ডাইনীর চোখে জল

0
660
ডাইনীর চোখে জল
Print Friendly, PDF & Email

ডাইনীর চোখে জল

– আবুল ফাতাহ মুন্না

এক

সামনে বসা লোকটাকে পর্যবেক্ষণ করছে তারেক ফয়সাল। লোকটা ধনী তা বুঝতে শার্লক হোমস হবার দরকার নেই কিন্তু তারেক এমন এক জিনিস লক্ষ্য করছে যা বোঝার সাধ্য স্বয়ং শার্লক হোমসেরও নেই। হোমসের কালচারে এই জিনিসের অস্তিত্বই নেই। লোকটার হাত মেহেদী রাঙানো। পরিণত বয়সের একজন পুরুষের হাতে মেহেদী মানেই সে সদ্য বিবাহিত। এ ছাড়াও তার বাঁ হাতে ঝকঝকে নতুন আঙটি। ওটাও নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে বিয়ের। 
লোকটার নাম অনুপ হায়দার। গতরাতে ফোন করে তারেকের এপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে সে। 
সাইকোলজিতে এম. এ. করেছে তারেক। বেশ কিছু জটিল রহস্যের সমাধান করায় নাম-ডাকও হয়েছে বেশ। পৈত্রিক সূত্রে পেয়েছে বিপুল সম্পত্তি,তাই চাকরি-বাকরির দিকে না গিয়ে গোয়েন্দাগিরির শখটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়ায় অনেক কেসও আসছে। তারেক আজকাল ভাবছে: গোয়েন্দাগিরিকে পেশা হিসেবে নিলে মন্দ হয় না। 
তবে তিনটি কারণে ওকে এখনও বলা যায় শখের গোয়েন্দা। 
প্রথমত, সব কেস ও নেয় না, যেগুলোকে ওর কাছে অসাধারণ কিছু মনে হয়, বেছে বেছে সেগুলোই শুধু নেয়। 
দ্বিতীয়ত, কেস সলভ হবার আগে কোনও পারিশ্রমিক নেয় না তারেক। 
এবং তৃতীয়ত, ধরা-বাঁধা কোনও পারিশ্রমিক নেই ওর। কেউ না দিলেও সই। 
গতরাতে যখন অনুপ হায়দার ফোন করল, তেমন আগ্রহ দেখায়নি ও। প্রতিদিনই এধরনের অনেক কল আসে ওর কাছে। কিন্তু ফোনের অপরপ্রান্তের মানুষটা যখন মরিয়া হয়ে জানাল, এটা তার জীবন-মরণ সমস্যা, তখন এক রকম বাধ্য হয়েই আজ আসতে বলে। 
মাত্র কিছুক্ষণ আগে ওর স্টাডিরুমে এসে ঢুকেছে অনুপ। কুশল বিনিময়ের পর দু’জনেই চুপ হয়ে গেছে। এই ফাঁকে তারেক তাকে খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছে। 
বয়স ত্রিশ হবে না, সম্ভবত আটাশ, সুদর্শন। সাধারণ পোশাক পরলেও তাতেই লোকটার আভিজাত্য প্রকাশ পাচ্ছে। 
‘সমস্যাটা সম্ভবত আপনার স্ত্রীকে নিয়ে, তাই না?’ লোকটাকে চমকে দেবার লোভ সামলাতে পারল না তারেক। ওর উদ্দেশ্য সফল। এতক্ষণ তারেকের স্টাডি রুমের বিশাল বইয়ের কালেকশন দেখছিল ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, অধিকাংশই সাইকোলজির উপর। তারেকের প্রশ্নটা যেন ধাক্কা দিয়ে গেল তাকে। ‘আপনি কীভাবে জানলেন?’ নগ্ন বিস্ময় তার কন্ঠে। 
বেশিরভাগ গোয়েন্দার মত তারেকও নাটকীয়তা পছন্দ করে। সাথে সাথে জবাব না দিয়ে সুইভ্যেল চেয়ারে হেলান দিল, ঠোঁটে রহস্যময় হাসি। অনুপের বিস্ময়ে চরমে পৌঁছবার পর বলল, ‘আপনার হাতের মেহেদী আর আঙটি, মাত্রই বিয়ে করেছেন। সম্ভবত এক সপ্তাহও হয়নি। বিয়ের এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই গোয়েন্দার কাছে ছোটাছুটি সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী’র সমস্যাকেই প্রকাশ করে না? আমি অবশ্য অনুমান করেছি, নিশ্চিত নই।’ 
সমস্যাটা কীভাবে বলব, বুঝতে পারছি না।’ ইতস্ততভাব অনুপের মধ্যে। 
‘শুরু থেকে বলুন, একেবারে ছোটবেলা থেকে।’ 
‘আমার সমস্যার সাথে আমার আমার জীবনবৃত্তান্তের কোনও সম্পর্ক নেই।’ 
‘তবুও বলুন,ছোট অনেক বিষয়ই বড় অনেক রহস্যের জট খুলতে সাহায্য করে। আপনার কাছে যেটা গুরুত্বহীন, আমার কাছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।’ 
‘হুম, নামটা তো আগেই বলেছি,’ শুরু করল অনুপ হায়দার, ‘আমার বাবা নামকরা গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ছিলেন। আমাদের বাড়ি সাভারে, বাবাই বানিয়েছিলেন বাড়িটা। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান আমি। আমার দু’বছর বয়সে মারা যান মা। এরপর বাবা আরেকটি বিয়ে করলেও সেটা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এক বছরের মাথায় আমার নতুন মা’র সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় বাবার। নিজের মায়ের মত সৎ মায়ের স্মৃতিও ঝাপসা আমার কাছে। এরপর আর বাবা বিয়ে থা করেননি। আমি পড়াশোনায় বেশ ভাল ছিলাম। পড়াশোনা শেষ করে দু’বছর হল বাবার ব্যবসার হাল ধরি।’ একটানা বলে থামল অনুপ কিছুক্ষণের জন্য। ‘গতবছর আমার বাবা মারা যান…’ শেষ বাক্যের পর আবার কিছুক্ষণের বিরতি। 
বাবার সঙ্গে বোধহয় অনুপের সম্পর্ক বেশ ভাল ছিল, বাংলাদেশে যেটা বিরল, ধারণা করল তারেক। 
‘বাবা মারা যাবার পরও আমি ব্যবসাটা ভালমতই সামলে নিতে লাগলাম। কিছুদিন আগে সিদ্ধান্ত নেই, বিয়ে করব। ঘটকের মাধ্যমে মেয়ে দেখা চলল। চার-পাঁচটা মেয়ে দেখার পরই একজনকে পছন্দ হয়ে গেল। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে লাবণ্য। গত ছয়দিন আগে আমাদের বিয়ে হয়, কিন্তু…’ বলতে বলতে দীর্ঘশ্বাস বেরুল অনুপের বুকের গভীর থেকে। ‘…কিন্তু বিয়েটা আমার জীবনে অভিশাপ হয়ে এল, এমনই অভিশাপ, যার জন্য বিয়ের এক সপ্তাহের মাথায় আপনার কাছে ছুটে আসতে হল।’ 
‘আপনার স্ত্রী’র সমস্যাটা কী?’ 
‘ও একজন ডাইনী, রূপক অর্থে নয়, ও সত্যিকারের ডাইনী।’ 
‘আপনি নিশ্চয়ই জানেন, কী বলছেন আপনি?’ এতক্ষণে কেসটার প্রতি কিছুটা আগ্রহ তৈরি হল তারেকের। 
‘হ্যাঁ, লাবণ্য একজন ডাইনী,’ একই রকম একঘেয়ে গলায় বলল অনুপ। 
‘ঠিক কী দেখে আপনার মনে হল, আপনার স্ত্রী একজন ডাইনী?’ 
‘ব্যাপারটা বিয়ের প্রথম রাতেই টের পাই,’ শুরু করল অনুপ, ‘আগত মেহমানদের বিদায় করতে করতে অনেক রাত হয়ে যায়। যেহেতু আমার কোনো অভিভাবক নেই সেহেতু সমস্ত ঝামেলা আমাকেই পোহাতে হয়। তো সবাইকে বিদায় দিয়ে বাসর ঘরে ঢুকি, দেখি মাথা নিচু করে বসে আছে লাবণ্য। আমি পাশে বসতেই মুখ তুলে তাকাল আমার দিকে, ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার জগৎ-সংসার ওলট পালট হয়ে গেল। চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী ক্রমেই একজন ডাইনীতে পরিণত হচ্ছে। 
চোখদুটো ধক করে জ্বলে উঠল লাবণ্যর। কুচকে যেতে লাগল গায়ের চামড়া। নিজের অজান্তেই প্রচন্ড এক চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। 
জ্ঞান ফেরার পর দেখি আত্মীয়স্বজনরা ঘিরে রেখেছে আমাকে। আমার শাশুড়ি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে তোমার, বাবা?’ 
আমি কী করে বলি, আপনার মেয়ে এক সাক্ষাৎ ডাইনী? বললাম, ‘ও কিছু না, সারাদিনের ধকলে মাথা ঘুরে উঠেছিল।’ 
কিছুক্ষণ বাদেই সবাই রুম ছেড়ে চলে গেল। সাথে সাথেই ভয়টা আরও জেঁকে ধরল আমাকে। একটা ডাইনীর পাশে সারারাত কাটাতে হবে ভাবলেই গা হিম হয়ে আসছিল। ছোটবেলা থেকেই যথেষ্ট সাহসী আমি তবুও সে রাতের পুরোটাই আমার কাটল দুঃস্বপ্ন দেখে। ঘুম হল ছাড়া ছাড়া। 
পরের রাতটা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল আরও বিভীষিকা নিয়ে। বিয়ের পরদিন আত্মীয়স্বজনরা বিদায় নিতেই বাড়ি খালি হয়ে গেল। সারাদিন কোনওমতে কাটিয়ে দিলাম। সন্ধ্যার পর থেকেই ফিরে আসতে লাগল গতরাতের হিমভাবটা। সারাদিন লাবণ্যর সাথে কাটালেও একবারের জন্যই মুখ তুলে ওর দিকে তাকাবার সাহস অর্জন করে উঠতে পারিনি। 
রাতের খাবারের পর বড় অসহায় মনে হল নিজেকে। সারারাত কাটাতে হবে এই মেয়ের সাথে! তবু কিছু করার তো নেই। খাওয়া দাওয়া শেষে একরকম বাধ্য হয়েই নিজের রুমে গেলাম। লাবণ্য কয়েকবার আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলেও হুঁ-হা করে পাশ কাটিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর লাইট নিভিয়ে করে লাবণ্য শুয়ে পড়ল আমার পাশে। ঘুমাবার অনেক চেষ্টা করলাম, পারলাম না। পাশে জান্তব বিভীষিকা নিয়ে ঘুমানো সম্ভব? তবুও নিশ্চল পড়ে রইলাম। 
ঘন্টাখানেক পরে দেখলাম আস্তে আস্তে বিছানা ছাড়ছে লাবণ্য। ভাবলাম বাথরুম-টাথরুমে যাবে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, রুমের দরজা খুলছে। ও বেরিয়ে যাবার পর দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখি লাবণ্য আস্তে আস্তে ছাদে ওঠার সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছে। বাকিটুকু দেখার আর সাহস হল না। নিশ্চয়ই ছাদে গিয়ে প্রেতসাধনা করবে ডাইনীটা। এরপর থেকে আমার গোটা জীবনটাই পরিণত হল দুঃস্বপ্নে। 
লাবণ্যকে ডিভোর্সও দিতে পারছি না। কোর্টে গিয়ে কী বলব, আমার স্ত্রী একজন ডাইনী?’ 
এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল তারেক, অনুপ থামতে প্রশ্ন করল, ‘এতটা নিশ্চিত হয়ে কীভাবে বলছেন? আপনার ভুলও তো হতে পারে, তাই না?’ 
‘আমি একা দেখলে সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু গত পরশু রহিম চাচাও দেখেছে।’ 
‘রহিম চাচা কে?’ 
‘আমাদের ম্যানেজার। বাবার আমল থেকে আছে, খুবই বিশ্বস্ত। তিনিও নাকি গত পরশু লাবণ্যকে ডাইনীর রূপ ধরে ছাদে যেতে দেখেছেন।’ 
‘তখন আপনার স্ত্রী’র চেহারা কি স্বাভাবিক ছিল?’ 
‘না, বললাম না, ডাইনীর চেহারা ধারণ করেছিল।’ 
‘আপনি রহিম চাচাকে জানিয়েছিলেন আপনার সন্দেহের কথা?’ 
‘হ্যাঁ, বিয়ের পরদিনই সব খুলে বলি। তিনিই তো আপনার ঠিকানা দিয়ে আমাকে আসতে বলেছেন।’ 
‘সবই তো শুনলাম, এখন বলুন, আপনি আমার কাছে ঠিক কী ধরনের সাহায্য চাইছেন? 
”আমি আর এভাবে থাকতে পারছি না। আপনি আমার সাথে আমার বাড়ি যাবেন এবং নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে দিয়ে আসবেন লাবণ্য স্বাভাবিক কি না। যদি ওর মধ্যে আসলেও অস্বাভাবিক কিছু থাকে তবে যেভাবেই হোক, ডিভোর্স দেব ওকে।’ 
তারেকের কাছে এর আগে এমন আধিভৌতিক টাইপ কেস আসেনি। এ কেসটা হাতছাড়া করবার প্রশ্নই ওঠে না। 
‘কবে যেতে হবে আপনার বাড়িতে?’ 
‘আপনি রাজি থাকলে এখনই। আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি, সমস্যা হবে না?’ 
‘আমি রাজি।’ 
অনুপ হায়দারের বুক থেকে যেন বিশাল এক পাথর নেমে গেল। 
‘আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাব, মি. তারেক। কিছু মনে করবেন না, আপনার পারিশ্রমিক…?’ 
‘পরিশ্রমই করলাম না, এখনই কিসের পারিশ্রমিক?’ 
‘না মানে… অ্যাডভান্স?’ 
‘আমি কোনও অ্যাডভান্স নিই না। আপনি বসুন, আমি তৈরি হয়ে আসছি।’

