আলোর অপেক্ষা

0
852
Print Friendly, PDF & Email

আলোর অপেক্ষা

রোকসানা হাবিব লুবনা

 

১.

অফিসে আসার পর নিজের চেয়ারে বসতে বসতে টেবিলের উপর রাখা ফাইল গুলির দিকে তাকিয়ে লায়লার মনটা খারাপ হয়ে গেল। এতো ফাইল একসাথে রাখা তার মানে আজও বাড়ী যেতে দেরী হয়ে যাবে। তার মানে আজও লাবিন একা একা সন্ধ্যার নাস্তা করবে। এই সপ্তাহে লাবিনকে একদম সময় দিতে পারেনি লায়লা। ছেলেটার জন্য খুব খারাপ লাগে। যে বয়সে বাচ্চাদের সব থেকে বেশী দরকার মাকে আর সেই সময় মাকেই জীবন আর জীবিকার জন্য সব থেকে বেশী ব্যস্ত থাকতে হয়। এর মধ্যে ফোনটা বেজে উঠলো, ফোনের দিকে তাকিয়ে লায়লা দেখলো, জয়ন্তি ফোন করেছে।

 

লাইলা ফোন ধরেই বললো, কি ব্যাপার জয়ন্তি সব কিছু কি ঠিক আছে? এতো সকালে তুই ফোন করেছিস? জরুরী কিছু?

 

জয়ন্তি বললো, আমার অফিসে আজ দুপুরে খেতে চলে আয়।আমি অপেক্ষা করবো।

 

লায়লা বললো, আজ অনেক কাজরে!আজ আসা হবে না।

 

জয়ন্তি বললো, তুই কি না খেয়ে কাজ করবি? তাহলে কি এক দিনেই তোর সব কাজ শেষ হয়ে যাবে? দুপুরে না খেলে শরীর খারাপ করবে। কাজতো থাকবেই। চলে আসিস, আমি অপেক্ষা করবো। বলেই ফোন রেখে দিল।

 

লায়লা এতো কাজের মধ্যেও হেসে দিলো। জয়ন্তির কথা শুনে আর ফোন কেটে দেওয়ার ভঙ্গি দেখে। জয়ন্তি সবসময় এইরকম, সবাইকে খুব ভালবাসে। মাঝে মাঝে মনে হয় একজন মানুষ তারমধ্যে এতো ভালবাসা কিভাবে ধরে রাখে! কখনও ওকে রাগ করতে অথবা কারো সম্পর্কে খারাপ কথা বলতে শুনেনি। কেউ ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করলে তাকেও একটা হাসি দেয়।

 

লায়লা কত রাগ হয়ে বলেছে, এই তুই ওকে কিছু বললিনা কেন? ও হেসে বলেছে, বললে কিহতো? ওর কি কোনও পরিবর্তন হত? শুধু কথায় কথা বাড়তো। লায়লার চিন্তায় ছেদ পড়লো, পিয়ন এসে একটা জরুরী ফাইল চাইলো। ওটা খুঁজে বের করে পিয়নের হাতে দিয়ে ও আবার কাজে মন দিলো। একবারে সাড়ে বারোটায় চেয়ার থেকে উঠে অফিস থেকে বের হয়ে গেল। গেটের কাছে দাড়ানো মাত্রই একটা রিক্সা পেয়ে তাতে উঠে পড়লো। জয়ন্তির অফিসের কাছে এসে রিক্সা থেকে নেমে ভিতরে গেলেই ওর অফিসের অন্যান্য সাথীরা সালাম দিলো। জয়ন্তি বললো, চল টেবিলে। বসে খাবো আর গল্প করবো। অনেক খিদা পেয়েছে। আজ সকালে খেয়ে আসার সময় ছিলনা।

লায়লা বললো, আমারও খুব খিদা পেয়েছে। টেবিলে বসেই দেখে ছোট মুরগীর ঝোল আর কচুশাক ভাজি এবং জলপাই দিয়ে ডাল। দেখেই খিদাটা আরো বেড়ে গেল। কিছুক্ষন কোনও কথা না বলে দুই বান্ধবী চুপ করে খেয়ে গেল।

তারপর হঠাৎ জয়ন্তি বললো, তুই কি জানিস লাবন্য দেশে এসেছে? আমিতো তোকে আগেই বলেছিলাম লাবন্যর দেশে আসার কথা। আজ সন্ধ্যায় আমি আর তুই লাবন্যদের বাসায় যাবো। তোকে আমি তোর অফিস থেকে তুলে নিবো।আমার জন্য অপেক্ষা করবি।

 

লায়লা বললো, নারেতুইযা, আমি অন্যএকদিন যাবো। অনেক বছর ওর সাথে দেখা হয়না। আমাকে কি ওর মনে আছে? তারউপর আবার জার্মানী থাকে।না বাবা, আমি যাবো না।

 

জয়ন্তি বললো, একবার চল, ভাল না লাগলে তুই ওখান থেকেই বাড়ী চলে যাবি। লাবন্য একইরকম আছে শুধু দুইবাচ্চার মা হয়েছে। বলেই হেসে দিলো। এরমধ্যে, জয়ন্তির অফিসের বাবুর্চি এসে একটা বাটি দেখিয়ে বলল, আপা! এরমধ্যে কচুশাক ভাজি রাখা আছে, আমি ফ্রীজে রেখে দিলাম আপনি মনে করে নিয়ে যাবেন। লায়লা জানতে চাইলো, তুই কচুশাক কোথায় নিবি?

 

জয়ন্তি বললো, লাবন্যর খুব প্রিয় কচুশাক তাই ওর জন্য নিয়ে যাবো। কচুশাক আর বিরিয়ানীর মধ্যে একটা পছন্দ করতে বললেও কচুশাক বেছে নিবে।

 

লায়লা বললো, আরে তাহলেতো তোর বান্ধবীকে দেখতে যেতে হয়। এতো বছর জার্মানী থাকার পরও যে কচুশাকের স্বাদ ভোলেনি তাকে না দেখলেতো জীবন বৃথা হয়ে যাবে।কথাটি বলেই খুব জোরে হাসলো।ওর সাথে জয়ন্তিও হেসে দিলো।

 

জয়ন্তি হাসলে মনে হয়, সারা পৃথিবী হাসছে। খাওয়া শেষ করেই লায়লা বের হয়ে যেতে চাইলো। জয়ন্তি ওকে চা খেয়ে যেতে বললো। বললো, চা না খেলে ভাত ঘুম পাবে। কিন্তু লায়লার হাতে একটুও সময় নেই। তাই হেসে বললো অফিসে যেয়ে খাবো।

 

লায়লা অফিসে ফিরেই গেটের মধ্যে শামিমের মোটর সাইকেল দেখতে পেল। নিজের টেবিলে এসে বসেই আবার ফাইলের মধ্যে ডুবে গেল। হঠাৎ করে অফিসের দারোয়ান এসে জানালো, জয়ন্তি রিক্সায় ওর জন্য অপেক্ষা করছে। লায়লা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সাড়ে পাঁচটা বাজে। ও অবাক হয়ে ভাবলো, সাড়ে পাঁচটা? কিভাবে ও টের পেলোনা। তাড়াতাড়ি ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলো, বাড়ীর থেকে কোন ফোন এসেছিল কিনা। কিন্তু জয়ন্তির মিসকল ছাড়া আর কোন কল নেই। ও বাইরে এসে জয়ন্তির রিক্সায় উঠেই বললো, যেতেই হবে লাবন্যর বাসায়? জয়ন্তী হেসে বললো, তোর ভাল লাগবে আমি জানি, তাইতো তোকে নিয়ে যাচ্ছি।

 

লায়লা সারা রাস্তা চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, লাবন্যর বাচ্চারা কি পছন্দ করে? ওদের জন্য কিছু নিয়ে যাই?

 

জয়ন্তী বললো, ওর বাচ্চাদের জন্যনা, তুই লাবন্যর জন্য মিষ্টি কিনতে পারিস।ও মিষ্টির পোকা, মিষ্টি দেখলে কোন কথা না বলেই খাওয়া শুরু করে।

 

লায়লা রিক্সাওয়ালাকে চৌরাস্তার মোড়ে বিক্রমপুর মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়াতে বলে।মিষ্টির দোকান থেকে লাবন্যের পছন্দের লাড্ডু নিয়ে রিক্সায় ফিরে এসে আবার চুপ করে থাকে। জয়ন্তি আস্তে করে ওর হাতটা ধরে বললো, তুই চিন্তা করিস না। লাবন্য তোর কোনও কথাই জানতে চাইবে না। ও কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে কখনো কথা বলেনা। আবার অন্য কেউ বললেও পছন্দ করে না। লাবন্য আমার ছোটবেলার বান্ধবী। এখনো পর্যন্ত কোনও দিন আমাদের মধ্যে কোনও ভুল বোঝা-বুঝি হয়নি। এইবার কি মুখটা একটু হাসিহাসি ভাব করবি? কথাটা বলে নিজেই হেসে দিলো।

 

রিক্সা তখন লোন-অফিস এলাকায় চলে এসেছে। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা একতলা বাড়ী দেখিয়ে রিক্সাওয়ালাকে বাড়ীটার সামনে দাঁড়াতে বললো জয়ন্তি।

 

লায়লা অবাক হয়ে বললো, ওমা! এটা লাবন্যদের বাসা? আমার বাসার এতো কাছে? খুব ভাল হলো, আমি হেঁটেই চলে যেতে পারবো।

 

জয়ন্তি হেসে বললো, লাবন্যকে দেখার আগেই বাসায় যাবার চিন্তা? ঠিক আছে দেখি তুই কতক্ষন থাকিস।

 

কলিংবেল বেজে উঠলে লাবন্যই দরজাটা খুলে দিলো এবং জয়ন্তিকে দেখে জড়িয়ে ধরলো। তারপর বললো, ওমা! এযে লায়লা? কেমন আছিস তুই?

আয় আয় ভিতরে আয়। কত বছর পর দেখা হলরে? একটু দাঁড়া লায়লা, আগে তোকে একটু দেখি!সেই কবে কলেজে দেখেছি তারপর আজ ২৪ বছর পর দেখা।

 

লায়লা হেসে, ওর হাতে মিষ্টির প্যাকেটটা তুলে দিলো।

 

লাবন্য বললো, কি এটা? মিষ্টি? দারুন। লাবন্য লায়লাকে হাত ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে এলো। ওর ছেলেমেয়েকে ডেকে বললো, এই দেখো আমার আর একটা বান্ধবী।

 

লাবন্যর ছেলেমেয়েরা লায়লাকে সালাম দিলো এবং পরিষ্কার বাংলায় বললো, কেমন আছো তুমি? তোমার নাম কি? লায়লার খুব মজা লাগলো ওদের মুখে বাংলা শুনে। লায়লা নিজের পরিচয় দিয়ে, জানতে চাইল তোমাদের নাম কি?
ছেলেটা বললো লুৎফি আর মেয়েটি বললো ইন্নি।লায়লা বলল খুব সুন্দর নামতো! কে রেখেছে এতো সুন্দর নাম? দুইজনে একসাথে বললো, বাবা।

লায়লার মনের ভিতরের অস্বস্তি ভাবটা আস্তে আস্তে চলে যেতে থাকলো। লাবন্য সত্যিই কচুশাকের বাটি নিয়ে খাওয়া শুরু করলো। এর মধ্যে লাবন্যর মা-বাবা অন্যঘর থেকে বের হয়ে এলেন। লায়লার সাথে লাবন্য তাদের পরিচয় করিয়ে দিলো। লাবন্যর মা বললেন, ভাত দিয়ে কচুশাক খাও। লাবান্য বললো, আগে এমনি একটু খাই তারপর রাতে ভাত দিয়ে খাবো। লায়লারা সবাই হেসে দিলো। উনারাও লায়লার সাথে গল্প শুরু করে দিলেন। এই সময় লাবন্য ভেতরের ঘর থেকে হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে ফিরে এলো। প্যাকেটটা লায়লার হাতে দিয়ে বললো, তোর জন্য খুব সামান্য কিছু উপহার। লায়লা বললো, এটা আবার কেন?

 

লাবন্য বললো, এটা তেমন কিছু নারে বোকা।এটা হল আমার স্মৃতি। যখন আমি থাকবো না, তখন এটার দিকে তাকালে তোর মনে হবে আমার কথা। মনে হবে অনেক দূরে বসেও কেউ তোর কথা চিন্তা করেছে। বলতে পারিস, আমাকে মনে রাখার একটা ব্যবস্থা করে গেলাম। বলেই, লাবন্য খুব মায়া করে হেসে দিলো।

লায়লা যতই লাবন্যকে দেখছে ততই অবাক হচ্ছে। ও একবারও ওর ব্যক্তিগত ব্যাপারে জানতে চাইলো না। এমনকি ওর মা-বাবাও না। লায়লা যতবার লুৎফির দিকে তাকায় ততবার চিন্তা করছিল, ওর লাবিনটাও তো এইরকম স্বাভাবিক বাচ্চা হতে পারতো! তাহলে ওর জীবনটা কত সহজ হয়ে যেতো! লায়লা লুৎফিকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমার বয়স কত বাবা? লুৎফি বললো ১২ বছর।

 

লায়লা বললো, লুৎফি তুমি কি জানো আমার একটা ছেলে আছে? তার নাম লাবিন। ওর বয়সও ১২ বছর। লাবন্য তুইকি জানিস, আমার ছেলেটা অটিষ্ট? লুৎফিরমত স্বাভাবিক না।

 

লুৎফি বললো, খালামনি ওরা আমাদের মত বাচ্চা। ওরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে একটা জগত তৈরি করে নেয়। সেই জগতের বাইরে কিছু হলে, ওদের অস্থিরতা বেড়ে যায়।

 

লায়লা বললো, তুমি কিভাবে জানো বাবা? লুৎফি বললো, আমার স্কুলেই আমার এক ক্লাসমেট আছে অটিষ্ট। আমরা একসাথেই সবকিছু করি। ওখানে সবাই একই স্কুলে পড়ে।

 

লায়লা জানতে চাইলো, তোমরা কেউ ওকে খেপাও না?

