এক ডজন তরুণ অভিব্যক্তি – স্মৃতি, আনন্দ, অনুভূতি ও প্রত্যাশার ঈদে

0
532
এক ডজন তরুণ অভিব্যক্তি – স্মৃতি, আনন্দ, অনুভূতি ও প্রত্যাশার ঈদে
Print Friendly, PDF & Email

এক ডজন তরুণ অভিব্যক্তি – স্মৃতি, আনন্দ, অনুভূতি ও প্রত্যাশার ঈদে

– কেতন শেখ

শুরুতেই শুভেচ্ছাপর্ব – সবাইকে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। হৃদয় থেকে বেশ বড়সর একটা “ঈদ মোবারক”।

ঈদ নিয়ে আমাদের অভিব্যক্তি, উপলব্ধি ও অনুভূতির শেষ নেই। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে ঈদের অনুভূতি স্মৃতিময়, আনন্দময়, সৌরভময় ও প্রত্যাশাময়। ঈদের বাতাস এক নহলী স্পর্শ, ঈদের অপেক্ষা এক প্রিয় আবেগ, ঈদের প্রস্তুতি এক সামাজিক ঐতিহ্য, আর ঈদের উদযাপন এক মহা উত্সব। আজকে আমি তাই ঈদ নিয়ে আমাদের তরুণ মনের স্মৃতি, আনন্দ, অনুভূতি ও প্রত্যাশার কথা লিখবো। তবে এই লেখা শুধু আমার একার অভিব্যক্তি নিয়ে নয়। আজকের লেখায় আমরা জানবো বাংলাদেশের বারোজন কীর্তিমান, সফল, গৌরবময় ও ভাবনাময় তরুণ ব্যক্তিত্বের ঈদের অনুধ্যায় … ঈদ নিয়ে তাঁদের ভাবনা।

এবারের ঈদের আনন্দে যোগ হয়েছে সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ সাউথ আফ্রিকা ওয়ান ডে সিরিজে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের উল্লাস ও গৌরব। অসাধারণ এই বিজয়গাথায় আমাদের ঈদকে রাঙানোর জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। কিন্তু এই আনন্দধারায় আমরা আমাদের বেদনাকে ভুলে যেতে পারি না। নিয়তি, বৈষম্য আর ব্যাভিচারের অভিশাপে আর ন্যায়বিচারের দুর্মূল্যে বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনো বেদনার ভারে ন্যুব্জ। আমাদের মানুষ প্রতিবছর বিভিন্ন অপঘাত ও অপলাপের অভিসম্পাতে কষ্ট ও কান্নার ধারায় ভেসেছে। এরই মাঝে প্রগতির শুচিবর্ষণ ও আনন্দধারায় আমরা যেমন চেতনার স্নান করেছি, দুর্গতির খরা আর উত্তাপে আমরা তেমনই ব্যথার দাবদাহে পুড়েছি। ছোট বড় বিজয়ে আমরা যেমন এক হয়েছি, মানবতার প্রতিটি পরাজয়ে আমরাই খন্ডবিখন্ড হয়েছি।

ভাঙা-গড়ার এই ডামাডোলে আর অসহায় জীবনে আমরা মানবিক শৃঙ্খলাকে প্রতিনিয়ত হারাচ্ছি। প্রতিবছর পবিত্র রমজান মাস হারানো সেই জীবন ও মনন-শৃঙ্খলাকে ফিরে পাওয়ার একটা সুযোগ আমাদের কাছে এনে দেয়। আর তাই বাংলাদেশের প্রতিটি মানবতাপ্রাণ ও শান্তিপ্রিয় মানুষ এই মাসের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।

বেদনার সুরে আমাদের নিত্যসঙ্গী ছিলো শান্তি, কীর্তি, উত্কর্ষ আর প্রত্যাশার স্বপ্ন। সেই পথে আমরা হয় তো হারিয়েছি আমাদের অনেক প্রিয় মানুষদের … তবুও আমরা প্রতিনিয়ত কলুষমুক্তির জন্য যুদ্ধ করে চলেছি। ত্যাগ, সংযম আর আত্মশুদ্ধির অন্বেষণে তাই আমরা স্বাগত জানাই পবিত্র রমজান মাসকে। সেই পবিত্র মাসের শেষে ঈদ আমাদের জন্য তাই নতুন করে সব শুরু করার এক আশীর্বাদ।

সেই আশীর্বাদে ঈদকে বরণ করার জন্য আমি আজকের লেখার অলংকরণ করবো বাংলাদেশের বারোজন কীর্তিমান, সফল, গৌরবময় ও ভাবনাময় তরুণ ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি ও অনুধ্যায় দিয়ে। জীবন ও পারিপার্শ্বিকতার প্রতিকূলতার মাঝেও এদের মতো তরুণ ও উদ্যমী ব্যক্তিত্বরাই আমাদের দেশ, রাষ্ট্র, জাতি, ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, গণমাধ্যম, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দর্শন ও চেতনার জন্য কীর্তি, সাফল্য ও প্রগতির যাত্রাকে অনড় ও অটুট রেখেছেন। এদের মতো সঙ্গীদের জন্যই সামাজিক ঐতিহ্যের উত্সবগুলো আমাদেরকে উজ্জীবিত করে। আর তাই আজকের লেখায় আমি পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর সম্পর্কে এদের অনুভূতি ও ঈদকে ঘিরে এদের ভাবনাকে তুলে ধরছি। এদের তারুণ্য হোক আমাদের পাথেয়। এদের সাফল্য ও কীর্তি হোক আমাদের অনুপ্রেরণা। ঈদকে ঘিরে এদের প্রত্যাশা হোক আমাদের ভবিষ্যতের দৃষ্টি ও দর্শন।

