নিরাকার

0
347
নিরাকার কেতন শেখ
Print Friendly, PDF & Email

নিরাকার

– কেতন শেখ

আজমের চায়ের স্টলে আজকে রোজকারের চেয়ে একটু বেশী ভিড়।

রানা ঘড়ি দেখলো। আটটা দশ। ইফতারের পরে এই সময়টাতে আজমের চায়ের স্টলে ব্যস্ততা থাকেই। শ্রাবণ মাস, বেশ লম্বা চওড়া দিনের রোজার পরে এই সময়টাতে অনেকেই চা সিগারেট আর পেঁয়াজু খেতে এই স্টলে আসে। চায়ের স্টলের পাশেই চটপটি ফুচকার গাড়ি, রাস্তায় চেয়ার পেতে চটপটি ফুচকা খাওয়ার ব্যবস্হা করা আছে। কাছাকাছি ভুট্টা আর ডাবলি বাদামের গাড়ি। পাবলিক লাইব্রেরীর সামনেই স্টল, রাত আটটাতেও ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা এখানে আড্ডা দেয়, প্রেম ট্রেম করে। খুব কাছে বড় রাস্তায় দুই হাসপাতাল আর মার্কেটের ভিড়, সারি সারি ফুলের দোকানের আলো, সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের সান্ধ্যকালীন আড্ডার মানুষজন। রাত বারোটা পর্যন্ত জায়গাটা গমগম করে।

আজকে চাঁনরাত হওয়ায় এমন জায়গায় এরকম সময়ে কাউকে খুন করা কঠিন কাজ। রানাকে এই কঠিন কাজটা এ্যারেন্জ করতে হবে। আর তিরিশ মিনিটের মধ্যেই কাজটা করার কথা। এই এলাকায় আজমের চায়ের স্টলসহ প্রায় সব স্টলের লোকজন রানাকে চেনে। খুনটা তাই রানা করতে পারবে না। খুনটা করবে সুলতান। এই মুহূর্তে সুলতান এই স্পটের পঞ্চাশ গজ দূরে ফুটপাথে অপেক্ষা করছে। রানার এসএমএস পেলেই সে খুন করতে আসবে।

আজকের খুনের পরিকল্পনা অনুযায়ী রানার কাজ হচ্ছে টার্গেটকে আলোর থেকে একটু দূরে নিয়ে আসা। সেজন্য টার্গেটের সাথে প্রথমে আলাপ পরিচয় করতে হবে। তাকে একান্তে কথা বলার প্রস্তাব দিয়ে চায়ের স্টলের পেছনে বড় গাছটার পাশে নিয়ে আসতে হবে। ফুটপাথের এই অংশে আলো নেই। টার্গেট একবার সেখানে এসে পড়লে সুলতানের জন্য খুন করা খুব সহজ। সুলতান ক্লোজ রেঞ্জে একটা ককটেল ফাটিয়ে টার্গেটকে দুইবার ফায়ার করে সরে যাবে। রানা তখন কি করবে সেই ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। রানা তখন “হেল্প হেল্প” বলে হাঁকডাক করে একসময় সরে যেতে পারে, অথবা খুনের পরপরই সুলতানকে ধরার জন্য তার পেছনে দৌড় দিতে পারে।

রানার কপালে ঘাম জমছে। ও পাঞ্জাবীর হাতায় মুখ মুছলো। টার্গেট এখনও এসে পৌঁছায়নি। এক ঘন্টা আগে টার্গেটের নাম পরিচয় আর ছবি রানাকে ফেসবুকে মেসেজ দিয়ে জানানো হয়েছে। চব্বিশ পঁচিশ বছর বয়সের যুবক, গালপাট্টা দাড়ি, পাঞ্জাবী পরা হাসিমুখের ছবি। এই ছেলেকে রানা আগে কখনও দেখেনি। কেন তাকে খুন করা হচ্ছে সেটাও রানা জানে না। ওর কাজ ছেলেটাকে কথাবার্তা দিয়ে ভুলিয়ে আজমের চায়ের স্টল থেকে ফুটপাথের গাছের আড়ালে নিয়ে যাওয়া। এরপরের কাজ সুলতানের।