 

লুৎফি খুব অবাক হয়ে বললো, কেন খেপাবো? ওতো আমার মতোই একটা বাচ্চা।

 

লায়লা ছোট লুৎফির কথা শুনে খুবই অবাক হল। সেই সাথে একধরনের স্বস্তি আর ভাললাগা শুরু হল। হঠাৎ করে জয়ন্তির ডাকে বাস্তবে ফিরে এলো।

 

জয়ন্তি বললো, ঘড়ি দেখেছিস? কয়টা বাজে, কোন খেয়াল আছে? বলেই জয়ন্তি খালাম্মাদের কাছ থেকে বিদায় নিলো।

 

লায়লা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ৮ টা বেজে গেছে।ও এতো অবাক হলো, এতক্ষন এই অচেনা পরিবারের সাথে গল্পে মেতে ছিল টেরই পায়নি কিভাবে সময় চলে গেছে।অনেকদিন পরে বাইরের কারো সাথে মন খুলে এতো কথা বললো। লাবন্য আর ওর ছেলেমেয়ে লায়লাদের সাথে গেট পর্যন্ত এলো। তারপর ওদের রিক্সায় উঠা পর্যন্ত গেটের সামনে অপেক্ষা করলো।

 

২.

জয়ন্তি রিক্সায় উঠেই লায়লাকে বললো, আমি কি ঠিক বলেছিলাম? লাবন্যকে না দেখলে কেউ বুঝবেনা ও কেমন মেয়ে। তুই ওর সাথে যোগাযোগ রাখবি, তোর ভাল লাগবে। লাবন্যর বরটাও একই রকম। মনেই হয়না আমার বান্ধবীর বর। মনে হয় সেও আমার বন্ধু, যাকে বিশ্বাস করা যায়। যার উপর ভরসা করা যায়।

 

লায়লার বাড়ীর কাছে জয়ন্তি ওকে নামিয়ে দিয়ে রিক্সা নিয়ে চলে গেল। লায়লা নেমে গেলেই জয়ন্তি ঘড়ির দিকে তাকালো। রাত প্রায় সাড়ে আটটা বাজতে গেল, মেয়েটা মনে হয় জানালা দিয়ে বারবার বাইরে দেখছে কখন আম্মু আসবে। মাঝে মাঝে জয়ন্তির দেরী হয়ে যায় মেয়েটার কাছে যেতে। তখন মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। কেমন জানি একটা অপরাধবোধ কাজ করতে থাকে। মনে হয়, আজ মেয়ের সাথে কাটানো সময়ে কমতি পড়ে গেল।

 

জেলা স্কুলের সামনেই ওর মায়ের বাড়ী। প্রতিদিন মার কাছে মেয়েটাকে রেখে ও অফিসে চলে যায়। আবার অফিস শেষ করেই মায়ের বাড়ী এসে মেয়েকে তুলে নিয়ে তারপর নিজের বাসায় যায়। মেয়ের কথা চিন্তা করতে করতেই রিক্সা মায়ের বাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ালো।

 

জয়ন্তি রিক্সাওয়ালাকে দাঁড় করিয়ে রেখে কলিংবেল চাপ দিল। ভেতর থেকে মেয়ের আম্মু আম্মু ডাক শুনতে পেলো। আম্মু আম্মু ডাকটা শুনেই মনটা জুড়িয়ে গেল। বড় ভাবী দরজা খোলার সাথেই শান্তুনু জড়িয়ে ধরলো ওকে। বাড়ীর ভিতর মুখটা বাড়িয়ে জয়ন্তি বললো, মা আমি আজ যাই, ভেতরে আসবো না। কাল সকালে কথা হবে। আজ অনেক দেরী হয়ে গেছে। ভাবীর কাছ থেকে বিদায় নিয়েই রিক্সায় শান্তুনুকে উঠালো।

 

ভাবী পেছন থেকে বললেন, এই জয়ন্তি! লাবন্য আমাদের বাসায় কবে আসবে কিছুইতো বললি না? জয়ন্তী বললো, কাল বলবো। এখন সময় নেই ভাবী! রিক্সাওয়ালাকে খাজুরা বাসস্ট্যান্ডের কাছে যেতে বললো।

রিক্সায় উঠেই, শান্তুনু গল্প শুরু করে দিলো, কে কি বলেছে। ও সারা দিন কি করেছে। জয়ন্তি মন দিয়ে মেয়ের কথা শুনছে। একটু পরেই মেয়ে ওর কোলের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। প্রতিদিন একই রকম হয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওর বাড়ীটা যদি মায়ের বাড়ীর কাছা-কাছি হতো তাহলে শান্তুনুর জন্য খুব ভাল হতো। কিন্তু জয়ন্তির বর আরিফ, খাজুরা বাসস্ট্যান্ডের কাছ থেকে আসতে চায় না। কারন সে ছোটবেলা থেকেই ওখানেই বড় হয়েছে। ওই এলাকার সবাই তাকে চেনে। আরিফ রাত তিন টায় বাড়ী ফিরলেও কেউ তাকে কিছু বলবে না। জয়ন্তিও বোঝে, কথাটা আসলেই সত্যি।

 

কাজের চাপ বেশী থাকলে অনেক রাত হয়ে যায় আরিফের বাসায় ফিরতে। আরিফ একটা পত্রিকা অফিসে চাকরি করে। তাই প্রায় দিনই ওর বাসায় ফিরতে রাত হয়ে যায়। জয়ন্তি ওর জন্য অপেক্ষা করে। আরিফ বাসায় ফিরে এলে তারপর দুইজনে একসাথে খেতে বসে। এই সময়টা ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর কথা বলার আর সুযোগ হয় না। দুজন দুজনকে সময় দেওয়া হয়না। জয়ন্তি সবসময় রাতে রান্না করে যেন আরিফ গরম গরম খেতে পারে। আবার রান্নার সময় শান্তুনুর সাথে গল্প করলে মেয়েটার সাথেও কিছুটা সময় কাটানো হয়। জয়ন্তি শান্তুনুর কথা শোনে আর হাসে। পাঁচ বছরের মেয়ের কত কথা, কত বড় বড় ইচ্ছা! বাইরে মোটরসাইকেলের শব্দ শুনে শান্তনু বলে, বাবা এসেছে! বাবা এসেছে!

 

লাবন্য ইন্নিকে ডেকে বলে, চলো ঘুমাবে, অনেক রাত হয়ে গেছে। লুৎফিকেও ঘুমাতে যেতে বলে ফোনটা হাতে নেয়। মা বললেন, এতো রাতে আবার কাকে ফোন করবে? লাবন্য বলে, জয়ন্তি ঠিকমত বাসায় পৌঁছালো কিনা সেটা জানা হয়নি। দেশের যে অবস্থা দেখছি। কেউ বাইরে গেলে খুব ভয় করে। এতো ভয় নিয়ে কিভাবে যে মানুষ বেঁচে আছে? আমরাও বেঁচে ছিলাম একসময়। এখন সেইদিনগুলির কথা চিন্তা করি আর ভয় পাই। অপর প্রান্তে রিং হচ্ছে কিন্তু জয়ন্তি ফোন ধরছে না।লাবন্যর খুব চিন্তা হল। ও আবার ফোন করলো।

 

এইবার জয়ন্তি ফোন ধরে কোনও হ্যালো না বলেই জিজ্ঞাসা করলো, কি ব্যাপার? এতো রাতে ফোন কেন?তুই এখনো ঘুমিয়ে পড়িস নি?

 

লাবান্য বললো, ইন্নিকে নিয়ে বিছানায় এসেছি কিন্তু তোর কথা মনে হল, তাই ফোন করলাম। তুই ঠিকমত বাসায় পৌঁছালি কি না?

 

জয়ন্তি হাসলো আর বললো, আমাদের নিয়ে এতো চিন্তা করতে হবে না।আমরা কেউ স্বাধীন না,তাই সকালে বের হওয়ার সময় জীবনটা হাতে নিয়েই বের হই। প্রথম প্রথম খুব ভয় লাগতো। জানিস, এখন আর লাগে না। ভয়ের সাথে বসবাস করতে করতে ভয় চলে গেছে। আমার মনে হয়, আর কিছুদিন পর বাংলাদেশের বাচ্চারা ভয় কি জিনিস সেটা জানবে না। কারন যে বাচ্চা নিজের চোখে তার বাবা-মা এর খুন হতে দেখে তার কি ভয় বলে কিছু থাকে? বাংলা সিনেমা এখন সিনেমা হল থেকে বের হয়ে রাস্তা-ঘাটে আমাদের বাস্তব জীবনেই ঘটছে। তাই এর মধ্যে যাদের বসবাস করতে হয় তাদের কি ভয় বলে কিছু থাকে? মোটরসাইকেলের শব্দ শুনে জয়ন্তি বললো, আরিফ চলে এসেছে। আমি ওকে ভাত দেই, তুই এখন ঘুমা। আমরা এরই মধ্যে বেঁচে থাকা শিখে গেছি। বলেই জয়ন্তি ফোন রেখে দিল।

 

লাবান্য জয়ন্তির কথা গুলি শুনে বুঝতে পারলো, কথাগুলির মধ্যে অনেক ক্ষোভ, দুঃখ কষ্ট লুকিয়ে আছে। ও জানে জয়ন্তির বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাই আজ দেশের এই অবস্থা দেখে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা মনে হয় অনেক বেশী কষ্টপায়,তাই তারা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।

 

এরপর মা বিছানায় এলে লাবান্য মায়ের সাথে গল্প শুরু করল এবং কিছুক্ষনের মধ্যে ও নিজেও যেন ছোট ইন্নির মত পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে গেল। আর ছোট ইন্নি তখন ঘুমের মধ্যে লাবন্যকে জড়িয়ে ধরলো।

 

লাবন্যর মা তাকিয়ে দেখলেন কি অদ্ভুত সেই দৃশ্য! তার মেয়ে তারপাশে পরমশান্তিতে ঘুমাচ্ছে আর তারপাশেই তার মেয়ের মেয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ওদের নিষ্পাপ মুখ দেখতে দেখতে মায়ের চোখে পানি চলে আসলো। কিন্তু সেই পানি উনি নিচে পড়তে দিলেন না। কারন আর কিছুদিন পরে এই বিছানায় তাকে একাই ঘুমাতে হবে। মেয়ে চলে যাবে তার নিজের সংসারে, মেয়ের এখন আলাদা জগত হয়েছে। চাইলেও তাকে আর ধরে রাখা যাবে না। এরই নাম মনে হয় জীবন। এটা ভাবতে ভাবতেই তারও চোখ জুড়ে ঘুম চলে আসে।

 

লায়লা কলিং বেলে চাপ দিলে লাবিন এসে দরজা খুলে বললো, মা! মা! লায়লা হেসে বললো, হ্যা মা এসেছে। তুমি নাস্তা করেছো ? লাবিন চুপ করে থাকলো। ভিতরের ঘর থেকে মা বললেন না, তোমার জন্য টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে অপেক্ষা করছিল। আমি বলেছিলাম, মায়ের আসতে দেরী হবে। তারপরও লাবিন কিছুই মুখে দেয়নি।

 

লায়লা বাথরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে সোজা ডাইনিং টেবিলে এসে লাবিনকে চেয়ারে বসতে বললো, ওর প্লেটে ছোলা ভুনা তুলে দিয়ে বললো, এটা খাও বাবা। এখন রাত আটটা বেজে গেছে। তুমি কেন বসেছিলে লাবিন? আমিতো তোমার একটা খালামনিকে দেখতে গিয়েছিলাম। তুমি জানো, ওই খালামনিরও তোমার মত একটা ছেলে আছে যে তোমার বন্ধু হবে।

লাবিন এই প্রথম লায়লার দিকে তাকালো আর বললো, বন্ধু ! লাবিনের বন্ধু! কই লাবিনের বন্ধু?

 

লায়লা বুঝতে পারলো, ওর দেরি দেখে লাবিন অভিমান করেছিল।এখন বন্ধুর কথা শুনে অভিমান ভুলে গেছে। লায়লা হেসে দিলো। বললো, বন্ধু কাল আসবে তোমাকে দেখতে। বিকালে তোমার সাথে খেলা করবে তারপর লাবিন তার বন্ধুকে নিয়ে নাস্তা করবে। তখন লাবিনের বন্ধু বলবে, ওমা লাবিন কত ভাল ছেলে! কই, তুমি কিছু মুখে দাও? এইযে মা লাবিনকে খাওয়ায়ে দিবে, মুখ খোল বাবা। লাবিন মুখ খুললো। লায়লা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। মনে মনে ভাবলো যাক অভিমান কমেছে। রাতে ভাত খাবার পর লাবিনকে লাবন্যদের গল্প বললো, লুৎফির কথা, ইন্নির কথা ওকে বললো। লাবিন খুব মন দিয়ে শুনলো।লায়লা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, অনেক রাত হয়েছে বাবা, এখন ঘুমাও।মাও ঘুমাবে। কাল আবার অফিস আছে মায়ের।

 

পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠলে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে শামিমের নামটা দেখতে পেল কিন্তু ফোনটা ধরতে ইচ্ছা করছিল না। লাবিনের সাথে কথা বলাটা অনেক জরুরী। লাবিন সারাদিন একা থাকে। স্কুল খোলা থাকলে তাও ছেলেটা দিনের অর্ধেক সময় স্কুলে থাকে, তাই লায়লার এত চিন্তা হয় না। স্কুল বন্ধ থাকলে ছেলেটা একা নানীর সাথে বাসায় থাকে।

 

কখন যে লাবিন ঘুমিয়ে গেছে লায়লা টের পেলো না। লায়লা ওর ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকলো আর লুৎফিকে ভাবতে লাগলো। লাবন্যর ছেলে-মেয়ে কত কিছু বোঝে! আচ্ছা, ওরা বিদেশে থাকে এই জন্যই কি ওদের মন এত বড় নাকি আসলেই ওরা খুব ভাল? লায়লা আজ কাল কোথাও ভাল কিছু দেখতে পায়না। সব কিছুতেই যেন ওর সন্দেহ হয়। কবে যে ও নিজে এতো বদলে গেছে মনে করতে পারলো না।

 

৩.

