
‘কী বললে? বাবা ইয়াসমিনকে মেরে ফেলেছে?’ চুড়ান্ত বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন জহির সাহেব।
আমি অস্বস্তি পড়ে গেলাম। খেই পাচ্ছি না কোনও। আমতা আমতা করে বললাম, ‘ওই যে, বাংলা সিনেমায় যেমন দেখা যায় আরকি! ’
হো হো করে হেসে উঠলেন জহির সাহেব। ‘না, না, আমার বাবা ওকে মারেননি। ইয়াসমিনের অন্তর্ধান রহস্য তার চাইতেও অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি কুটিল। ’
আমি নড়ে চড়ে বসলাম।

 

যারা সম্পুর্ণ বইটি পেতে ইচ্ছুক –

ঢাকায় যারা রয়েছেন তারা বাংলাবাজার ইসলামী টাওয়ারের দোতলায় রোদেলার শো-রুম থেকে সবচাইতে সুলভে (৪০%কমিশনে) বইটি কিনতে পারবেন। আর নীলক্ষেতে বইটি পাচ্ছেন নিচের ঠিকানায়:

নিউ ঢাকা লাইব্রেরি
৪৮৯, ইসলামিয়া মার্কেট (মেডিকেল গলির শেষ মাথায়)
ফোন: 01926750595

আর যারা হোম ডেলিভারি কিংবা ঢাকার বাইরে থেকে বইটি নিতে চান তারা আপনার চাহিদা লিখে Book Street – এ মেসেজ করুন।

একজন অভ্র এবং জনৈক পিতা
লেখক: আবুল ফাতাহ
ধরন: রহস্য, রোমান্টিক, উপন্যাস
প্রকাশক: রোদেলা
মূল্য: ১৬০ টাকা (মূদ্রিত মূল্য)

জন্ম ৭ এপ্রিল ১৯৯১। আদি নিবাস সিরাজগঞ্জ হলেও বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা ফরিদপুর শহরে। লেখালেখির শুরু ছয় বছর আগে, থ্রিলার উপন্যাস দিয়ে। রহস্য সাহিত্যের দিকেই ঝোঁকটা বেশি। এখন পর্যন্ত লিখেছেন অসংখ্য ছোটগল্প, বেশ কিছু উপন্যাসিকা এবং ছ’টি উপন্যাস। প্রথম একক উপন্যাস গ্রন্থ ‘প্রহর শেষে’।

Comments

comments