এসব কন্ট্রাক্ট এরকমই হয়। ঘন্টাখানেক আগে ডিটেইলস আসে, সেই অনুযায়ী কাজ শেষ করতে হয়। ঐ টার্গেট কার কি, খুনের কারণ কি … এসব কিছুই রানা জানে না। সুলতান জানলেও জানতে পারে, কিন্তু তাকে রিমান্ডে নিয়ে মার লাগালেও সে কিছু বলবে না। রানাও কাউকে কিছু বলতে পারবে না। যে কন্ট্রাক্ট দেয় সে ফেসবুকে ফেইক প্রোফাইলে আছে। তার ফেসবুক নাম “আকাশ বন্ধু”। আসল নাম পরিচয় অজানা হলেও রানা বুঝতে পারে যে সে ভয়ঙ্কর ক্ষমতাশীল। তার পক্ষে রানাকে উধাও করে দেয়া চুটকির ব্যাপার।

রানা স্টলের ভিড়ের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে বললো, মামা চা দাও। রং চা। সাথে একটা সাদা বেনসন।

আজম মুখ তুলে তাকালো না। ওর চেহারা ভাবলেশহীন। যণ্ত্রের মতো হাত নড়ছে। ওর সাথে ওর দশ-এগারো বছর বয়সের ছেলেটাও কাজ করছে। এরা দুজনই রানাকে চেনে। গত দুই বছরে রানা এই এলাকায় যেখানে যেই খুনেই সাহায্য করুক না কেন এই স্পটে কিছু করেনি। এই স্পটের কেউ রানার ঐ পরিচয় জানে না। আজমের চায়ের স্টলের এই স্পট হচ্ছে রানার আশ্রয়। এখানে বন্ধুবান্ধবের সাথে রানা কোনো কারণ ছাড়াই আড্ডা দেয়, কিন্তু কোথাও খুনের প্রজেক্ট থাকলে খুন শেষ হওয়ার পরপরই রানা এখানে চলে আসে।

আজকের প্রজেক্টের সবচেয়ে বিপদজ্জনক ব্যাপার হচ্ছে খুনের স্পট এখানেই। টার্গেট এখানে আড্ডা দিতে আসবে। টার্গেট আসার সাথে সাথে সুলতানকে এসএমএস করে সেটা জানাতে হবে। টার্গেট কি যেন একটা রেডিও স্টেশনে জকি … ফেসবুক মেসেজটাতে ডিটেইলস আছে। রানাকে সেই সূত্রে তার সাথে আলাপ শুরু করতে হবে। আলাপের এক পর্যায়ে টার্গেটকে সিরিয়াস ব্যবসায়িক আলাপের কথা বলে আড়ালে নিয়ে আসতে হবে। এর মধ্যে সুলতানের এসে পড়ার কথা। সুলতান এসে পড়লে রানার আর কোনো কাজ নেই।

আজমের ছেলেটা কাঁচের কাপে রং চা নিয়ে এসেছে। রানার দিকে কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বললো, পিঁয়াজু খাইবেন ?

– যা নিয়ে আয়। হাফপ্লেট আনবি।

– হাফপ্লেট পিঁয়াজু বারো টাকা। চা ছয় টাকা। সাদা বেনসন দশ টাকা।

রানা পকেট থেকে তিরিশ টাকা বের করে ছেলেটার হাতে দিলো। মুখের ভেতরটা শুকনো লাগছে। পানি খেতে পারলে ভালো হতো। এখানে মিনারেল ওয়াটারের কোনো ভরসা নেই, পুরানো বোতলে যে কোনো পানি ভরে চালিয়ে দিতে পারে। রানা চায়ে চুমুক দিলো। শ্রাবণ মাসের বৃষ্টিহীন উত্তপ্ত দিন কাটানোর পরে সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাসে রং চায়ের স্বাদ অমৃতের মতো লাগছে। আজমের স্টলে ভিড় থাকলেও পরিচিত কেউ এখনও আসেনি। চাঁনরাতের কারণে সবাই ব্যস্ত।

বাংলাদেশে চাঁনরাতের উৎসব ঈদের চেয়েও জাঁকজমকপূর্ণ। ইফতার শেষ করে সবাই এখন কেনাকাটা করতে বের হবে। প্রিয়জনদের জন্য এটা ওটা কিনবে। অনেকের হাতে আজকে ঈদ বোনাস আসবে। তারা আজকে বাজার-সদাই করবে। বাসার মা মেয়েরা বাজারের অপেক্ষায় থাকবে। বাজার আসলে ঈদের রান্না বসবে। যাদের দোকানপাটের ব্যবসা তারাও আজকে ধুম বিক্রির জন্য উঠে পড়ে লাগবে। দোকানের স্টাফদের বেতন বোনাস হবে। রাত এগারোটা বা বারোটা পর্যন্ত ব্যবসা শেষ করে সবাই সেলুনে যাবে চুল দাড়ি কাটাতে। সেখানে আরেক আড্ডা হবে … রোজার মাসের সুখ দুঃখের আলাপ, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ে আহাজারি, টাকাপয়সার দুরাঅবস্থার গল্প। দৈনন্দিন দুঃখের এসব গল্প আজকে হবে হাসিমুখে।

