নাতি কাহিনী

নাতি কাহিনী ওরাইওন
Print Friendly, PDF & Email

আগমন

কুরবানীর ঈদের জামাত শেষ করে কেবল ঘরে ঢুকেছি, এমন সময় মেয়ের ফোন এলো। ব্যস্ত কণ্ঠ- বাবা, তোমরা মনে হয় অনেক তারাতাড়ি নানা নানী হয়ে যাবে। আমরা হাসপাতালে যাচ্ছি বলেই ফোন ছেড়ে দেয়। বলে কি মেয়ে? এতদিন বললো নাতি হবে অক্টোবরের শেষে, এখন কেবল সেপটেম্বরের শেষ, এখনো প্রায় একমাস বাকী। বিস্তারিত জানতে মেয়ে এবং জামাইকে বারবার ফোন করি। ওরা ফোন ধরেনা। স্ত্রীকে সংবাদটা জানাই, তিনি বলেন কি জানি ফলস পেইন হতে পারে। এখন ও তো অনেকদিন বাকী। যাহোক, কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি, কি করবো ঠিক করতে পারি না। আমরা দুজনেই কুরআন শরীফ পড়তে বসি। প্রায় ঘন্টাখানেক পর ছেলের ফোন আসে। সে মামা, আমরা নানা নানী হয়েছি। আল্লাহর রহমতে মেয়ে ও নাতি দুজনেই সুস্থ। তবে, নবজাতকের ওজন কিছুটা কম। ডাক্তার বলেছেন উদ্বেগের কিছু নেই। আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের ঈদের আনন্দ আরো বহুগুণে বেড়ে যায়। ফোন করে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বান্ধবদের সংবাদটা জানাই। খুশীও যে সংক্রামক হতে পারে সে ব্যপারটা প্রথমবারের মতো অনুধাবন করি।

তার আগমনকে ঘিরে আমাদের কতদিনের পরিকল্পনা। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে মেয়ের ওখানে যাবো। নাতি ভূমিষট হবার আগেই এটা করবো, সেটা করবো। থাইল্যান্ডে থাকা ওর ফুফু হেদার কে অনুযোগ করলাম- তোমার ভ্রাতষ্পুত্র আমাদের সব পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিলো। সে তার ভ্রাতষ্পুত্রের পক্ষ নিয়ে বললো সে প্রথাবিরোধী নায়ক- জাস্ট ফলো হিম।

অবশেষে মেয়ে জামাইর সাথে কথা হয়। আগামীকালই ওরা হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে যাবে। জিজ্ঞেশ করি- আমরা কি টিকেট পরিবর্তন করে আগে আসবো? মেয়ে বলে না। তোমরা আগের প্লান মতোই আসো। বাচ্চা কিভাবে ম্যানেজ করবে বললে বলে- তোমাদের জামাই পিতৃত্ব ছুটি(paternity leave) পাবে। আমরা দুজনে সামলে নেবো।

কার মতো হয়েছে?

নবজাতককে নিয়ে প্রথম যে আলোচনাটি হয় তা হলো সে দেখতে কার মতো হয়েছে। বাবার মতো, নাকি মায়ের মতো? দাদা, দাদী, নানা, নানী,খালা, ফুফু, মামা, চাচাদের মত? এ বিষয়ে নানাজনের নানা মত। আমাদের নাতি ও এর ব্যতিক্রম নয়? কেউ বলে মায়ের মতো, আবার কেউবা বলে বাবার মতো হয়েছে। এমন সব নানা মত। আমি নিজে এ ব্যাপারটা খুব ধরতে পারিনা। তবে একটা জিনিশ বুঝতে পারি, নাতির একেকদিনের তোলা ছবি একরকম। অর্থাৎ সে এখনো বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং ক্রমেই নিজস্ব স্বকীয় অবয়ব লাভ করছে।
হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি। ইতোমধ্যে নাতির নাম রাখা হয়েছে- ওরাইওন(Orion)। এটি একটি গ্রীক শব্দ যার অর্থ হচ্ছে – সূর্যোদয়।