দুই

ঘন্টাখানেক পর তারেকের বাড়ির গাড়ি-বারান্দা থেকে বেরিয়ে এল ঝকঝকে একটা প্রিমিও।

তারেকের মা অনুপকে কিছুতেই না খাইয়ে ছাড়লেন না। ছেলেটার গোটা অস্তিত্ব জুড়ে যে বিষাদ প্রকট হয়ে আছে সেটা নজর এড়ায়নি তাঁর। নিজের সন্তানের মতই যত্ন করে খাইয়েছেন অনুপকে। অনুপকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল চোখে জমে ওঠা জল আড়াল করতে। 
অনুপ নিজেই ড্রাইভ করে এসেছিল তারেকের বাসায়, এখনও সেই-ই চালাচ্ছে গাড়ি। সিডি প্লেয়ার থেকে পুরনো দিনের একটা গান মৃদুলয়ে ভেসে আসছে। 
‘ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁয়ো না।’ 
আকাশ মেঘলা, বৃষ্টি নামলে পূর্ণতা পেতে পারত গানটা। 
গাড়িতে তেমন কথা হল না দু’জনের মধ্যে। অপ্রয়োজনীয় দু’একটা কথা শুধু। ঘন্টাদেড়েক পর সাভার বাজারে পৌঁছল ওরা। ওখান থেকে ডানে মোড় নিল গাড়িটা। দশ মিনিট চলার পর একটা বিশাল দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল গাড়ি। বাড়িটা ডুপ্লেক্স, বাড়ির মালিকের রুচির সাক্ষ্য দিচ্ছে। যদিও বেশ পুরনো এরপরও আধুনিক অনেক বাড়ির সাথেই পাল্লা দিতে পারবে। 
গাড়ি থেকে নামল তারেক। বাড়ির মূল দরজার দিকে এগোল অনুপের পিছু পিছু। তারেক আগেই জেনেছে এ বাড়িতে অনুপ, লাবণ্য আর রহিম চাচা ছাড়াও একজন রাঁধুনি, পরিচারক আর ড্রাইভার থাকে। মাঝে মধ্যে অনুপের আত্মীয় স্বজন এলে ভিন্ন কথা। গেস্ট এলে নিচতলার গেস্ট রুমে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। দোতলাতেও কয়েকটা বাড়তি রুম থাকলেও বিশেষ কারণ ছাড়া অতিথিরা নিচতলাতেই থাকে। দোতলায় এখন শুধু অনুপ আর লাবণ্যই থাকে। 
কলিংবেল টিপতে একজন সৌম্য চেহারার ভদ্রলোক দরজা খুলে দিলেন। মুখে মেহেদী রাঙানো চাপদাড়ি। নিশ্চয়ই রহিম চাচা। 
আগেই কথা হয়েছে, অনুপ আর রহিম চাচা ছাড়া আর কেউ তারেকের আসল পরিচয় জানবে না। ও অনুপের বন্ধু, কয়েকদিন থাকবে, ব্যস। 
খাওয়া-দাওয়ার পাট আগেই চুকেছে, রহিম চাচার সাথে কুশল বিনিময় সেরেই দোতলায় চলে এল তারেক। ওর থাকার ব্যবস্থা দোতলাতেই হয়েছে। 
অনুপ একবার নিজের রুমে উঁকি দিয়ে বলল, ‘লাবণ্য তো ঘুমাচ্ছে, তুমিও না হয় খানিক বিশ্রাম নাও, বিকেলে পরিচয় করিয়ে দেব। এসো, রুম দেখিয়ে দিচ্ছি।’ 
সম্মতি জানিয়ে অনুপের পিছু নিয়ে পাশের রুমের দরজার এসে দাঁড়াল তারেক। ওদের সম্পর্ক ইতোমধ্যেই আপনি থেকে ‘তুমি’-তে নেমে এসেছে। এমনিতেও অবশ্য তুমি করেই বলতে হত, যেহেতু তারেকের বর্তমান পরিচয়-ওরা পরস্পরের বন্ধু। 
অনুপ দরজা খুলে দিলে ভেতরে ঢুকে পড়ল তারেক। গোছানো রুম। অনুপের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘তুমিও খানিক রেস্ট নাও।’ 
‘আমার আবার বিশ্রাম!’ তিক্ত স্বরে বলল অনুপ। মুখেও তিক্ত হাসি ঝুলে রইল একটা কয়েক মুহূর্তের জন্য।’দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে। বাই দ্য ওয়ে, তোমার স্ত্রীর অনিদ্রা রোগ আছে নাকি?’ 
‘আরে নাহ! বড্ড ঘুমকাতুরে মেয়ে লাবণ্য। রাতেরবেলা প্রেত সাধনা করে এসে লম্বা ঘুম দেয়, আবার দুপুরে খাবার পরও কিছুক্ষণ ঘুমায়।’ 
‘হুম,’ গম্ভীর হয়ে গেল তারেক। 
‘আচ্ছা, আমি আসি, বিকেলে দেখা হবে।’ চলে গেল অনুপ। 
অনুপ বিদায় নিতেই তারেক খাটে বসে ওর ব্যাগ খুলল। সপ্তাহখানেক চলার মত সব কিছুই নিয়ে এসেছে। কতদিন থাকতে হয় কে জানে! 
ব্যাগ থেকে একটা ছোট নীল রঙের নোটবুক বের করল তারেক। প্রতিটা কেসের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো লিখে রাখে ও এটায়। প্রথম কয়েকটা পাতা উল্টে একটা সাদা পাতায় চলে এল। পৃষ্ঠার উপর শিরোনাম করল: ডাইনী। নিচে কয়েকটা প্রশ্ন লিখল। 

১) লাবণ্য কি সত্যিই ডাইনী? 
২) না হলে অনুপ কেন ভাবছে? হ্যালুসিনেশন? 
৩) রহিম চাচাই বা কেন ভাবছে? হ্যালুসিনেশন? 
৪) নববধূর ব্যাপারে দু’জন মানুষের হ্যালুসিনেশন কতটা যৌক্তিক? 
৫) ইনসমনিয়া না থাকা সত্বেও লাবণ্য প্রতি রাতে কেন ছাদে যায়? প্রেতসাধনা (!) 