আমার এই লেখার জন্য এই বারোজন চমত্কার ব্যক্তিত্বকে আমি কোনো নির্দেশনাই দেইনি। আমি শুধু বলেছি ঈদ নিয়ে আপনার যা মনে আসছে লিখে দেন। আর তাই এদের ভাবনা আর অভিব্যক্তিকে জেনেই আমার আজকের লেখার পরিসমাপ্তি হবে। আমি সঙ্গীতপ্রিয় মানুষ। ঈদের আগমনে আমার মনে গান শুরু হয়। তাই আমার প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ও সুর করা ঈদের গানের কথা দিয়ে আমার লেখার পর্ব শেষ করছি …

“ও মন রমজানের এই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ,

তুই আপনারে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ”

ডঃ-আফিফা-রায়হানা
ডঃ আফিফা রায়হানা
ডঃ আফিফা রায়হানা

পরিবেশবিদ

যখন ঈদ নিয়ে লিখতে বসলাম, আর ভাবছি কি লিখবো … একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছে – ঈদ বদলে গেছে। অ – নে – ক বদলে গেছে।

শুরুতেই মেহেদী লাগানোর কথা বলি। মা ছিলো পার্লার, আর না ছিলো কোনো কোন্। মেহেদী পাতা আনতে হতো পাড়ার বন্ধুদের বাসা থেকে। তারপর সেটা বেঁটে একটা শলা দিয়ে আম্মু প্রতিবছর একই ডিজাইন করে দিতেন … আঙ্গুলের মাথায় টুপি আর হাতের তালুতে চাঁদ-তারা। আমরা বছরের পর বছর এই ডিজাইন চালিয়ে গেছি, কখনও মনে হয়নি ভিন্ন কিছু করা দরকার। রোজার সময় খুব ইচ্ছে হতো ঠান্ডা শরবত খেতে। আমাদের বাসায় ফ্রিজ ছিলো না। বাসার কোণায় একটা লোক বরফের চাঁই বিক্রি করতো – “পাহাইড়া বরফ, পাহাইড়া বরফ”। আমার নানা ছিলেন ডাক্তার। কিছুতেই সেই বরফ কিনতে দিতেন না, কারণ সেই বরফ নাকি ড্রেনের পানি দিয়ে বানানো হয়।

ঈদের দিন খুব ইম্পর্ট্যান্ট একটা ব্যাপার ছিলো সবাইকে পা ছুঁয়ে সালাম করা, এবং ঈদি নেয়া। এখন আমরা পা ধরে সালামও করি না, ঈদিও পাই না। এখনকার ঈদে যেসব নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে একটু বলি। মাস্ট ভিজিট টু পার্লার, ফেসবুকে ছবি আপলোড, বাহারী নামের কাপড় (ফ্লোর টাচ গাউন, চেন্নাই এক্সপ্রেস শাড়ি), ঈদের ছুটিতে আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা না করে বিদেশ ভ্রমণ …. ঈদ সত্যিই বদলে গেছে, অ – নে – ক বদলে গেছে।

কিন্তু ঈদের স্বাদ ফিকে হয়ে যায়নি। তখন একরকম আনন্দ ছিলো, এখন অন্যরকম! সবাইকে ঈদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

সাকী আহমদ
সাকী আহমদ
সাকী আহমদ

গীতিকার ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা

এসোসিয়েট ক্রিয়েটিভ ডাইরেক্টর, ইন্টারস্পীড

গান ভালোবাসি বলেই, আমার কাছে ঈদ মানে, “রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”, এই গানটি! … বিশেষ করে রোজার ঈদ মানেই এই গান। রোজার ঈদ আরেকটি কারণে আমার কাছে একটু বিশেষ। বাংলাদেশে অডিও মার্কেট এই ঈদে সরগরম হয়ে ওঠে। ঈদের উত্সবে নতুন নতুন অ্যালবাম বের হতো এই সময়।

এখন যদিও চিত্রটা একেবারেই অন্যরকম। মাত্র বছর দশেক আগেও, মনে পড়ে … তারাবীর নামাজ শেষ করেই চলে যেতাম “ক্যাসেট”-এর দোকানে। আজকে নতুন কোন কোন অ্যালবাম আসলো! খুব উত্তেজনা কাজ করতো … আজ না জানি কোন চমক পাই! যখন গান লিখতে শুরু করি, তখনকার স্মৃতি আরো মধুর! ইফতারের পরপর আমি আর আমার গীতিকার জুটি বন্ধু মামুন চলে যেতাম হাতিরপুলের সাউন্ডগার্ডেনে। কারও না কারও রেকর্ডিং থাকতোই। তাদের সাথে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা, নতুন নতুন গান শোনা। কোনো কোনো দিন নিজের লেখা গানের রেকর্ডিং বা মিক্সিং থাকতো … সেদিন তো পুরো ঈদ!!

এখন আর এতো অ্যালবাম বের হয় না। তবে এবারের ঈদটা একটু অন্যরকম। জিপি মিউজিক নামে নতুন একটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হয়েছে, তারাই রিলিজ দিয়েছে পনেরোটির মতো অ্যালবাম! এছাড়া বিভিন্ন লেবেল মিলিয়ে বাজারে আসছে আইয়ুব বাচ্চু, ফিডব্যাক, অবসকিউরের অ্যালবাম। ঈদে প্রিন্স মাহমুদ আর জুয়েল বাবুর মিক্সড অ্যালবাম মিস করি খুব! হাবিব ওয়াহিদের সাথে গান করেছি আবার। মেহরীণের নতুন অ্যালবামে গান লিখেছি হাবিবের সুরে। অনেকদিন পর ঈদে গান আসছে আমার … তাই একটু বেশীই খুশি!