এসব আনন্দের সাথে রানার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। বাবার মৃত্যুর পরে মা বারো বছর একা সংসার টেনে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত ও অসুস্হ হয়ে পড়েছেন। কোনো ব্যাপারেই তাঁর তেমন কোনো উত্তেজনা নেই। রানার বড় ভাই রিমন হেরোইন আসক্ত, বহুদিন ধরে চিকিৎসাধীন অবস্হায় আছে। হেরোইনের আসক্তি বিষের মতো ওর সমস্ত শরীরে ছেয়ে গেছে। চিকিৎসা চললেও ওর অবস্হার কোনো উন্নতি হচ্ছে না। ওদের একটাই বোন ছিলো … চৈতী। দুই বছর আগে এই ক্যাম্পাসেই হঠাৎ একদিন ক্রস ফায়ারে চৈতী মারা গেলো।

চৈতীর মৃত্যু রানার জীবনে হঠাৎ আসা ঝড়ের মতো ছিলো। এক ঝটকায় সব এলোমেলো করে দেয়া ঝড়। ক্রস ফায়ারে কারও মৃত্যু হলে যে এই দেশের কোনো আইন সেই হত্যার কোনো বিচার করতে পারে না, সেটা রানার জানা ছিলো না। চৈতীর মতো একটা সদা হাস্যোজ্জ্বল ফুটফুটে মেয়ে এক মুহূর্তের একটা দুর্ঘটনায় কয়েকদিনের খবর আর ব্লগের বিষয় হয়ে গেলো। লাইক, শেয়ার আর কমেন্টে চৈতীর মৃত্যু বেঁচে থাকলো ভারচুয়াল অনেক প্ল্যাটফর্মে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে চৈতীর মৃত্যু একটা এন্ট্রি হয়েই রইলো। আইনী তারিখের ভিড়ে চৈতীর অকাল মৃত্যুর শোক কোথায় যেন হারিয়ে গেলো।

অপঘাতে মৃত্যু এই দেশে দৈনন্দিন ব্যাপার। টানাটানির সংসারে সেই শোক দীর্ঘস্হায়ী হওয়ার কথা না। শোকের আসল আঘাত পড়লো রানার মনের ভেতরে। মা পাথরের মতো হয়ে গেলেন। রিমনের মাদকাসক্তি বেড়ে গেলো। সংসারের উপার্জন তখন রানার টিউশন আর বুটিক সাপ্লাই-এর টুকটাক কাজ থেকে আসে। সেই বুটিকও শুরু হয়েছিলো চৈতীর ভাবনা থেকে। ঘরে তৈরী সেলাই-এর ডিজাইন করে ফ্যাশন হাউজগুলোতে সাপ্লাই … রানা শখ করে সেই ব্যবসার নাম রেখেছিলো চৈতী ফ্যাশনস। সেই পায়ে হাঁটা ডিজাইন সাপ্লাই আর টিউশনে চলতো রিমনের চিকিৎসার খরচ, সাংসারিক খরচ। চৈতীর আকস্মিক মৃত্যুর পর জীবন আর ভাবনার শূন্যতা রানার সবকিছু পাল্টে দিলো।

চৈতী হারিয়ে যাওয়ার পর রানা সেই নামেই ছোট করে বুটিক ব্যবসা শুরু করলো। কিছুদিনের মধ্যেই ব্যবসার সূত্রে সুলতানের সাথে ওর পরিচয়। স্বল্প পুঁজির ব্যবসায় রানা তখন হিমশিম খাচ্ছে, টাকাপয়সার টানাটানিতে সংসার প্রায় অচল। তখন থেকেই সুলতান আর আকাশ বন্ধুর সাথে এসব অপরাধের কাজ শুরু। এরপর সেই পথ থেকে ফেরার আর সুযোগ হয়নি। হওয়ার কথাও না।

আজমের স্টলের ভিড় ঠেলে একটা আধো পরিচিত মুখ রানার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, রানা ভাই, খবর কি ?

