দাম্পত্যে পলিটিক্যালি কারেক্ট কথোপকথন

0
1355
Print Friendly, PDF & Email

কেতন শেখ

—————————————————

নতুন বছর এসেছে (জৈষ্ঠ্য এসে গেছে), সেই সাথে এসেছে নতুন রেজোলিউশন। যখন আমরা কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করি, আমাদের রেজোলিউশনগুলো এক ধরণের হয় … টাকা জমাবো, আর সিগারেট খাবো না, প্রতিদিন অন্তত দুইঘন্টা পড়াশোনা করবো, এসব। সেই সময়টাতে ‘আমরা’ শুধু ‘আমরাই’থাকি, কাজেই রেজোলিউশনগুলোও আমাদেরকে ঘিরেই থাকে। সংসার পাতার পরে অবধারিতভাবে নিজের পৃথিবী পাল্টে যায়। দাম্পত্যের রেজোলিউশনগুলোতে আমরা কম থাকি, আমাদের সঙ্গীরা ঢুকে যায়। ওর জন্য এটা করবো, ওর জন্য সেটা করবো, ওকে এটা দিবো, ওকে ওখানে নিয়ে যাবো, এসব।

দাম্পত্য তাই একটা বিশাল পরিবর্তন, আর সেই পরিবর্তনের সাথে আমাদের মধ্যেও পরিবর্তন আসে। পৃথিবীর সব বড় দুর্যোগের শুরুটা যেমন কোনো ছোটখাটো ব্যাপার থেকে হয়, দাম্পত্যের দুর্যোগের শুরুটাও তেমনই ছোট ছোট ভুল থেকে শুরু হয়। এরকম একটা ভুল হচ্ছে দাম্পত্যের কথোপকথনের ভুল। প্রেমের বা প্রি-দাম্পত্যের যেসব নির্দোষ কথাবার্তা একসময় আমাদের সুখস্মৃতিতে থাকে, পোস্ট-দাম্পত্যে কিভাবে যেন সেই একই কথাবার্তা মহা অপরাধে পরিণত হয়। প্রি-দাম্পত্যের কথোপকথনে আমরা কোনো কথারই বহুবিধ অর্থ খুঁজি না, সোজা সাপ্টা অর্থটাই বুঝি। একভাবে বলতে গেলে, আমরা সেই অর্থগুলোই গ্রহণ করি যেগুলো অপর পক্ষকে আমাদের আরও কাছে আনে। অথচ পোস্ট-দাম্পত্যে আমরা সেসব কথার সোজা অর্থটা ছেড়ে অন্য সব ত্যাড়া অর্থগুলোই খুঁজে বের করি। কেন আমরা এমন করি সেটা কেউই জানি না।

একটা উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন প্রেমিক-প্রেমিকা গভীর রাতে ফোনে কথা বলছে। প্রেমিকা খুব আহ্লাদ করে বললো, এই, বলো না, আজকের কমলা রঙের ড্রেসটাতে কি আমাকে কালো লাগছিলো ?

– না তো!

– না, কেমন জানি কালো কালো লাগছিলো … তাই না!

– আরে নাহ! কি যে তুমি বলো!

– না তো … সত্যি করে বলো … আমার কেন জানি মনে হয় কালো কালো লাগছিলো …

– না তো বেবী, একদম লাগছিলো না!

এখন ধরুন সেই যুগলের বিয়ে হলো, এবং বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে একই ধরণের একটা কথোপকথন হলো। কোনোদিন মেয়েটা গাঢ় সবুজ রঙের ড্রেস পরে ছেলেটাকে বললো, এই, দেখো তো, এই রঙের ড্রেসটাতে কি আমাকে কালো কালো লাগছে ?