এই পাঁচটা প্রশ্নের উত্তর জানতে পারলেই রহস্য সমাধান হয়ে যায়। প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবতে বসল তারেক।প্রথম প্রশ্ন: লাবণ্য কি সত্যিই ডাইনী? 
এটা সবচাইতে জটিল প্রশ্ন। উত্তরটা জানা থাকলে আজ ওকে এখানে থাকতে হয় না। 
দ্বিতীয় প্রশ্ন: মেয়েটা ডাইনী না হলে অনুপ কেন ভাবছে? 
হতে পারে মেয়েটা আসলেই ডাইনী! আর না হলে তবে কি হ্যালুসিনেশন? 
হ্যালুসিনেশন হবার পেছনে দুটো কারণ দেখতে পাচ্ছে তারেক এই মুহূর্তে। প্রথমত: অনুপ মুখে বললেও মেয়েটা আসলে অত সুন্দরী না, যা অনুপের অবচেতন মন মেনে নিতে পারছে না। ফলে উল্টোপাল্টা দেখছে অনুপ। 
দ্বিতীয়ত: অনুপ ফিজিকালি অক্ষম যার ফলে এসব ছুতোনাতা বানাচ্ছে। দুটোর একটাও গ্রহণযোগ্য যুক্তি নয়। 
প্রশ্ন তিন: রহিম চাচা কেন লাবণ্যকে ডাইনী ভাবছে? ভাবছে কারণ তিনি লাবণ্যকে ডাইনীরূপে দেখেছেন। আসল প্রশ্নটা হল, তিনি কেন এটা দেখবেন? তাঁকে যতটুকু তারেক দেখেছে, মিথ্যা বলার মানুষ মনে হয়নি। তাহলে কি তাঁরটাও হ্যালুসিনেশন? 
রহিম চাচার হ্যালুসিনেশন হবার কারণটা দুর্বোধ্য তারেকের কাছে। 
চতুর্থ প্রশ্ন: দু দু’জন মানুষ বাড়ির নববধূর ব্যাপারে এমন উদ্ভট এবং অবাস্তব ধারণা কেন করবে? একটা ভিত্তি তো থাকা চাই। লাবণ্যকে ডিভোর্স দিতে চাইলে অনেক যৌক্তিক কারণ বের করা সম্ভব। এমন উদ্ভট কারণ কেউই বেছে নেবে না। 
প্রশ্নগুলো জট পাকিয়ে যাচ্ছে তারেকের মাথার ভেতর। পাঁচ নাম্বার প্রশ্ন নিয়ে ভাবার আগেই ঘুমের গভীরে তলিয়ে গেল তারেক ফয়সাল।

তিন

দরজার কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙল তারেকের। ঘড়ি তখন জানাচ্ছে সময়টা সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। আড়মোড়া ভেঙে দরজার দিকে এগোল তারেক।

‘ঘুম ভালই হয়েছে দেখছি।’ দরজার ওপাশে হাসি হাসি মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনুপ। 
‘হুউউউম,’ হাই তুলে গভীর ঘুমের ব্যাপারটা নিশ্চিত করল তারেক। ‘তুমি কী করলে?’ 
‘আমি আর কী করব? আমার লাইব্রেরিতে বসে বসে বই পড়লাম। ঠিক করেছি আজ রাত থেকে লাইব্রেরিতেই ঘুমাব। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলব বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছি। ভাল বুদ্ধি না?’ 
‘কম খারাপ না।’ 
‘তারমানে বেশি খারাপ?’ হো হো করে হেসে উঠল অনুপ। 
হাসিটুকু ভাল লাগল তারেকের। সকালের সেই অসহায়ভাবটা এখন আর নেই। সম্ভবত ভরসা করতে শুরু করেছে ওর উপর। 
‘চলো, নিচে লাবণ্য চা নিয়ে অপেক্ষা করছে।’ 
‘তুমি যাও, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।’ 
‘তাড়াতাড়ি এসো।’ 
‘কেন, একা একা ভয় করবে ডাইনী বউয়ের সাথে থাকতে?’ 
আবারও হেসে ফেলল অনুপ। চলে গেল। 
তারেক ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল রুম থেকে। দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে চোখ চলে গেল টি-টেবিলের দিকে। ধাক্কামত খেল তারেক। টেবিলে বসে আছে লাবণ্য আর অনুপ। এতদূর থেকেও ওদের সম্পর্কের শীতলতা অনুভব করতে পারল তারেক। তবে ধাক্কা খেয়েছে অন্য কারণে। মেয়েটা চরিত্রে ডাইনী কিনা তারেক জানে না, তবে রূপে যে অপ্সরা তাতে একবিন্দু সন্দেহ নেই ওর।এত সুন্দর একটা মেয়ের মধ্যে অশুভ কিছু কীভাবে বাসা বাঁধে? কীভাবে ডাইনী হয় এই মেয়ে? 
চোখ ফেরাল তারেক। নেহাতই অন্যের বউ, নইলে এত সহজে পারত কিনা সন্দেহ আছে! 
তারেক গিয়ে টেবিলের সামনে দাঁড়াল। অনুপ পরিচয় করিয়ে দিল ওদের, ‘লাবণ্য, এ হল তারেক, আমার স্কুলজীবনের বন্ধু। অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না। আর তারেক, ওর পরিচয় তো জানোই, ও লাবণ্য।’ অনুপের কন্ঠস্বর কেমন আড়ষ্ট শোনাল শেষের দিকে। 
‘কেমন আছেন?’ নিচু স্বরে সালাম দিয়ে বলল লাবণ্য। 
‘ভাল, আপনি?’ জবাব দিয়ে প্রশ্ন করল তারেক। 
‘ভাল,’ ছোট করে বলল লাবণ্য। 
তারেক লক্ষ্য করল স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও লাবণ্যর মধ্যে ওর প্রতি চাপা বিদ্বেষ চাপা থাকছে না। স্বামীর বন্ধুর প্রতি লাবণ্যর রাগের উৎসটা ধরতে পারল না তারেক। নাকি প্রেতসাধনা করে ওর পরিচয় জেনে ফেলেছে! সর্বনাশ! 
চায়ের আসরটা একদমই জমল না। কথাও না। টেবিলে উপস্থিত তিনজনের সম্পর্ক ঠিক স্বাভাবিক নয়। তারেককে বিশ্বাস করে অনুপ কিন্তু লাবণ্যর প্রতি রয়েছে চরম অবিশ্বাস, যার সাথে মিশে আছে প্রবল ভীতি। 
অনুপের প্রতি লাবণ্যর দৃষ্টিভঙ্গি এ মুহূর্তে পরিষ্কার নয় তারেকের কাছে। তবে ওর প্রতি গোপন আক্রোশ আছে এই মেয়ের। 
বিব্রতকর পরিস্থিতি বুঝতে পারল অনুপ। চা শেষ করেই বলল, ‘তারেক, চলো, এলাকাটা ঘুরিয়ে আনি তোমাকে।”হ্যাঁ, চলো।’ লাবণ্যর দিকে ফিরে বলল, ‘পরে কথা হবে আবার।’ 
বাড়ি থেকে বেরিয়ে তারেক মুখ খুলল। ‘তোমার স্ত্রী বোধহয় আমার আসল পরিচয় জেনে ফেলেছে।’ 
‘জানবেই তো, ডাইনী না?’ 
তারেক আমল দিল না অনুপের কথা। ‘রহিম চাচা বলে দেননি তো?’ 
‘না না, রহিম চাচাকে আমি নিজের চাইতেও বেশি বিশ্বাস করি। তিনি কিছুতেই বলবেন না।’ 
‘হুম,’ মাথা ঝাঁকিয়ে চুপ হয়ে গেল তারেক। 
নীরবে হাঁটতে লাগল দু’জন। এলাকাটা বেশ সুন্দর। না-শহর, না-গ্রাম।হাঁটতে হাঁটতে একটা বিশাল মাঠের কাছে চলে এসেছে ওরা। কিছুক্ষণ পরই সন্ধ্যা ঘনাবে। পৃথিবীটা লাল হয়ে আছে। সন্ধ্যার লালিমাকে ছুঁতে চাইছে রাতের কালিমা। 
বেশ কিছু ছেলে মাঠে জড় হয়ে বসে আছে। খেলা শেষ হলেও মাঠের শীতল বাতাস ছেড়ে যেতে চাইছে না কেউ। কিছুক্ষণ পর পরই শরীর জুড়ানো বাতাসের এক একটা ঝাপ্টা আছড়ে পড়ছে গায়ে। অসাধারণ এক মুহূর্ত। এখন অনুপের পাশে ওর পরিবর্তে লাবণ্যর থাকা উচিৎ ছিল – ভাবল তারেক। 
মাঠের ধারে ঘাসের বুকে বসে পড়ল ওরা। 
‘আজ থেকেই কাজ শুরু করে দেব ভাবছি।’ বলল তারেক। 
‘কীভাবে শুরু করতে চাও?’ 
‘তোমার বাড়ির প্রতিটা বাসিন্দার সাথে কথা বলতে হবে আমার।’ 
‘লাব্যণ্যর সমস্যার সাথে ওদের কী সম্পর্ক? ওরা তো কিছু জানেই না।’ 
‘আছে। কার কথা থেকে কী জানা যাবে, কে বলতে পারে?’ 
‘ওকে, আমি বাসায় পৌঁছে আমি সবাইকে পাঠিয়ে দেব তোমার রুমে।’ 
‘মাথা খারাপ! ও কাজ ভুলেও করতে যেও না। লাবণ্যকে ঘুণাক্ষরেও কিছু বুঝতে দেয়া যাবে না। সময়-সুযোগমত আমি নিজেও সবার সাথে কথা বলে নেব। তোমার অনুমতি নিয়ে রাখলাম আরকি। রহিম চাচাকে দিয়েই শুরু করব ভাবছি।’ 
‘মুশকিল হয়ে গেল যে। রহিম চাচা আজ বিকেলেই মাল শিপমেন্ট করতে চিটাগং গেছে। ফিরবে পরশু।’ 
‘ওহ, সমস্যা নেই,’ একটু বিরতি দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, রহিম চাচা বিয়ে করেননি?’ 
‘হ্যাঁ, করেছেন তো। স্ত্রী সন্তান থাকে দেশের বাড়ি কুমিল্লায়। চাচা সপ্তাহ দু’সপ্তাহে গিয়ে দেখে আসেন। আমি বলেছিলাম, ওঁদেরকে এখানে নিয়ে আসতে, রাজি হননি।’ 
কিছুক্ষণ নীরবতায় কাটল। কথাটা বলতে বেশ ইতস্ততবোধ হচ্ছে তারেকের। 
‘ইয়ে…মানে…. একটা প্রশ্ন ছিল।’ 
‘নিশ্চয়ই।”তোমাদের মধ্যে কি ফিজিকালি কোনও…।’ 
‘পাগল! ওকে দেখলেই তো ভয়ে সিঁটিয়ে যাই আমি!’ 
‘আরেকটা প্রশ্ন, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড।’ 
‘করে ফেলো।’ 
‘সক্ষম তো তুমি?’ 
‘পুরোমাত্রায়!’ সলাজ হেসে বলল অনুপ। লজ্জা কাটাতেই হয়ত বলল, চলো, ফেরা যাক।’ 
‘চলো।’ উঠে দাঁড়াল তারেক। 
আকাশ থেকে দিনের শেষ আভাটাও অদৃশ্য হয়েছে তখন।