একটা সময় ছিল, কত হাসি গান ছিল লায়লার মনে। যখন কলেজে পড়তো সেই সময়ের কথা মনে পড়ে গেল। লাবন্যর সাথে ওর পরিচয় হয়েছিল একটা গল্পের বইকে কেন্দ্র করে। লায়লা খুব গল্পের বইয়ের পোকা ছিল। একটা বই শুরু করলে সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওর ঘুম হত না। এক দিন ক্লাসে পড়ার বই এর মাঝে গল্পের বই লুকিয়ে রেখে পড়ছিল। অর্থনীতির স্যার ক্লাসের লেকচার শেষ করে কখন বের হয়ে গেছে ও জানেও না।

 

হঠাৎ করে দেখে মেয়েরা সবাই ক্লাস থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। লায়লার পরের ক্লাসটা এই রুমেই হবে তাই ও বই নিয়ে বের হয়নি। লায়লার এক বান্ধবী ডাক দিলে ও ক্লাস থেকে বের হয়ে তার কাছে গিয়েছিল। সেই সময় লাবন্য ওর টেবিলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গল্পের বইটা দেখে হাতে তুলে নিয়ে বইয়ের ভুমিকা পড়া শুরু করেছিল। লায়লা যখন টেবিলে ফিরে এলো, দেখলো ওর বইটা বন্ধ করে কে যেন সেটার ভুমিকা পড়ছে। লায়লা খুব রেগে গেল। জানতে চাইল, ওকে না বলে কেন সে বইটা ধরেছে আর বই কেন বন্ধ করেছে?

 

লায়লা তখনও লাবন্যকে চেনে না। ও লাবান্যকে বললো এটা আমার বই, তুমি না বলে ধরেছো কেন? আরো অনেক কথা বললো। লাবন্য কোনও কথার উওর না দিয়ে বইটা ফিরিয়ে দিয়ে বললো, খুব দুঃখিত, বইটা দেখে লোভ সামলাতে পারি নি।তারপর লাবন্য চলে গেল।

 

লায়লার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কেন শুধু শুধু ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করতে গেল? ওইদিন অনেক খুঁজলো লাবন্যকে কিন্তু কোথাও ওকে পেলো না। তারপরের দিন লাবন্যকে দেখে ও নিজেই দুঃখিত বললো। ওর সাথে পরিচিত হল, সেই থেকে লাবন্যের সাথে আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব হল। কিন্তু কলেজ শেষ করার পর আর কোনও দিন ওর সাথে যোগাযোগ হলনা। ও যে কোথায় হারিয়ে গেল, আর লায়লাও এতদিনে লাবন্যকে ভুলে গিয়েছিল।

 

জীবন যুদ্ধে লায়লা এত ব্যস্ত ছিল যে কারো কথা আর মনে পড়তো না। সেই কবে লাবিনকে নিয়ে একা পথ চলা শুরু করেছে। সেই থেকে আর পিছন ফিরে দেখার সময় হয়ে উঠেনি। কে যে বন্ধু আর কে শত্রু জানতে মন চাইতো না! অনেক দিন আগের কথা, প্রথম যখন লাবিনকে নিয়ে যশোর এলো। তখন চাকরি, বাসা আর লাবিনের স্কুলের ভর্তি নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকতে হতো। এরপর বড় আপা কানাডা থেকে এলে লায়লাদের সবাইকে নিয়ে বাইরে একটা রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে গেলেন।

 

তখন লায়লা লাবিনকে বের করতো না। খুব লজ্জা লাগতো। ওর মনে হতো কেন অদ্ভুতভাবে মানুষগুলি লাবিনের দিকে তাকায়? ওর খুব কষ্ট হতো তখন। কারো কাপড়ে যদি পারফিউম লাগানো থাকতো লাবিন কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতো। কারন পারফিউমের গন্ধ লাবিনের খুব প্রিয়। মানুষগুলি তখন লাবিনকে পাগল মনে করতো, খুব বিরক্ত হত এবং দূরে সরে যেত।

 

সে সময় লাবিনকে নিয়ে ওর মরে যেতে ইচ্ছা করতো। মনে হত চিৎকার করে বলে, ও পাগল না। ও অটিষ্ট বাচ্চা। তোমরা কি জান, অটিজম যাদের থাকে তাদের অটিষ্ট বাচ্চা বলে? কিন্তু ও কিছুই বলতে পারতো না, আবার কোনও ভাবেই মানুষের এই অবহেলা মানতেও পারতো না। সে যে কি ভয়ঙ্কর কষ্ট! কি যে অপমানিত অনুভব করতো, সেটা কোনও দিন কাউকে বোঝানো যাবেনা! তখন নিজেই নিজেকে বোঝাতো, লাবিনের নিজের বাবাই তার অটিষ্ট বাচ্চাকে মেনে নিতে পারেনি। তাহলে বাইরের মানুষের কাছে ও কিভাবে আশা করবে, তারা লাবিনকে ভালভাবে গ্রহন করবে? তাই সেদিন লাবিনকে মায়ের কাছে রেখে ও বড় আপাদের সাথে রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছিল।

 

ওই রেস্টুরেন্টে লায়লার স্কুলের কিছু বান্ধবীরাও ছিল এবং তারা অনেকদিন পরে লায়লাকে দেখে খুব আনন্দের সাথে গল্প শুরু করলো। এক পর্যায়ে লায়লার স্বামী এখন কোথায় আছে জানতে চাইলে ও নির্দ্বিধায় বললো, কিছুদিন হল ওদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। এটা শোনার সাথে সাথেই সবার মুখের চেহারা বদলে গেল। সবাই নিজেদের মধ্যে গল্প শুরু করলো। তারা সবাই এমন ভাব করলো, লায়লা নামে ওখানে যে কেউ আছে তারা হঠাৎ করে সেটা ভুলে গেছে। লায়লা ওদেরকে আর বিরক্ত না করে, বিদায় নিয়ে চলে এলো।

 

এরপর থেকে নিজের অজান্তেই লায়লা তার স্কুল, কলেজের বান্ধবীদের দেখলে এড়িয়ে যেতো। একমাত্র জয়ন্তিকে লায়লা কোনওভাবেই এড়িয়ে যেতে পারলো না। ওকে এড়ানোর চেষ্টা করলে, জয়ন্তি নিজেই এমনভাব করতো যেন কিছুই বুঝতে পারছেনা। জয়ন্তি কিভাবে যেন ওর বন্ধুত্বের জায়গাটা খুবই মজবুত করে ফেললো। এতোই মজবুত যে লায়লা নিজেই হেরে গেল আর জয়ন্তির উপর আস্তে আস্তে নির্ভর করা শুরু করে দিলো। মন খারাপ লাগলে জয়ন্তি ওকে বাইরে খেতে নিয়ে যেতো। কোনও ড্রেসের দোকানে জয়ন্তি গেলে লায়লাকেও সাথে করে নিয়ে যেতো। লায়লা আবার নতুন করে জয়ন্তিকে বান্ধবী বানিয়ে ফেললো। এখন জয়ন্তি ওর প্রিয় বান্ধবীদের একজন হয়ে গেছে।

 

লাবন্য খুব সকালেই এককাপ চা হাতে নিয়ে ছাদে এসে দাঁড়ালো। ছাদে এসে চায়ের কাপটা রেলিং এর উপর রেখে, হাত দুটি দুইপাশে মেলে ধরে বড় করে নিশ্বাস নিলো। এমনভাব করলো যেন সব বাতাস নিজের ভিতরে নিয়ে নিবে। তারপর হাত নামিয়ে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে ছাদের চারপাশে হেঁটেহেঁটে চা খেতে লাগলো। লাবন্যদের বাড়ীর আশেপাশে আগে কোনও তিনতলা বাড়ী ছিল না। সবারই একতলা বাড়ী ছিল, তাই আকাশটাকে ঘরের মধ্যে থেকেও দেখা যেত।

 

এখনও মনে আছে বিছানায় শুয়েশুয়ে চাঁদের আলো গায়ে মেখে গান শুনতো। কি অপুর্ব ছিল সেই রাত গুলি, আর এখন চারিদিকে এত বিশাল বিশাল পাঁচ-ছয়তলা বাড়ী তৈরী হয়ে গেছে। যার কারনে ঘরের ভেতর থেকে এখন আর আকাশ দেখা যায় না। আকাশ দেখার জন্য এখন ছাদে উঠে আসতে হয়। আহ! কি সুন্দর ডালপুরী ভাজার গন্ধ বাতাসে ভেসে আসছে।

 

বাড়ীর সামনেই পাড়ার এক চাচীর চায়ের দোকান আছে। সেখানে সকালে চায়ের সাথে ডালপুরী আর গোড়গোল্লা বানিয়ে বিক্রি করেন। গোড়গোল্লা গুড়ের এক ধরনের পিঠা। গোড়গোল্লা নাম কিভাবে এলো, এটা লাবন্যর কখনও কারো কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়নি। তবে ওর মনে হয় এই পিঠাটা  গুড় দিয়ে বানানো এবং গোলগোল হওয়ার কারনেই মনে হয় এর নাম গোড়গোল্লা হয়েছে। লাবন্য আগে একসময় এই চাচীর কাছ থেকে ডালপুরী কিনে খেতো। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পর আর খেতে পারেনা। প্রথমবার দেশে এসে খুব শখ করে কিনে খেয়েছিল, তারপর পেটের অবস্থা খুবই খারাপ হয়েছিল। সারারাত রীতিমত বদনা যুদ্ধ করতে হয়েছিল আর সেই সাথে মায়ের বকা। তারপর থেকে লাবন্য বুঝতে পেরেছিল, ও নিজে এখনও বাংলাদেশী আছে কিন্তু ওর পেট জার্মান হয়ে গেছে।

 

কাউকে যদি এই কথা বলে সে হাসবে, মনে করবে ও ঢং করছে। তাই এখন আর কাউকে এইসব কথা বলেনা। খুব সাবধানে বাইরের খাবার এড়িয়ে যায়। নিচের থেকে মায়ের ডাক শুনতে পেলো। বাসার কাজের মেয়ে হাসিনা এসে বললো, আপা টেবিলে খাবার দিয়েছি, খালা ডাকছেন। লাবন্য জানতে চাইলো, লুৎফি আর ইন্নি কি উঠেছে? এই সময় ইন্নি ছাদে এসে হাজির হলো। মিষ্টি করে একটা হাসি দিয়ে বললো, মা! এই যে আমি! ভাইয়া এখনও ঘুমাচ্ছে। লাবন্যর মনে পড়ে গেল আজ লুৎফিকে লায়লাদের বাসায় নিয়ে যেতে হবে। কাল রাতেই লুৎফি ওকে বলেছিল তার খুব ইচ্ছা লাবিনকে দেখতে যাবে। লাবন্যও কথা দিয়েছিল। ও ইন্নিকে বললো, চল মা! আমরা নানুর সাথে নাস্তা করি। ভাইয়া যখন উঠবে তখন নাস্তা করবে।

 

পরের দিন সকালে লায়লা অফিসে এসে পৌঁছানোর কিছুক্ষন পরেই জয়ন্তি ফোন করে বললো, আজ তুই বাসায় যাবি কখন?

 

লায়লা বললো, কেন রে? কোথাও যেতে হবে?

 

জয়ন্তি বললো, লাবন্য লুৎফি আর ইন্নিকে নিয়ে আজ সন্ধ্যায় তোর বাসায় যেতে চাইছে। লাবন্য আমাকে কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিল।

 

লায়লা খুব খুশি হয়ে বললো, ওমা তাই! কাল আমাকে বলেছিল কিন্তু আমি ভেবে ছিলাম, শুধুই বলার জন্য বলেছে। সত্যি কি আর আমার বাসায় যাবে?

 

ঠিক আছে তুই ওদের নিয়ে ৭টার দিকে আয়। শোন জয়ন্তি! ওর ছেলে মেয়ে কি খেতে পছন্দ করে রে?

 

জয়ন্তি বললো, ঘরে বানানো সব জিনিস ওরা খায়। শুধু বাইরের বানানো কোনও জিনিস লাবন্য ওদেরকে খেতে দেয় না। লাবন্য নিজে অবশ্য সবই খায়। ও তো তেলাপোকার মত সর্বভুক প্রানী, বলেই জয়ন্তি হেসে দিলো।

 

লায়লাও হেসে দিলো। ফোন রেখে দিয়ে অনেক দিন পর আনমনে গুনগুন করে গাইলো “হে ক্ষনিকের অতিথী, এলে প্রভাতে, পথ চাহিয়া…”

 

পাশের টেবিলের নাছিমা আপা হেসে বললেন, খুব ভাল লাগছে শুনতে লায়লা। অনেকদিন পর তুমি এই রবীন্দ্রসংগীতটা গাইলে। এতো সুন্দর তোমার কন্ঠ, খুব ভাল লাগে। এই রকম ভরাট গলায় রবীন্দ্রসংগীত দারুন লাগে।

 

৪.

লায়লা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে এলো। লাবিন খুব মন দিয়ে এক মনে কার্টুন দেখছিল। লায়লা পাশে বসে বললো, লাবিন কি করছো? এই যে মা এসেছে! কিন্তু লাবিন এক মনে টিভি দেখছে। কোনও দিকে খেয়াল নেই। ও যখন বললো, আজ সন্ধ্যায় লাবিনের বন্ধু আসবে লাবিনের সাথে খেলা করতে।

 

লাবিন সাথে সাথেই বললো, লাবিনের বন্ধু? লাবিনের বন্ধু? কই লাবিনের বন্ধু?

 

লায়লা বললো, এখনো আসেনি বাবা। সন্ধ্যায় আসবে।

 

লাবিন বললো, বন্ধু সন্ধ্যায় আসবে! বন্ধু সন্ধ্যায় আসবে।

 

লায়লা বললো, তুমি টিভি দেখো। এখন মা লাবিনের বন্ধুর জন্য নাস্তা বানাবে।

 

লাবিন বললো, আচ্ছা! টিভি দেখবো! টিভি দেখবো!