রানা হাসলো। ছেলেটার পরিচয় মনে পড়ছে … মনসুর, ব্লগে লেখালেখি করে। জুনিয়র ছেলে, একই ডিপার্টমেন্টে পড়তো। গতবছর মাস্টার্স শেষ করেছে। রানা কাপের বাকি চা-টুকু শেষ করে বললো, এই তো মনসুর, আছি … তোমার লেখালেখির খবর কি ?

– ভালো না ভাই। দৌড়ের উপর থাকি, তার মধ্যে উটকা চাপ। জানেন তো অবস্হা …

– ঐসব ভয় করে কি লেখালেখি বন্ধ করে দিবা ?

মনসুর হেসে মাথা নাড়লো। সহজ স্বরে বললো, ঐসব ভয় পাইলে তো ভাই ব্লগই থাকতো না। আপনের ব্যবসার খবর কি ভাই … ব্যবসা ফালায়ে চাঁনরাতে এইখানে কি করেন ?

আজমের ছেলেটা হাফপ্লেট পেঁয়াজু নিয়ে এসেছে। সাথে একটা ছোট পিরিচে টক। পেঁয়াজু আর টক বেঞ্চে রেখে সে শার্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করে রানার হাতে দিলো। রানা সিগারেট ধরিয়ে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললো, সিগারেট খাবে মনসুর ?

– না ভাই, একটু আগে খেয়েছি একটা। পেঁয়াজু খেতে পারি।

– খাও, পেঁয়াজু খাও।

ইটের মতো শক্ত পেঁয়াজু, খুব সম্ভবত অনেক আগে ভাজা হয়েছে। অতিরিক্ত ভাজার কারণে বিস্বাদ হয়ে গেছে। একটা পেঁয়াজু খেলে আর খেতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু মনসুর বেশ আগ্রহ নিয়েই খাচ্ছে। খেতে খেতেই বললো, আজকে সকালেও থ্রেট আসছে রানা ভাই … দুইটা চায়ের অর্ডার দেই, এরপর আপনারে সব গুছায়ে বলি।

রানা একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মনসুরের মতিগতি দেখে মনে হচ্ছে সে খুব সহজে রানাকে ছাড়বে না। হয় তো পরিচিত কেউ আড্ডায় আসেনি, তাই রানাকে পেয়ে এখানেই খুঁটি গাড়ছে। মনসুরের সাথে আড্ডা দেয়ার ব্যাপারে রানার কোনো আগ্রহ নেই। ওর সব গল্পেই কিভাবে ওকে হয়রানি করা হচ্ছে এসবের বিতং এবং মনগড়া বর্ণনা থাকে। ওর কথাবার্তা শুনলে মনে হবে ব্লগে লিখে ও একাই ফাটিয়ে ফেলছে, এবং ওকে এখনই না থামালে ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আদলই পাল্টে দেবে। এখন এসব আলাপ শুনলে বিরক্ত লাগে। কয়েকশ ব্লগে হাজার হাজার মানুষ লিখছে। এতো লেখা হলে পড়ার লোকই কমে যাবে, আর পড়ে রিএ্যাক্ট করবে কে!

রানার বন্ধুবান্ধব ওর সমবয়সী, জুনিয়র ছেলেদের সাথে ওর তেমন একটা খাতির নেই। চাঁনরাত হওয়ার কারণে আজকে রানার বন্ধুবান্ধব কেউই এখানে আড্ডায় আসবে না। আজকের কাজের জন্য বন্ধুবান্ধবের কাছে থাকাটাও উচিত না। টার্গেটের আসার সময় হয়ে যাচ্ছে। এখন এসব উটকো লোকজনকে বিদায় করতে হবে। এই স্পটে রানা আগে কখনও খুন করায়নি। এই প্রথম এমন কিছু করতে হলে আশেপাশে কোনো পরিচিত লোকজনের থাকা ঠিক না।

রানা অল্প কেশে বললো, মনসুর, চা লাগবে না। আমার একটা কাজ আছে, তোমার গল্প আরেকদিন শুনবো।

– কি কাজ ভাই ? আমি ভাবলাম একজনের সাথে আপনার পরিচয় করায়ে দিবো …

– কার সাথে ?

