ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব ও উপায়সমূহ!

0
168
ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব ও উপায়সমূহ
Print Friendly, PDF & Email

আত্মশুদ্ধি অর্থ হলো নিজের সংশোধন, নিজেকে খাঁটি করা, পরিশুদ্ধ করা ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায় সর্বপ্রকার অনৈসলামিক কথা ও কাজ থেকে নিজ অন্তরকে মুক্ত ও নির্মল রাখাকে আত্মশুদ্ধি বলা হয়। আল্লাহ তায়ালার স্মরণ, আনুগত্য ও ইবাদত ব্যতীত অন্য সমস্ত কিছু থেকে অন্তরকে পবিত্র রাখাকেও আত্মশুদ্ধি বলা হয়।

আত্মশুদ্ধির আরবি পরিভাষা হলো ‘তাযকিয়াতুন নাফস’। একে সংক্ষেপে ‘তাযকিয়াহ’ ও বলা হয়। স্বীয় আত্মাকে সবধরনের পাপ-পংকিলতা ও অনৈতিক কর্মকান্ড থেকে মুক্ত রাখাই তাযকিয়াহ- এর উদ্দেশ্য।

আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তাঃ

মানুষের জন্য আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বস্তুত দেহ ও অন্তরের সমন্বয়ে মানুষ গঠিত। দেহ হলো মানুষের হাত-পা, মাথা, বুক ইত্যাদি নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এর সমষ্টি। আর অন্তর হলো আত্মা বা কালব। এ দুটোর মধ্যে কালবের সংশোধন প্রয়োজন। আর কলবের সংশোধনই হলো আত্মশুদ্ধি। কালব যদি সৎ ও ভালো কাজের নির্দেশ দেয় তবে দেহ ভালো কাজ করে। একটি হাদিসে মহানবি (সঃ) সুন্দরভাবে এ বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জেনে রেখো! শরীর এর মধ্যে একটি গোশতপিন্ড রয়েছে। যদি তা সংশোধিত হয়ে যায়, তবে গোটা শরীরই সংশোধিত হয়। আর যদি তা কলুষিত হয়, তবে গোটা শরীরই কলুষিত হয়ে যায়। মনে রেখো তা হলো কালব বা অন্তর’। (বুখারি ও মুসলিম)

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। আর ইবাদতের পূর্বশর্ত হলো পবিত্রতা। কেননা আল্লাহ তাআলা স্বয়ং পবিত্র। তিনি পবিত্রতা ব্যতীত কোনো জিনিসই কবুল করেন না। সুতরাং ইবাদতের জন্যও দেহ-মন পবিত্র হওয়া আবশ্যক। দৈহিক পবিত্রতা লাভ করলেই হবে না বরং অন্তরকেও পবিত্র করতে হবে। অন্য সব কিছু থেকে মনকে পবিত্র রেখে কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করতে হবে। আর অন্তর আত্মার পবিত্রতা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।

মানুষের আত্মিক উন্নতি, প্রশান্তি ও বিকাশ সাধনের জন্যও আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। আত্মশুদ্ধি মানুষের নৈতিক ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটায়। সদা সর্বদা ভালো চিন্তা ও সৎকর্মে উতসাহিত করে। আত্মশুদ্ধি মানুষের চরিত্রে প্রশংসনীয় গুণাবলির চর্চা করে দেয়। পক্ষান্তরে যার আত্মা কলুষিত সে নানাবিধ পাপ চিন্তা ও অশ্লীল কাজে লিপ্ত থাকে। সে অন্যায় অত্যাচার, সন্ত্রাস-নির্যাতন করতে দ্বিধাবোধ করে না। ফলে সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলাও বিনষ্ট হয়। অতএব, নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষা ও বিকাশের জন্য আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

আত্মশুদ্ধির গুরুত্বঃ

আত্মশুদ্ধি মানুষকে বিকশিত করে, সফলতা দান করে। ইহজীবনে আত্মশুদ্ধি মানুষকে পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত করে। এরুপ মা্নুষ সবধরনের কুপ্রবৃত্তি থেকে, সকল পাপাচার ও অনৈতিক কাজ থেকে দূরে থাকে। ফলে সমাজে সে একজন আর্দশ মানুষ হিসেবে সকলের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা লাভ করে।

বস্তুত আত্মশুদ্ধি হলো সফলতা লাভের মাধ্যম। যে ব্যক্তি আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে ব্যর্থ সে দুর্ভাগা। সে কখনোই সফলতা লাভ করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

‘নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আত্মাকে পূত-পবিত্র রাখবে সেই সফলকাম হবে, আর সে ব্যক্তিই ব্যর্থ হবে যে নিজেকে কলুষিত করবে’। (সূরা আশ-শামস, আয়াত ৯-১০)

পরকালীন জীবনের সফলতা এবং মুক্তিও আত্মশুদ্ধির উপর নির্ভরশীল। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে নিজ আত্মাকে পবিত্র রাখবে পরকালে সেই মুক্তি লাভ করবে। তার জন্য পুরষ্কার হবে জান্নাত। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

‘সেদিন ধনসম্পদ কোনো কাজে আসবে না, আর না কাজে আসবে সন্তান-সন্ততি। বরং সেদিন সে ব্যক্তিই মুক্তি পাবে, যে আল্লাহর নিকট বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে আসবে।’ (সূরা আশ-শুয়ারা, আয়াত ৮৮- ৮৯)

মূলত ইহ ও পরকালীন সফলতা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই অর্জন করা যায়। এজন্যই ইসলামে আত্মশুদ্ধির প্রতি অত্যধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আত্মশুদ্ধির উপায়ঃ

মানুষের অন্তর হলো স্বচ্ছ কাঁচের মতো। যখনই মানুষ কোনো খারাপ কাজ করে তখনই তাতে একটি কালো দাগ পড়ে। এভাবে বারংবার পাপ কাজ করার দ্বারা মানুষের অন্তর পুরোপুরি কলুষিত হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা এ সর্ম্পকে বলেন,

‘কখনোই নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়েছে।’ (সূরা আল – মুতাফফিফিন, আয়াত ১৪)

মানুষের কাজের কারণেই মানুষের অন্তর কলুষিত হয়। সুতরাং আত্নশুদ্ধি প্রধান উপায় হলো খারাপ কাজ ত্যাগ করা এবং কুচিন্তা, কুঅভ্যাস বর্জন করা। সদাসর্বদা সৎকর্ম, সৎচিন্তা, নৈতিক ও মানবিক আর্দশে নিজ চরিত্র গড়ে তোলার দ্বারা আত্মশুদ্ধি অর্জন করা যায়।

মহানবি (সঃ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক বস্তুরই পরিশোধক যন্ত্র রয়েছে। আর অন্তর পরিষ্কারের যন্ত্র হলো আল্লাহর যিকির’। (বায়হাকি)

বেশি বেশি আল্লাহ তায়ালার স্মরণ ও যিকির এর মাধ্যমে অন্তরের কালো দাগ ও মরিচা দূর করা যায়। যিকিরের মাধ্যমে আত্মা প্রশান্ত ও পরিশুদ্ধ হয়। এ ছাড়াও তওবা, ইস্তিগফার, তাওয়াক্কুল, যুহদ, ইখলাস, সবর, শোকর, কুরাআন তিলাওয়াত, সালাত ইত্যাদির মাধ্যমেও আত্মাশুদ্ধি অর্জন করা যায়।

আমরা আত্নাকে পরিশুদ্ধ করব, আত্মশুদ্ধি অর্জন করব এবং মহান আল্লাহর প্রিয়পাত্র হব।

Comments

comments