 

লায়লা রান্না ঘরে এসে কিছু নাস্তা বানালো, এরই মধ্যে মা এসে কলিং বেলে চাপ দিলেন। লায়লা দরজা খুলে দিলো। মা ভিতরে আসলে, লায়লা তাকে বললো জানো মা! আজ লাবন্য আসবে? লায়লার মা খুব খুশী হলেন কারন তিনি ও লাবন্যকে দেখতে চান। নাস্তা বানিয়ে টেবিল সাজিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালো লায়লা। ঠিক তখনই কলিং বেলের শব্দ আর সেই সাথে অনেক গুলি বাচ্চার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। মনে হল অনেক গুলি পাখির কিচির-মিচিরের শব্দ।

 

মা বললেন, দেখতো! কে এলো লায়লা?

 

লায়লা বললো, মনে হয় লাবন্যরা এসেছে। সাথে বাচ্চাদের কথাও শোনা যাচ্ছে। দরজা খুলেই দেখে লাবন্য, জয়ন্তি এবং পিউ দাঁড়িয়ে আছে। পিউকে দেখে লায়লা ভীষন অবাক হল। অনেক বছর পর ওর সাথে দেখা হল। এক সময় সবাই একই কলেজে ছিলো। আর এখন কে কোথায় আছে কেউ জানে না। জীবন মানুষকে যে কোথায় নিয়ে যায়!

 

একটা সময় পুরনো সব কিছুকে পেছনে ফেলে নতুন মানুষদের জায়গা করে দিতে হয়। কিন্তু জীবন আবার সেই পুরনো মানুষদেরকেই এক দিন হঠাৎ করে সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়! এটা যেন জীবনের অদ্ভুত এক খেলা! আর আমরা সবাই দিবা নিশি সেই খেলায় মেতে আছি। পিউ লায়লাকে জড়িয়ে ধরলো। লায়লার খুব ভাল লাগলো। পিউ ওর ছেলেদের সাথে লায়লার পরিচয় করিয়ে দিল। ছেলে দুইটি এক বছরের ছোট বড় হবার কারনে দুই ভাইয়ের মিলটা অনেক বেশী। সেই সাথে আছে লাবন্যর মেয়ে ইন্নি, ছেলে লুৎফি এবং জয়ন্তির মেয়ে শান্তুনু। তাইতো বাইরের থেকে এই রকম পাখির মত কিচির-মিচির শব্দ আসছিল। লুৎফির সাথে অন্য বাচ্চারাও ঘরের ভেতর এসে লাবিনকে ডাক দিলো।

 

লাবিন অন্য ঘর থেকে বের হয়ে এলে লাবন্য ও কে জড়িয়ে ধরে বললো, লাবিন! আমি তোমার লাবন্য খালা মনি! এই দেখ তোমার অনেক বন্ধু এসেছে তোমার সাথে পরিচিত হবার জন্য।

 

লাবিন আবার বললো, লাবিনের বন্ধু! লাবিনের বন্ধু! কোথায় লাবিনের বন্ধু?

 

লুৎফি এগিয়ে এসে লাবিনের হাত ধরে বললো, এই যে আমি তোমার বন্ধু। তারপর লাবন্য সব বাচ্চাদের সাথে লাবিনের পরিচয় করিয়ে দিলো। লাবিন সব বাচ্চাদের নামগুলিকে বিভিন্ন অক্ষরে ভাগ করে নিলো। যেমন, লুৎফিকে সে ‘ল’ এর মধ্যে রাখলো। তারপর নিজেই বললো ‘ল’ তে লুৎফি এবং ‘ই’ তে ইন্নি। এই ভাবে সব বাচ্চাদের নাম গুলিকে নিজের মধ্যে সাজিয়ে নিলো। এরপর লাবিন খুব সহজে লুৎফি এবং অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশে গেল। অন্য বাচ্চারাও খুব স্বাভাবিক ভাবে লাবিনের সাথে মিশে গেল। লায়লা নিশ্চিন্ত হয়ে গেল।

 

এরপর ওরা সব বান্ধবীরা গল্প শুরু করলো। কে কি বলছে সেটা কেউ শুনছে না। অনেক দিন পর সবাই এক সাথে সেই কলেজের মতো, কথা কম হাউ খাউ বেশী করলো। সবাই এটা বুঝতে পেরে আবার হাসা-হাসি শুরু করে দিলো।

 

লায়লার মা এসে পাশে দাঁড়ালে, লাবন্যর সাথে উনার পরিচয় করিয়ে দিলো জয়ন্তি। লাবন্য সাথে সাথেই ওর মায়ের সাথে গল্প শুরু করে দিলো। তখন লায়লা আর পিউ অনেক গল্প করলো। লাবন্য হঠাৎ করেই জানতে চাইলো, লায়লা! তোর বড় ভাবী কোথায় থাকে, যে লাবিনকে পাগল মনে করে? তাকে একটু দেখতে চাই। লায়লা হেসে বললো, হায়হায়! এই কথা তোকে জয়ন্তি বলেছে? জয়ন্তি হেসে দিলো। লায়লা বললো আমার ভাবী তো জয়ন্তির বান্ধবী! জয়ন্তি তোকে নিয়ে যাবে।

 

লায়লাদের বাড়ীটা দুই তলা। লায়লা ওর মায়ের সাথে এক তলায় থাকে আর দুই তলায় লায়লার বড় ভাই আর ভাবী। তাদেরও কটা ছেলে আছে, যে লাবিনকে পাগল মনে করে। এই জন্য লাবিনের দুই তলায় যাওয়ার কোনও অনুমতি ছিলনা আগে। এখন অনুমতি আছে কিন্তু লাবিন নিজেই এখন আর যেতে চায় না। শক্ত হয়ে নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। লায়লাদের বাসায় আসার আগেই জয়ন্তি খুব দুঃখ করে বলেছিল লাবন্যদেরকে।

 

লায়লা বললো, উনি দুই তলায় থাকেন। সাথে সাথে লাবন্য দুই তলায় চলে গেল এবং ওর সাথে সাথে পিউ আর জয়ন্তিও চলে গেল। লায়লা বাচ্চাদের সাথে নীচে থাকলো। লায়লা দেখলো লাবিন তার আঁকা ছবি গুলি দেখাতে খুব ব্যস্ত আর লুৎফি খুব মন দিয়ে ছবি গুলি দেখছে। কিছুক্ষন পর লাবন্যরা নিচে নেমে এলে লায়লা জানতে চাইলো কেমন দেখলি?

 

লাবন্য হেসে বললো, উনিতো নিজেই পাগল তাই সবাইকে পাগল মনে করেন। লায়লা তুই মনে কষ্ট পাবি না।

 

লাবন্যর বলার ভঙ্গি দেখে লায়লারা সবাই হেসে দিলো। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে তাই ওরা আর বসলো না। লায়লার মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওরা চলে গেল। ওদের কে রাস্তা পর্যন্ত দিতে লায়লা এবং লাবিন বাড়ীর থেকে বের হয়ে এলো। ওদের চলে যাওয়ার দিকে লায়লা আর লাবিন তাকিয়ে থাকলো অনেক্ষণ। ওরা যখন চোখের আড়ালে চলে গেল তখন লায়লা অনুভব করলো লাবিন খুব শক্ত করে ওর হাত ধরে রেখেছে। লায়লা লাবিনকে বললো, তুমি মন খারাপ করবেনা। আমি তোমাকে তোমার বন্ধুর কাছে নিয়ে যাবো।

 

লাবিন কোনও কথা বললো না। বাসায় এসে নিজের ঘরে চলে গেল। তারপর কাগজ আর রঙ নিয়ে ছবি আঁকতে বসলো। লায়লা বুঝতে পারলো যে লুৎফির সাথে কাটানো সময়টাকে সে ছবির মধ্যে ধরে রাখবে। একটা সময় লায়লা জানতোনা লাবিন ছবি আঁকতে পারে। একদিন দূপুরে ওকে ঘুম পাড়াতে যেয়ে লায়লা নিজেই ঘুমিয়ে গিয়ে ছিলো। তখন লাবিন মাত্র ৩ বছরে পা দিবে। ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেলো, লাবিন একটা কলম দিয়ে ওর দুই হাত ভরে গাড়ীর ছবি এঁকেছে।

 

এবং সেই গাড়ী গুলি লায়লার ছোট ভাই ওকে খেলার জন্য কিনে দিয়ে ছিল। লাবিন খুব গাড়ী পছন্দ করে, সব মডেলের গাড়ী তার দেখতে হবে, জানতে হবে। লায়লা তার মা আর ছোট ভাইকে হাত ভরে আঁকা গাড়ীর ছবি গুলি দেখালে সবাই খুব মজা পেয়ে ছিল। আবার একই সাথে খুব সুন্দর পরিপাটি ভাবে আঁকা ছবি গুলি দেখে ভীষন অবাক হয়ে গিয়েছিলো। এর পরই লায়লা ওকে কাগজ এবং রঙ কিনে দিলো। ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ দেখে ছবি আঁকার স্কুলে ভর্তি করে দিলো।

 

কিন্তু অন্য অভিভাবকরা আড় চোখে ওর দিকে তাকানো শুরু করলো। বাচ্চারা ওকে দেখলে ভয়ে সরে যেতো। লাবিন আবার মন খারাপ আর অভিমান করা শুরু করলো। লায়লা খুব কেঁদেছে, অসহায় বোধ করেছে। কিন্তু কেউ ওর সেই অসহায়ত্বকে বুঝতে পারেনি। কেউই লাবিনকে বুঝতে চাইলো না যে ও অন্য বাচ্চাদের মত ছোট একটা বাচ্চা। প্রার্থক্য শুধু একটাই যে ও অটিষ্ট বাচ্চা। ও কাউকে কোনও ক্ষতি করছেনা।

 

ও ওর মত থাকতে পছন্দ করে। তাহলে ওকে দেখে কেন অন্য বাচ্চারা অন্য জায়গায় চলে যাবে? বাচ্চাদের মায়েরাও কেন তাদের বাচ্চাদের মতনই লাবিনকে দেখলে কানা-ঘুষা শুরু করে? কেন সরে দাড়ায়? শেষ পর্যন্ত লাবিনের আঁকার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিতে হলো। ঠিক যেমনটি সাধারন স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছিলো।

 

নিজের শহরে ফিরে এসে, লায়লা সব কিছু একটু গুছিয়ে নিয়ে লাবিনকে সাধারন একটা স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলো। কিন্তু স্কুলের বাচ্চারা ওকে এত বেশী খেপাতে লাগলো যে ও মানসিকভাবে আবার ও অসুস্থ হতে শুরু করলো। ওর অভিমানের মাত্রা বেড়ে গেল এবং সেই সাথে অস্থিরতাও বেড়ে গেল। অভিমান হলেই নিজেকে আলমারীর পিছনে লুকিয়ে ফেলতো এবং ঘন্টার পর ঘন্টা ওই অন্ধকারে বসে থাকতো।

 

বাসায় কোনও মানুষ আসলে ও লুকিয়ে থাকতো। মা কত দিন বলেছেন, ওকে বের করে নিয়ে আয়, ওর যদি কোনও বিপদ হয়? লায়লা নিজের উপর রাগে কষ্টে বলতো, ও ওখানেই থাকুক। ওর কিছু হবে না। রাতে সবাই চলে গেলে, ঘুমন্ত লাবিনের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব কাঁদতো। নিজেকে মেরে ফেলতে ইচ্ছা করতো। কিন্তু লাবিনের মুখের দিকে তাকালে আর কিছুই করা হতো না লায়লার। কারন ও ভাবতো, ওর কিছু হলে লাবিনকে দেখাশুনা করবে কে? মা হয়ে কিভাবে নিজের স্বার্থে বাচ্চাকে একা রেখে মরে যেতে চায়? তখন নিজেকে ওর অপঁয়া মনে হতো। সে যে কি ভীষণ কষ্ট, কি অপরিসীম ব্যথা কাউকে কোনও দিন ওর বলা হয়নি। টেবিল গোছাতে গোছাতে অনেক দিন পর সেই সব দিন গুলির কথা ভাব ছিলো। হঠাৎ মায়ের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো।

 

মা বললেন, লাবান্যকে খুব ভাল লেগেছে। নিজে যেমন বাচ্চাদেরও ঠিক তেমন করেই মানুষ করতে পেরেছে। আমি তো কিছুই পারলাম না। লায়লা বুঝতে পারলো মা বড় ভাইয়ার কথা ভাবছেন। সারাক্ষণ মা বড় ভাইয়ার কথা চিন্তা করেন। বাবা মারা যাবার পর মা মনে করে ছিলেন, বড় ভাই লায়লাদের সবাইকে আগলে রাখবে বাবার মত। কিন্তু হাতের পাঁচটা আঙ্গুল যেমন সমান হয়না ঠিক সেই রকম লায়লার ভাই-বোনেরাও মনে হয় সমান হয়নি।

 

লায়লা যখন প্রথম মায়ের কাছে এলো তখন বড় ভাই আর ভাবী বলেছিল এই পাগল ছেলেকে নিয়ে তুই কেন চলে এলি? লায়লা অবাক হয়ে গিয়েছিল। কথা হারিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। মা সেই দিনই লায়লাকে নিয়ে নিচে নেমে এলেন। আবার তার সংসার শুরু করলেন লায়লা আর লাবিনের সাথে। কিন্তু মা কোনও দিন ভাইয়াকে, ভাবীকে কিছু বলেননি। এমন কি এখনো বাসায় বাইরের লোক আসলে বুঝতে পারেনা যে মা উপরে যান না। লায়লা নিজেও কখনও ভাইয়ার উপর রাগ হয় না, কারন লাবিনের বাবা যখন নিজেই তার ছেলেকে পাগল মনে করে তখন অন্যরা পাগল বললে তাদের আর দোষ কি?

 

মা! মা! বলে ডেকে উঠলো লাবিন। ওর ডাক শুনে লায়লা পাশে গিয়ে দেখলো লাবিন তার আর লুৎফির এবং অন্য সব বাচ্চাদের ছবি একেঁছে। লাবিনের ছবির মধ্যে দুইটা মেয়ে দেখে ইচ্ছা করে জানতে চাইলো এরা দুই জন কে?

 

লাবিন বললো, বোন! বোন! ইন্নি, শান্তুনু।

 

লায়লা জানতে চাইলো, লাবিন কি বোনদের ভালবাসে?

 

লাবিন বললো, লাবিন বোনদের ভালবাসে! বোনদের ভালবাসে!