– ইরফান নামের একটা ছেলে। তারুণ্য রেডিওতে জকি, খুব স্মার্ট ছেলে। আপনার প্রোডাক্ট প্রমোশনের কাজে লাগতে পারে। ওদের এ্যাড-এর ডিল খুব ভালো।

রানা এক মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গেলো। মনের গভীরে কেন যেন কেউ বললো, “ফেসবুক চেক করো, ইরফানই তোমার টার্গেট”। ছেলেটার ছবিটা চোখে ভাসছে, কিন্তু নামটা মনে পড়ছে না। যদি ইরফানই টার্গেট হয়, তাহলে এখন কাজ খুব সহজ। মনসুর পরিচয় করিয়ে দিলে প্রাথমিক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। রানা সহজ স্বরে বললো, তুমি বসো, আমি একটা সিগারেট নিয়ে আসি।

মনসুর পকেট থেকে সিগারেট প্যাকেট বের করে বললো, আমার থেকে নেন …

– না, না থ্যাংকস … আমি সাদা বেনসন খাই ….

আজমের স্টলের কাছে এসে রানা মোবাইলে ফেসবুক চেক করলো। টার্গেটের নাম ইরফান হাবিব, তারুণ্য রেডিওর জকি। রানা সিগারেট ধরালো। এরপর বেঞ্চে ফিরে এসে শান্ত কণ্ঠে বললো, কোথায় ? ইরফান এসেছে ?

– না … তবে টেক্সট করলো, কাছেই আছে।

– গুড। পরিচয় করিয়ে দিও।

– অবশ্যই ভাই।

আজমের স্টলের সামনে রাখা চটপটির গাড়িতে এখন ভিড় বেড়েছে। অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েরা চেয়ারে বসে গল্প করছে আর ফুচকা খাচ্ছে। মেয়েগুলোর চোখেমুখে লজ্জা লজ্জা ভাব। ছেলেগুলো কথা বলছে তাদের সঙ্গিনীর দিকে তাকিয়ে। প্রেমের জন্য এই বয়সটার কোনো তুলনা হয় না। জীবনের এই চমৎকার সময়গুলো সবার ভাগ্যে জোটে না। চৈতীর ভাগ্যে জোটেনি। তার আগেই তাকে পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়েছে। ভালোবাসার মানুষের হাতে হাত রেখে সন্ধ্যার বাতাসে গল্প করার সুযোগ প্রকৃতি চৈতীকে দেয়নি। নিয়তির নিষ্ঠুরতায় চৈতীর সেই অনুভূতি অপূর্ণ রয়ে গেছে।

রানার খুব কাছেই ইরফান রিকশা থেকে নামলো। ফেসবুকে পাঠানো ছবির সাথে ছেলেটার বেশ ভালোই মিল। আজকেও সে নীল রঙের পাঞ্জাবী পরে আছে। মুখ হাসি হাসি। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে মনসুরের দিকে তাকিয়ে হাসলো। সরল সুন্দর তারুণ্যের হাসি। এই ছেলে জানে না যে তার নিয়তিতে কি অপেক্ষা করছে। আর কুড়ি মিনিটের মাথায় তার ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে সে জানে না। তার ভাবনা জুড়ে এখন চাঁনরাত, ঈদের আনন্দ, পরিবারের প্রিয় মানুষের মুখ, সন্ধ্যা সমীরণের প্রিয় অবসাদ।

রানা সুলতানকে এসএমএস করলো … “ইট ইস রেইনিং”। কোড। এর অর্থ হচ্ছে টার্গেট এসে পৌঁছে গেছে, এখন থেকে দশ পনেরো মিনিটের মধ্যে সুলতানের কাজ। সুলতান এখন রওনা দিয়ে এখানে কাছাকাছি এসে পৌঁছাবে। এরপর ওর সুবিধা মতো স্পটে এসে ককটেল ফাটিয়ে ফায়ার করবে। এরপর কাজ শেষ।

মনসুর উঠে ইরফানের সাথে হাত মিলালো। এরপর রানার দিকে তাকিয়ে বললো, রানা ভাই, এই হচ্ছে ইরফান, যার কথা বলছিলাম।

ছেলেটা সালাম দিয়ে খুব সহজ কণ্ঠে বললো, ভাইয়া ভালো আছেন ?

– হ্যাঁ আছি, তুমি ভালো ?

– জ্বি আলহামদুলিল্লাহ। আপনাকে পরিচিত লাগছে ভাইয়া …

রানা অল্প হেসে বললো, হ্যাঁ ঐরকম অনেকেই বলে। চা চলবে ?

– না ভাইয়া চা খাবো না … থ্যাংকস। ইন ফ্যাক্ট আমি বেশীক্ষণ বসবো না, একটা জায়গায় যেতে হবে। কিন্তু আপনার নামটা কি আরেকবার বলবেন ভাইয়া ?