চার

শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছিল তারেক। খাবার নিয়ে এল বাইশ তেইশ বছরের এক্কটা ছেলে। আগেই তারেক জেনেছে এই ছেলেটাই বাড়ির সব কাজকর্ম দেখাশোনা করে। নামটাও জানা আছে, তবুও জিজ্ঞেস করল, ‘নাম কী তোমার?’ 
‘মামুন,’ খাবার সাজাতে সাজাতে ছোট করে জবাব দিল ছেলেটা। 
‘দেশের বাড়ি কোথায়?’ 
‘নরসিংদী।’ 
‘তাই নাকি!’ তারেকের ভঙ্গি দেখে মনে হতে পারে নরসিংদী বাড়ি হওয়াটা দারুণ ব্যাপার। ‘খুব সুন্দর জায়গা,’ যদিও জীবনেও কখনও যায়নি সে ওখানে তবুও বলল। 
কৌশলটা কাজে লাগল। প্রভাবিত হল মামুন। ‘নরসিংদী গেছেন স্যার আপনি? কোথায় গেছেন?’ 
‘হুঁ,’ অবলীলায় মিথ্যে বলল তারেক। মামুনকে আর কোনও প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে নিজেই শুরু করল, ‘এ বাড়িতে কতদিন হল আছো?’ 
‘এই তো দেড় বছর। আগে গুলশান থাকতাম, মালিক ছিল ‘খাইস্টা’ লোক।’ 
ছেলেটা বড় বেশি কথা বলে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিদেয় করতে হবে।’তোমার এখনকার মালিক কেমন লোক? ‘ 
‘কে, অনুপ স্যার? খুবই ভাল। ওনার বাবাও ভাল মানুষ ছিল। আমি আসার ছয় মাসের মাথায় মারা যায়।’ 
‘তোমার বোধহয় অনেক কষ্ট হয় এখানে, তাই না? বড়লোক মানুষের বাড়িতে কাজ করো নিশ্চয়ই ক’দিন পর পর বাড়িতে পার্টি হয়।’ 
‘না, না আমি এখানে আসার পর শুধু বড় সাহেবের কুলখানি আর অনুপ স্যারের বিবাহের অনুষ্ঠান হইছে।’ 
অবাক হল তারেক। এ বাড়িতে নাকি পার্টি-টার্টি হয় না। অথচ উল্টোটা হওয়াই তো স্বাভাবিক। ব্যবসায়িক পরিবার-সামাজিক অনুষ্ঠান তো লেগেই থাকবার কথা বাড়িটাতে। যতটুকু তারেক বুঝেছে অনুপ কিংবা ওর বাবা দু’জনেই বেশ দিলখোলা মানুষ। তবে? 
‘আচ্ছা, তোমাদের বেগম সাহেবা কেমন মানুষ?’ 
‘বেগম সাহেবারে তো আমি দেখি নাই। অনুপ স্যার ছোট থাকতেই মারায় যায়।’ 
‘তাঁর কথা বলছি না, অনুপের স্ত্রী কেমন মানুষ?’ 
‘ও লাবণ্য আপা? খুবই ভাল মানুষ। আমাদের সবাইকে উনি বেগম সাহেবা ডাকতে নিষেধ করছে। ”লাবণ্য আপা” বইলা ডাকতে বলছে। এই তো তিনদিন আগে আমাদের রাঁধুনী জুলেখার জ্বর আসছিল। তখন তো লাবণ্য আপাই মাথায় পানি ঢেলে দিছিল। রাত একটার পর ঘুমাইছে সেদিন।’ 
‘আচ্ছা!’ যতটা অবাক হয়েছে ততটা প্রকাশ করল না তারেক। ‘খুব ভাল।’ 
‘কিন্তু স্যার, লাবণ্য আপার একটা সমস্যা আছে, জানেন?’ 
‘তাই নাকি? কী সমস্যা?’ পুরোপুরি সচেতন হয়ে উঠল তারেক। 
‘প্রতি রাতে ছাদে যায় উনি।’ 
‘ছাদে গিয়ে কী করে, জানো?’ 
‘না, আদার ব্যাপারী জাহাজের খবর নিয়া লাভ কী?’ 
‘তাও ঠিক।আচ্ছা, মামুন তোমার সাথে কথা বলে ভাল লাগল, পরে আবার দেখা হবে।’ 
মামুন সালাম দিয়ে চলে গেল। সাথে সাথেই এইমাত্র প্রাপ্ত তথ্যগুলো নোটবুকে লিখতে বসল তারেক। 

১) এ বাড়িতে কোনও সামাজিক অনুষ্ঠান হয় না। কেন? 
২) লাবণ্য রূপবতী, পাশাপাশি একজন গুণবতীও বটে। যে কিনা রাত একটা অবধি বাড়ির অসুস্থ কাজের মানুষের মাথায় পানি ঢালার মানসিকতা রাখে। 
৩) লাবণ্য সত্যি সত্যি ছাদে যায়। এটা অনুপ কিংবা রহিম চাচার বিভ্রান্তি নয়। তবে কেন যায়- জানা যায়নি। 

এটুকু লিখে নোটবুক বন্ধ করল তারেক। পরে এগুলো নিয়ে চিন্তা করবে। খাবারে মনোযোগ দিল। 
খাওয়া শেষে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে দেখল বসে আছে অনুপ। 
‘সরি, না বলেই ঢুকে পড়েছি। তোমার তদন্ত কেমন এগোচ্ছে জানার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল।’ 
‘ভাল। বেশ কয়েকটা ইন্টারেস্টিং তথ্য জানা গেছে।’ 
‘যেমন?’ 
‘বাড়ির কাজের লোকরা লাবণ্যকে খুবই ভালবাসে।’ 
‘তা তো বাসবেই। অবাক হবার কিছু নেই। আসল পরিচয় কি আর ওরা জানে?’ 
‘আমরাও কী জানি? বিড়বিড় করে আওড়াল তারেক।’ 
‘কিছু বললে?’ 
‘না, আচ্ছা, তোমাদের ছাদে কি তালা দেয়া থাকে?’ 
‘না, আর থাকলেও লাভ হত না। ডাইনীটা মন্ত্র পড়ে ঠিকই খুলে ফেলত।’ 
‘আহ!’ বিরক্ত হল তারেক। ‘আমি এখন ছাদে যেতে চাচ্ছিলাম একবার।’ 
‘ও তাই বলো, হ্যাঁ সব সময়ই খোলা থাকে।’ 
‘ওকে। আর শোনো, তোমাকে লাইব্রেরিতে ঘুমাতে হবে না। এতদিন যখন কিছু হয়নি সামনেই দু’দিনেও কিছু হবে না। আশা করি এর মাঝেই আমি কোনও একটা সমাধানে আসতে পারব। আর যদি দেখো লাবণ্য রাতে বাইরে যাচ্ছে তবে মিসকল দেবে আমাকে।’ 
‘ঠিক আছে,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল অনুপ। কিছু বলল না আর। উঠে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। 
অনুপ বিদায় নিতেই তারেক পায়ে সেন্ডেল গলিয়ে উঠে এল ছাদে। 
বিশাল ছাদ। কে যেন বাগান করেছে। কী কী ফুল আছে বোঝা যাচ্ছে না অন্ধকারে, তবে পুরো ছাদ ভরে আছে সুবাসে। গাছ-পালা ছাড়া তেমন কিছু চোখে পড়ল না। তবে দূরে দেখা গেল একটা নাম না জানা নদীর বাঁকানো কোমর। ওখান থেকে ধেয়ে আসছে উন্মাদ বাতাস। আকাশে প্রায় পূর্ণ একটা চাঁদও উঠেছে আজ। 
কতদিনের চাঁদ? ভাবল তারেক। এগারো নাকি বারো? কবে পাবে পূর্ণতা? 
প্রেমে পড়ার মত অপরূপ ছাদ। তবে লাবণ্য নিশ্চয়ই গভীর রাতে ছাদের সাথে প্রেম করতে আসে না। জানাটা খুব জরুরি, কেন আসে সে। আগামীকাল দিনের বেলা একবার এসে দেখে যাবে- ঠিক করল তারেক। 
প্রায় পূর্ণ চাঁদটার দিকে আরেকবার চোখ চলে গেল ওর। ঠিক সেই মুহূর্তে অদ্ভুত এক প্রতিজ্ঞা করল তারেক।

