দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দিদশা থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ছিটমহল বিনিময়

0
131
ছিটমহল
Print Friendly, PDF & Email

১৯৪৭ সালে বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমারেখা টানার পরিকল্পনা করেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল রেডক্লিফকে প্রধান করে সে বছরই গঠন করা হয় সীমানা নির্ধারণের কমিশন। ১৯৪৭ সালের ৮ জুলাই লন্ডন থেকে ভারতে আসেন রেডক্লিফ। মাত্র ছয় সপ্তাহের মাথায় ১৩ আগস্ট তিনি সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন। এর তিন দিন পর ১৬ আগস্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় সীমানার মানচিত্র। ১৯৪৭ সালে রেডক্লিফের মানচিত্র বিভাজন থেকেই উদ্ভব ছিটমহলের।

ভারতের প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি অনুসমর্থনের দলিল হস্তান্তরের পর বেগবান হয় ছিটমহল বিনিময় কর্মসুচি। এরপরপরই দুই দেশের ছিটমহলে আনুষ্ঠানিকভাবে চালানো হয় জরিপ। গত ৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ জনগণনা জরিপ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে ১৬ জুলাই।

পৃথিবীতে শেষবার কোনও আন্তর্জাতিক মানচিত্র নতুন করে আঁকা হয়েছিল, যখন চার বছর আগে সুদান ভেঙে তৈরি হয়েছিল নতুন দেশ দক্ষিণ সুদান। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে এই নতুন সীমান্ত আঁকাটাই হবে এরপরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে  একটা নতুন ইতিহাস ও নতুন মানচিত্রে সিলমোহর দিয়েছেন দুদেশের প্রধান মন্ত্রী।

ছিটমহল বিনিময়ের দিনকে বিশেষভাবে পালনের জন্যে চূড়ান্ত প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছে বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি ও ছিটমহলবাসী। কিন্তু কী হবে সেই দিনের বিশেষত্ব? ১৯৪৭ সালে থেকে শুরু করে ২০১৫ পযন্ত দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দিদশা থেকে ১ আগস্ট মুক্তি মিলছে বাংলাদেশ ও ভারতের ১৬২ ছিটমহলের অধিবাসীদের। এদিন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে ছিটমহল বিনিময়।

এ দিনকে সামনে রেখে উৎসবের আমেজের শেষ নেই দুই দেশের ছিটমহলবাসীদের মধ্যে। এদিন ৬৮ বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্তির স্মারক হিসেবে ৩১ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা ০১ মিনিটে প্রজ্জ্বলন করা হবে ৬৮টি মোমবাতি। পরের দিন ১ আগস্ট বাংলাদেশ অংশের ছিটমহলগুলোর প্রতিটি বাড়িতে উড়বে জাতীয় পতাকা। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে মঞ্চ করে দিনব্যাপি চলবে নানা অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা। থাকবে জারি গান, সারি গান, নাটক।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সভাপতি মঈনুল হক বলেন, ‘ছিটমহল বিনিময়কে কেন্দ্র করে ছিটমহলবাসীর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তাই বিশেষ অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হচ্ছে।’ ছিটমহলবাসীদের জন্য বহু প্রতীক্ষিত এই সময়টি এনে দেয়ার জন্য সরকারকেও ধন্যবাদ জানান মইনুল হক।

তিনি জানান, অতিথি হিসেবে এসব অনুষ্ঠানে বাইরের কেউ থাকছেন না। ছিটমহল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসা মানুষেরাই অতিথি থাকবেন এসব অনুষ্ঠানের।

এদিকে গত শুক্রবার গভীর রাতে ঢাকার একটি হোটেলে শেষ হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ সীমান্ত কার্যকরী কমিটির বৈঠক। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছিটমহলগুলোর জনগণনা জরিপ থেকে কেউ বাদ পড়ে থাকলে তারা আপাতত ‘ছিটমহল হস্তান্তরের পর কোন দেশের নাগরিক হতে চান’ তার ‘অপশন’ দেবার আর কোনো সুযোগ পাবেন না। নতুন করে জনগণনাও আপাতত আর হবে না।

৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ জনগণনা জরিপ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে ১৬ জুলাই। দশ দিনের জরিপ শেষে গত সোমবার লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর সংলগ্ন ভারতের কুচবিহার জেলার চ্যাংড়াবান্ধায় বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ জরিপ কর্মসূচির সরকারি পর্যায়ে এক সমন্বয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

গত  শুক্রবারের এই বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় ১১১টি ছিটমহলের ৯৭৯ জন ভারতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অপরদিকে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশি ৫১টি ছিটমহলের কেউ বাংলাদেশে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেনি। ভারতে যেতে আগ্রহী ব্যক্তিগণ আগামী ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ভারতে যেতে পারবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহল রয়েছে, এতে প্রায় ৩৭ হাজার মানুষের বাস করেন। অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের বাসিন্দা ১৪ হাজার। ২০১১ সালে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে শুমারিতে এই তথ্য পাওয়া যায়।

ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের আয়তন মোট ৭ হাজার ১১০ একর। অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহলের আয়তন ১৭ হাজার ১৬০ একর।

ছিটমহল বিনিময় চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল (৭,১১০ একর জমি) ভারতের অংশ হয়ে যাবে। আর ভারতের ১১১টি ছিটমহল (১৭,১৬০ একর জমি) বাংলাদেশের অংশ হয়ে যাবে।

ছিটমহলগুলো বিনিময়ের পর এসব স্থানের অধিবাসীরা স্ব স্ব দেশের নাগরিকত্বসহ ভোটাধিকারের পাশাপাশি সব ধরনের নাগরিক সুবিধা ভোগ করবেন।

আরও জানুন » নাগরিক সুবিধার প্রতীক্ষায় ছিটমহলের মানুষ »

Comments

comments