দেশের বাইরে থাকি বলে পরিবারের সবাইকে মিস করবো নিশ্চিতভাবেই। তবে প্রবাসজীবন দুই বছর হয়ে এলো প্রায়। নটিংহ্যামের বাঙালীদেরকেই আপাতঃকালীন পরিবার বলে মেনে নেয়ার চেষ্টা করছি প্রাণপণ। সকালবেলা আম্মার হাতের সেমাই, ছোটবোনের বানানো খাবার আর আব্বার সাথে নামাজ পড়তে যাওয়ার কথা মনে পড়বে খুব। থাক! কি হবে আর দুঃখ করে … গান নিয়েই কথা বললাম তাই!

বর্ণা আহমেদ
বর্ণা আহমেদ
বর্ণা আহমেদ

কবি ও শিক্ষিকা

আজকে মনটা বেশ আনন্দে আছে … অনেকদিন পর ঈদ নিয়ে কিছু লিখবো, আবার সেই দিনগুলোকে মনে করবো, কিছুটা হলেও অনুভব করার চেষ্টা করবো। ঈদ ছিলো আমার শৈশবের এক অন্যতম আকর্ষণ। রোজা শুরু হবে সেজন্যে ঘরে চলছে আম্মার বাজারের লিস্ট, একইসাথে অনবরত ঘর পরিষ্কারের আয়োজন। একদফা কাপড়ের দোকান ঘুরে আসা হলো, কেননা ঈদের কাপড় বানানোর আগে চার জুম্মার নতুন কাপড়েরও একটা বাজেট ধরা আছে!

রাতে উঠে সেহরী খাওয়া, সবার সাথে ইফতার তৈরী করা, প্লেটে প্লেটে ইফতার সাজিয়ে রাখা … সবকিছুর মাঝে ছিলো নিটোল আনন্দ আর অকৃত্রিম পাওয়া। এখন আমার পরিবেশ একেবারে ভিন্ন। পরিস্হিতির কারণে অনেক সময় পুরোনো সেই দিনগুলোকে একটু ভিন্ন স্বাদে বরণ করে নিতে হয়। তবে আনন্দের কোনো ঘাটতি হয় না।

ঈদে দুই হাত ভরে মেহেদী পরার প্রচলন আমার ছেলেবেলায় যেমন আবশ্যক ছিলো, আমার মেয়ে এখন নিজের থেকে সেই একই রীতি পালন করে যাচ্ছে। এখন ভাবতে ভালো লাগে যে আমি আমার মায়ের ভূমিকা পালন করছি … ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করা, আনন্দের সাথে ঈদের কার্ড তৈরী করা, সময়মতো পোস্ট করা। ঈদের সকালে শরীয়তমতো তৈরী হওয়া, বাচ্চাদেরকে তৈরী করা, নামাজে শরীক হওয়া, খাবার টেবিল বিভিন্নরকম খাবার দিয়ে সাজিয়ে দেয়া। ঈদ আমার কাছে খুবই আনন্দের এক অনুভূতি। বিদেশে বসে নিজের সংস্কার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একইভাবে পৌঁছে দেয়ার যে অক্লান্ত প্রচেষ্টা, ঈদ সেখানে এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করে।

আমার পাঠক সব বন্ধুদের জন্য ঈদের শুভেচ্ছা, ঈদ মোবারক।

কিঙ্কর আহসান
কিঙ্কর আহসান
কিঙ্কর আহসান

সাহিত্যিক, ও

এসোসিয়েট ক্রিয়েটিভ হেড, আইপজিটিভ কমিউনিকেশনস

চ্যানেল একটাই তখন। বিটিভি শুধু। “চাঁদ উঠেছে, চাঁদ উঠেছে” বলে রাস্তায় ছুটতে ছুটতে, বাড়ির পাশ কাটাতে গিয়ে কানে আসতো “রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ …”। মোটা বেঢপ টিভি থেকে ভেসে আসতো প্রিয় সেই গানটা।

তারপর ঈদের আগের রাতটায় ঘুম নেই চোখে। জামা-কাপড় যা কেনা হয়েছে লুকিয়ে রাখা হয়েছে সব। ঈদের দিন দেখানো হবে বন্ধুদের, প্রথমবারের মতন। ঈদের দিনের সবচেয়ে কষ্ট ছিলো ঘুম থেকে ওঠা। বাবা খুব সকালে উঠতেন। টিউবয়েলের পানি দিয়ে গোসল, তারপর পান্জাবী পরে আতর লাগানো। এটাই নিয়ম। রাতে ঘুম না হওয়ায় চোখে ঘুম লেগে থাকতো আমার। বাবার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে গোরস্হান রোডের মসজিদে যেতাম। জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ। সবচেয়ে আনন্দের ছিলো কোলাকুলির অংশটা। পরিচিত অপরিচিত সবার সাথে কোলাকুলি হতো।

নামাজ শেষেই বাসার দিকে দৌড়। রুহ আফজার শরবত ছাড়া ঈদের সকালটার কথা ভাবাই যেতো না। সেমাই কিংবা ফিরনি আর ঝাল কিছু বলতে গরুর মাংসের সাথে লুচি। অমৃত যেন। পটকা পাওয়া যেতো। সারাদিন ঐ পটকা ফাটিয়েই কেটে যেতো। দুপুরে কোনো এক বন্ধুর বাড়িতে খেয়ে নিতাম। সালামী নেয়া হতো জোর করেই। দুই টাকা, পাঁচ টাকার কড়কড়ে নতুন নোট। তারপর ঝুপ করে সন্ধ্যা নামতো। আমাদেরও মন খারাপ … মনে হতো ঈদটা মনে হয় চলেই গেলো। ইশ, ঈদটা একদিনের কেন হয় ?

রাতের বেলা বিটিভিতে ঈদের নাটক আর ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। একদিনে ঈদ শেষ হতেই দেয়া হতো না। টানা তিনদিন চলবে আনন্দ। পড়াশোনা বন্ধ। এই তো ঈদ। ভালোবাসার, ভালোলাগার ঈদ!