 

পাঁচ

পরের দিন দুটো কাজ করল তারেক। সকালে উঠেই ছাদে গেল। দিনের আলোয় রাতের অনেক রহস্যই আর রহস্য থাকে না। কিন্তু কাজ হল না। অস্বাভাবিক কিছুই নেই যা দেখে ধারণা করা যায় এখানে প্রেতসাধনা টাইপ কিছু করা হয়। কাল রাতে অবশ্য ছাদে আসেনি লাবণ্য। অন্তত অনুপ ওকে কোনও মিসডকল দেয়নি। আজ সকালে উঠেই অফিসে চলে গেছে ছেলেটা। 
তারেকের পরিচয় পেয়েই কি কাল রাতে ছাদে আসেনি লাবণ্য? 
ছাদ থেকে নেমে বাড়ির অন্যান্য কাজের লোকেদের সাথে কথা বলল তারেক। সবাই পাঁচ মুখে প্রশংসা করে গেল লাবণ্যর। লাবণ্যকে অবশ্য সারাদিন দেখতে পেল না তারেক, নিজের রুমের দরজা আটকে বসে রইল মেয়েটা। অনুপেরও দেখা পেল না সারাদিন, অনেক রাতে যখন অনুপের আগমন ঘটল, তারেক তখন ঘুমে। 
সে রাতেও লাবণ্য ছাদে গেল না। 
পরের দিনটাও কেটে গেল ঘটনাবিহীন। রাত থেকে ঘটতে শুরু করল ঘটনা। 
সকাল থেকেই মেজাজ খিঁচরে রয়েছে তারেকের। তিনদিন হতে চলল এখনও কাজের কোনও অগ্রগতি নেই। গতকালের মত আজও অনুপ সকালেই অফিসে চলে গেছে। 
তারেকের মায়া হল অনুপের জন্য। নিজ বাড়ি থেকে পালিয়ে বেড়ানোর মত দুর্ভাগ্য বোধহয় খুব কমই আছে পৃথিবীতে। 
লাবণ্যর জন্যও খারাপ লাগল তারেকের। 
একটা মেয়ে কত স্বপ্ন নিয়ে স্বামীর বাড়িতে আসে মা-বাবাকে ছেড়ে। লাবণ্যর সে স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্ন। ভয়ের কারণে স্বামী বঞ্চিত করছে ভালবাসা থেকে। সাথে যোগ হয়েছে বিশাল বাড়ির শূন্যতা। মেয়েটার শশুর নেই, শাশুড়ি নেই, ননদ, দেবর কেউ নেই। শুধুমাত্র যাকে নিয়ে বাঁচা যায়, সেই স্বামী থেকেও নেই। 
কীভাবে বাঁচবে এই দম্পতি? 
সকাল থেকে একটা থ্রিলারে ডুব দিতে গিয়েও একটু পর পরই খেই হারিয়ে যাচ্ছিল তারেকের। অবশেষে বিরক্ত হয়ে বিকেলের দিকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। গতকাল কৌশলে বাড়ির রাঁধুনী, ড্রাইভার আর দারোয়ানের সাথে কথা বলে ফেলেছে। এখন শুধু বাকি আছে রহিম চাচা আর অন্য আরেকজন দারোয়ান। এ বাড়িতে দুজন গার্ড। একেকজন একেকদিন পাহারা দেয়। তারেক কাছে গিয়ে খাতির জমিয়ে ফেলল তার সাথে। অতিরিক্ত পান খাবার কারণে কথা কিছুটা অস্পষ্ট তবুও কথা চালিয়ে গেল তারেক। 
‘রাতে একা একা পাহারা দাও, ভয় লাগে না?’ জিজ্ঞেস করল তারেক। 
‘আগে লাগত না, এখন লাগে?’ 
‘কেন? এখন লাগার কারণ কী?’ 
‘লাবণ্য আপা রাইতেরবেলা ছাদে গিয়া খাড়ায়া থাকে। দেখলেই ভয় লাগে।’ 
‘তারেক ঘাড় ফিরিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে দেখল এখান থেকে ছাদের একটা অংশ পরিষ্কার দেখা যায়। কিনারা ঘেঁষে কেউ দাঁড়ালেই চোখে পড়বে।’ 
‘ছাদে গিয়ে কী করে?’ 
‘আমি তো খালি খাড়ায়া থাকতেই দেখি।’ 
‘তা হলে ভয় পাবার কী আছে?’ 
‘ভয় তো আমার লাইগা না। এত রাইতে ছাদে গেলে যদি কুনো ক্ষতি হয়? মাইয়া মানুষ, তার উরপে সুন্দরী।’ 
‘লাবণ্য আপার জন্য অনেক মায়া তোমার?’ 
‘হইব না? কুনোদিন শুনছেন বাড়ির মালকিন দারোয়ানরে ”কোফি” বানায়া খাওয়ায়?’ 
‘তোমার লাবণ্য আপা তোমাকে কফি বানিয়ে খাইয়েছে?’ 
‘হ, তাইলে আর কইলাম কী?’ 
‘তোমার আপার জন্য দোয়া কোরো।’ 
‘কেন কী হইছে লাবণ্য আপার? পরিষ্কার উদ্বেগ দারোয়ানের গলায়।’ 
‘কিছু যাতে না হয় সে দোয়াই করো।’ আর দাঁড়াল না তারেক। চলে এল। 
অনুপ আর লাবণ্য ওদের সম্পর্কের শীতলতা রহিম চাচা বাদে আর সবার কাছ থেকে গোপন রাখতে পেরেছে দেখে স্বস্তিবোধ করল তারেক। 
একটু পর অনুপের গাড়ি প্রবেশ করল বাড়ির ড্রাইভওয়েতে। তারেক বাগানেই ছিল, এগিয়ে গেল। পেছনের সিট থেকে নামল অনুপ আর রহিম চাচা। তিনি ফিরেছেন চট্টগ্রাম থেকে। তারেককে দেখে নিখাঁদ স্নেহমাখা কন্ঠে বললেন, ‘কেমন আছো,বাবা?’ 
‘ভাল,’ এক মুহূর্ত বিরতি দিয়ে বলল, ‘চাচা, আপনি কি আজ রাতে আমাকে কিছুটা সময় দিতে পারবেন। কয়েকটা কথা জানার ছিল।’ 
‘অবশ্যই বাবা। চা খেয়ে কথা বলি? ‘ 
‘শিওর।’ 
বাড়িতে একসাথেই ঢুকল ওরা তিনজন। ডাইনিং রুমে বসে থাকতে দেখা গেল লাবণ্যকে। মেয়েটাকে হাতে গোনা কয়েকবার চোখে পড়েছে তারেকের এ বাড়িতে আসার পর থেকে। 
রহিম চাচা আর অনুপ ফ্রেশ হতে চলে গেল। বিনা কারণে চলে গেলে খারাপ দেখায় বলে লাবণ্যর সামনে একটা চেয়ারে বসে পড়ল তারেক। 
‘কেমন আছেন?’ 
‘ভাল,’ চোখমুখ শক্ত করে জবাব দিল লাবণ্য। বোঝাই যাচ্ছে তারেকের উপস্থিতি মোটেও ভালভাবে নিচ্ছে না মেয়েটা। 
ইচ্ছে করেই আচমকা একটা বিদঘুটে প্রশ্ন করে বসল তারেক। ‘অনুপকে বিয়ে করে আপনি কতটা সুখী?’ 
মুখটা লাল হয়ে গেল লাবণ্যর। ‘এ ধরনের প্রশ্ন করার অধিকার কে দিয়েছে আপনাকে?’ 
‘কেউ না, তবে আমি কিন্তু আমার উত্তর পেয়ে গেছি।’ হাসি হাসি মুখে জানাল তারেক। 
‘কী উত্তর পেয়ে গেছেন আপনি?’ তারেকের হাসিমুখ আগুনে ঘি ঢালল যেন। 
‘পেয়েছি কিছু একটা।’ লাবণ্যর রাগ আমলে নিল না তারেক। 
‘কী পেয়েছেন আমি জানি না, তবে শুনে রাখুন, আমি আমার স্বামীকে ভালবাসি।’ 
‘অনুপও কি আপনাকে ভালবাসে?’ 
একজন মানুষের মুখ যতটা লাল হওয়া সম্ভব ততটাই লাল হয়ে গেল লাবণ্যর মুখ। চা শেষ না করেই ঝট করে উঠে দাঁড়াল। গট গট করে হেঁটে চলে গেল। 
মুচকি হাসতে লাগল তারেক সেদিকে তাকিয়ে। 
‘একা একা হাসছো যে, লাবণ্য কই?’ অনুপ এসে দাঁড়াল তারেকের সামনে। 
‘তোমার রাজকন্যা তো রাগ করে চলে গেল।’ হাসতে হাসতেই জবাব দিল তারেক। 
‘কেন?’ বসে জানতে চাইল অনুপ। 
‘আমি রাগিয়েছি, তাই। দেখতে চেয়েছিলাম তোমার বউ আমাকে চোখের আগুনে ভস্ম করতে পারে কি না। পারল না তো। লাবণ্য বোধহয় নিম্নশ্রেণির ডাইনী। ক্ষমতা-টমতা বড় একটা নেই।’ 
তারেকের রসিকতা সহজভাবে নিতে পারল না অনুপ। গম্ভীর হয়ে বলল, ‘তুমি আমার কথা বিশ্বাস করোনি, তাই না?’ 
‘অবশ্যই করেছি। আমি বিশ্বাস করি, তুমি এবং রহিম চাচা যা বলেছো তাতে একবিন্দু মিথ্যে নেই।’ 
আর কোনও কথা বলল না অনুপ। চা শেষ করে চলে গেল। 
একটু পর রহিম চাচা এসে বসলেন তারেকের সামনে। প্রথম সুযোগেই কাজের কথায় চলে এল তারেক। ‘চাচা একটা প্রশ্ন করি?’ 
‘অবশ্যই করবে।’
‘চাচা, অনুপ সম্পর্কে কিছু বলুন। কেমন ছেলে ও? ‘ 
‘আমি আমার সারাজীবনে এমন ভাল ছেলে খুব কমই দেখেছি। কোনও দিনও মিথ্যে বলতে দেখিনি ওকে।’ 
‘বাবার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল ওর? ‘ 
‘একেবারে বন্ধুর মত। একমাত্র ছেলে তো, সব সময় আগলে আগলে রাখতেন। বাইরের কারো সাথে মিশতে দিতেন না। স্কুল ছুটি হবার সাথে সাথে ওকে নিয়ে আসার দায়িত্ব ছিল আমার উপর। খেলাধুলার সমস্ত সরঞ্জাম কিনে দিয়েছিলেন তিনি ছেলেকে। বাপ-বেটা মিলে খেলত।’ 
‘তিনি বেঁচে থাকতে নিশ্চয়ই এ বাড়িতে পার্টি-টার্টি লেগেই থাকত?’ 
‘নাহ, একদমই পছন্দ করতেন না উনি এসব।’ 
‘আচ্ছা, আপনার বউমা, মানে লাবণ্য কেমন মেয়ে?’ 
‘দীর্ঘশ্বাস পড়ল রহিম চাচার। সত্যি বলতে, অমন মেয়ে বউ হিসেবে পাওয়া সাত জনমের কপাল। যেমন সুন্দরী তেমনই গুণবতী। কিন্তু… ‘ আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে থেমে গেলেন মানুষটা। 
‘আচ্ছা, সেদিন আপনি ঠিক কী দেখেছিলেন, একটু খুলে বলবেন?’ 
‘সে ভয়াবহ দৃশ্য।’ যেন এখনও সে দৃশ্য চোখ থেকে মুছে যায়নি রহিম চাচার। শিউরে উঠলেন। 
‘কেমন ভয়াবহ দৃশ্য, খুলে বলুন, চাচা।’ 
বলতে শুরু করলেন রহিম চাচা। 
এবং পরবর্তী দশ মিনিটে তারেকের চোখের সামনে থেকে সরে গেল সব অন্ধকার। খুলে গেল সব রহস্যের জট।