 

লায়লা আর ওর মা দুইজনেই হেসে দিলো। লায়লা লাবিনকে জড়িয়ে ধরে বললো, লাবিনের বোনরাও লাবিনকে খুব ভালবাসে।

 

লাবিন বললো, বোনরা ভালবাসে! বোনরা ভালবাসে!

 

৫.

লাবন্য আজ খুব খুশী কারন পিনাকী আজ যশোর আসবে। পিনাকীকে আনতে ও নিজেই এয়ারপোর্ট যেত। কিন্তু জয়ন্তি অফিস শেষ করে যাবে তাই লাবন্য আর যায়নি। কিছুক্ষণ পর জয়ন্তি আর পিনাকী এসে কলিং বেল চাপ দিলো। ইন্নি আর লুৎফি, বাবা! বাবা! বলে দরজা খুলতে গেল। দরজা খুললেই পিনাকী ছেলে-মেয়েদের জড়িয়ে ধরলো। লাবন্য জানে পিনাকীর জন্য বাচ্চাদের ছেড়ে থাকাটা বেশ কষ্টের একটা ব্যাপার। তারপরও পিনাকী এতদিন ঢাকায় ওর আম্মার কাছে ছিল।

 

পিনাকীর পিছনে জয়ন্তি আর লায়লা দাঁড়িয়ে আছে দেখে, লাবন্য ওদের কে ভিতরে আসতে বললো। লায়লা তাঁকিয়ে তাঁকিয়ে পিনাকী আর বাচ্চাদের আদর-ভালবাসা দেখছে। লাবান্য ব্যাপারটা লক্ষ করে বললো, বাচ্চারা বাবাকে ছেড়ে একা থাকতে পছন্দ করেনা। কোথাও বেড়াতে গেলে সবাই এক সাথেই যাই। এইবার আমি বাচ্চাদের নিয়ে একা চলে আসার জন্য বাচ্চারা মনে মনে খুব অখুশী হয়েছিল। পিনাকীর ও ভালো লাগে না। প্রতিদিন ফোন করে মাথা খারাপ করে দিয়ে ছিলো। লায়লা তেমন কোনও কথা বললো না। খুব বেশী চুপ হয়ে ছিল। পিনাকী লায়লার সাথে কথা বললো। ওদেরকে পরের দিন দূপুরে এক সাথে খেতে বললো। লাবিনকেও নিয়ে আসতে বললো।

 

লায়লা অবাক হয়ে বললো, পিনাকী ভাই আপনি আমার ছেলের নাম জানেন?

 

পিনাকী বললো, ফোনে লুৎফি আমাকে লাবিনের কথা বলেছে। লুৎফি লাবিনের বন্ধু।

 

লায়লা বললো, ঠিক আছে ভাইয়া। আমি লাবিনকে নিয়ে আসবো। তারপর জয়ন্তি আর লায়লা চলে গেল।

 

জয়ন্তি লায়লাকে ওর বাসার সামনে নামিয়ে রিক্সা নিয়ে সোজা বাসায় চলে গেল কারন আজ শান্তুনুকে ওর বাবা নানীর কাছ থেকে নিয়ে এসেছে। অনেক দিন পর পিনাকীকে দেখে জয়ন্তিরও খুব ভাল লাগলো। লাবন্যর সাথে বিয়ের পর যে দিন পিনাকীর সাথে লাবন্য পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সেই থেকে পিনাকীকে ও বন্ধু বলে ডাকে। কখনও পিনাকী ভাই বলা হয়নি। আরিফের সাথে বিয়ের পর আরিফ জিজ্ঞাসা করে ছিল, বন্ধু কেন বলো?

 

জয়ন্তি বলেছিল, লাবন্য আমার প্রিয় বান্ধবী, ও সবসময় বলতো বন্ধুর কোন লিঙ্গ হয়না। বন্ধু মানে বন্ধু। সেই থেকে হয়তো পিনাকীকেও জয়ন্তি বন্ধু মনে করে ছিলো। লাবন্য আর পিনাকী এমন ভাবে মিলেমিশে থাকে মনে হয় ওরা একে অন্যের ছায়া। ওদের এই সম্পর্কটা দেখতেই জয়ন্তির বেশী ভাললাগে। আজ লায়লাও মনে হয় লাবন্যদের এই ব্যাপারটা লক্ষ করেছে।

 

লায়লার কথা মনে হতেই মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল। কোন কিছুই মাথায় আসেনা। মাঝে মাঝে মনে হয় এমন না হলে কি এমন ক্ষতি হত? লায়লার পরিবার খুবই ভাল। সব ভাই বোনেরা ভাল আছে। নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত আছে আর লায়লা? খালাম্মা যখন থাকবেন না, তখন লায়লা কি করবে?

 

হঠাৎ করে রিক্সা ওয়ালা জানতে চাইলো, ডান দিকে যাবো নাকি বাম দিকে যাবো আপা?

জয়ন্তি ডান দিকে যেতে বললো।

 

লায়লা বাসায় এসে খুব চুপ-চাপ ছিল। লাবিন নিজের মত খেলা করছিল। তার পর নানীর সাথে ভাত খেয়ে লায়লার পাশে এসে বসলো। লায়লা তাড়াতাড়ি অ্যালবাম বন্ধ করলো। কিন্তু লাবিন ঠিকই দেখে ফেললো অ্যালবামটা এবং খুব শক্ত হয়ে গেল।

 

লাবিন বললো, দেখবেনা। লাবিন দেখবেনা। লাবিন দেখবেনা।

 

লায়লা বললো, আমি দেখছিনা বাবা। তুমি ঘুমিয়ে পড়। আসো মা গল্প বলবে আর লাবিন ঘুমাবে।

 

লাবিন বললো, লাবিন গল্প শুনবেনা। গল্প শুনবেনা।

 

লায়লা হেসে বললো, লাবিন তার বন্ধু লুৎফির গল্প শুনবেনা?

 

লাবিন বললো, লাবিনের বন্ধু লুৎফি। বন্ধু লুৎফি। লুৎফি যাবো মা।

 

লায়লা বললো ঠিক আছে তোমাকে কাল লুৎফির কাছে নিয়ে যাবো। সাথে সাথে লাবিনের মন ভাল হয়ে গেল। লায়লাও স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। লাবিন খুবই অভিমানী হয়ে যায় এই অ্যালবামটা দেখলে, কারণ এখানে জুলফিকারের ছবি আছে। লাবিন যখনই তার বাবার ছবি দেখে, তখনই খুব শক্ত হয়ে যায়। খুব অভিমান করে এবং লুকিয়ে থাকে। কারো সাথে কথা বলেনা।

 

প্রায় ৪ বছর পর অ্যালবামটা বের করে দেখছিল। আজ ইন্নি এবং লুৎফিকে ওদের বাবার সাথে খুনসুটি করতে দেখে জুলফিকারের কথা মনে পড়ে গেল। লাবিনের জন্য কি জুলফিকারের একটুও কষ্ট হয়না? একবারও কি জুলফিকারের মনে হয় না ছেলেটা কত বড় হয়েছে? কার মত দেখতে হয়েছে?

 

চোখ বন্ধ করলেই সব কিছু চোখের সামনে ভেসে উঠে। মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। লায়লার বড় খালার ছেলে ওদের সবার মধ্যে বড়। তারই বন্ধু ছিল জুলফিকার। বড় খালার বাড়ীতেই প্রথম জুলফিকারের সাথে পরিচয় হয়েছিল। প্রথম দেখাতেই দুইজন দুইজনকে ভালবেসে ফেলেছিল। যাকে বলে “Love at first sight”, ঠিক সেই রকম একটা ব্যাপার হয়েছিল। দুই মাসের মধ্যেই বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পরই জুলফিকার লায়লাকে নিয়ে চট্টগ্রাম চলে যায়। প্রথম ছয় মাস স্বপ্নের মত ওদের দিনগুলি চলে গিয়েছিল।

 

নতুন সংসার, কত কাজ। কি ভাবে ঘর সাজাবে? বিকালে জুলফিকার বাসায় এলে চায়ের সাথে কি নাস্তা দেবে? এই সব চিন্তায় সারাদিন মশগুল থাকতো লায়লা। ও রান্না করতে খুব পছন্দ করে। সবাই ওর রান্নার দারুন প্রশংসা করে। একমাত্র লায়লাই জানে ওর এই ভাল রান্না করার পিছনেও ছিল জুলফিকার। কারন জুলফিকার বিভিন্ন পদের রান্না খেতে ভালবাসতো। একটা মানুষকে ভালবেসে নিজের সব কিছু অবলীলায় ভুলে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে মনে হয় লায়লা নিজের অস্বত্বিতকেই মনে হয় ভুলে গিয়েছিল।

 

লায়লার মনে হয়েছিল এই ছয় মাস ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল। স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল যখন ডাক্তার বললো, ও মা হবে। জুলফিকার কিছুতেই বাচ্চা নিতে রাজী ছিলনা। বার বার বলেছিল, বাচ্চাটাকে ফেলে দাও। আমি এখন বাচ্চা চাইনা। কিন্তু লায়লা কিছুতেই বাচ্চাটাকে মেরে ফেলতে পারেনি।

 

লায়লা অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। ও মা হয়ে কিভাবে নিজের বাচ্চাকে খুন করবে? জুলফিকার তখন ওকে পালটা যুক্তি দেখিয়েছিল, বাচ্চা এখন ও হয়নি আর এটা মেরে ফেলা নয়। অনেকেই এটা করে। লায়লা বার বার বলেছিল, আমার ভিতরে আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব দিন দিন বড় হচ্ছে। এটা আমাদের ভালবাসা। কোনও ভাবেই আমি একে মেরে ফেলতে পারবো না।

 

লাবিন যখন পেটে, সেই সময়টা খুবই খারাপ গিয়েছিল লায়লার। ও সবসময় নিজেকে বোঝাতো, বাচ্চাটার মুখ দেখার পর জুলফিকার বদলে যাবে। ছোট শিশুর মুখের হাসি, বাবা ডাক শুনে বাচ্চা না রাখার সিদ্ধান্তের জন্য নিজেই একদিন লজ্জা বোধ করবে।

 

কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তখন হেসে ছিলেন। তা না হলে লাবিনের জন্মের পর থেকেই লায়লার উপর মানসিক অত্যাচারের মাত্রা আরোও বেড়ে গিয়েছিল কেন? তারপর সেই সীমাও অতিক্রম করে জুলফিকার এক দিন লায়লার গায়ে হাত তুলে ফেললো। লায়লা তখন হতবাক হয়ে গিয়েছিল। দুই দিন কথা বললো না। ঠিক রাগে নয়, নিজের মনকে কোনও ভাবেই বোঝাতে পারছিল না। ওকি এই ছেলেকেই ভালবেসে ছিল? জুলফিকার ও বাড়ী আসলো না।

 

লায়লা বাড়ীতে লাবিনকে নিয়ে একা, অসহায় চুপ-চাপ কাটিয়ে দিলো। তারপর জুলফিকার বাড়ী ফিরলো। লায়লার কাছে ক্ষমা চাইলো। ওর খুব অভিমান হল, তারপরও ক্ষমা করে দিলো। এরপর কিছুদিন ভাল ভাবে সংসারটা চলছিল। লায়লা মনে করে ছিল সবঠিক হয়ে গেছে।

 

এই বার লাবিনকে নিয়ে শুরু হল নতুন চিন্তা। ছেলেটা কথা বলেনা, নিজের মত নিজেই খেলা করে। পাশের বাসার এক ভাবী বললেন, ওকে ডাক্তার দেখান। লায়লা জুলফিকারকে বললো ডাক্তারের কথা। আবার শুরু হল অশান্তি। তার মধ্যেও লায়লা জোর করে জুলফিকারসহ লাবিনকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ডাক্তার লাবিনকে দেখে কিছু পরীক্ষা করে তারপর বললো লাবিন অটিজম অসুখ নিয়ে জন্ম নিয়েছে। যেসব বাচ্চাদের মধ্যে অটিজম থাকে তাদেরকে অটিষ্টক বাচ্চা বলে।

 

লায়লার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো আর জুলফিকার রাগে পাগল হয়ে গেল। এরপর শুরু হল লায়লার উপর নরক যন্ত্রনা। জুলফিকারের সাথে তাল মেলালো শশুর বাড়ীর লোকেরা। পাগল ছেলের মা হওয়ার অপরাধে তারা লায়লাকে তালাক দিতে বললো। এক দিকে লায়লার উপর জুলফিকারের রাগ। আর সেই রাগের পরিনতি হিসাবে শুরু হল নতুনভাবে মানসিক এবং শারীরিক অত্যাচার।

 

এরপর একদিন জুলফিকার রাগের মাথায় লাবিনকে পাগল ছেলে বলেই ওর দিকে হাত উঁচু করলো। তখন কোথা থেকে যেন লায়লার ভেতর থেকে অনেক সাহস আর শক্তি চলে আসলো। কোনও কিছু চিন্তা না করেই লাবিনকে নিয়ে সেইদিন ও এক কাপড়ে বাসা থেকে বের হয়ে এলো।

 

কোথা থেকে এত সাহস সেদিন পেয়েছিলো আজ ও মনে করতে পারেনা লায়লা। হয়তো লাবিনের চোখে যে ভয় আর আতঙ্ক সে দেখেছিলো সেটাই ওর মাতৃস্বত্তাকে সাহস জুগিয়েছিল। লায়লা বাসে করে একাই লাবিনকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে সোজা খুলনায় ওর বড় খালার বাড়ী চলে এসেছিলো।

 

খালা লায়লাকে দেখে খুব কেঁদে ছিলেন। এরপর ডিভোর্সের চিঠি পাঠালে এক বার জুলফিকার খালার বাসায় এসেছিল। তখনও জুলফিকার চিৎকার করে লায়লাকে গালাগালি দিয়েছিল। লায়লা কোনও কাজের না, সে বিয়ে না করলে কেউ এই অপঁয়া মেয়েকে বিয়ে করতো না। ওর পেটে পাগল ছেলে হয়েছে এবং আরও অনেক নোংরা কথা বলেছিল। শেষের দিকের কথাগুলো লায়লা ঠিকমত শুনেনি। কারন তখন লায়লার নিজের প্রতি করুনা হচ্ছিল এই ভেবে, যে আসলেই তো ঠিক! ওর দ্বারা কিছুই হবে না। তা-না হলে জুলফিকারের মধ্যে যে একটা পশু লুকিয়ে আছে সেটা লায়লা কি ভাবে বুঝতে পারেনি?