– রানা, আমার নাম রানা।

– ও … আপনি কি লেখালেখি করেন ?

রানা একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, না রে ভাই, ঐসব আমার দ্বারা হয় না … আমি ব্যবসা করি। ইন ফ্যাক্ট আমার ব্যবসার ব্যাপারে তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো, মানে এ্যাড-এর ব্যাপারে। তোমাদের প্যাকেজ সম্পর্কে জানতে চাই।

-জ্বি অফকোর্স ভাইয়া, বলেন কি জানতে চান।

মনসুরের ফোন বাজছে। গুড টাইমিং। কাকতালীয়ভাবে ব্যাপারটা রানার ফর-এ গেছে। মনসুর ফোনে ব্যস্ত হলেই ইরফানকে আড়ালে নেয়া যাবে। রানা সহজ স্বরে বললো, আসো ঐদিকে যাই, আমি চা খাবো। এখানে বেশ শব্দ, ঐদিকটায় আরামে কথা বলা যাবে।

ইরফান নির্দ্বিধায় রানার সাথে ফুটপাথের দিকে এগিয়ে গেলো। রানা মনে মনে বললো, আই এ্যাম সরি মাই ব্রাদার, আমাকে ক্ষমা কোরো। আমি এখন এটা না করলে আমি থাকবো না। করলে তুমি থাকবে না। আকাশ বন্ধু চায় না তুমি থাকো। আমাকে বাঁচতে হবে। সরি।

আজমের স্টল পার হয়ে ফুটপাথের বড় গাছটার আড়ালে গিয়ে রানা সিগারেট ধরালো। এসএমএস করার পর প্রায় সাত আট মিনিট পার হয়ে গেছে। এখন যে কোনো মুহূর্তে সুলতানের এসে পড়ার কথা। মনসুর ফোনে ব্যস্ত। ওর হাবভাবে মনে হচ্ছে না ফোনে কথা শেষ হলে ও এখানে আসবে। না আসলেই ভালো। আসলে ওর বিপদও হতে পারে। ফায়ারিং-এর সময় সুলতান টার্গেট ভুল করে ওকেও গুলি করতে পারে।

রানা কিছু বলার আগেই ইরফান বললো, ভাইয়া কিসের ব্যবসা করেন ?

– বুটিক। চৈতী ফ্যাশনস, বাড্ডায় অফিস আর শো রুম।

ইরফান হঠাতই নিষ্প্রভ হয়ে গেলো। মনে হলো ও থমকে গেছে। রানার নিশ্বাস ভারী হয়ে যাচ্ছে। এই ছেলে কি কিছু জানে ? এই ছেলেকে ব্যবসার আসল নাম বলা হয় তো ঠিক হলো না … যদি কিছু জানে তাহলে সব ভন্ডুল হয়ে যাবে। এই মুহূর্তে সেটা খুব বিপদজ্জনক। আজকের কাজের হাফ পেমেন্ট হয়ে গেছে। এখন কাজে ভন্ডুল হলে রানার পালানোর উপায়ও নেই।

রানা ঘড়ি দেখলো। সুলতানের আসার সময় হয়ে গেছে, কিন্তু ওর দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। স্পটে এসেই সুলতানের একটা সাদা ককটেল ফাটানোর কথা। এই ককটেলে কোনো স্প্লিন্টার নেই, কিন্তু প্রচন্ড শব্দে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য এটা যথেষ্ট। এই আতঙ্কে ছুটাছুটি শুরু হলেই সুলতান ক্লোজ রেঞ্জে ইরফানকে গুলি করবে। এক মিনিটের ব্যাপারও না, কিন্তু কখন সেটা হবে বুঝা যাচ্ছে না। রানা ইতস্তত করে বললো, কি ব্যাপার, কি ভাবছো ?

ফুটপাথের অন্ধকারেও ইরফানের চেহারায় একটা মলিন ভাব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ছেলেটা ঢোক গিলে বললো, ভাইয়া, আপনার পুরো নাম কি বলবেন প্লিজ …

– কেন ?

– বলেন প্লিজ …

– আব্দুল মতিন রানা … কেন বলো তো ?

ইরফান নিজের চুলে হাত বুলালো। চোখ নামিয়ে মৃদু স্বরে বললো, আপনি চৈতীর বড় ভাই রানা, তাই না ?

