আগামী প্রজন্মের জন্য ডায়াবেটিস মারাত্মক হুমকি

0
388
আগামী প্রজন্মের জন্য ডায়াবেটিস মারাত্মক হুমকি
Print Friendly, PDF & Email

আগে কলেরা, ডায়রিয়া, বসন্ত ইত্যাদি সংক্রামক রোগের আক্রমণে মানুষ মারা যেত বেশি, বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে সংক্রামক ব্যাধি থেকে মানুষকে করেছে মুক্ত। কিন্তু বর্তমানে বয়স জনিত জটিলতার কারণে ঘাতক ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি বেড়ে যাচ্ছে। ডায়াবেটিস নামক ঘাতক রোগটি দিন দিন বেড়েই চলেছে। সারা পৃথিবীতে ২৮৫ মিলিয়ন মানুষ নীরব ঘাতক ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত এবং এর শতকরা ৭০ ভাগই দরিদ্র ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। ২০৩০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে।

ডায়াবেটিসের কারণে সমাজ হারাতে পারে কর্মক্ষম ও সম্ভাবনাময় এক তরুণ যুবক প্রজন্মকে। আরো যোগ হবে অন্ধত্ব, স্নায়ুর রোগ, কিডনি ও হৃদযন্ত্র বিকল হওয়া, অকালমৃত্যু ও পঙ্গুত্ব ।

ডায়াবেটিসের কারণে হাজার হাজার মানুষ নিজেদের কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে, পরিবারের ও সমাজের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

তাই এই ব্যাধিকে প্রতিহত করতে হবে এবং প্রতিরোধ করার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। ডায়াবেটিস জনিত রোগ প্রতিরোধ করতে হলে সামাজিক ব্যবস্থার সবচেয়ে ছোট অংশ হলো পরিবার তাই পরিবার কে-ই স্বাস্থ্য সচেতনার প্রথম ধাপটি শুরু করতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য ডায়াবেটিস মারাত্মক হুমকি, তাই এর প্রতিরোধে যেসব বিষয়ে আমরা সচেতন হতে পারি-

দ্রুত নগরায়ন

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে খুব দ্রুত নগরায়ন হচ্ছ ফলে মানুষ হয়ে যাচ্ছে অলস। তাই মানুষের ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কায়িক শ্রম ও ব্যায়াম কমে যাচ্ছে, মানসিক চাপ বাড়ছে, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন হচ্ছে ইত্যাদি কারণে আনুপাতিক হারে ডায়াবেটিসের রোগীর সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে।

বাচ্চাদের মাত্রাতিরিক্ত পড়ার চাপ

অনেক বাচ্চাদের ছেলেবেলা থেকেই পড়াশোনার অত্যধিক প্রতিযোগিতা, মাত্রাতিরিক্ত মানসিক চাপ, খেলা ধূলার প্রতি অনীহা বা পড়াশোনার ব্যস্ততায় সময়ের অভাব, মানুষকে আরো বেশি অলস জীবন যাপনে অভ্যস্ত করে তুলছে আর বাড়াচ্ছে রোগ ব্যাধি।

ফাস্ট ফুড

বিশেষ করে বাচ্চারা এবং আমরা অনেকেই ফাস্ট ফুড খেতে পছন্দ করেন। বিদেশে এগুলোকে জাংক ফুড বলে। বাংলায় এদের জঞ্জাল খাবার বলা যেতে পারে। এসব খাবার শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর অধিক ক্যালরিসমৃদ্ধ ও অধিক চর্বি-শর্করা জাতীয় খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস শিশু কিশোরদের স্থূলতা বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক খবরের কাগজে চোখ রাখলে দেখা যাবে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস ,ক্যান্সার ও কিডনী রোগীর সংখ্যা আশংকাজনক ভাবে বাড়চ্ছে। এর অন্যতম কারণ ভেজাল খাবার ও ফাস্ট ফুড জাতীয় খাবার।