 

সেই সময় হঠাৎ লায়লা দেখে লাবিন পাশের ঘর থেকে বের হয়ে এসে ওর বাবাকে দরজা দেখিয়ে বলছে, যাও! যাও! লায়লা আর ওর খালা ওই দিন খুবই অবাক হয়েগিয়েছিল কারন লাবিন ‘মা’ছাড়া, এই প্রথম স্পষ্ট করে অন্য একটা নতুন শব্দ বললো। লাবিন ওর বাবাকে ‘যাও যাও’ বলে চিৎকার করছে। জুলফিকার নিজেও অবাক হয়েগিয়েছিল কারন এরপর আর কোনও কথা সে বলেনি এবং দরজা খুলে চলে গিয়েছিল। কোনও ঝামেলা ছাড়াই ওদের ডিভোর্স হয়ে গেল।

 

লায়লা লাবিনকে নিয়ে মায়ের কাছে চলে এলো। বড় ভাইয়া, ভাবী তখন সমাজের কথা চিন্তা করে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। সারাক্ষন বাসায় অশান্তি। ভাবী সবাইকে বলতো লাবিন একটা পাগল ছেলে। ভাবী নিজেই লাবিনকে দেখলে ভয়ে সরে যেত। লাবিনের নিজের বানানো জগতের মধ্যে কোথাও ভাবীর মত মানুষ ছিলনা।

 

তাই লাবিনও ভাবীকে দেখলে অস্থির হয়ে যেত। দিনকে দিন লাবিনের অস্থিরতা আরো বেড়ে গেল এবং ওর অস্থিরতা বেড়ে গেলে সাধারন মানুষ তখন লাবিনকে আরও পাগল ভাবতে থাকে, এড়িয়ে চলে। লায়লাও তখন এত অসহায় হয়ে পড়েছিলো, মাঝে মাঝে মনে হতো ও লাবিনকে নিয়ে ঘরের কোনায় লুকিয়ে থাকবে। কারও সামনে লায়লার বের হতে ইচ্ছা করতো না।

 

এরপর একসময় ছোট বোনের বিয়ে ঠিক হল। সবাই কত আনন্দ করছিল আর ও লাবিনকে নিয়ে একা একা থাকতো। কারো সামনে যেতো না যদি কেউ লাবিনকে পাগল বলে? লায়লা মা হয়ে কি ভাবে সেটা সহ্য করবে? কিন্তু এই প্রথম সৃষ্টি কর্তা মনে হয় লায়লার প্রতি সদয় হলেন তাই ছোট বোনের শ্বশুড়বাড়ীর লোকেরা লাবিনকে খুব ভালবাসা দিলেন।

 

তারা লায়লাকে বোঝালেন, লাবিনকে নিয়ে বের হতে। দশটা সাধারন বাচ্চার সাথে লাবিনকে মিশতে দিতে। আস্তে আস্তে তাহলে লাবিন অনেক ভাল হয়ে যাবে। মানুষের সামনে লায়লা এবং লাবিন দুই জনে এক সাথে একটু একটু করে বের হতে শুরু করে। নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য লায়লার একটা চাকরী খুব দরকার হয়ে পড়লো। লায়লা চাকরী খোঁজা শুরু করলো। প্রথম দিকে মা বলেছিলেন, তিনি-তো চাকরী করছেন! লায়লাকে এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। লায়লা বাসায় লাবিনের সাথে থাকলেই ভাল হবে।

 

পরে মা নিজেই মনে হয় বুঝেছিলেন যে বাইরে গেলে, চাকরী করলে দশটা নতুন মানুষের সাথে মিশলে লায়লা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে। তখন উনিও উৎসাহ দিলেন চাকরী করার জন্য আর সেই সময় এই এনজিওতে ওর চাকরী হল।

 

এই এনজিও শুধুমাত্র অসহায় বাচ্চাদের উপর কাজ করে। তাই লায়লার আরও ভাল লাগলো। চাকরীতে যোগ দেওয়ার আগেই লায়লা লাবিনকে বোঝাতে থাকলো, মা সারাদিন অফিসে থাকবে। লাবিনকে নানীর কাছে থাকতে হবে। সকালে স্কুলে যেতে হবে। লাবিনের জগতের মধ্যে এই সব তথ্য আর চিন্তাটা খুবই সুন্দর করে সাজিয়ে দিলো ও।

 

তারপর প্রথম যেদিন লায়লা অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরী হলো তখন লায়লা কাঁদতে থাকে কারন এর আগে ও কখনও লাবিনকে একা রেখে এত লম্বা সময় বাইরে থাকেনি। কিন্তু লায়লাকে আর নানীকে অবাক করে দিয়ে লাবিন লায়লার চোখ মুছিয়ে দিল।

 

লাবিন বললো, লাবিন আর নানী থাকবে। মা অফিসে যাবে। লাবিনের জন্য মা গাড়ী কিনবে। লাবিন আর নানী থাকবে! থাকবে!

 

মা বললেন, দেখেছো আমার নানা ভাই কত বড় হয়ে গেছে? কত সুন্দর করে তোমাকে বোঝাচ্ছে। এখন তুমি অফিসে যাও তা না হলে প্রথম দিনই তোমার দেরী হলে সবাই খারাপ মনে করবে। লায়লা দেরী না করে বের হয়ে গেল। কিন্তু লায়লার ভাগ্যে মনে হয় সুখ শব্দটার কোনও অস্তিত্ব নেই তাই কিছু দিন পরই অফিসে কানা-ঘুষা শুরু হল। ডিভোর্সি একটা মেয়ে, ছেলে আছে এবং সে আবার পাগল! কেউ কেউ আবার অনেক উৎসাহ নিয়ে লায়লাকে জিজ্ঞাসা করা শুরু করলো।

 

লায়লা প্রতিদিন অফিস থেকে বাসায় এসে বাথরুমে দাঁড়িয়ে একা একা কাঁদতো। মা সবই বুঝতেন কিন্তু কিছুই জিজ্ঞাসা করতেন না। কারন মায়ের স্কুলেও তো সেই একই কানা-ঘুষা আর সেই সাথে মাকে নিয়ে করুনা। এই সময় জয়ন্তির সাথে লায়লার আবার দেখা হল। জয়ন্তি লায়লাকে সাহস দিলো। সবার প্রশ্নের উওরে একটা হাসি দিতে শেখালো। মন বেশী খারাপ থাকলে জয়ন্তি বাইরে খাওয়াতে নিয়ে যেত। আস্তে আস্তে লায়লা নিজেকে এবং লাবিনকে গুছিয়ে ফেললো। লাবিনের জন্য বাসায় একজন আর্ট টিচার রেখে দিলো। লাবিন অনেক খুশী হল।

 

৬.

চারিদিক থেকে সকালের আযান শুরু হলো। লায়লাও বিছানা থেকে উঠে পড়লো। সারারাত ঘুম না হওয়ার জন্য ওর মাথাটা খুব ঝিমঝিম করছে। নামায পড়ে উঠে চা বানাতে গেল। মায়ের শব্দ পেয়ে জিজ্ঞাসা করলো, মা তুমি কি চা খাবে?

 

মা বললেন, আদা দিয়ে চা দিতে পারো। গলা ব্যথা করছে। মনে হয় জ্বর আসবে!

 

লায়লা আদা দিয়ে চা বানিয়ে মাকে দিলো এবং সেই সাথে কপালে হাত দিয়ে দেখলো, জ্বর আছে কিনা? কপালটা গরম মনে হল। মাকে বললো, আজ শুক্রবার তুমি সারাদিন বিশ্রাম করবে। আমি বাজার করে তারপর রান্না করবো। তুমি বিছানা থেকে উঠবে না আজ।

 

এরপর লায়লা বারান্দায় চা নিয়ে এসে বসলো। সকালের এই ঠান্ডা বাতাস আর আস্তে আস্তে সূর্য্যের উঁকি দেওয়া তারপর হঠাৎ করে চারিদিকে ঝলমলে আলো ছড়িয়ে সবাই কে জানানো যে দিনের শুরু হল। নতুন দিন তাই নতুন কিছু আশা নিয়ে সে এসেছে। লায়লাও নতুন দিনের দিকে তাকিয়ে নতুন কোনও স্বপ্ন আর আশার আলো খুঁজে চলছে। একদিন লাবিন স্বাভাবিক মানুষদের সাথে মিশতে পারবে এবং স্বাভাবিক মানুষরা লাবিনকে সুন্দরভাবে গ্রহন করবে। সূর্য্যের আলোর মতো ওদের জীবনে সেই আলোর জন্য লায়লা অপেক্ষা করে প্রতিদিন।

 

হঠাৎ করেই ফোনটা বেজে উঠলে তাঁকিয়ে দেখে শামীম ফোন করেছে। লায়লা হ্যালো বললে অপর প্রান্ত থেকে শামীম হ্যালো বললো। জানতে চাইল, লায়লা আর লাবিন কেমন আছে! খুব ব্যস্ত না কি? লায়লা লাবন্যর কথা বললো। তারপর আরও কিছু অফিসের কথা বলে ও ফোন রেখে দিলো। লায়লা ঘরে এসে কাঁচাবাজারে যাওয়ার জন্য তৈরি হবে শুনেই মা বললেন ফ্রিজে অনেক কিছু আছে। কিছু লাগবেনা। লাবিনকে নিয়ে তুমি লাবন্যর বাসায় যাও।

 

শামীম ফোনটা রেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে লায়লার কথা ভাবছিল। শামীমের কেন জানি লায়লাকে খুব ভাললাগে। এখনও মনে আছে যে দিন লায়লাকে প্রথম দেখেছিল। শামীম মাত্র ১ বছর আগে ঢাকার প্রধান অফিস থেকে যশোরে ওদের এনজিওর প্রধান হয়ে এসেছে। শামীমদের এনজিও অসহায় শিশু এবং নারীদের জন্য কাজ করে। যশোরে আসার কিছু দিন পরই লায়লাদের এনজিওতে একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেখানেই প্রথম লাবিনকে দেখেছিল ও। লাবিন গান শুনে জোরে জোরে হাত তালী দিয়েছিল এবং সেই শব্দ শুনে ও পিছনে তাঁকাতেই লাবিনকে দেখতে পায়।

 

পাশেই লায়লাদের অফিসের এক সহকর্মী বসে ছিলেন। তাকে বাচ্চাটার কথা জিজ্ঞাসা করলে উনি লায়লাকে দেখিয়েছিলেন। লায়লা তখন স্টেজে রবীন্দ্র সংগীত গাইছিল। বেশ ভরাট এবং সুরেলা গলায় লায়লা গেয়েছিল ‘ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে! ও বন্ধু আমার! না পেয়ে তোমার দেখা একা একা দিন যে আমার কাটে নারে…”।

 

এখনও চোখ বন্ধ করলেই সেই দিনে ফিরে যায় শামীম। লায়লার আগেই লাবিনকে ওর ভাললেগে গিয়েছিল। ওই দিন লায়লার সাথে শামীমের আর কোনও কথা হয়নি।

 

এর আরও ৭মাস পরে লায়লাদের অফিসে ওর সাথে পরিচয় হয়। তারপর অনেক বার দেখা হয়েছে দুজনের কিন্তু কখনও লায়লার কাছ থেকে ওর নিজের কথা জানা হয়নি। কিন্তু লায়লার অফিস থেকেই শামীম ওর সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে ছিল। যার কিছুটা ছিল সহকর্মীদের মন গড়া কাহিনী, কিছুটা সত্য। আকাশের দিকে তাকিয়ে শামীম একা কী একটা পাখীকে উড়ে যেতে দেখে নিজের অজান্তেই লায়লার একাকিত্বকে খুব গভীর ভাবে অনুভব করে। নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে, ওই উড়ে যাওয়া একাকী পাখী আর লায়লা, ওরা কি একই রকম নিসঙ্গ? না! লায়লার আছে লাবিন আর আছে অনেক দায়িত্ব। জীবন যুদ্ধে ব্যস্ত এবং ক্লান্ত। যার বিশ্রাম নেওয়ার কোনও সময় নেই। নিজের সব কাজ নিজেকেই করতে হয় তাকে। তার উপর সমাজের নানান ধরনের কটুক্তি তো আছেই।

 

শামীমের মনে আছে, অফিসের একটা কাজে একদিন লায়লাকে ফোন করেছিল ও। তারপর থেকেই মাঝে মাঝে লায়লার সাথে ওর কথা হয়। শামীম বুঝতে পারে লায়লা ওকে এড়িয়ে যায়। লায়লা সব মানুষদের এড়িয়ে চলে। একদিন কথা প্রসঙ্গে শামীম জানতে চেয়েছিল, ওকি সারাটা জীবন এইভাবে একাকী কাটাবে? লায়লা খুব সতর্কতার সাথে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে শামীম নিজেও সতর্ক হয়ে গেছে। কারন শামীম অনুভব করে, ও লায়লাকে হারাতে চায় না।

 

কখন যে বড় আপা এসে পিছনে দাঁড়িয়েছেন শামীম টের পায়নি। আপা কাঁধে হাত রেখে ডাক দিয়ে বললেন কি-রে কখন থেকে ডাকছি কোন সাড়া শব্দ নেই কেন? শামীম চমকে বললো, আপা! আমি একদমই শুনতে পাইনি। কেন বলতো! বাজারে যেতে হবে? ঠিক আছে, তুমি লিষ্ট করে দাও আমি এখনই বের হচ্ছি। শামীম আপার সামনে থেকে অনেকটা পালিয়েই চলে গেল। আপাকে শামীম লাবিন আর লায়লার কথা বলেছে আগেই। বলেছে অটিষ্ট একটা বাচ্চাকে নিয়ে একজন মায়ের একাকী জীবন সংগ্রামের কথা। আপা খুব মন দিয়ে শুনে ছিলেন ওর কথা।