কেবল দূর থেকে দেখা

হোবোকেন, নিউ জার্সি পৌঁছেই পরদিন সকাল আটটায় আমরা ডাক্তারের ক্লিনিকে Tdap টিকা দিতে যাই। ঢাকা থেকে ফ্লুর টিকা দিয়ে এসেছিলাম। ঢাকার সব হাসপাতাল, ক্লিনিক খুঁজে ও Tdap টিকা পাওয়া যায়নি। বিশ্বের দ্বিতীয় নিকৃষ্ট বসবাস যোগ্য শহর থেকে নানাবিধ জীবানু বয়ে এনেছি। নবজাতককে এর প্রভাবমুক্ত রাখতেই এ সতর্কতা। তাছাড়াও আমাদের নাতি নির্ধারিত দিনের একমাস আগে জন্ম নিয়েছে, তাই বাড়তি সতর্কতা। যাহোক, ক্লিনিক থেকে ফেরার পথে নাতির স্ট্রলার ঠেলার সুযোগ পেয়ে ভীষণ আনন্দ হলো। টিকা কার্যকর হতে কিছুটা সময় নেয়। তাই এখনও নাতিকে স্পর্শ করছিনা আমরা, ওর বাবা মার ছাড়পত্র সত্বেও। কিছুটা দূর থেকে ওর নড়াচড়া, গোসল করা দেখি এবং প্রচুর কান্না শুনি। কান্নাও কি এতো মধুর হয়! পরের দিন, পাশে বসে নাতিকে একটা রকিং বেড এ দোলা দিই। সে ঘুমায়।

আমরা দুজন তাকিয়ে থাকি। কি যে ভালো লাগে।

আশা করছি, আজ আমরা নাতিকে কোলে নেবো।

পরীক্ষা

অন্যান্য নবজাতকের মতো আমাদের নাতি ও শেষরাতের দিকে কাঁদে। আমরা দুজনেই শেষরাতে ঘুম থেকে উঠে যাই বিধায় মেয়েকে বলি, নাতিকে আমাদের রুমে দিয়ে দিতে। মেয়ে না করে। বলে তোমরা দুজনেই বুড়ো হয়ে গেছ, অনেকদিন ছোট বাচ্চা দেখাশোনা করো নাই, পারবে না। আমরা বলে যাই। মেয়ে চুপ থাকে।

আজকে, ঘন্টা দু’একের জন্য মেয়ে ও জামাই বাইরে যায়। নাতিকে আমাদের কাছে রেখে যায়। সম্ভবতঃ পরীক্ষা করছে। নানী নাতিকে খাওয়ায়, ন্যাপী পরিষ্কার করে, এবং ঘুম পাড়ায়। আমি তাঁকে সহায়তা করি। আমরা মেয়ের আস্থা অর্জনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করি। কেননা আমাদের নাতির পক্ষে সকল সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব তাঁর।

আমারা দুজনেই মনে করি আস্থা অর্জনের পরীক্ষা আমরা ভালোই দিয়েছি। এখন ফলাফলের অপেক্ষা।

শিক্ষানবিসি

আলহামদুলিল্লাহ, অবশেষে শিক্ষানবিস হিসাবে আমরা দুজনেই নাতি সেবা শুরু করেছি। কাল, প্রায় দেড় ঘন্টা ব্যাপী প্রশিক্ষন ছিল স্থানীয় হাসপাতালে। প্রশিক্ষনের বিষয়বস্তু ছিল কোন কারণে সাময়িকভাবে শিশুর শ্বাস বন্ধ হলে কিভাবে সি পি আর, এবং গলায় কিছু আটকে গেলে কিভাবে হাইমলিক ম্যানুভার প্রয়োগ করতে হবে। হাইমলিক সাহেব তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতি ব্যবহার করে কেউ টাকা পয়সা দিচ্ছেনা দেখে, তাঁর নাম ব্যবহারে আপত্তি করেছেন। তাই এখন এটাকে এবডমিনাল প্রসিডুর নামে ডাকা হয়। হায়রে পুঁজিবাদ!