রানা কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। ওর মাথা কাজ করছে না। রাস্তার কোলাহলের কিছুই ও এখন শুনতে পারছে না। মাথার ভেতরে একটা চিনচিনে শব্দ হচ্ছে। ওর দৃষ্টিতে চৈতীর মুখ, কিন্তু ওর সামনে ইরফান দাঁড়িয়ে আছে। ইরফান বিড়বিড় করে বললো, চৈতী আপনার কথা খুব বলতো …. আপনাদের বুটিকের নাম আমি ওর কাছেই শুনেছি।

– চৈতীকে কিভাবে চেনো তুমি ?

ইরফান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, আমি ওর বন্ধু … ও যেদিন মারা যায়, আমি ওর সাথে ছিলাম। গুলি লাগার পরে আমিই ওকে মেডিকেলে নিয়ে যাই ….

– তুমি এসব কি বলছো !

– সত্যি বলছি ভাইয়া। আমরা টিএসসি-তে ছিলাম, তখন গোলাগুলি শুরু হলো। আমরা কলাভবনে যাওয়ার জন্য রাস্তায় বের হলাম, চৈতী আমার হাত ধরে দৌড়াচ্ছিলো। লাইব্রেরীর কাছাকাছি এসে দেখি ওর গুলি লেগেছে। রক্ত পড়ছে …

রানার মাথা ঘুরছে। ওর মনে হচ্ছে এভাবে ও দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। ও সিগারেট ফেলে দিলো। মাথার শূন্যতা পর্ব শেষ হয়ে এখন সব শব্দ কানে আসছে। মনে হচ্ছে শব্দগুলো অনেক তীব্রভাবে মাথায় ঢুকে গেথে যাচ্ছে। রানা কাঁপা কণ্ঠে বললো, তুমি মিথ্যা বলছো ….

– না ভাইয়া, সত্যি বলছি। চৈতীকে আমি ভালোবাসি … দুই বছর আমাদের মেলামেশা ছিলো। সিএনজি-তে মেডিকেলে নেয়ার সময় চৈতী আমার হাত ধরে ছিলো। আমার শার্টে ওর রক্ত আছে, সেই শার্ট আমি রেখে দিয়েছি … ভাইয়া, ও সিএনজি-তে বারবার আপনার কথা বলছিলো। মেডিকেলে নেয়ার পরেও আপনার কথা বলছিলো …

– আমি যখন মেডিকেলে যাই তখন তোমাকে দেখি নাই কেন ?

ইরফান কিছু বলার আগেই প্রচন্ড শব্দে ককটেল ফুটলো। হৈচৈ শুরু হয়ে গেছে। নিশ্চই সুলতান এসে পড়েছে। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ও ইরফানকে গুলি করবে। ককটেল ফুটার সাথে সাথে একটা সাদা ধোঁয়ার মতো কিছু হয়ে সব দৃশ্য অস্পষ্ট হয়ে গেছে। ককটেলের আতঙ্কে স্টলের মানুষজন এদিক ওদিক দৌড়াচ্ছে। কিন্তু ইরফান রানার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখেমুখে কোনো আতঙ্ক নেই। ও রানার আরও কাছে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বললো, ভাইয়া এখান থেকে চলেন, গন্ডগোল হবে ….

ঠিক সেই মুহূর্তে রানা সাত আট গজ দূরত্বে সুলতানকে দেখলো। সুলতানের হাতে কালো কুচকুচে পিস্তল, সোডিয়াম লাইটের আলোতে চকচক করছে। এই দূরত্ব থেকে সুলতান খুব সহজে ইরফানের পিঠে গুলি করতে পারবে। এক গুলিতে ইরফান পড়ে গেলে কাছে এসে বুকেও গুলি করতে পারবে। রানার সমস্ত শরীরে অসার বোধ হচ্ছে। বুকের ভেতরে ধ্বকধ্বক করছে। সুলতানের পিস্তল ধরা হাত উঁচু হচ্ছে। ইরফান রানার দিকে তাকিয়ে আছে। ও রানাকে ধরে রেখেছে। ওর পেছনে কি হচ্ছে সেটার কোনো খেয়াল ওর নেই।

রানা এক ঝটকায় ইরফানকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিলো। ফুটপাথের আধো অন্ধকারে ঠিক তখনই ওর চোখের সামনে দুইবার বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গের মতো আলো জ্বললো। গুলির শব্দ রানা শুনতে পায়নি। ফুটপাথের গাছে পিঠ ঠেকার আগে রানা কোনো ব্যথাও অনুভব করেনি। এর পরের ঘটনাগুলোর সাথে কিছুক্ষণের জন্য রানা সব যোগাযোগ হারিয়ে ফেললো।