 

আপা বলেছিলেন, শামীম! একদিন লায়লা আর লাবিনকে আসতে বলতে পারিস? আমি ওদের দেখতে চাই। আপা ওদের তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। শামীমদের আব্বা-আম্মা মারা গেলে, এই আপা-দুলা ভাই ওদেরকে বড় করেছিলেন। আপার জীবনেও অনেক বড় একটা কষ্ট আছে।

 

আপার বিয়ে হয়েছিল খুব অল্প বয়সে এবং বিয়ের পরপরই বাচ্চা এসেছিল কিন্তু ডাক্তার আপাকে কিছু পরীক্ষা করে বলেছিলেন আপার বাচ্চাটার ৮০% সম্ভাবনা আছে প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম হওয়ার। একথা শুনে দুলা ভাই খুবই ভয় পেয়ে যান এবং দুলা ভাই ২০% সম্ভাবনাকে মাথায় না রেখেই বাচ্চাটাকে রাখবেন না বলে সিদ্বান্ত নিয়ে নেন। আপা নিজের সাথে বোঝাপড়া করার আগেই বাচ্চাটাকে নষ্ট করে ফেলেন। কিন্তু এরপর কোনও কারন ছাড়াই আপার আর কোনও দিন বাচ্চা হয়নি।

 

অনেক ডাক্তার দেখিয়েছিলেন দুলা ভাই কিন্তু কোনও ডাক্তারই আপার শারীরিক সমস্যা খুঁজে পাননি। আস্তে আস্তে আপা অন্য রকম হয় গেলেন। নিজের ভেতরে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন। এখন বেশির ভাগ সময়ই তিনি খুব চুপ চাপ থাকেন। দুলাভাইও আগের মতন আর হৈ চৈ করেন না। অনেক বেশি শান্ত হয়ে গেছেন। আপা দুলাভাইয়ের জন্যই শামীম যশোরে বদলী হয়ে এসেছে। ওর মন বলছিল আপা বিষন্নতায় ভুগছেন।

 

জয়ন্তির আজ অনেক কাজ। তাই সকালেই শান্তুনুকে নাস্তা করিয়ে আরিফকে বললো, আমি একটু মার্কেটে যাচ্ছি। তুমি শান্তুনুকে নিয়ে দূপুরে লাবন্যদের বাসায় চলে যেও। জয়ন্তি রিক্সায় উঠে লিষ্টটা বের করে একবার ভাল করে দেখে নিল। লাবন্য এবং ইন্নির জন্য কিছু সেলোয়ার কামিজ বানাতে দিয়েছিল, সেগুলি নিয়ে যেতে হবে। আর কিছু দিন পরেই লাবন্য চলে যাবে। মনে পড়লেই ওর খুব কান্না পায়। জয়ন্তি এবং লাবন্য দুই জন সেই ছোট বেলার বন্ধু। একটা সময় ওরা একই এলাকায় থাকতো। এত বছর হয়ে গেছে, এর মধ্যে অনেক মেয়ের সাথেই ওর বন্ধুত্ব হয়েছে কিন্তু কেউই লাবন্যর জায়গাটা নিতে পারেনি।

মার্কেটে হঠাৎ করে শামীমের সাথে দেখা হয়ে গেল। শামীম এগিয়ে এসে জয়ন্তির সাথে কথা বললো। শামীম ওকে চা খাওয়ার জন্য বললো। কিন্তু জয়ন্তীর হাতে এখন সময় নেই কারন লাবন্যদের বাসায় দূপুরে ওরা সবাই এক সাথে খাবে বলে জানালো। তারপর শামীমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা লাবন্যদের বাসার দিকে রওনা দিল। জয়ন্তি রিক্সা থেকে নেমেই গেটের কাছে লায়লা আর লাবিনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। জয়ন্তি লাবিনকে আদর করে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি কেমন আছো বাবা?

 

লাবিন তার উওরে বললো, লাবিনের বন্ধু! লাবিনের বন্ধু লুৎফি!

 

লায়লা বললো সকাল থেকেই লাবিন লুৎফির জন্য অপেক্ষা করছে। সেই সময় লাবন্য দরজা খুলে দিল। পিনাকী লাবন্যর পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। লাবিনকে দেখ পিনাকী বললো, তুমি কেমন আছো লাবিন?

 

লাবিন বললো, লাবিনের বন্ধু লুৎফি! এই কথা বলেই লাবিন ঘরের ভেতরে চলে গেল।

 

পিনাকী আর লাবন্য দুই জনই হেসে দিলো। লুৎফি তখন পিছন থেকে বললো, লাবিন কেমন আছো?

 

পিনাকী লাবিনকে তার ফোন থেকে হেড ফোন দিয়ে গান শুনতে দিলো। লাবিন মুগ্ধ হয়ে সেই গান শুনতে লাগলো। লাবিন এনিগমার (Enigma) মিউজিক খুব পছন্দ করলো। লায়লা অবাক হয়ে গেল, পিনাকী কি ভাবে জানে লাবিন মিউজিক পছন্দ করে! অনেক দিন পর দারুন একটা সময় কাটিয়ে লায়লা লাবিনকে নিয়ে বাসায় চলে এলো।

 

লাবন্যদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পর থেকে লাবিন বেশ চুপ-চাপ হয়ে আছে। মনে হয় নিজের জগতে বসে সে চরিত্র গুলিকে সাঁজিয়ে রাখছে। পিনাকীকে লাবিনের খুব ভাল লেগেছে। আজ লাবিনকে দেখে লায়লা বুঝতে পারলো লাবিন তার বাবার অভাব অনুভব করে। কারন লাবিন অনেক বার পিনাকী আর লুৎফিকে লক্ষ করেছিল। লায়লা সবই বুঝতে পারে। লায়লা জানেও যতই চেষ্টা করুক না কেন এক জন মা কোনও ভাবেই সন্তানের বাবার জায়গা নিতে পারেনা। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় সন্তান তার বাবাকে ভুলে গেছে, মায়ের সাথে ভাল আছে। কিন্তু এক সময় মা ঠিকই বুঝতে পারে বাচ্চাটা তার বাবার অভাব অনুভব করছে। কিন্তু কোনও ভাবেই বাচ্চা সেই অভাব বোধটা মায়ের কাছে প্রকাশ করে না।

 

পরের দিন জয়ন্তি অফিসে যেয়ে লায়লাকে ফোনে জানালো, আজ বিকালে লাবন্য সহ ওরা সব বান্ধবীরা একটা ক্যাফেতে বসে কফি খাবে। লায়লা খুব খুশী হয়ে বললো, তুই অফিস থেকে যাবার পথে আমাকে তুলে নিস। ফোন রেখে লায়লা হাতের কাজ গুলির দিকে মন দিলো। আর গুন গুন করে গান গাই ছিল ‘সখী বহে গেল বেলা, শুধু হাসি খেলা, একি আর ভাল লাগে…’

 

নাছিমা আপা লায়লার দিকে তাকিয়ে হাসলেন আর ভাবলেন, মেয়েটা এত ভাল তারপরও কেন ওর ভাগ্যে এত কষ্ট! তিনি বুঝতে পারেন, তারপরও মেয়েটা একটা আলোর জন্য অপেক্ষা করে। আর তাই হয়তো এইভাবে এত সুন্দর করে মাঝে মাঝেই অপার্থিব এক সুর বের হয়ে আসে ওর কন্ঠে।

 

৭.

বিকালে অফিস শেষ করেই লায়লা জয়ন্তির সাথে সিটি প্লাজা রেষ্টুরেন্টের সামনে এসে লাবন্যর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। লাবন্য রিক্সা থেকে জয়ন্তিকে দেখে বুঝতে পারে এটাই সিটি প্লাজা। রিক্সাওয়ালা পিছন ফিরে লাবন্যর দিকে তাকিয়ে বললো, আপা! এটাই সিটিপ্লাজা।

 

লাবন্য রিক্সাওয়ালাকে জয়ন্তিদের সামনে দাঁড়াতে বললো। রিক্সা থামলে লাবান্য ভাড়া দিয়ে রিক্সা থেকে নেমে জয়ন্তিদের সাথে যোগ দিল।

 

লায়লা বললো, লাবন্য তুই এত চুপ-চাপ কেন? তোকে চুপ-চাপ থাকলে ভাল লাগেনা।

 

লাবন্য বললো, জানিস লায়লা! এটা আমার নিজের শহর অথচ আজ আমি কিছুই চিনতে পারছিলাম না। তাহলে কি আমি, না কি আমার শহর আমাকে বর্জন করেছে লায়লা? এটাই ভাবছিলাম। লাবন্যর কথায় ওর মনের ব্যথাটা ফুটে উঠলো।

 

লায়লা অবাক হয়ে ভাবলো, লাবন্য বিদেশে থেকেও দেশের জন্য, নিজের শহরের জন্য এখনও কত ভালবাসা অনুভব করে! লায়লা যতই লাবন্যকে দেখে ততই অনুপ্রাণিত হয়। একদিন ঠিকই সেই আলো আসবে ওর আর লাবিনের জীবনে, যার অপেক্ষা সে হয়তো নিজের অজান্তেই করে।

 

জয়ন্তি লিফটের কাছে এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ শুনতে পেলো, কে যেন ওর নাম ধরে ডাকছে। পিছনে তাঁকিয়ে শামীমকে দেখতে পায়। জয়ন্তি অবাক হয়ে জানতে চাইলো, আপনি এখানে কেন?

 

শামীম বললো, আমাদের এক ডোনার এই হোটেলে আছেন। তাকে এখানে নামিয়ে দিতে এসেছিলাম। আপনাকে দেখতে পেলাম, তাই ডাক দিলাম।

 

জয়ন্তি বললো, খুব ভাল করেছেন। আমাদের সাথে উপরে ক্যাফেতে চলুন, সবাই এক সাথে কফি খাবো।

 

শামীম বললো, যেতে পারি তবে একটা শর্তে। কফিটা আমি খাওয়াবো।

 

জয়ন্তি হেসে বললো, আগে তো চলেন আমাদের সাথে। তারপর দেখা যাবে। একথা বলেই জয়ন্তি হেসে দিলো। এই সময় লায়লা আর লাবন্য এসে দাঁড়ালে জয়ন্তি লাবন্যর সাথে শামীমের পরিচয় করিয়ে দিল। শামীম খুব আন্তরিকতার সাথে লাবন্যকে সালাম দিয়ে কথা বললো। লায়লার দিকে তাঁকিয়ে, তাকেও সালাম দিল।

 

লিফটটা ৭ তলায় এসে দাঁড়ালে, শামীম খুবই ভদ্র ভাবে এক পাশে সরে দাঁড়িয়ে জয়ন্তিদের বের হওয়ার জন্য জায়গা করে দিলো। ক্যাফেতে ঢুকে সবার চেয়ার সরিয়ে সবাইকে বসতে দিল। তারপর নিজে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলো। এরপর ওয়েটারকে ডেকে মেনু কার্ড চাইলো।

 

লাবন্য এই প্রথম কথা বললো, শামীম ভাই! আপনি আমার জন্য চিনি ছাড়া কফি আর লায়লাদের জন্য পেষ্ট্রি আর কফি বলুন। আমিজানি ওদের ক্ষুধা পেয়েছে। লাবন্য খুব ভাল করে শামীমকে লক্ষ করছিল। শামীমকে ওর খুবই ভদ্র মনে হয়েছে।

 

শামীম পেষ্ট্রির সাথে শিককাবাব ও অর্ডার করলো। সব শেষে কফি দিতে বললো। চারজন মিলে অনেক গল্প হল ওদের। কফি শেষ করে সবাই যখন উঠে দাঁড়ালো তখন ওয়েটার এসে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিল লায়লার হাতে। লায়লা খুব অবাক হয়ে বললো, এটা কি?

 

শামীম খুব সাবলীল ভাবে বললো এটা পেষ্ট্রি! লাবিনের জন্য।

 

লায়লা কোনও কথা না বলে প্যাকেটটা নিল। কিন্তু ওর মুখ দেখে বোঝা গেল ব্যাপারটা ও একদম পছন্দ করেনি। শামীম লায়লার দিকে না তাঁকিয়ে বিল পরিশোধ করে দিয়ে, লাবন্যদের কাছে এসে বললো চলুন আপনাদের রিক্সায় উঠিয়ে দেই।

 

নীচে নেমে লাবন্য আর লায়লা শামীমের এবং জয়ন্তির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিক্সায় উঠলো। কারন লাবন্য আর লায়লার বাড়ী একই এলাকায়। রিক্সায় তেমন কোনও কথা হল না দুজনের মধ্যে। লায়লা খুব বেশী গম্ভীর হয়েছিল। লাবন্য বুঝতে পারছিল, লায়লার মনের মধ্যে নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়া চলছে। তাই ওকে সময় দিলো। রিক্সাওয়ালা লায়লাদের বাড়ীর সামনে আসলে লাবন্য রিক্সাওয়ালাকে গেটের সামনে দাঁড়াতে বললো। লায়লা কোনও কথা না বলেই রিক্সা থেকে নেমে গেল। লাবন্য রিক্সা থেকে নেমে লায়লাকে বললো, প্যাকেটটা নিয়ে যা। তারপর লায়লার হাত ধরে আস্তে করে বললো, আমাদের হাতের পাঁচ আঙ্গুলের দিকে তাঁকিয়ে দেখ। কেউ কারো মত নয়। একজন মানুষকে দিয়ে সবাইকে তার মতন মনে করা উচিৎ নয়। তারপর লায়লার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিক্সায় উঠে সামনে বাম দিকের রাস্তায় যেতে বললো।

 

লায়লা বাসায় এসে লাবিনের ঘরে উঁকি দিলো। লাবিন তখন খুব মন দিয়ে ওর বইগুলিকে গুছিয়ে রাখছে। লাবিন লায়লাকে দেখতে পায়নি কিন্তু বুঝতে পারলো মা এসেছে। লায়লা হাত মুখ ধুয়ে এসে লাবিনকে নাস্তা করতে ডাকলো। লাবিন মা! মা! বলে সব ঘরে খুঁজতে লাগলো ওকে। লায়লা তাড়াতাড়ি বললো, আমি এখানে লাবিন। টেবিলে আসো, নাস্তা খাবে! লাবিন টেবিলের কাছে এসে মাকে দেখেই হাসি দিলো। লাবিন হাসলেই লায়লার সব কষ্ট এক নিমিশেই আনন্দে রুপ নেয়। মাঝে মাঝে লায়লার জানতে ইচ্ছা হয়, সব মা এরই কি এমন অনুভুতি হয়? লায়লা পেষ্ট্রি প্লেটে তুলে দিলে লাবিন খুব খুশী হয়ে খাওয়া শুরু করলো। ও জানে, পেষ্ট্রি লাবিনের খুব পছন্দ।

 

লাবিনের চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়লো ওর আনন্দগুলো। লাবিনের আনন্দ দেখে লায়লার সব রাগ এবং বিরক্তি এক নিমিশে চলে গেল। মনে পড়ে গেল লাবন্যর কথা, “হাতের পাঁচটা আঙ্গুল সমান না”। হঠাৎ লাবিনের কথায় লায়লা বাস্তবে ফিরে এলো। লাবিন বললো, মা! মা! লাবিন দুইটা খাবে! দুইটা খাবে!