প্রশিক্ষণটি বিনামুল্যের। ব্রেকের সময় হাল্কা নাস্তা, এমনকি পারকিং ফি মওকুফের ব্যবস্থা আছে। সম্ভবতঃ রাষ্ট্র এর ব্যায়ভার বহন করে। শিশুর ম্যানিকুইন এর সহায়তায় হাতেকলমে প্রশিক্ষন দেন একজন মেডিক। মোট নয়জন প্রশিক্ষণার্থী। বেশীর ভাগ নতুন পিতামাতা অথবা সন্তানসম্ভবা দম্পতি। আমরাই কেবল ব্যতিক্রম।

ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জের ফলে এ ধরণের প্রশিক্ষন খুব প্রয়োজন। নানীসাহেবা বোস্টনে এধরনের একটি প্রশিক্ষন নিয়েছিলেন প্রায় ত্রিশ বছর আগে। আমাদের সন্তানরা শিশুকাল পার করেছে একই সময় আগে। প্রায় সবকিছুই ভুলে গেছি আমরা। আগের দিনে সন্তানসংখ্যা বেশী ছিল। আমার বড়বোন আমার ছোটমামা থেকে সামান্য বড় ছিলেন। অর্থাৎ আমার নানী ও মা প্রায় একই সময়ে সন্তান ধারণ করেছিলেন। কাজেই শিশুসেবা সবার হালনাগাদ থাকতো। তাছাড়াও আমাদের সন্তানেরা তুলনামুলক ভাবে বয়সে বেশী বয়সে বাচ্চা নিচ্ছে। ফলে এ ধরণের হালফিল কোর্স খুবই ফলপ্রসূ।

ছেড়ে আসা

প্রায় সাত সপ্তাহ হলো নাতির কাছে এসেছি। প্রথমে ভেবেছিলাম এতদিন কি করবো? সময়ই বা কাটবে কিভাবে? দেখতে দেখতে ঢাকায় ফেরার সময় হলো। কিভাবে সময় কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। নাতি, মেয়ে, জামাই সহ বিদায় দিতে বিমানবন্দরে এসেছে। আমাদের বিদায়ের মুহূর্তেই নাতির কান্না শুরু হয়ে গেলো। ও কি বুঝতে পেরেছে, আমরা চলে যাচ্ছি? দেশে ফেরার প্লেনে উঠেছি, কান্নার শব্দটাই বারবার কানে বাজছে। একজন নবজাতক, এইতো মাত্র ক’দিনের পরিচয়, এর মধ্যে এতোটা মায়ার বাধনে জড়িয়ে যাবো ভাবিনি। আল্লাহ চাহেনতো, আবার নাতির কাছে ফেরার আশা করি। বিশেষ করে, নানীর ফিরে আসা ঠেকানো যাবেনা বলেই মনে হচ্ছে। মাঝখানের দিনগুলোতে ফেসটাইম ই ভরসা।

আপনারা সবাই আমাদের নাতির জন্য দোয়া করবেন।


বাঙালিয়ানা Magazine এর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম! আপনি যদি বাঙালিয়ানা Magazine এ আপনার কোন লেখা প্রকাশ করতে চান তাহলে তা unicode Bangla font দিয়ে লিখে তার সাথে প্রয়োজনীয় সকল ছবি সহ আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। মানসম্মত লেখা অবশ্যই প্রকাশিত হবে। আমাদেরকে লেখা পাঠাতে ইমেইল করুন এই ঠিকানায় bangalianamagazine@gmail.com ( আপনি প্রথমবার লেখা পাঠিয়ে থাকলে অবশ্যই আপনাকে আপনার একটি ব্যক্তিগত ছবি ও ৩-৫ লাইনের সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতি পাঠাতে হবে )
বিঃ দ্রঃ দয়া করে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আপনার পাঠানো লেখাটি অনলাইনে আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। যদি অনলাইনে আগে অন্য কোথাও আপনার লেখাটি প্রকাশিত হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সেটা প্রকাশ করতে পারব না। Copy করা কোন লেখা পাঠাবেন না।

ডঃ এম, ফাওজুল কবির খান, বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিসিওএল এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস এর প্রাক্তন অধ্যাপক। মাঝে, মাঝে, নিজের পছন্দমতো বিভিন্ন বিষয়ে লিখে থাকেন।

Comments

comments