বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ হতে পারে কাঁকড়া চাষ

0
425
বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ হতে পারে কাঁকড়া চাষ
বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ হতে পারে কাঁকড়া চাষ
Print Friendly, PDF & Email

বিদেশে কাঁকড়ার চাহিদা এখন আকাশছোঁয়া। সঠিক পরিকল্পনা নিলে এ পণ্য বদলে দিতে পারে লাখো মানুষের ভাগ্য। এক সময়ের একেবারেই অবহেলিত ছিল এই জলজ প্রাণী কাঁকড়া। আমাদের দেশের নোনা পানিতে কাঁকড়ার বসবাস। কিন্তু রান্নার পর এর স্বাদ এক শ্রেণির ভোজন রসিকদের মুগ্ধ করেছে।

বর্তমান চাহিদা- কাঁকড়া রপ্তানি করে এখন প্রতিবছর গড়ে আয় হচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। দিন দিন যে হারে চাহিদা বাড়ছে তাতে সাদা সোনা হিসেবে পরিচিত চিংড়িকেও হার মানাতে পারে। কাঁকড়া রপ্তানি করে বছরে হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে এমনটাই মনে করছেন কাঁকড়া চাষীরা। ১৫ বছর ধরে রপ্তানি হয়ে আসছে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কাঁকড়া। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ১৮ হাজার টন কাঁকড়া রপ্তানি করছে যা দেশের অর্থনীতিকে দিচ্ছে ঊর্ধ্বমুখী গতি।

প্রক্রিয়াজাতকরণ- পাঁচ উপকূলীয় এলাকায় হচ্ছে কাঁকড়ার বাণিজ্যিক চাষ। রপ্তানি হচ্ছে ১৮ টি দেশে। ১৫ বছর ধরে রপ্তানি হয়ে আসছে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কাঁকড়া। চাষীরা নদী, সাগর, ডোবা, জলাশয় থেকে কাঁকড়া আহরণ করে প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে সেগুলো রাজধানীতে পাঠাতেন। রপ্তানিকারকরা সেগুলো নিজেদের মতো করে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করতেন। মত্স্য কর্মকর্তারা জানান, বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের দেড় লাখেরও বেশি জেলে প্রাকৃতিক উত্স থেকে কাঁকড়া ধরে জীবনযাপন করছেন। খুলনার পাইকগাছা, দাকোপ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, তালা, বাগেরহাটের রামপাল ও মংলা  এসব এলাকায় নয় শতাধিক কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ খামার গড়ে উঠেছে। শুধু পাইকগাছা উপজেলায় রয়েছে ৩০০ খামার।

চিংড়ি বাদ দিয়ে কাঁকড়া চাষ- চিংড়ি চাষ বাদ দিয়ে দেশের অনেকে এখন কাঁকড়া চাষে ঝুঁকছেন। সুন্দরবন এলাকায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার নারী-পুরুষ এ পেশায় সরাসরি জড়িত। অল্প জায়গায় অধিক উত্পাদন ও ভাইরাসের আক্রমণ কম হওয়ায় কাঁকড়া চাষে চাষীরা ঝুঁকছেন বেশি। কাঁকড়া চাষ করে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার মানুষের দিন বদলে যাচ্ছে। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার অধিকাংশ গ্রামে চাষ করা হচ্ছে কাঁকড়া। পোনা কিনতে হয় না, ঝুঁকি কম ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় আইলা দুর্গত অঞ্চলের মানুষজন কাঁকড়া চাষ করে স্বনির্ভর হচ্ছে। তাছাড়া স্থানীয় এনজিও আধুনিক পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে চাষীদের।  জেলার ২০ হাজারের অধিক চাষী কাঁকড়া চাষ করছেন। এ শিল্পের সঙ্গে পাঁচটি উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষ সরাসরি যুক্ত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাতক্ষীরায় উত্পাদিত কাঁকড়া রপ্তানি করে সরকার বছরে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে।

১২ জাতের কাকড়ার চাষ সুন্দরবন এলাকায় সহস্রাধিক প্রজাতির কাঁকড়া রয়েছে। এদের মধ্যে বাংলাদেশ সীমানায় ১২ প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়। এসব কাঁকড়ার মধ্যে মাইলা, শাইলা, সিরোটা ও শীলা প্রজাতি উল্লেখযোগ্য। মাইলা ও শীলা জাতের কাঁকড়া সবচেয়ে উন্নতমানের, তাই বিদেশে এগুলোর চাহিদা বেশি। বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত কাঁকড়ার মৌসুম।

কৃত্রিম পোনা উত্পাদন- কাঁকড়া চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং চাহিদা ও কদর বাড়ার কারণে দেশে বাগদা চিংড়ির মতোই এবার কৃত্রিম প্রজননে কাঁকড়ার পোনা উত্পাদন শুরু হয়েছে। কারণ পোনার জন্য একমাত্র ভরসা প্রাকৃতিক উত্স। ফলে পোনা সংগ্রহে পোহাতে হয় নানা ঝামেলা। চাষীদের সেই সমস্যা বিবেচনা করেই কৃত্রিম প্রজননে পোনা উত্পাদনের গবেষণা শুরু করা হয়েছে।

পৃষ্ঠপোষকতা- এটি সরকারের সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের মৎস্য সম্পদের তালিকায় থাকলেও বাস্তবে এর জন্য মাঠপর্যায়ে মৎস্য বিভাগের কোনো তৎপরতা নেই। খুলনা, সাতক্ষীরা কিংবা কক্সবাজার থেকে ট্রাক ভর্তি  উৎপাদিত বা আহরণ করা কাঁকড়া নিয়ে রাজধানীতে পৌছতে পৌছতে চাষীকে রাস্তায় গুনতে হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। রপ্তানিকারকরা বললেন, রপ্তানি ছাড়পত্র নিতে গিয়েই বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়। রপ্তানিকারক গাজী আবুল হাশেম বলেন, কাঁকড়া মৎস্য সম্পদ হলেও এটিকে দেওয়া হয়েছে বন বিভাগের অধীনে। আর বন বিভাগ থেকে ছাড়পত্র আনতে গেলে তারা নানা অজুহাতে সময় নষ্ট করে। তখন এই কাঁচামালটি নষ্ট হতে থাকে। তিনি বলেন, রপ্তানিকারকদের তখন বাধ্য হয়ে ঘুষের বিনিময়ে ছাড়পত্র আনতে হয়। অথচ প্রতি কেজি কাঁকড়া রপ্তানিতে সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছি তিন টাকা।

কাঁকড়া উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে উপকূলীয় অঞ্চলের বেকার যুবকদের কাঁকড়া চাষের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করা সম্ভব হবে।

আরও জানুন » সফল হতে হলে যে ২১ টি সুত্র আপনাকে মেনে চলতে হবে! »

Comments

comments