এসময়কার ঈদ শুধুই অফিস শেষে ঘুম। আর একটু আধটু সামাজিক দায়িত্ব পালন করা। সেই আবেগ কই ? খাবারের সেই স্বাদ কই ? সব পানসে আজকাল। ভোঁতা অনুভূতি। হায় রে পানসে অনুভূতি। আফসোস। আফসোসের ঈদ।

ডঃ নাঈমা পারভীন
ডঃ নাঈমা পারভীন
ডঃ নাঈমা পারভীন

সহকারী অধ্যাপক, কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি ইউ কে,

ও আবৃত্তিকার

আমার কাছে ঈদ মানেই আনন্দ। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ উল ফিতর মুসলমানদের জীবনে বয়ে আনে অপার আনন্দ। কিন্তু এই আনন্দ শুধু সীমাবদ্ধ থাকে না ধর্মীয় সীমার মাঝে। এই আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে ধর্ম নির্বিশেষে সবার মাঝে।

ঈদের আয়োজন কিন্তু শুরু হয় ঈদের দিনের অনেক আগে। প্রকৃতপক্ষে এটা শুরু হয় রমজান মাসের শুরু থেকেই। সবাই ব্যস্ত হয়ে যায় নতুন কাপড় কেনার জন্য। সবাই তাদের সাধ্যমতো, পছন্দমতো নতুন কাপড় কেনে … নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের জন্য। আর এই আয়োজনে সব থেকে বেশী ব্যস্ত থাকে মেয়েরা। তারা ব্যস্ত থাকে নতুন কাপড়ের সাথে ম্যাচিং জুতা, অর্নামেন্টস কিনতে। তাদের এই শপিং উত্তেজনা চলে চাঁনরাত পর্যন্ত।

রোজার শেষ সপ্তাহে শুরু হতো ঈদকার্ড বানানোর ধুম। আমাদের শৈশবে ফেসবুক ছিলো না, সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর চমত্কার শৈল্পিক ও সৃষ্টিশীল চলন ছিলো শিশু-কিশোরদের হাতে বানানো ঈদকার্ড। এখন আর সেই দিন নেই। তবে আজও চাঁনরাতের উত্তেজনার কোনো শেষ নেই। কেননা নতুন চাঁদ দেখা গেলেই ঈদ হবে পরের দিন। তাই সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে নতুন চাঁদ দেখার জন্য, অথবা নতুন চাঁদ দেখার সংবাদের জন্য। ঈদের আনন্দ আর উত্সব তাই শুরু হয়ে যায় সেই চাঁনরাত থেকেই। চাঁদ দেখা গেলেই সবাই ব্যস্ত হয়ে যায় শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায়। শুরু হয়ে যায় নানারকমের মজাদার খাবার রান্নার ধুম। মেয়েরা সবাই একে অন্যের হাতে মেহেদী পরিয়ে দেয়। আকাশে বাতাসে শুধু আনন্দ আর আনন্দ।

ঈদের দিন সকালে সপরিবারে নতুন কাপড় পরে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া হয়। নামাজ শেষে সবাই একে অপরের সাথে কোলাকুলি করে। নামাজের পড়ে বাড়ি ফিরলে ছোটরা পরিবারের বড়দেরকে সালাম করে, তাঁদের কাছ থেকে আশীর্বাদস্বরূপ ঈদি বা সালামী পায়। সে এক আরেক উত্তেজনা … পরিবারের ছোটরা খুব আগ্রহ নিয়ে গল্প করে কে কতো বেশী ঈদি পেয়েছে! এরপর ছিলো আত্নীয়স্বজন আর বন্ধুদের বাসায় গিয়ে সবাই একসাথে হওয়ার মজা। লোকজন কমে যাওয়ায় ঢাকার রাস্তাগুলো ঈদের দিনে কি সুন্দর আর জানযট মুক্ত হয়ে যেতো … আজও হয় তো হয়। তখন এমনি এমনি বেড়াতেও কি আনন্দ!

এমনিভাবে ঈদের প্রতিটি মুহূর্তই আমার কাছে অনেক আনন্দের, অনেক প্রিয়। আর এই আনন্দের দিনে সবার জন্য রইলো আমার শুভকামনা ও ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি মানুষের মনে। ঈদ মোবারক।

নিলয় মাসুদ
নিলয় মাসুদ
নিলয় মাসুদ

চলচ্চিত্র নির্মাতা ও পরিচালক,

ক্রিয়েটিভ গ্যারাজ

ঈদ মানে খুশির দিন,আর তাই এই ঈদ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য মহা আনন্দের উত্সব। তেমনি আমার জীবনেও ঈদ মহা আনন্দের।

যখন ছোট ছিলাম তখন বাবার হাত ধরে ঈদের নামাজ পড়তে মসজিদে যেতাম। মহা খুশিতে সালামী তুলতাম। আর এখন উল্টা সালামী দেই। এই বছর ঈদে আমার তেমন কোনো প্ল্যান নেই, তবে আমি চাই প্রত্যেক মুসলমান ঈদের দিনটা যেন ভালোমতো কাটাতে পারে, এবং সবাই যেন নতুন জামা পরে নামাজ পড়তে যেতে পারে। সেজন্য আমাদেরকে শুধু প্রার্থনা করলেই চলবে না, আমাদের প্রত্যেকের সত্যিকারের কিছু করার আছে।

আমার এই লেখা আপনার যারা পড়বেন, তারা সবাই একটা করে ঈদের জামা কম কিনে  ঐ একটা জামার টাকা যেসব ছেলেমেয়েরা নতুন জামা কিনতে পারে না তাদেরকে দান করবেন। আমাদের মতো ওরাও যেন খুশিতে সবার সাথে ঈদের দিনটা কাটাতে পারে।

