ভুমিকম্প হলে করণীয় ও প্রতিরোধের উপায় সমূহ

0
951
ভুমিকম্প হলে করণীয়
Print Friendly, PDF & Email

ভূমিকম্পের ফলে ক্ষয়ক্ষতির তীব্রতার যে মাত্রা রয়েছে সে সূচক অনুযায়ী ঢাকা পৃথিবীর শীর্ষ ২০ টি ঝুঁকিপূর্ণ শহরের অন্যতম।

ঢাকায় ভূমিকম্প পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির রূপ ভয়াবহ আকার নিতে পারে। ঢাকার জনসংখ্যার ঘনত্ব বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। নেপালের চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি। ফলে এখানে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কাও বেশি।

জলাভূমি ভরাট করে ঢাকায় অনেক আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে। ভূমিকম্পের সময় এগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া ঢাকাসহ দেশের অনেক জায়গাতেই জাতীয় ইমারত নির্মাণ নীতিমালা মেনে চলা হচ্ছে না। এ বিষয়ে তদারকিরও ব্যাপক অভাব রয়েছে।

ভূমিকম্প ঝুঁকি অনুযায়ী ঢাকাকে চারটি এলাকায় ভাগ করে দেখা গেছে উত্তরা এলাকা সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং খিলগাঁও, বাড্ডা, গুলশান, ক্যান্টনমেন্ট এবং পুরনো ঢাকার বুড়িগঙ্গা সংলগ্ন অঞ্চল বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছে।

ভূমিকম্প বিষয়ে অনেক সাধারণ তথ্যই সাধারণ মানুষের অজানা। ভূমিকম্প হলে কী করতে হবে এবং কী করা যাবে না- এসব নিয়ে মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত ধারণা নেই বলেই অনেকের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়।

গত ২৫ এপ্রিল ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প নেপালকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। এতে নিহতের সংখ্যা ৮ হাজার ছাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ভূমিকম্পে ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা হবে অনেক বেশি।

ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মূল কারণ

আমরা ভূমিকম্পে যে ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ধ্বংস হতে দেখি তার জন্য মূলত দায়ী সেকেন্ডারি ওয়েভ এবং সারফেস ওয়েভগুলো- কারণ, এগুলোই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী।

এখন প্রাথমিক ভূ-কম্পন পাবার কতো সময় পর বাকিগুলো টের পাবেন? উত্তর হচ্ছে ব্যবধান খুব সামান্য। ধরুন আপনার অবস্থান ভূমিকম্পের এপিসেন্টার বা উৎপত্তিস্থল থেকে ২০০ কিমি দূরে।

সেকেন্ডে যদি ১৪ কিমি বেগে প্রাথমিক ভূ-কম্পন আসে তবে ২০০ কিমি অতিক্রম করতে সময় নেবে প্রায় ১৪ সেকেন্ড। আর এরপর ৮ কি.মি./সে বেগে সেকেন্ডারি ওয়েভ আসতে সময় নেবে প্রায় ২৫ সেকেন্ড।

অর্থাৎ আপনি ভূমিকম্প টের পাবার মোটামুটি ১১ সেকেন্ডের ব্যবধানে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়ে যাবে। এর মধ্যেই আপনাকে আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

পূর্ব পরিকল্পনা নেবার পূর্ব  প্রস্তুতি

– আপনি যদি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকেন তবে খোঁজ নিন আপনার ভবনটিতে ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা আছে কিনা, থাকলে তা কী মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করতে পারবে। যদি না থাকে তবে রেট্রোফিটিং-এর ব্যবস্থা নিন। কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুরনো ভবনেও রেট্রোফিটিং-এর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। জাপানে ভূমিকম্প একটি নৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু তাদের ভবনগুলিতে ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা থাকায় তাদের ক্ষয়ক্ষতি হয় অতি সামান্য।

– পরিবারের সবার সাথে বসে এ ধরনের জরুরী অবস্থায় কি করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে- মোট কথা আপনার পরিবারের ইমার্জেন্সি প্ল্যান ঠিক করে সব সদস্যদের জানিয়ে রাখুন। ভূমিকম্পের সময় হাতে খুব সামান্যই সময় পাওয়া যাবে। এ সময় কী করবেন তা সবাইকে নিয়ে আগেই ঠিক করে রাখুন।

– বড় বড় এবং লম্বা ফার্নিচারগুলোকে যেমন- শেলফ ইত্যাদি দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখুন যেন কম্পনের সময় গায়ের উপর পড়ে না যায়। আর টিভি, ক্যাসেট প্লেয়ার ইতাদি ভারী জিনিষগুলো মাটিতে নামিয়ে রাখুন।