ছয়

রহিম চাচার সাথে কথা বলে মনটা অনেক হালকা তারেকের। 
রাতের খাবার খেয়েই শুয়ে পড়ল।ঘুম ভাঙিয়ে দিল মোবাইলের ভাইব্রেশন। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল অনুপের নাম্বার। নিশ্চয়ই ছাদে যাচ্ছে লাবণ্য। 
ঘড়িতে রাত পৌনে বারোটা। সেন্ডেল ছাড়াই রওনা হল তারেক ছাদের দিকে। সতর্ক পদক্ষেপ। 
ছাদে ঢোকার সিড়ির মুখে দাঁড়িয়ে উঁকি দিল তারেক। চমকে উঠল। 
না, কোনও মরার খুলি সামনে নিয়ে বসে নেই লাবণ্য। অশুভ কোনও পরিবেশও বিরাজ করছে না নিঝুম ছাদে। শুধুই দাঁড়িয়ে আছে লাবণ্য। দেখছে দূরের নদীটা, ভয় পাবার কোনও উপাদান না থাকা সত্বেও তারেক চমকেছে লাবণ্যর পোশাক দেখে। ধবধবে সাদা নাইটড্রেস পরেছে মেয়েটা। গোড়ালি অবধি লম্বা, পত-পত করে উড়ছে জোরালো বাতাসে। চাঁদের রহস্যময় আলো যোগ হয়েছে তাতে। মিলে-মিশে পৃথিবীর সাধারণ এক মেয়ে যেন পরিণত হয়েছে অন্য ভূবনের কেউ একজনে। 
ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জাতীয় কিছু একটা লাবণ্যকে জানিয়ে দিল ওর কয়েক হাত পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ। পেছনে ফিরে চাইতে শুরু করেছে লাবণ্য। রহস্যময় পরিবেশ আবারও অযৌক্তিক ভয় জাগিয়ে তুলল তারেকের মনে। 
কী দেখবে এখন? 
লাবণ্যর স্বাভাবিক সুন্দর মুখটা, নাকি ভয়ংকর কিছু? 
এক সময় ফিরে তাকাল লাবণ্য। 
না, স্বাভাবিক মুখই দেখা গেল মেয়েটার। 
ওকে দেখে দু’পা এগিয়ে এল লাবণ্য। রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়ল ওর মুখে। আবারও চমকে গেল তারেক। কাঁদছে মেয়েটা। 
ডাইনীর চোখে জল! 
পায়ে পায়ে ওর একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল লাবণ্য। 
ভূমিকা ছাড়াই শুরু করল, ‘ভাইয়া, আমি জানি আপনি কে। আমাকে বাঁচান, প্লিজ। আর কয়েকটা দিন এভাবে চললে আমি আবার পাগল হয়ে যাব।’ কোনও ভণিতা নেই মেয়েটার মধ্যে। বিদ্বেষের সেই ভাবটাও আর নেই। 
‘এক মিনিট, আবার পাগল হয়ে যাবে মানে?’ তারেক খেয়ালও করেনি মেয়েটাকে ও তুমি বলে ফেলেছে। 
‘ছোটবেলায় আমার মাথায় একটু প্রবলেম দেখা দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ্। কিন্তু অনুপ আমাকে এ কারণে ভয় পায়। কথা বলে না।’ 
‘অনুপ ব্যাপারটা জানল কীভাবে?’ 
‘আমাদের বিয়ের আগে বাবা সব জানিয়ে দিয়েছিল, যেন পরে কোনও সমস্যা না হয়, কিন্তু এটাই এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ 
‘তুমি আসল ব্যাপারটা তাহলে জানো না?’ 
‘কী আসল ব্যাপার?’ 
‘অনুপ তোমাকে ভয় পায় অন্য কারণে।’ 
‘কী কারণ?’ 
‘ও তোমাকে…ডাইনী ভাবে।’ ইতস্তত করে বলেই ফেলল তারেক। 
‘কী ভাবে?!’ চরম বিস্ময়ে গলা চড়ে গেল লাবণ্যর। ‘এটা কী বলছেন আপনি? আমাকে কেন ডাইনী ভাববে? আমি কী করেছি?’ 
‘কেন ভাবে সেটা কাল জানতে পারবে। এখন তুমি আমাকে বলো, তুমি প্রতি রাতে ছাদে কী করতে আসো?’ 
‘ভাইয়া, ছোটবেলা থেকেই আমার ভয়-ডর কম। প্রতি রাতে ছাদে না এলে আমার ঘুম আসে না। অভ্যাস হয়ে গেছে। পত্রিকায় ছবি দেখেই আমি চিনে ফেলেছিলাম আপনাকে। আপনর ভয়ে গত দুই রাত ছাদে আসিনি। দম বন্ধ হয়ে গেছে। সারারাত ঘুম হয়নি। আজ আর থাকতে না পেরে চলে এসেছি। বিয়ের আগে ভাবতাম বিয়ের পর স্বামীকে নিয়ে ছাদে আসব, গল্প করব। কিন্তু এখন শুনছি আমি নাকি ডাইনী। 
ভাইয়া, আমি খুব সাধারণ একটা মেয়ে। সারাজীবন স্বামী সংসার নিয়ে কাটিয়ে দিতে চাই। ও আমাকে ভাল না বাসলেও আমি এ কদিনে ওকে প্রচন্ড ভালবেসে ফেলেছি। আপনি তো অনেক মানুষের অনেক হারানো জিনিস খুঁজে দিয়েছেন, আপনার এই ছোটবোনটার স্বামীকে তার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবেন না?’ বলতে বলতেই দু’হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল লাবণ্য। ফুলে ফুলে উঠতে লাগল পিঠটা। 
তারেকের সেই মুহূর্তে খুব ইচ্ছে করল মেয়েটার মাথায় হাত রেখে কিছু একটা বলে। কিন্তু কিছুই বললে না ও। লাবণ্যকে রেখে নীরবে নেমে এল ছাদ থেকে।