নাজমুন নাহার লুনা
নাজমুন নাহার লুনা
নাজমুন নাহার লুনা

প্রভাষক, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

প্রতিবছর ঈদের জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকি। সেই আনন্দের দিনে আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে একজন আরেকজনকে কাছে টেনে নেই, আর বলি, ঈদ মোবারক। বাংলাদেশে ঈদ যে শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীরাই উদযাপন করে, তা নয়। ঈদের দিনে আমাদের ছোট্ট সোনার বাংলাদেশে দৃষ্টি রাখলেই বোঝা যায় যে এই উত্সব ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের। আর তাই বাংলাদেশে ঈদ মানেই অপরিসীম আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার এক মিলনমেলা।

আমার শৈশবে ঈদের পুরো আনন্দটা ঘিরে ছিলো আমাদের গ্রামের দাদুবাড়ি। ঈদের আগের রাতেই আমার সাত চাচা ও এক ফুপুর পরিবারসহ সব ভাইবোনেরা চলে যেতাম মানিকগন্জের গ্রামের বাড়িতে। চাঁনরাতটা ছিলো যেন শুধুই আমাদের আড্ডাবাজি আর মেহেদী দেয়ার জন্য। ঈদের দিনে যখন মা, দাদী, চাচীরা রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত, আমরা সব ভাইবোনেরা তখন নতুন জামাকাপড় পরে কখনও সালামী নেয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ি, তো কখনও খেলায় মগ্ন – কানামাছি, বৌচি, ছোঁয়াছুই, বরফপানি। প্রতিবছর ঈদে আমাদের গ্রামে একটা মেলা হতো। সেই মেলার পঁচা পানির চটপটি আর কুলফি না খেলে যেন ঈদটাই অপূর্ণ থেকে যেতো। ছোটবেলার সেই চিন্তাহীন নির্ঝন্ঝাট ঈদের আনন্দটা যেন স্মৃতির পাতায় আজও রঙীন।

বড়বেলার ঈদগুলো হয় তো ছোটবেলার ঈদের মতো রঙীন আর নির্ঝন্ঝাট নয়, কিন্তু এখন ঈদের আনন্দের আরো কিছু অর্থ খুঁজে পেয়েছি। আমার জন্য ঈদ মানে এখন আর হয় তো ভাইবোনদের সাথে ছোঁয়াছুই খেলা নয় … ঈদ এখন আমার কাছে ত্যাগ আর সবাইকে কাছে টেনে নেয়া। যখন একটি অভাবগ্রস্ত শিশুকে ঈদের নতুন কাপড় দেয়ার পরে তার মুখে উজ্জ্বল হাসিটা দেখি, তখন মনে হয় এই তো ঈদ। আমার জন্য ঈদ তাই বছরে মাত্র দুইবার আসে না, ঈদের মাহাত্ম লুকিয়ে থাকে সবার মুখে হাসি ফোটানোর মাঝে। ঈদের সংজ্ঞা তাই আমার কাছে জীবনকে আনন্দে ভরিয়ে তোলা, আর সবাইকে সেই আনন্দ ভাগাভাগি করে দেয়া।

সবাইকে ঈদের অনেক শুভেচ্ছা।

ডঃ এজাজ আহমেদ
ডঃ এজাজ আহমেদ
ডঃ এজাজ আহমেদ

সহযোগী অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া

আমার কাছে ঈদ মানেই সবার জন্য আনন্দ, আর পরিবার ও স্বজন-বন্ধুদের নিয়ে একসাথে আনন্দ। ঈদ মানে উত্সব আর মানবতার ঐক্য। ধনী ও দরিদ্র সবার জন্যই ঈদ নিয়ে আসে সুখময় অনুভূতি। নতুন কাপড় পরা, ভালো খাবার খাওয়া, আর ঈদি হচ্ছে ঈদের দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ট্র্যাডিশন।

আমার কৈশোরে ঈদ ছিলো সবার সাথে খুব ভালো খাবার খাওয়া, আর বড়দের থেকে ঈদি পাওয়া। এখন বড় হয়েছি – এখন তো আর ঈদি পাই না। তবে ঈদি দিতে এখনও সেই একই আনন্দ অনুভব করি। তবে প্রবাসে আমি ঈদের আড্ডা খুব মিস করি। সেই আড্ডা ছিলো পরিবার ও বন্ধুদের সাথে।

আমি মনে করি ঈদ মানুষের মনে শান্তির বার্তা নিয়ে আসে। ঈদ আমাদের দুঃখ কষ্টকে কিছু সময়ের জন্য হলেও ভুলিয়ে দেয়, আর জীবনের আয়োজনকে আরো উত্সবমুখর করে। এই ঈদে আমি আমার মায়ের রান্না খুব মিস করবো, কিন্তু মেলবোর্নের পরিবার ও বন্ধুদের সাথে অবশ্যই জীবনের আরেকটি ঈদ খুব আনন্দ নিয়ে পালন করবো।

মদিনা জাহান রিমি
মদিনা জাহান রিমি
মদিনা জাহান রিমি

কথা-সাহিত্যিক

আমাদের দেশে ইসলাম, সনাতন, বৌদ্ধ ও খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীরা যে যার ধর্ম এবং উৎসব নির্বিঘ্নে পালন করে। তবে ঈদের সময়টাতে যেন একটু বেশীই আনন্দ উল্লাসে চারদিক উজ্জ্বল হয়ে যায়। আমার ব্যক্তিগত ঈদ নিয়ে মজার সময় এবং ঘটনাগুলো স্মৃতির আলমারিতে পড়ে আছে। মাঝে মাঝে স্কুলের বন্ধুরা ফোন করে বলে আমি নাকি স্বার্থপর হয়ে গেছি। আমি বলি কিছুটা তো বোধ হয় সবাই হয়ে গেছি। কথাটা লিখতে চোখে পানি এসে গেছে, কিন্তু স্বার্থপরের চোখের পানির কোনো দাম নেই।