দাম্পত্যে পুরুষরা কিন্চিত ডিফেন্সিভ হয়। স্বভাবগত বা অভাবগত কারণেই হয়। ছেলেটা সাথে সাথে বললো, না তো … কালো লাগছে না।

– মানে ? পরিষ্কার করে বলো।

– মানে … এই রঙটাতে তোমাকে একদম কালো লাগছে না।

– ও, তার মানে আমাকে অন্য রঙে কালো লাগে, তাই না! তোমার এতো বড় সাহস, তুমি মুখের উপরে আমাকে কালো বললে ….. এই কথাও আমার শুনতে হলো ….

আমি হয়তো দাম্পত্যে নারীর জটিলতার উদাহরণ দিয়েছি, আর পুরুষদের ডিফেন্সিভ কৌশলের কথা বলেছি। কিন্তু এর উল্টোটাও আছে। দাম্পত্যে কথোপকথনের ফাকফোকর কিন্তু উভয়পক্ষেই বেশ ভালোমতোই থাকে। প্রকৃতির কোনো একটা অদ্ভূত নিয়মে দাম্পত্যে পুরুষ এবং নারী ভিন্ন দুই ভূমিকায় থাকে। এই ভারসাম্যেই সংসারগুলো টিকে যায়। যেমন, কিছু সংসারে পুরুষের চিন্তাধারা হয় জটিল ও সমালোচনামুখর, আর নারীরটা হয় সরল ও প্রাণবন্ত। এসব সংসারে পুরুষরা সারাক্ষণ এটা সেটা নিয়ে বকবক আর খচখচ করে, আর নারীরা সেসব বকবকানি খচখচানিকে পাত্তাও দেয় না। অন্যান্য সংসারে উল্টো টাইপের সেটিং হয়তো থাকে, তবে নারীরটা পুরুষকে শুনতেই হয়।

সে যাই হোক, সংসার তো সংসারই, কোনো একভাবে চলতে থাকে। এর মধ্যেই ভালোবাসার স্পর্শ থাকে। তাই সংসারপ্রেমী দম্পতিদের নতুন বছরের রেজোলিউশনে একটা আইটেম থাকবেই …. ‘ওকে কিভাবে খুশি রাখবো’, বা ‘আর কি কি করলে ও খুশি থাকবে’ (দাম্পত্যের প্রথম তিন-চার বছর)। সেটা এভাবে না থাকলেও অন্যভাবে থাকে … যেমন ‘ওর সাথে এই যণ্ত্রণার মধ্যে আমি কিভাবে আরও ভালো থাকবো’ (তিন-চার বছর পর)। আমার মাথায় হঠাত আসলো যে কিছু কিছু কথোপকথনের ফাকফোকর বন্ধ করলেই দাম্পত্য জীবনে একজন আরেকজনকে খুশি রাখতে পারবে (অথবা নিজে খুশি থাকতে পারবে)। এর অর্থ হচ্ছে যে সাংসারিক বা দাম্পত্যের কথোপকথনেরও একটা পলিটিক্যাল কারেক্টনেস আছে। আমি আমার ভাবনায় এমন কিছু পলিটিক্যালি কারেক্ট উত্তর খুঁজে পেলাম। এসব কার কতোটা কাজে আসবে জানি না, তবে এই লাইনে উত্তর দিলে কিছু অনাকাঙ্খিত তর্ক, অনভিপ্রেত আচরণ বা অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া থেকে দাম্পত্য রেহাই পাবে। এতে দাম্পত্য আরও অনেক সুখের হবে। অল্পস্বল্প ঝগড়াঝাটি বা খুন্তি কড়াই-এর ঠনঠনানি হোক, কিন্তু দাম্পত্যের কথোপকথনের বুদ্ধিদীপ্ততা স্বামীকে স্ত্রীর প্রতি আর স্ত্রীকে স্বামীর প্রতি আরও আকর্ষিত করতে পারে। এই খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে করতে দাম্পত্য আরও উপভোগ্যও হতে পারে। এটা বিখ্যাত ব্যাটল অফ দা সেক্সেস-এর থিওরির একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আমার মনে আসা সেরা দশ ‘দাম্পত্যের পলিটিক্যালি কারেক্ট উত্তর’-এর একটা তালিকা দিলাম। আমার ধারণা এগুলো মোটামুটি সব লাইনের কথোপকথনকে কাভার করে। সত্যি কথা বলতে কি, দাম্পত্যের পলিটিক্যালি কারেক্ট উত্তরের তালিকার কোনো শেষ নেই। তাই আমি আমার মনে আসা সেরা দশ দিলাম। এর পাঁচটা পুরুষের জন্য, আর পাঁচটা নারীর জন্য।