সাত

পরদিন সকালে তারেকের রুমে একত্রিত হয়েছে অনুপ, রহিম চাচা আর লাবণ্য। তারেকই আসতে বলেছে ওদের। গতরাতেই সমাধান হয়েছে সমস্ত রহস্যের, এখন সময় হয়েছে সব খুলে বলার। 
‘আমার পরিচয় ইতোমধ্যে রুমে উপস্থিত সবাই জেনে ফেলেছেন, সুতরাং ভূমিকার কোনও প্রয়োজন দেখছি না,’ শুরু করল তারেক। রুমের মধ্যে একমাত্র ও-ই দাঁড়িয়ে আছে। ‘অদ্ভুত একটা কেস নিয়ে আমি এসেছিলাম এ বাড়িতে। সেটা হল, অনুপ এবং রহিম চাচা কোনও একটা কারণে লাবণ্যকে ডাইনী ভাবতেন। সে কারণ জানার জন্যই আমার আগমন। 
শুরু থেকেই আমি ডাইনীর ব্যাপারটা বিশ্বাস করিনি। ডাইনীর সংজ্ঞাটা আসলে কী? যারা তন্ত্র-মন্ত্র দিয়ে অলৌকিক সব কাজ করতে পারে। এজন্য বিভিন্ন অপশক্তির সাধনা করতে হয় তাদের। এখন প্রশ্নটা হল লাবণ্যর মত একটা সুন্দরী আধুনিক মেয়ে কোন দুঃখে ডাইনী হতে যাবে? 
তা হলে কি এরা দু’জন ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছে? নাকি মিথ্যে বলছে দুজনেই? মিথ্যেই বা কেন বলবে? 
লাবণ্যকে ডিভোর্স দেয়ার জন্য বলতে পারে। তবে সেটা বিশ্বাস্য নয় কোনওমতেই। লাবণ্যর মত সুন্দরী একটা মেয়েকে পাগল ছাড়া আর কেউ তালাক দেয়ার কথা চিন্তাও করবে না। আর দিলেও তার পেছনে জোরালো কারণ থাকবে। এমন উদ্ভট যুক্তি অন্তত কেউ দেখাবে না। সেক্ষেত্রে আবারও সেই প্রশ্নটা ঘুরে ফিরে আসে, অনুপ আর রহিম চাচা তবে কী দেখল? কেন দেখল? 
সেই প্রশ্নের জবাবই আমি খুঁজেছি এতদিন ধরে। 
প্রথমে অনুপের ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক। অনুপ ছোটবেলাতেই মা’কে হারিয়েছে, মানুষ হয়েছে বাবার কাছে। বাবাও একমাত্র ছেলেকে প্রচন্ড ভালবাসতেন। সারাটা জীবন আগলে রেখেছেন ছেলেকে। হায়দারসাহেবের সাথে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি কারণ বোধহয় এটাই ছিল। মহিলা সৎ ছেলেকে আপন করে নিতে না পারায় এস্পেপারেশন হয়ে যায় তাদের মধ্যে। এরপর হায়দার সাহেব আর বিয়ে করেননি, সন্তানকে সম্বল করেই বেঁচে ছিলেন আজীবন। 
ছোটবেলা থেকেই অনুপকে তিনি একটি গন্ডির মধ্যে বেঁধে রেখেছেন। কোনও বন্ধু-বান্ধব হতে দেননি অনুপের, নিজেই বন্ধু হয়ে ছিলেন, সঙ্গ দিয়েছেন। হায়দার সাহেব মানুষ হিসেবে তেমন সামাজিক ছিলেন না, অনুপকেও তিনি ওভাবেই দেখতে চেয়েছিলেন। এ কারণেই বাড়িতে কখনও পার্টির আয়োজন করতেন না। অনুপও নিঃসঙ্গভাবে, শুধু মাত্র বাবার সাহচর্যে বড় হতে লাগল। অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল ও এই জীবনযাত্রায়। কিন্তু গত বছর বাবা মারা যাওয়ায় মারাত্মক শক পায় অনুপ। বাবা হারাবার চাইতে একজন অকৃত্রিম বন্ধু হারাবার ব্যথা কাতর করে তুলল ওকে। হায়দার সাহেব স্বভাবগতভাবে অসামাজিক হলে অনুপ কিন্তু মানসিকতায় খুবই মিশুক প্রকৃতির সেটা আমি বুঝেছি মাত্র কয়েক ঘন্টায়ই ও আমাকে যেভাবে আপন করে নিয়েছে, তা দেখে। 
যাই হোক, অনুপ তার একমাত্র বন্ধু বাবাকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে বাবার গড়া বিশাল লাইব্রেরির বইগুলোকে বন্ধু বানিয়ে নেয়। বই অনেক ক্ষেত্রেই ভাল বন্ধু হলেও সব ক্ষেত্রের নয়। বই কখনও সুখ-দুঃখের ভাগীদার হতে পারে না মানুষের। সঙ্গ-পিপাসু অনুপের মন সত্যিকারের একজন বন্ধু খুঁজে ফিরতে লাগল। কিন্তু বাবার শিক্ষা অবচেতন মনে গেঁথে যাওয়ায় বরাবরই বাধা পেয়েছে অনুপ। দুই মনের মধ্যে তৈরি হল এক ধরনের টানা-পোড়েন।’ একটানা বলে থামল তারেক। এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিল তিন শ্রোতা, তারেক থামতেই সবাই উৎকণ্ঠিত হয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। 
মজা পেল তারেক। উদ্বেগমুক্ত করার আগে সবাইকে একবার চরম উদ্বেগের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। 
‘এই টানা-পোড়েন অনুপের মনে একটা অ্যাবনরমাল মেন্টাল ডিজঅর্ডারের বীজ বুনে দেয়।’ কিছুক্ষণ বিরতির পর শুরু করল তারেক। সাইকোলজির পরিভাষায় এ রোগের নাম ”ক্যালিগাইনিফোবিয়া”। অদ্ভুত এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সুন্দরী মেয়েদের ডাইনী ভাবে, ঠিক অনুপের মত! 
তবে সব নিঃসঙ্গ মানুষের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটবে এমন কোনও কথা নেই। কারণ সবাই অনুপের মত সঙ্গ-পিপাসু হয় না। নিঃসঙ্গতাই তাদের আকাঙ্ক্ষিত।’ 
‘কিন্তু তারেক সুন্দরী মেয়ে তো আমি জীবনে কম দেখিনি, তাহলে তখন এই সমস্যাটা হল না কেন?’ বলল অনুপ। পরক্ষণেই জানতে চাইল, ‘আর বিয়ের রাতেই বা কেন?’ 
‘আমি আগেই বলেছি তোমার বাবার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে বীজ বপন হয়ে যায় এ রোগটার, মহীরুহের আকার ধারণ করে বিয়ের রাতে। কারণটা সম্ভবত লাবণ্য রূপ। এবং এই রোগটাই তোমার হ্যালুসিনেশনের কারণ।’ 
‘বুঝলাম, আমি এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ভুল-ভাল দেখেছি, কিন্তু রহিম চাচাও কি এ রোগে আক্রান্ত? না হলে তিনি কেন দেখবেন?’ 
‘সে ব্যাপারেই আসছিলাম এখন। না, রহিম চাচা ”ক্যালিগাইনিফোবিয়া”য় আক্রান্ত নন এবং তিনি মিথ্যে বা ভুল কিছুও বলেননি লাবণ্যর ব্যাপারে।’ 
এইমাত্র বলা তারেকের কথাটা আবার রুমের পরিবেশ গুমোট করে তুলল। একটু আগে বলা তারেকের ব্যখ্যা শুনে লাবণ্যর চেহারায় এক ধরনের আভা ফুটে উঠেছিল এইমাত্র সেটা অদৃশ্য হয়ে গেল আবার। দল বেধে ফিরে আসছে দুঃশ্চিন্তার মেঘগুলো। 
মেয়েটাকে আর কষ্ট দিতে ইচ্ছে হল না তারেকের। শুরু করল, ‘রহিম চাচাও ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশনের শিকার হয়ে ওসব দেখেছেন। তবে তার হ্যালুসিনেশনের কারণ ক্যালিগাইনিফোবিয়া না, সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা কারণ। কারণটা বলছি। 
রহিম চাচা ছোটবেলা থেকে অনুপকে দেখে আসছেন। জানেন, খুবই ভাল একজন মানুষ অনুপ, সৎ এবং সত্যবাদী। কখনও ওকে মিথে বলতে শোনেননি। তো এই অনুপই যখন এসে বলল, লাবণ্য একজন ডাইনী-রহিম চাচা সেটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করলেন। এর ক’দিন পর যখন তিনি গভীর রাতে দেখলেন, লাবণ্য ছাদে যাচ্ছে, অনুপের বলা প্রভাব সৃষ্টিকারী কথাগুলো তার মনে আলোড়ন তুলল। হ্যালুসিনেসন হল তাঁর। এই হল লাবণ্যর ডাইনী হবার রহস্য।’ 
কথা শেষ করে তারেক হেঁটে গেল টেবিলের কাছে। গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে ওদের দিকে পিছন ফিরেই বলল, ‘আমার এই হাইপোথিসিসের ভিত্তিটা এবার বলি তাহলে। এ বাড়ির সব কাজের লোকই লাবণ্যকে খুবই পছন্দ করে। অবশ্য ভালবাসা পাবার মতই মেয়ে লাবণ্য।’ কথাটা বলার সময় তারেক আঁড়চোখে লাবণ্যর দিকে তাকাল একবার। মাথা নিচু করে ফেলেছে মেয়েটা। লজ্জা পেয়েছে সম্ভবত। 
‘এমন একটা মেয়ে যে ডাইনী হতে পারে না সে ব্যপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু অনুপ আর রহিম চাচার দেখা দৃশ্যগুলো খচ-খচে অনুভূতি তৈরি করছিল। তারা কেন এগুলো দেখবেন? এটা যে হ্যালুসিনেশন তা আমি বুঝতে পারি দুটো কারণে। প্রথমত অনুপ আর রহিম চাচা ছাড়াও এ বাড়ির আরও দু’জন লাবণ্যকে ছাদে যেতে দেখেছে কিন্তু এদের কেউই কিন্তু ওকে অস্বাভাবিক কোনও রূপে দেখেনি। কারণ এরা জানতও না লাবণ্যকে ডাইনী বলে সন্দেহ করা হয়। জানলে তারাও ভয় পেত, হয়ত হ্যালুসিনেশনও হত। 
দ্বিতীয় কারণ, আমি এখানে আসবার পথে অনুপের কাছ থেকে জানতে পারি, বিয়ের রাতে ও লাবণ্যকে চামড়া কুঁচকে যাওয়া একটা ডাইনী বুড়ি হিসেবে দেখতে পেয়েছে। যার চোখজোড়া জ্বলছিল অঙ্গারের মত। আমরা জানি ডাইনীরা এক ধরনের তান্ত্রিক। কোনও কারণই নেই তাদের চেহারা ভয়ঙ্কর হবার। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই ডাইনীরা ভয়ঙ্কর চেহারার অধিকারী হয়, তা হলেও তরুণী লাবণ্যর চেহারা বুড়ির মত কেন হবে?’ চুপ হয়ে গেল তারেক। কয়েক মুহূর্ত পর বলল, ‘হবে, কারণ আমরা ছোটবেলায় রুপকথার বইয়ের পাতায় ডাইনীদের যে বর্ণনা পেয়েছি সেটা এক খুনখুনে বুড়ির। চামড়া কোঁচকানো, চুল শনের মত ইত্যাদি, ইত্যাদি। আর হ্যালুসিনেশনের সময়ও অনুপ এমন একটা চেহারাই দেখতে পেয়েছে লাবণ্যর। কিন্তু পরবর্তীতে যখন রহিম চাচার কাছে লাবণ্যর ডাইনী রূপের বর্ণনা পাই তখনই আমি নিশ্চিত হই তারা আসলে হ্যালুসিনেশনের শিকার। সে রাতে রহিম চাচা লাবণ্যর ঠোঁটের পাশ দিয়ে শ্বদন্ত বেরিয়ে আসতে দেখেছিলেন। চোখ ছিল টকটকে লাল। এখন প্রশ্ন এসেই যায়, দু’জনের বর্ণনার এই ভিন্নতা কেন? উত্তরটা হল, অনুপ রহিম চাচাকে লাবণ্যর ব্যাপারে নিজের সন্দেহের কথা বললেও বলেনি সে রাতে লাবণ্যকে ঠিক কী চেহারায় দেখেছিল। শুধু বলেছিল ভয়াবহ একটা রূপে দেখা যায় লাবণ্যকে। এদিকে রহিম চাচার অচেতন মনে ডাইনীর যে ছবিটা আঁকা ছিল সেটা ছিল একটা ভ্যাম্পায়ারের! তিনি ভাবতেন ডাইনীদের চেহারা বুঝি অমনই হয়। ড্রাকুলা আর ডাইনীকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। মোটকথা, যার অবচেতন মনে ডাইনীর যে রূপাটা আঁকা ছিল, হ্যালুসিনেশনের সময় সেটারই প্রকাশ ঘটেছে। 
এই হল, আমার হাইপোথিসিস। কারও কোনও প্রশ্ন?’ 
‘আমি জানি লাবণ্যর ইনসমনিয়া নেই। তা সত্ত্বেও সে কেন ছাদে যায় প্রতি রাতে?’ জানতে চাইল অনুপ। 
‘প্রশ্নটা আমাকে না করে তোমার বউকে করলেই হয়ত আর এত কিছু ঘটত না। যাই হোক, এটা লাবণ্যর ছোটবেলার অভ্যেস। রাতে ছাদে না গেলে ঘুম আসে না ওর। আর তোমাদের ছাদটা তো এমনিতেই প্রেমে পড়ার মত। লাবণ্যকে যে সেটা আরও বেশি করে টানবে তাতে আর আশ্চর্য কী? তবে লাবণ্যরও উচিৎ ছিল তোমাকে বিষয়টা জানানো। কিন্তু সুযোগটাই বা পেল কখন? স্বামী-প্রবর তো তাকে দেখেই ভিরমি খায়!’ বলতে গিয়ে সামান্য হাসল তারেক। তাকিয়ে আছে তিনজনের দিকে। তিনজনই মাথা নিচু করে আছে। লাবণ্য বোধহয় কাঁদছে। একটু পর-পরই ফুলে উঠছে পিঠ। নিশ্চয়ই কষ্টের কান্না এটা নয়। অনুপও তো কাঁদছে, কাঁদুক। 
রহিম চাচাকে ইশারা করে রুম থেকে বেরিয়ে এল তারেক ফয়সাল।