– বিছানার পাশে সবসময় টর্চলাইট, ব্যাটারী এবং জুতো রাখুন।

– বছরে একবার করে হলেও ঘরের সবাই মিলে আসল ভূমিকম্পের সময় কী করবেন তার একটা ট্রায়াল দিন।

ভূমিকম্পের সময় করণীয়

নিচের পরামর্শগুলো বেশি কার্যকরী যদি ভবনে ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা থাকেঃ

১. নড়াচড়া বা দৌড় দৌড়ি করবেন না

ভূমিকম্পের সময় বেশি নড়াচড়া, বাইরে বের হবার চেষ্টা করা, জানালা দিয়ে লাফ দেবার চেষ্টা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা উচিত।

একটা সাধারণ নিয়ম হল- এ সময় যত বেশি মুভমেন্ট করবেন, তত বেশি আহত হবার সম্ভাবনা থাকবে। আপনার ভবনে যদি ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা থাকে বা রেট্রোফিটিং করা থাকে তবে ভূমিকম্পের সময় বাসায় থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ।

২. ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন

আমেরিকান রেডক্রসের পরামর্শ অনুযায়ী- ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল ‘ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন’ বা ‘ডাক-কাভার’ পদ্ধতি।

অর্থাৎ কম্পন শুরু হলে মেঝেতে বসে পড়ুন, তারপর কোন শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নীচে ঢুকে কাভার নিন, এমন ডেস্ক বেছে নিন বা এমনভাবে কাভার নিন যেন প্রয়োজনে আপনি কাভারসহ মুভ করতে পারেন।

কোনো ভবন ভূমিকম্পরোধক হলে তা খুব কমই ধসে পড়ে; যেটা হয় তা হল আশেপাশের বিভিন্ন জিনিস বা ফার্নিচার গায়ের উপর পড়ে আহত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই এগুলো থেকে বাঁচার জন্য এ সময় কোন শক্ত ডেস্ক বা টেবিলের নিচে ঢুকে আশ্রয় নেয়া জরুরী।

৩. লিফট

ভূমিকম্পের সময় এলিভেটর বা লিফট ব্যবহার পরিহার করুন।

৪. গাড়ি বন্ধ করে বসে থাকা

ভূমিকম্পের সময় যদি গাড়িতে থাকেন তবে গাড়ি বন্ধ করে ভেতরে বসে থাকুন। গাড়ির বাইরে থাকলে আহত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

৫. আফটার শক

“মেইন শক” বা মূল ভূমিকম্পের আগে এবং পরে মৃদু থেকে মাঝারি আরো কিছু ভূমিকম্প হতে পারে যেগুলো ‘ফোরশক’ এবং ‘আফটার শক’ নামে পরিচিত। সতর্ক না থাকলে এগুলো থেকেও বড় বিপদ হয়ে যেতে পারে। সাধারণত কোনো বড় ভূমিকম্পে ‘আফটার শক’ প্রথম ঘণ্টার মধ্য থেকে শুরু করে কয়েক দিনের মধ্যে হতে পারে।

৬. ইউটিলিটি লাইন

প্রথম ভূমিকম্পের পর ইউটিলিটি লাইনগুলো (গ্যাস, বিদ্যুত ইত্যাদি) একনজর দেখে নিন। কোথাও কোন লিক বা ড্যামেজ দেখলে মেইন সুইচ বন্ধ করে দিন।

ধ্বংসস্তুপে আটকে পড়লে করণীয়

১. রুমাল বা তোয়াল

ধুলাবালি থেকে বাঁচার জন্য আগেই সাথে রুমাল বা তোয়ালে বা চাদরের ব্যবস্থা করে রাখুন।

২. আগুন জ্বালানোর চেষ্টা

আগুন জ্বালানোর চেষ্টা বা ম্যাচ জ্বালাবেন না। কারণ দালান ধ্বসে পড়লে গ্যাস পাইপ লিক হয়ে থাকতে পারে। বিশাল ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

৩. শেষ চেষ্টা

চিৎকার করে ডাকাডাকি শেষ চেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করুন। কারণ, চিৎকারের সময় মুখে ক্ষতিকারক ধুলাবালি ঢুকে যেতে পারে। পাইপে বা ওয়ালে বাড়ি দিয়ে বা মুখে শিস বাজিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে পারেন। তবে ভাল হয় সাথে যদি একটা রেফারির বাঁশি বা হুইসেল থাকে, তার প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন আগেই।

আরও জানুন » কিভাবে বুঝবেন আপনার কাছের কেউ মাদকাসক্ত কিনা? »

Comments

comments