হৈচৈ বা রাস্তার কোনো শব্দ রানার কানে আসছে না। ওর কানে একটানা একটা ভোঁ ভোঁ শব্দ আসছে। রানার মনে হচ্ছে ওর শরীরে কোনো শক্তি নেই। ওর মাথা কারও কাঁধে হেলান দেয়া। চোখ খোলার সাথে সাথে ও আলো আধারির মাঝে কালচে রঙের লোহার গ্রীলের দৃশ্য দেখতে পেলো। গ্রীলের ওপাশে সিএনজি চালকের পিঠ। সিএনজির কাঁচের সামনে প্রচন্ড ভিড়। রানার বমিভাব হচ্ছে। মুখের ভেতরে মরুভূমির খরা। ও বিড়বিড় করে বললো, ভাই কে আপনি … আমি কই ভাই ?

পাশে বসা কারও হাত রানাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। কাঁপা কণ্ঠে বললো, ভাইয়া আমি ইরফান। আপনি ভয় পাবেন না, আমরা মেডিকেলে যাচ্ছি।

– আমার কি গুলি লেগেছে ?

– ভাইয়া আপনি ভয় পাবেন না … আপনার কিছু হবে না। আমি আছি …

– আমার কয়টা গুলি লেগেছে ভাই ?

ইরফান কিছু বললো না। আরও শক্ত করে রানাকে জড়িয়ে ধরলো। দুই বছর আগে ঠিক এভাবেই ও চৈতীকে জড়িয়ে ধরেছিলো। ঠিক এভাবেই আশ্বাস দিয়েছিলো। চৈতী বারবার বলছিলো, আমার রানা ভাইয়াকে একটা খবর দাও প্লিজ। আমি ভাইয়াকে একটু দেখতে চাই। আমি বাঁচবো না, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুল উল্লাহ ….

রানা মৃদু স্বরে বললো, ইরফান, ভাই আমার, তুমি কি চৈতীর শেষ সময়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলে ? … আমার বোনটার অসুখ হলে আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম …

ইরফান কিছু বললো না। ওর প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে। ও রানার মাথায় হাত রাখলো। রানার প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। সিএনজির শব্দে রানার মাথায় প্রচন্ড যণ্ত্রণা হচ্ছে। ওর মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে গেলে এই শব্দটা থেকে রক্ষা পাওয়া যেতো।

ওদের সিএনজি এখনও মেডিকেল থেকে বেশ দূরে, ভিড়ের মধ্যে আটকে আছে। চাঁনরাতের ভিড়। খুব সহজে এই ভিড় কমবে বলে মনে হচ্ছে না।

আরও জানুন » অজানায় »

সাহিত্য, কাব্য, সঙ্গীত আর শিল্প নিয়ে কেতন শেখ-এর স্বপ্নময় জীবন। ২০১৩ থেকে জাগৃতি প্রকাশনীর সাথে নিয়মিত লিখছেন। কাজল, নীল গাড়ি ও সাদা স্বপ্ন, এক-দুই-আড়াই, অধরা অনুরাগ ও অভিসরণ আলোচিত উপন্যাস। এ ছাড়াও লিখেছেন অন্তঃস্রোত (গল্পগ্রন্হ) ও চতুষ্পথ (কাব্যগ্রন্হ)। বাংলা কবিতা, বাঙালিয়ানা ম্যাগাজিন, প্রিয়.কম সাহিত্য পত্রিকা, আলফি পত্রিকা, নক্ষত্র ও অন্যান্য ব্লগে ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।

জন্ম ঢাকায়। ভ্রমণ শৌখিন। পৃথিবীকে দেখার স্বপ্ন নিয়ে ভ্রমণ করেছেন ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, চীন, কোরিয়া ও অন্যান্য দেশে। পেশায় অর্থনীতিবিদ। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ সাউদাম্পটন থেকে অর্থনীতিতে পি এইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টমিন্স্টারে অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। লেখালেখির মতো সঙ্গীতও তাঁর অন্যতম প্রিয় শখ। তাই মাঝে মাঝে অবসরে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত রেকর্ডিং স্টুডিও এপসিলনে নীল বাতি জ্বালিয়ে সুর সৃষ্টি করেন।

ব্যক্তিজীবনে আড্ডাপ্রিয় ও বন্ধুপরায়ণ। স্ত্রী ও দুই পুত্রকে নিয়ে থাকেন ইংল্যান্ডের এইল্সবারীতে।

Comments

comments