আট

সেদিন দুপুরে। খাওয়া-দাওয়া সেরে ব্যাগ গোছাচ্ছে তারেক। চলে যাবে। পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে অনুপ আর লাবণ্য। দু’জনে মিলে মোটামুটি বারশতেক অনুরোধ করেছে আরও ক’টা দিন থেকে যাবার জন্য। রাজি হয়নি তারেক। আজকের এমন খুশির দিনে এই দম্পতির মাঝে ‘কাবাব মে হাড্ডি´হবার কোনও ইচ্ছে ওর নেই। ক’দিন পর আবার আসবে-এমন শর্তে নিমরাজি হয়ে এখন ওর ব্যাগ গোছানো দেখছে দু’জনে। লাবণ্য সাহায্য করতে চেয়েছিল। মানা করে দিয়েছে তারেক। 
অনুপের দিকে তাকিয়ে তারেক বলল, ‘আমার এক সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধুর ঠিকানা দিচ্ছি। মনে করে একবার যেও। নয়ত পরে সোশাল ফোবিয়া হয়ে যেতে পারে।’ 
‘যাবে না মানে?! আমি নিজে ওকে নিয়ে যাব। না গেলে খবর আছে না!’ সলাজ হেসে বলল লাবণ্য। 
পেছন ফিরে থাকায় ওরা জানতে পারল না তারেক হাসছে। 
কে বলবে আজ সকালেও এই ছেলে-মেয়ে দুটোর মধ্যে কী ভয়ানক শীতলতা বিরাজ করছিল? 
‘তারেক, তুমি আমাদের জন্য যা করলে তার ঋণ শোধ করার সাধ্য আমাদের নেই। তবুও তুমি মনে না করলে তোমাকে কিছু দিতে চাই আমরা।’ 
‘পারিশ্রমিক?’ মুচকি হেসে জানতে চাইল তারেক। 
‘ছি-ছি, ভাইয়া, পারিশ্রমিক হবে কেন? আমরা কি উপহার দিতে পারি না তোমাকে? তবে তোমার অনুমতি ছাড়া দিলে আবার কী মনে করো…।’ এবার লাবণ্য জবাব দিল অনুপের হয়ে। তারেককে ও-ও ‘তুমি’ করে ডাকা শুরু করেছে। 
‘অনুপের মত বন্ধু পেয়েছি, তোমার মত বোন পেয়েছি-আর কী উপহার তোমরা দিতে চাও?’ 
‘না-না, ভাইয়া, এসব কোথায় কাজ হবে না।’ বাচ্চা মেয়ের মত জেদ ধরল লাবণ্য। 
ব্যাগ গোছানো বাদ দিয়ে সোজা হয়ে ওদের মুখোমুখি হল তারেক। অনুপ আর লাবণ্যকে পাশাপাশি দারুণ মানিয়েছে। কারও চেহারায় এতটুকু উদ্বেগ, ভয় কিংবা শংকার ছায়া নেই। স্বস্তির ছোঁয়া তাতে। 
‘সত্যিই আমাকে কিছু দিতে চাও তোমরা?’ 
‘একযোগে মাথা ঝাঁকাল দু’জনেই।’ 
‘তো শোনো, আজ চতুর্দশী পূর্ণিমা। আজ রাতে ভরা পূর্ণিমার সময় ছাদে যাবে তোমরা। হাত রাখবে হাতে। ঠিক সেই মুহূর্তে যদি আমার কথা মনে পড়ে যায় তবে ধরে নিয়ো এক অপেশাদার গোয়েন্দা পেয়ে গেছে তার পারিশমিক।’

পরিশিষ্ট

ঝকঝকে রূপালি চাঁদ উঠেছে আকাশে। 
চতুর্দশী পূর্ণিমায় ভেসে যাচ্ছে সব। উথাল পাতাল এই জোছনা শুধু চোখ দিয়ে দেখার নয়, হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করার। 
জোছনায় ভিজছে দুই মানব-মানবী। একজনের হাতে অপরজনের হাত। কেউই ছাড়তে চাইছে অন্যের হাতটা। নীরব এক প্রতিজ্ঞা করেছে যেন তারা-কখনই দূরে সরে যাবে না। কোনোদিনও না। 
তারেক ফয়সাল পেয়ে গেছে তার পারিশ্রমিক।

আরও জানুন » অদ্ভুত ছবিগুলো (১) »

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো তা আমাদেরকে অবশ্যই জানাবেন। আপনার মতামত আমাদের কাছে খুবই মূল্যবান। আপনি যদি আপনার নিজের লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ বা অন্য যেকোনো বিষয় বাঙালিয়ানা Magazine এ প্রকাশ করতে চান, তবে আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে আপনার লেখা প্রকাশে সচেষ্ট হব । আগ্রহীদের এই ইমেইল ঠিকানায় bangalianamagazine@gmail.com যোগাযোগের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হল । Copy করা কোন লেখা পাঠাবেন না। দয়া করে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আপনার পাঠানো লেখাটি অনলাইনে আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। যদি অনলাইনে আগে অন্য কোথাও আপনার লেখাটি প্রকাশিত হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সেটা প্রকাশ করতে পারব না। আমরা অরাজনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক এবং নিরপেক্ষ।
বিঃ দ্রঃ লেখাটি কোনরকম পরিমার্জন ব্যতিরেকে সম্পুর্ণ লেখকের ভাষায় প্রকাশিত হল। লেখকের মতামত, চরিত্র এবং শব্দ-চয়ন সম্পুর্ণই লেখকের নিজস্ব । বাঙালিয়ানা Magazine প্রকাশিত কোন লেখা, ছবি, মন্তব্যের দায়দায়িত্ব বাঙালিয়ানা Magazine কর্তৃপক্ষ বহন করবে না।

জন্ম ৭ এপ্রিল ১৯৯১। আদি নিবাস সিরাজগঞ্জ হলেও বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা ফরিদপুর শহরে। লেখালেখির শুরু ছয় বছর আগে, থ্রিলার উপন্যাস দিয়ে। রহস্য সাহিত্যের দিকেই ঝোঁকটা বেশি। এখন পর্যন্ত লিখেছেন অসংখ্য ছোটগল্প, বেশ কিছু উপন্যাসিকা এবং ছ’টি উপন্যাস। প্রথম একক উপন্যাস গ্রন্থ ‘প্রহর শেষে’।

Comments

comments