এবার আসি মায়ের কথায়। আমার মা বৃষ্টিতে ভিজতে পছন্দ করেন, রান্না করতে পছন্দ করেন। কিন্তু দশ-বারো রকমের শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে গৃহবন্দী করে রেখেছে। মেয়ে হিসেবে মায়ের ভালোবাসার মর্যাদা আমি হয় তো ঠিকমতো দিতে পারি নাই। আমার লেখা প্রথম উপন্যাসের বই তাঁকে উৎসর্গ করা, লজ্জায় সেটিও তাঁকে বলতে পারি নাই। তবু তিনি আমাকে নিয়ে গর্ব করেন … অকারণ সে এক অদ্ভূত গর্ব! আমার মায়ের জন্য জীবনের প্রথম ঈদ উপহার কিনেছিলাম টিউশনির টাকা জমিয়ে। মা উপহারের কথা এমনভাবে সবাইকে বলে বেড়াচ্ছিলেন, যেন আমি তাঁকে দেড় হাজার টাকার চাদর না, দেড় লাখ টাকার গয়না উপহার দিয়েছি!

আমার বাড়ি উত্তরবঙ্গে। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গে যাওয়ার রাস্তায় যানজটের দুর্ভোগ কেমন তা ভুক্তভোগীরাই ভালো জানেন। আমিও প্রতিবছর এইসব ঝামেলা ঠেলে বাড়ি যেতাম। তবে এই প্রথম আমি ঈদে বাড়িতে যাচ্ছি না।

আমার পক্ষ থেকে আমার পরিচিত সকলকে এবং তাদের পরিবার, শুভাকাংখীদের জানাই ঈদের শুভেচ্ছা।

শেখ রানা
শেখ রানা
শেখ রানা

গীতিকার, কবি ও সঙ্গীত শিল্পী

আনন্দের শীর্ষ অনুভূতির পর শূন্যতার বোধ। ঈদের দিন মানেই ছিলো দমবন্ধ করা আনন্দ। আর সন্ধ্যা রাত না হতেই ঈদ শেষ হয়ে যাচ্ছে ভেবে একটু একটু মন খারাপের শুরু।

আমাদের সবচেয়ে সুন্দর কাল শৈশব। শৈশব আর শৈশবের হাত ধরে কৈশোরে পা দেয়া গুটিশুটি দিন। সময়গুলো নির্ভার। সব দায়িত্ব বড়দের। আমাদের আর কি! পড়াশোনা করা, বিকেল হলেই ক্রিকেট,ফুটবল আর ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলেই টিলোস্প্রেস খেলার সহজিয়া আনন্দ। আমরা থাকতাম হাইকোর্ট কলোনীতে, একদম হাইকোর্ট কম্পাউন্ডের ভেতরে। অবারিত সবুজ মাঠ,ইট সুরকি পথ আর সবুজ গাছের সারি। হাইকোর্ট বলে নিরাপত্তাও ছিলো শতভাগ। আমরা ছোট থেকে একটু বড় হয়েই রাত-বিরেতে কতো হেঁটেছি কলোনীর মাঠে। আহ! শৈশবের সেই নির্ভার সময়গুলো। বিভিন্ন পালা-পার্বণে,উৎসবে,আনন্দে বন্ধুদের একসাথে ঘুরে বেড়ানো। ৮৮-৮৯ এর কথা। ঢাকা তখন রিকশা চেপে আরাম করে হারিয়ে যাওয়ার শহর ছিলো সত্যি। আর ঈদের দিন ছিলো হারিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর দিন।

কাঙ্ক্ষিত চাঁনরাত এলেই কলোনীতে সাজ সাজ রব পড়ে যেতো। আমাদের বাঁধা-ধরা বন্ধু ছিলো না। সবাই সবার বন্ধু ছিলাম। ছোটবড় সব মিলেমিশে জমাট বেঁধে যেতাম। তখন মাত্রই ঈদগাহ মাঠ হয়েছে। নতুন হওয়া ঈদগাহ মাঠে আমরা চাঁনরাতে গোপন বৈঠক করতাম। কাল কি কি করবো,কোথায় কোথায় যাবো,কি খাবো। তখন ঢাকায় মাত্র কোন্ আইসক্রিমের চলন হয়েছে। চার বা পাঁচ টাকা দাম। প্রেসক্লাবের ঠিক উল্টোদিকে বিএমএ ভবনে পাওয়া যেতো। আমি,টগর,পলাশ মিলে এইসব বুদ্ধি পরামর্শ করতাম। রুমা,সুইটিও ছিলো। ঈদ উপলক্ষ্যে হাইকোর্টের মূল ভবনে লাইটিং করা হতো। পুরো হাইকোর্ট আলোর পোষাক পরে ঝলমল করে বলতো দেখো আমাকে দেখো। আমরা দেখতাম আর আনন্দে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াতাম সেই চাঁনরাতে। কি উত্তেজনা! কি আনন্দ! কাল ঈদ যে…

তারপর ঈদের দিন আসতো হাসিমুখে। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আম্মার হাতে বানানো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সেমাই খেয়েই নতুন পান্জাবী-পায়জামা পরে আব্বার সাথে ঈদগাহে যেতাম। নামাজে মন থাকতো কম। নামাজ শেষ হলেই যে ঈদের দিন শুরু হতো। নামাজ শেষে কোলাকুলি আর বন্ধুদের খুঁজে বের করে নিরন্তর কোলাকুলি। কোলাকুলি শেষে আমরা চোখ বড় করে প্রেসিডেন্ট,প্রধানমন্ত্রী,বড় মন্ত্রী,ছোট মন্ত্রী, তাদের লটবহর আর গাড়ি দেখতাম। আমাদের বাসার সামনে দিয়েই হুশশশ…করে চলে যেতো। আমরা চোখ গোলগোল রেখে হাত নেড়ে টাটা দিতাম।