সবার দাম্পত্য সুখের হোক, রঙীন হোক, আর প্রফুল্ল হোক।

    দাম্পত্যের সেরা দশ পলিটিক্যালি কারেক্ট উত্তর:

১০.      স্ত্রী:       ‘অমুক’ ভাবীকে কালকে রাতের পার্টিতে খুব সুন্দর লাগছিলো, তাই না ?

স্বামী:   ও তাই নাকি! আমি তো খেয়ালই করিনি … আমি তো শুধু তোমাকেই  দেখছিলাম। আর লক্ষ্য রাখছিলাম যে পার্টির আর কোন কোন পুরুষের নজর তোমার দিকে ….

৯.        স্বামী:   আচ্ছা, তোমার ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের মধ্যে যারা তোমার বার্থডে পার্টিতে এসেছিলো, এদের মধ্যে তোমার সবচেয়ে প্রিয় ছেলেবন্ধু কে ছিলো ?

স্ত্রী:       ইউনিভার্সিটি লাইফে আমার আসলে কোনো প্রিয় বন্ধু ছিলো না …. আমি জানতাম পরে কোনো একদিন আমার প্রিয় বন্ধুকে পাবো …

৮.        স্ত্রী:       আচ্ছা শোনো, তোমার মা এই তরকারীটা খুব ভালো রাঁধতেন, তাই না ? তিনি কি এটা আমার চেয়েও ভালো রাঁধতেন ?

স্বামী:   সত্যি কথা বলতে কি, আমার না বিয়ের আগের কোনো কথা একেবারেই মনে নেই ….

৭.        স্বামী:   ভাবছি … আমি যদি দাড়ি রাখি, তাহলে আমাকে দেখতে কেমন লাগবে। তোমার কোনো মতামত ?

স্ত্রী:      দেখো, আমি যখন তোমার কথা ভাবি, তোমার স্পর্শ তোমার লুকস-এর চেয়ে অনেক বেশী ইম্পর্টেন্ট …

৬.        স্ত্রী:       এই প্রথম তুমি আমাকে নাইটি আর অন্তর্বাসের দোকানে নিয়ে এসেছো। কেমন লাগছে … ?

স্বামী:   জানি না …. আসলে, আমি আগে কখনও এসবের দোকানে যাইনি … তোমার সাথেই এই প্রথম আসা ….

৫.        স্বামী:   আচ্ছা শোনো, আমি কি আমার চুলে রঙ দেয়া শুরু করবো ?

স্ত্রী:       আরে না …. এখন বরং তুমি তোমার ইয়াং লুকটাকে একটা ম্যাচিউর্ড ছাপ দাও …

৪.        স্ত্রী:       শোনো …. আমরা কি ইন্টারনেটে একটা প্যারেন্টাল লক দিবো … বাচ্চারা ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, কোন সময় কোন এডাল্ট সাইটে ঢুকে যায় ….

স্বামী:   বাংলাদেশে ইন্টারনেটে এডাল্ট সাইট আছে নাকি … আশ্চর্য, আমি জানতাম না তো!

৩.        স্বামী:   এই … তুমি কি আমার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছো ?

স্ত্রী:       আরে না না … কি যে বলো … আসলে কি, আজকাল আমার মনটা যেন অন্য কি কি চিন্তা করছে ….