 

লায়লা হেসে বললো, হ্যাঁ! লাবিন দুইটা খাবে। ভালবেসে লাবিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো ও। লাবিন সাথে সাথেই অন্য হাত দিয়ে চুল ঠিক করে ফেললো। লায়লা হেসে দিলো। লাবিন সব কিছু গোছানো পছন্দ করে। এলোমেলো কোনও জিনিস লাবিনের পছন্দ না। পরিষ্কার এবং গোছানো না থাকলে লাবিন খুব অস্থির হয়ে যায়। আগে লাবিন অনেক বেশী অস্থির থাকতো। লায়লা আস্তে আস্তে লাবিনকে বুঝিয়েছে এবং এখন লাবিনের অস্থিরতা অনেক কমে এসেছে। কোনও নতুন মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার আগেই লাবিনকে তার সম্পর্কে নানা ধরনের তথ্য দেয়। তারপর মানুষটার সাথে লাবিনকে পরিচয় করিয়ে দিলে লাবিন খুব সহজে তাকে গ্রহন করতে পারে।

 

এখন লাবিনকে কারো বাসায় নিয়ে গেলে লায়লা ওকে যেখানে বসতে বলে ও সেখানেই বসে থাকে। অনেক ভাবীরা বলেন, আপনার বাচ্চা সাধারন বাচ্চাদের থেকেও অনেক শান্ত। লায়লার তখন খুব ভাল লাগে। ও আশার আলো দেখতে পায়। লায়লা অপেক্ষা করে সেই আলোর জন্য। যে আলোতে একদিন লাবিনের সাথে স্বাভাবিক বাচ্চারা বন্ধুত্বের হাত বাড়াবে!

 

লাবিন সব সময় স্বাভাবিক বাচ্চাদের সাথে মিশতে চায়, খেলতে চায়। কিন্তু লাবিনকে দেখেই বাচ্চারা পালিয়ে যায়। এমন একটা আচরণ বাচ্চাদের মধ্যে থাকে যেন লাবিন একটা পাগল, যেন এখনই ও অন্য বাচ্চাদের মারবে। বাচ্চারা যখন পালিয়ে যায় লাবিন খুব করুন এবং অসহায় চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজের সাথে তখন অভিমান করে ও। বুঝতে পারেনা, কেন বাচ্চারা ওর বন্ধু হয় না! লাবিন জানতে চায় ওর অপরাধটা কি?

 

লায়লা তখন খুব অসহায় বোধ করে। লায়লা আড়ালে যেয়ে কাঁদে। মা হিসাবে নিজেকে ব্যর্থ মনে হতে থাকে। লায়লা আস্তে আস্তে লাবিনকে মানুষের সম্পর্কে বুঝিয়েছিল। ওকে বলেছিল সব মানুষ লাবিনকে পছন্দ করবে না, তার মানে এই-না লাবিন ভাল না। মাকেও অনেকে পছন্দ করে না কিন্তু লাবিন তোমাকে ভালবাসে! তাই নয় কি? লাবিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজে নিজেই বললো, লাবিন মাকে ভালবাসে! ভালবাসে!

 

তারপর থেকে লাবিনের অনেক পরিবর্তন হল। অস্থিরতা কমতে থাকলো। এই সব কাজ গুলি একা একজন মায়ের জন্য সহজ ছিল না। তার উপর মায়ের বাসায় থাকাটা বড় ভাবী ভাল চোখে দেখছিলেন না। বারবার লাবিনকে পাগল বলে ওকে অস্থির করে তুলতো। লায়লা এখনও সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলিকে ভুলতে পারেনা। একা একজন মাকে শুধু জীবিকা নিয়ে চিন্তা করলেই হয় না। তার অতি আপনজনদের মানসিক অত্যাচারগুলো জীবনকে আরও বেশী ভয়াবহ করে তোলে। কিন্তু সেই অবস্থার কথা কারো কাছেই বলা যায় না। কারন হাজার হলেও তারা তো নিজেরই আপনজন।

 

এখন লাবিন নিজেই বুঝতে পারে, কার কাছে ও যাবে এবং কোথায় যাবে না। লায়লার বড় ভাই এবং ভাবীকে দেখলে লাবিন ওখান থেকে সরে যায় কারন ও বুঝতে পারে যে তারা লাবিনকে পছন্দ করেনা। শামীম লাবিনের সাথে দেখা করতে চায়। লায়লাকে বলেছে, শামীমের বড় বোনের কথা। লায়লার খারাপ লেগেছিল কিন্তু ও চুপ করেছিল। লায়লা এখন আর কোনও মানুষকে বিশ্বাস করতে পারেনা।

 

লায়লা নতুন করে লাবিনের সাজানো জগতে অন্য কোনও মানুষের জায়গা বানাতে চায়না। কিন্তু ও বোঝে, লাবিনের জন্য ও মা হিসাবে যাই করুক না কেন লাবিন বাবা নামক মানুষটির অনুপস্থিতি অনুভব করে। তাই তো লায়লা যখন লাবিনকে নিয়ে বিকালে হাঁটতে বের হয় তখন পাশের বাসার বাচ্চাটা যখন তার বাবার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলে, লাবিন কিছুক্ষনের জন্য থমকে দাঁড়ায়। লায়লার হাতটা খুব শক্ত করে ধরে রাখে। লাবিনের স্পর্শ অনেক না-বলা কথা লায়লাকে বলে যায়।

 

লাবন্য সকালে উঠেই বাবা এবং মায়ের সাথে নাস্তা করে চা নিয়ে ছাদে চলে এলো। সকাল থেকে আকাশটা মেঘলা হয়ে ছিল। এখন হঠাৎ করে ঠান্ডা বাতাস শুরু হল এবং সেই সাথে ফোঁটায় ফোটাঁয় বৃষ্টিও শুরু হল। লাবন্যের চায়ের মধ্যে বৃষ্টির ফোঁটা পড়লো। লাবন্য কোন গুরুত্ব না দিয়ে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে চা খেতে থাকলো এবং ওর চোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকলো। নীচ থেকে তখন ভেসে আসছে, ‘যখন পড়বেনা মোর পাঁয়ের চিহ্ন এই বাঁকে। আমি বাইবোনা, আমি বাইবোনা…’। বাবা রবীন্দ্রসংগীত শুনছেন। এই সময় নিচে থেকে ইন্নির মা! মা! ডাক শুনতে পেলো।

 

লাবন্য বৃষ্টিতে ভেজা অবস্থায় নীচে নামলে মা খুব বকা দিলেন। বললেন, আজ চলে যাবে, এখন যদি জ্বর আসে তাহলে তোমাকে যেতে দেবো না। ইন্নি সাথে সাথে বললো, মাকে ছাড়া আমরা যে থাকতে পারবো না!

 

মা ইন্নির কথায় মজা পেয়ে বললেন, কেন? তোমার বাবা তো আছে! তুমি তোমার বাবার কাছে থাকবে!

ইন্নি কান্না গলায় বললো, আমি মাকেও চাই, বাবাকেও চাই। ইন্নির এই কান্নার ভঙ্গি দেখে সবাই হেসে দিল।

 

পিনাকী মেয়ের পাশে এসে বললো, থাক! আমার ছোট মায়ের কান্না করতে হবে না। নানীমনি তোমার সাথে মজা করেছে।

 

লায়লা সকালে অফিসে এসে পৌঁছানোর পর আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি শুরু হল। লায়লার মনে হল, লাবন্য আজ চলে যাবে তাই হয়তো আকাশটাও কাঁদছে। লায়লার মনটা আজ খুব খারাপ। চেয়ারে বসেই জয়ন্তিকে ফোন দিলো। জয়ন্তি ফোন ধরতেই, লায়লা বললো এয়ার পোর্টে যাবার সময় ওকে অফিসের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যেতে। জয়ন্তি বলল, ঠিক আছে। আর কোনও কথা বললো না। লায়লা বুঝতে পারলো, জয়ন্তির মনটাও অনেক বেশী খারাপ।

 

লাবন্য সব সময় বিদায় নেওয়ার সময় চিন্তা করে এই বার আর কাঁদবে না। কিন্তু তারপরও চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। চোখের পানি শেষ হতে চায় না। লাবন্যর কান্না দেখে ইন্নিও কাঁদে। ইন্নি মনে করে মাকে মনে হয় কেউ বকা দিয়েছে। অসহায় চোখ নিয়ে খুঁজতে থাকে, কে মাকে বকা দিয়েছে? ওদের গাড়ী লোন-অফিস এলাকা ছাড়িয়ে যখন এয়ার পোর্টের দিকে রওনা দিলো তখন জয়ন্তি ড্রাইভারকে বললো, লায়লা ম্যাডামকে তুলে নিবেন তার অফিস থেকে। ড্রাইভার জ্বী ম্যাডাম বলে লায়লার অফিসের দিকে গেলো।

 

অফিসের ঠিক সামনেই লায়লা দাঁড়িয়েছিল। গাড়ীটা সামনে এসে দাঁড়ালেও গাড়ীতে উঠে লাবন্যর পাশে বসলো। লুৎফি আর ইন্নির সাথে কথা বললো। লায়লা বুঝতে পারে না লাবন্যদের জন্য ওর কেন এত খারাপ লাগছে? এয়ারপোর্টের লবিতে বসে লায়লা এক প্যাকেট বিস্কিট খুলে দেয় লুৎফিদের। সিকিউরিটি চেকিং এর জন্য যাত্রীদের ডাক দিলে পিনাকী লায়লাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে সিকিউরিটি পার হয়ে ভেতরে চলে যায়। লাবন্য জয়ন্তিকে জড়িয়ে ধরলে জয়ন্তি অন্য দিকে তাঁকিয়ে থাকে। লাবন্য যখন লায়লার কাছে এসে লায়লাকে জড়িয়ে ধরে তখন লায়লা চোখের পানি কোন ভাবেই থামাতে পারেনা।

 

লাবন্য খুব আস্তে করে লায়লার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, জীবন খুব নিষ্ঠুর না। সবাইকে সে কিছু সুযোগ দেয়। যারা বুদ্ধিমান তারা সেই সুযোগ গ্রহণ করে। আবার নতুন ভাবে জীবনকে সাঁজিয়ে ফেলে। যারা বোকা তারা অতীতের কষ্টকে আঁকড়ে ধরে সারাজীবন ভাগ্যকে দোষ দিতে থাকে।

 

তারপর আস্তে করে লায়লাকে ছেড়ে দিয়ে নিজের চোখকে আড়াল করে সিকিউরিটির গেট পার হয়ে ভিতরে চলে গেল লাবন্য। লায়লা আর জয়ন্তি কাঁচের ভেতর থেকে যতক্ষণ দেখা যায়, ততক্ষণ লাবন্যকে দেখতে থাকলো। এক সময় লাবন্য ওদের দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেল। ওর চোখে যে এখনও এত পানি আছে লায়লার জানা ছিলনা। হঠাৎ করে জয়ন্তি লায়লার ঘাড়ে হাত দিয়ে চাপ দিলো। লায়লা পিছনে ঘুরে তাঁকিয়ে দেখে শামীম দাঁড়িয়ে আছে। খুব লাজুক একটা হাসি দিয়ে বললো, আমি মনে হয় বেশী দেরী করে ফেলেছি?

 

লায়লা চোখ মুছতে মুছতে বলল, না! খুব বেশী দেরী হয়নি! আমরা এখনও আছি। এই কথা শুনে ওরা তিনজনই হেসে দেয়। শামীমের দিকে তাঁকিয়ে লায়লা বলল, আপনার কি সময় হবে? তাহলে আপনার সাথে লাবিনের পরিচয় করিয়ে দেবো।

 

রোকসানা হাবিব

মিডল্যান্ডস

ইংল্যান্ড

২১ শে মার্চ ২০১৫

আরও জানুন » তস্কর »

লেখালেখি বলতে যা বোঝায় সেটা কখনই আমি লিখি না। তবে ছোটবেলা থেকেই প্রচুর সাহিত্য, জীবন ধর্মী লেখার নিয়মিত পাঠিকা। বেগম, দেশ এমন অনেক পত্রিকার একনিষ্ঠ পাঠিকা। প্রবাস জীবনে চারিপাশের মানুষদের দেখে, নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখে অনেক অনুভূতি হয়। সেগুলো মাঝে মাঝেই ইচ্চা হয় অন্যদের সাথে শেয়ার করি যেন তারা আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে কিছু নিতে পারে। যদি আমার একটা অভিজ্ঞতা অন্য কারো কাজে লাগে, এই ভেবেই লেখা। ইতিহাসের উপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স পাশ করার পর কিছুদিন বেসরকারী চাকরিতে ছিলাম। এরপর ফ্যাশন টেকনোলজীর উপর ডিপ্লোমা এবং বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের কেক এবং বেকিং নিয়ে পড়াশুনা করি। বাংলাদেশ এবং বিশ্বের ক্যান্সার নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যেই এই কেক এর পেছনে কাজ করে যাওয়া। জীবনবোধ থেকে লিখতে চাই আমার অনুভূতিগুলো।

Comments

comments