প্রযুক্তিগত উন্নয়ন

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খেলার মাঠের অভাব, বিদ্যালয়ে শরীর চর্চা বা খেলাধূলার সংস্কৃতির বিলোপ, টেলিভিশন আর কম্পিউটার গেম ও ফেসবুক, শহরে অলস জীবন, গাড়ি-লিফট, চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহারের প্রবণতা।

অপুষ্টি

গ্রামের শিশুদের ছেলেবেলার অপুষ্টি এবং বড় হয়ে শহরে অভিবাসনের পর অধিক পুষ্টির মন্দ চক্রও এখানে ডায়াবেটিসের জন্য দায়ী।

মানসিক চাপ

দেশে খুব দ্রুত নগরায়ন হচ্ছ ফলে আজকের এই যান্ত্রিক জীবনে মানসিক চাপ যেন মানুষের সব সময়ের সঙ্গী৷ সার্বক্ষণিক মানসিক চাপ ডেকে আনে ডায়াবেটিস সহ নানা অসুখ, এমনকি মৃত্যুও৷

ডায়াবেটিস কি?

ডায়াবেটিস শরীরের এমন একটি বিশেষ অবস্থা, যে অবস্থায় মানুষের দেহে রক্তে গ্লুকোজের পরিমান স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু দেহ কোষগুলো এই অতিরিক্ত গ্লুকোজকে ব্যবহার করতে পারে না। এই অসুখটি হয় প্রধানত ‘ইনসুলিন’ নামে এক রাসায়নিক পদার্থের অভাবের জন্য।

ডায়াবেটিস এর লক্ষণ-

ডায়াবেটিসের মূল লক্ষণ যেমন অতিরিক্ত পিপাসা, ঘনঘন প্রস্রাব, রাত্রে উঠে প্রস্রাব করতে হয়, প্রচুর খিদে পায় ইত্যাদি।

আপনি সব সময় সুস্থ ছিলেন, কিন্তু হঠাত্ মনে হচ্ছে ওজন কমে যাচ্ছে, অথচ খাওয় দাওয়া ঠিক মতই চলছে এবং রুচি বা ক্ষুধাও বেশ বেশি, অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত।

যদি এমন হয় দ্রুত ওজন হারাচ্ছে শরীর, অথচ তার কোন চেষ্টা করা হয়নি যেমন হাঁটাচলা, ব্যায়াম কিছুই হচ্ছে না বা খাদ্য নিয়ন্ত্রণের কোন চেষ্টা চলছে না, অথবা অকারণে ওজন কমছে, তাহলে ধরে নিতে পারেন রক্তের সুগার বেড়েও যেতে পারে।

আপনি ভাল ছিলেন অথচ বেশ কিছু দিন যাবত বাড়তি ক্লান্তি বা অবসাদ বোধ করেন।

বারবার ছোট খাট অসুখ হচ্ছে, যেমন- ঘন ঘন শরীরে ফোড়া হচ্ছে, বারবার প্রস্রাবে ইনফেকশন হচ্ছে, জিহবায় সাদা সাদা ক্যানডিডার আক্রমণ, মহিলাদের যৌনাঙ্গে ঘন ঘন ছত্রাক জাতীয় রোগের আক্রমণ ইত্যাদি।

কোথায় সামান্য কাটা-ছেড়া বা ঘা হবার পর তা দ্রুত শুকাচ্ছে না।

কারণে অকারণে হাত পা অবস হয়ে আসে বা ভারি ভারি লাগে। এগুলোকে মেডিক্যাল টার্মে নিউরোপ্যাথি বলে, যার অন্যতম কারণ ডায়াবেটিস।
পায়ে ঘা হওয়া বা পায়ের আঙ্গুলের মাঝে ছত্রাকের আক্রমণ।

ডায়াবেটিসের একটি লক্ষণ যারা গ্রামে গঞ্জে খোলা যায়গায় প্রস্রাব করেন, সেখানে দেখা যায় পিপড়া আসছে।