বাসায় ফিরে টপাটপ ঈদের নতুন জামা জুতো পরে তৈরী হয়ে যাওয়া। তারপর একসাথে হয়েই আমরা সবার বাসায় বাসায় দলবেঁধে সালাম করতে যেতাম। কার বাসায় প্রথম যাবো সে নিয়ে রীতিমতো লটারি হতো। সালাম তো উপলক্ষ্য মাত্র,আসল লক্ষ্য ছিলো খালাম্মাদের হাতের মজাদার সব সেমাই,মিষ্টান্ন খেয়ে ঢেকুর তোলা, আর সালাম করে হাসিহাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা। সালামীর আশায়। সেসব কথা ভেবে এখন মজাই লাগে! দুপুর গড়াতো,বিকেল আসতো রোদ্দুরের হাত ধরে। এমনিতে সারাবছর আমরা খেলায় মেতে থাকলেও ঈদের দিন বলে কথা। কড়া শাসনের ফাঁক গলে এই একটা দিন একটু সাহসী হয়ে যেতাম। রিকশা করে প্রেসক্লাবে গিয়ে কোন্ আইসক্রিম খাওয়া,রমনায় দল বেঁধে ডিসটিউনে গান গাওয়া, আর একটু এগিয়ে শিশুপার্কে টিকেট কেটে ঢুকে পড়া আলবৎ। আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরি হয়ে যেতো নিমিষেই।

সন্ধ্যা নামতো। সারাদিনের দমবন্ধ আনন্দ একটু থিতু হতো তখন। গোল হয়ে বসে আড্ডা দিতাম, আর না হয় কলোনীর বড়ভাই-আপুদের কাছে নানারকম বায়না। ছেলেবেলায় কতো রঙীন যে ছিলো ঈদের দিন। রঙধনুর সবকটা রঙ আকাশ থেকে নেমে আসতো মাটিতে। তারপর জড়িয়ে ধরে থাকতো আমাকে।

আর একটু বড় হয়ে সেই দমবন্ধ আনন্দে রাশ টেনে ধরেছিলো কে যেন! বয়স? তাই হবে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আনন্দের রকমফের ঘটে যায় অলক্ষ্যেই। তখন আনন্দ পেতাম বাজারে আসা নতুন নতুন ব্যান্ড-এর অ্যালবাম কেনায়। টিফিনের টাকা জমিয়ে,বা ঈদের জামা বাবদ বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে কিছু টুপাইস মেরে দিয়ে ব্যান্ড-এর অ্যালবাম কিনতাম স্টেডিয়াম ঘুরে ঘুরে। তখন তো ঢাকা শহরে অনেক ক্যাসেটের দোকান, এখানে-ওখানে। এখন আর নেই।

এখন আর ঈদের সেই দমবন্ধ আনন্দও নেই। এখন বরং নিজে সাদাকালো থেকে ছোট ছোট শিশুদের রঙীন ঝলমলে পোষাকে ঘুরে বেড়ানো দেখতে ভালো লাগে। ভালো লাগে এই রঙ দেখে সেই ঈদের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে। শব্দে,লেখায়। তখন আনন্দের উপকরণ ছিলো উপচে পড়া। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। রংতুলিতে ছোপছাপ। এখনও আছে। শুধু ভাবনার ঘুলঘুলিতে আনন্দগুলো বাঁক বদল করেছে কেবল। নতুন নতুন নাম নিয়েছে বুঝি।

জুলিয়া ইসলাম শিশির
জুলিয়া ইসলাম শিশির
জুলিয়া ইসলাম শিশির

শিক্ষিকা, বিজ্ঞাপন কর্মী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

ঈদের প্রসঙ্গ এলেই মন ফিরে যেতে চায় সেই শৈশবে, যখন অপার আনন্দে জীবনের সবটুকু সুখ অবলীলায় উপভোগ করা হতো। বাবার কর্মস্থল থেকে নানার বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার জন্য সারাটা বছর অপেক্ষায় থাকতাম। তাই ঈদ মানেই আমার কাছে এখনও লঞ্চে করে ক্ষরতা যমুনা নদী পার হওয়ার ভালোলাগা।

ঈদের সকালটা কতোই না মধুময় ছিলো! বাবা মামাদের সাথে ঈদগাহে নামাজ পড়তে না গেলে যেন ঈদটাই মাটি হয়ে যেতো। মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও পাজামা-পান্জাবী পরে নামাজ পড়তে যেতাম, আর সেজন্য আমাকে প্রতি ঈদেই বাবা-মা নতুন পাজামা-পান্জাবী কিনে দিতেন। ঈদগাহ থেকে ফেরার পথে মেলা থেকে কতোই না খেলনা কিনে আনা হতো! তারপর বাড়ি ফিরে নতুন জামা-জুতা পরে সেসব খেলনা দিয়ে সমবয়েসী মামা,খালা আর মামাতো-খালাতো ভাইবোনের সাথে খেলা। জীবন থেকে শৈশব চলে গেলেও সেসব বর্ণীল ঈদের মধুময় স্মৃতি আজও মনে সুখের অনুভূতির সৃষ্টি করে।

আজ আমি একজন কর্মজীবি নারী। কাজের ফাঁকে ঈদের ছুটিকে বিশ্রাম নেয়ার সময় বলে মনে করতেই বেশী ভালো লাগে … যদিও এই সময়েই সংসারের কাজ সবচেয়ে বেশী! ঈদের সকালে নতুন পোষাক পরার সেই উত্তেজনাও আর নেই। বিয়ের পর বাবা-মার সাথেও আর ঈদ করা হয় না। তাই সারাদিন মায়ের ‘এটা খাও,ওটা খাও’শুনে আর বিরক্তি প্রকাশ করা হয়ে ওঠে না। আত্মকেন্দ্রীক সুখ খুঁজতে গিয়ে হঠাত করে বাসার বুয়া আর দারোয়ানদের দিকে দৃষ্টি আটকে যায়। ওরা নিশ্চই ওদের পরিবারের সাথে ঈদ করতে পারলে খুশি হতো। কিন্তু ওদের ছাড়া যে আমার বাড়িটা অচল, সেই চিন্তাও স্বার্থপরের মতো পরমুহূর্তেই আমার বিলাসী মনকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে।