২.        স্ত্রী:       এই, ক্যাটরিনা কাইফকে দেখলে তোমার চোখের পলক পড়ে না কেন ?

স্বামী:   ওকে দেখলে আমার তোমার কথা মনে হয়। যখন তুমি ওর বয়সী ছিলে, ঠিক এমন ছিলে …

১.        স্বামী:   গতকাল পার্টিতে তুমি অনেকক্ষণ ধরে মিস্টার ‘তমুকের’ সাথে হেসে হেসে কথা বলছিলে … কি নিয়ে এতো কথা বলছিলে তোমরা ?

            স্ত্রী:       ওহ … আর বোলো না …. উনি তোমার খুউব প্রশংসা করছিলেন … আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম।

আরও জানুন » হাত বাড়ালেই বন্ধু »

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো তা আমাদেরকে অবশ্যই জানাবেন। আপনার মতামত আমাদের কাছে খুবই মূল্যবান। আপনি যদি আপনার নিজের লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ বা অন্য যেকোনো বিষয় বাঙালিয়ানা Magazine এ প্রকাশ করতে চান, তবে আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে আপনার লেখা প্রকাশে সচেষ্ট হব । আগ্রহীদের এই ইমেইল ঠিকানায় bangalianamagazine@gmail.com যোগাযোগের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হল । Copy করা কোন লেখা পাঠাবেন না। দয়া করে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আপনার পাঠানো লেখাটি অনলাইনে আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। যদি অনলাইনে আগে অন্য কোথাও আপনার লেখাটি প্রকাশিত হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সেটা প্রকাশ করতে পারব না। আমরা অরাজনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক এবং নিরপেক্ষ।
বিঃ দ্রঃ লেখাটি কোনরকম পরিমার্জন ব্যতিরেকে সম্পুর্ণ লেখকের ভাষায় প্রকাশিত হল। লেখকের মতামত, চরিত্র এবং শব্দ-চয়ন সম্পুর্ণই লেখকের নিজস্ব । বাঙালিয়ানা Magazine প্রকাশিত কোন লেখা, ছবি, মন্তব্যের দায়দায়িত্ব বাঙালিয়ানা Magazine কর্তৃপক্ষ বহন করবে না।

সাহিত্য, কাব্য, সঙ্গীত আর শিল্প নিয়ে কেতন শেখ-এর স্বপ্নময় জীবন। ২০১৩ থেকে জাগৃতি প্রকাশনীর সাথে নিয়মিত লিখছেন। কাজল, নীল গাড়ি ও সাদা স্বপ্ন, এক-দুই-আড়াই, অধরা অনুরাগ ও অভিসরণ আলোচিত উপন্যাস। এ ছাড়াও লিখেছেন অন্তঃস্রোত (গল্পগ্রন্হ) ও চতুষ্পথ (কাব্যগ্রন্হ)। বাংলা কবিতা, বাঙালিয়ানা ম্যাগাজিন, প্রিয়.কম সাহিত্য পত্রিকা, আলফি পত্রিকা, নক্ষত্র ও অন্যান্য ব্লগে ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।

জন্ম ঢাকায়। ভ্রমণ শৌখিন। পৃথিবীকে দেখার স্বপ্ন নিয়ে ভ্রমণ করেছেন ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, চীন, কোরিয়া ও অন্যান্য দেশে। পেশায় অর্থনীতিবিদ। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ সাউদাম্পটন থেকে অর্থনীতিতে পি এইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টমিন্স্টারে অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। লেখালেখির মতো সঙ্গীতও তাঁর অন্যতম প্রিয় শখ। তাই মাঝে মাঝে অবসরে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত রেকর্ডিং স্টুডিও এপসিলনে নীল বাতি জ্বালিয়ে সুর সৃষ্টি করেন।

ব্যক্তিজীবনে আড্ডাপ্রিয় ও বন্ধুপরায়ণ। স্ত্রী ও দুই পুত্রকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের এইল্সবারীতে।

Comments

comments