ডায়াবেটিস থেকে বাঁচার জন্য প্রতিরোধ করাটাই জরুরী-

প্রতিরোধের উপায়-

রোগটি যেহেতু সারা জীবনের, তাই এই রোগে যাতে আক্রান্ত না হতে পারে সে লক্ষ্যে রোগ হওয়ার আগেই একে প্রতিরোধ করাটাই জরুরী। অর্থাত্ রোগটির বিরুদ্ধে আগে থেকে সচেতন হওয়া। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূলমন্ত্র সুশৃংখল জীবন যাপন। এর মাধ্যমে রোগটি কে দূরে রাখা সম্ভব। নিচের কিছু কিছু পরামর্শ মেনে চললে এ ঘাতক ব্যধি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব-

খাদ্যাভ্যাস-

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো এবং পরিমাণ মতো খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ছোটবেলা থেকেই বেশি বেশি সবুজ শাক সবজি, মাছ খেতে হবে। কম চর্বি ও কর্ম শর্করাযুক্ত খাদ্য গ্রহণে উদ্ধুদ্ধ হতে হবে।

আরও জানুন » শারীরিক ও মানসিক শান্তি পেতে ১৭টি সঠিক খাদ্যাভ্যাস
অধিক ক্যালরিযুক্ত খাবার –

খাবার, ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার, চকলেট, আইসক্রিম ইত্যাদি পরিহার বা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চিনি ও মিষ্টি জাতীয় খাবার যেমন মিষ্টি, সরবত, গ্লুকোজ, পায়েস ইত্যাদি কম খেতে হবে।

কায়িক শ্রম ও ব্যায়াম-

ডায়াবেটিসের রোগীর ব্যায়ামের বিকল্প নেই। অবশ্যই রোগীদের নিয়মিত কায়িক শ্রম এবং যত অল্পই হোক সার্মথ্য অনুযায়ী ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সকাল সন্ধ্যা নিয়মিত হাঁটাচলা, আরো সম্ভব হলে সাঁতার বা জগিং করা।

কায়িক শ্রমের অভ্যাস-

শিশু, কিশোর বয়স্ক সবার মধ্যেই কায়িক শ্রমের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। খেলার মাঠ ছাড়া কোন স্কুল-কলেজ থাকতে পারবে না। পাড়ায় পাড়ায় থাকবে পার্ক বা খোলা জায়গা, হাঁটার উপযোগী ফুটপাত এবং সর্বোপরী নিরাপদে হাঁটার পরিবেশ।

নিয়ম শৃঙ্খলা-

ডায়াবেটিস রোগীর জীবন নিয়ম-শৃঙ্খলবদ্ধ। এর মানে সব কিছু নিয়ম মাফিক মেনে চলা। যেমন-খাওয়া-দাওয়া, ঠিক মত হাঁটাচলা বা ব্যায়াম করা, ওষুধপত্র নিয়ম মাফিক ব্যবহার করা ইত্যাদি। যারা শৃঙ্খলা মেনে চলে তারা যেমন ডায়াবেটিস হওয়া থেকেও মুক্ত থাকতে পারে, এমনকি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে একে নিয়ন্ত্রণে করতে পারে।

ধূমপানের বিরুদ্ধে যেমন গণসচেতনতা গড়ে উঠেছে, তেমনিভাবে মন্দ খাদ্যাভ্যাসের বিরুদ্ধেও সচেতনতা গড়ে তোলা দরকার। শুধু জীবন যাত্রার একটু খানি পরিবর্তন, একটু সচেতনতা ও সদিচ্ছা শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ ডায়াবেটিসকে প্রতিরোধ করতে পারে।

আরও জানুন » হার্ট অ্যাটাক কি? হার্ট অ্যাটাক এর কারণ, উপসর্গ ও প্রতিকারে করণীয় »

Comments

comments