আমরা নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করি, আর তাই ইসলাম ধর্মের সব উত্সব উদযাপন করতে কোনোরকম কার্পণ্য করি না। তবে ইসলাম সাম্যের কথা বললেও কতোটুকুই বা আমরা সেই সাম্যের মর্যাদা দেই? না … এটা কাউকে উদ্দেশ্য করে কোনো প্রশ্ন নয়,নিজেকেই মনে মনে জিজ্ঞেস করছি। সেই সাথে সবাইকে অনুরোধ করছি,আসুন,আমরা যে যেভাবেই থাকি,ঈদের দিন আমাদের চারপাশের মানুষগুলোর সাথে ঈদের আনন্দটুকু ভাগ করে নেই।

সবার প্রতি রইলো ঈদের শুভেচ্ছা ও সাম্যের আহবান।

সার্জিল খান
সার্জিল খান
সার্জিল খান

গল্পকার

বছর ঘুরে ঈদ আসে। ঈদ আসলে কি? শুধুই কি মুসলমানদের ধর্মীয় উতসব, নাকি সেই সাথে রূপ নেয়া সার্বজনীন একটি উতসব? জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে উপমহাদেশীয়রা মেতে উঠে ঈদের আনন্দে। এক মাস সিয়াম সাধনার পড় ধনী-গরীব নির্বিশেষে আসে ঈদ-উল-ফিতর, সবাইকে আনন্দের সাগরে ভাসিয়ে নিতে। ঈদ্গাহে নামাজ পড়তে যাওয়া থেকে শুরু করে সারাটি দিনে থাকে না ধনী-গরীবে কোন ভেদাভেদ।

রমজান মাসে চাঁদ দেখার পর থেকে শুরু হয় সাধনা, নিজেকে ভুল-ত্রুটি থেকে পরিষ্কার করার জন্য একটি মাস কেবল রোজা রেখেই নয় আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য নেক আমলনামার মধ্য দিয়েই এক মাস পার করার পর ঈদের চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ঈদ প্রস্ততি।

ঈদকে ঘিরে আমাদের অনেক আয়োজন। সুন্নতমতে নতুন কাপড়-চোপড় পরা, ঈদের দিন মিষ্টি কিছু খাওয়া, ফিতরা বাকি থাকলে তা আদায় করে নেয়া … সবই ঈদের আনুসাঙ্গিক ব্যাপার। প্রতিটি মুসলমানই এই কাজটি দক্ষতার সাথে করে থাকেন। মূলত ইসলামিক জীবন বিধানে কোনো ভেদাভেদ নেই, এই বার্তা নিয়েই যেন ঈদ আসে ধনী-গরীব সকলের মাঝে। ছোট ছোট শিশুদের আনন্দ উল্লাস, বড়দের একে অপরের সাথে সৌহার্দ এর সবই যেন ঈদের দিনের ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবুও সবকিছুর পরে ঈদ কারো কারোর জন্য আনন্দের দিন হয় তো বয়ে আনে না। রোগে-শোকে ভুগতে থাকা জরাজীর্ণ অসুস্থ মানুষটিরও ঈদ আনন্দে মেতে উঠতে ইচ্ছে করে। রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকা নানান পদের কর্মকর্তারাও কাজে ব্যস্ত থাকেন ঈদের দিনে। হাজার হাজার মাইল দূর পরবাসে আত্মীয়-স্বজনদের ছেড়ে এক শ্রেণীর মানুষেরা ঈদ কাটায় প্রবাসী হয়ে।

তবুও আনন্দের বিষয় ঈদ ঈদই। সবার জন্যই কল্যাণকর ও আনন্দের।

সাহিত্য, কাব্য, সঙ্গীত আর শিল্প নিয়ে কেতন শেখ-এর স্বপ্নময় জীবন। ২০১৩ থেকে জাগৃতি প্রকাশনীর সাথে নিয়মিত লিখছেন। কাজল, নীল গাড়ি ও সাদা স্বপ্ন, এক-দুই-আড়াই, অধরা অনুরাগ ও অভিসরণ আলোচিত উপন্যাস। এ ছাড়াও লিখেছেন অন্তঃস্রোত (গল্পগ্রন্হ) ও চতুষ্পথ (কাব্যগ্রন্হ)। বাংলা কবিতা, বাঙালিয়ানা ম্যাগাজিন, প্রিয়.কম সাহিত্য পত্রিকা, আলফি পত্রিকা, নক্ষত্র ও অন্যান্য ব্লগে ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।

জন্ম ঢাকায়। ভ্রমণ শৌখিন। পৃথিবীকে দেখার স্বপ্ন নিয়ে ভ্রমণ করেছেন ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, চীন, কোরিয়া ও অন্যান্য দেশে। পেশায় অর্থনীতিবিদ। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ সাউদাম্পটন থেকে অর্থনীতিতে পি এইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টমিন্স্টারে অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। লেখালেখির মতো সঙ্গীতও তাঁর অন্যতম প্রিয় শখ। তাই মাঝে মাঝে অবসরে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত রেকর্ডিং স্টুডিও এপসিলনে নীল বাতি জ্বালিয়ে সুর সৃষ্টি করেন।

ব্যক্তিজীবনে আড্ডাপ্রিয় ও বন্ধুপরায়ণ। স্ত্রী ও দুই পুত্রকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের এইল্সবারীতে।

Comments

comments