অটিজম কি? অটিস্টিক শিশুদের প্রতিক্রিয়া ও আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি!

0
1155
অটিস্টিক শিশু
Print Friendly, PDF & Email

অটিজম সম্পর্কে সারা বিশ্বে ব্যাপক গণসচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছর ২ এপ্রিল ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে।

অটিজম হল শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা। শিশুর অন্যান্য বিকাশজনিত সমস্যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অটিজম। যার লক্ষণ সাধারণত শিশুর জন্মের দেড় বছর থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ পায় যদিও ওই সময়টায় এসব শিশুদের দেখতে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়।

অটিস্টিক শিশুদের ইন্দ্রিয়ানুভূতি, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং অন্যান্য শিক্ষন প্রক্রিয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা যেতে পারে। তাই অটিজমে আক্রান্ত শিশু তার পরিবেশের সাথে যথাযথভাবে যোগাযোগ করতে পারে না বা নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। অটিস্টিক শিশুদের বৈশিষ্ট্য, সবলতা ও প্রতিকুলতার মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়।

অটিস্টিক শিশুর সামাজিক বন্ধনের ক্ষেত্রে কি কি প্রতিক্রিয়া  হতে পারে, তা যথাসাধ্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা কর হল-
১. সামাজিক সম্পর্ক

সাধারণ শিশু, নিকটজন বা পরবর্তীতে অন্যদের সাথে যেভাবে সামাজিক সম্পর্ক তৈরী করে, অটিস্টিক শিশু তা করতে পারে না। অটিস্টিক শিশুরা সামাজিক সম্পর্ক সহজেই গড়ে তুলতে পারেনা।

২. দৃষ্টি দিয়ে অনুসরণ

স্বাভাবিক শিশু বৃদ্ধির সাথে সাথে বাবা-মার চোখে চোখ রেখে হাসে, চোখ ঘুরিয়ে দৃষ্টি দিয়ে মাকে অনুসরণ করে, কোলে ওঠার জন্য হাত বাড়ায়। অটিস্টিক শিশুরা দৃষ্টি দিয়ে সচরাচর অনুসরণ করতে পারে না।

৩. আচরণের প্রত্যুত্তর

অটিস্টিক শিশুরা সচরাচর বাবা-মা বা পরিচর্যাকারীর চোখে চোখ রেখে তাকায় না, মুখভঙ্গি বা শারীরিক অভিব্যক্তির মাধ্যমেও সে তার প্রতি অন্যদের সামাজিক আচরণের প্রত্যুত্তর সঠিকভাবে দিতে পারে না।

৪. সাড়া না দেয়া

নিজের নাম বোঝার বয়সে এসব শিশুকে নাম ধরে ডাকা হলেও সে সচরাচর সাড়া দেয় না, এমনকি ফিরেও তাকায় না।

৫. বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ সহজে বোঝে না

সমবয়সী শিশুদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারে না, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ ব্যাপারটা সে সহজে বোঝে না। অন্য শিশুদের মাঝে রাখা হলেও সে একপাশে সরে যায় অথবা উদ্দেশ্যবিহীনভাবে কাউকে শারীরিক আঘাত করে বসে। অন্যদের ব্যাপারে সে কোন আগ্রহ বোধ করে না। সে আপনমনে থাকতে পছন্দ করে। দেখে মনে হয়, সে যেন একাকী, আলাদা, নিজস্ব জগতে বাস করে, যে জগতের সাথে অন্য কারো কোন সম্পর্ক নেই।

৬. আনন্দদায়ী বস্তু বা বিষয়

কোন ধরণের আনন্দদায়ী বস্তু বা বিষয় সে অন্যদের সাথে ভাগ করতে জানে না। সাধারণ শিশুরা নতুন বা আকর্ষক কোন খেলনা হাতে পেলে বা তার জন্য উদ্দীপক কোন বস্তু বা বিষয় দেখতে পেলে তার দৃষ্টি সেই খেলনা, বস্তু বা বিষয়ের দিকে আকর্ষিত হয়। কিন্তু অটিস্টিক শিশুদের বেলায় এসব বিষয়ে নিজস্ব আগ্রহ কখনো তৈরী হলেও এ নিয়ে কোন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায় না।

৭. আদর বোঝেনা

কোলে নেয়া বা আদর করা তারা পছন্দ করে না। কেউ আদর করতে গেলে হয় নিষ্পৃহ থাকে অথবা চিৎকার-কান্নাসহ অস্বাভাবিক আচরণ করে। বেশীরভাগ শিশু পারিবারিক পরিমন্ডলে ‘অমিশুক’ বলে চিহ্নিত হয় রোগ ধরা পড়ার আগেই।

অটিস্টিক শিশু মেধা বিকাশ এর ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া কি কি হতে পারে?
১. ভাষা বিকাশ

ভাষা অথবা অভিব্যক্তির মাধ্যমে অন্যের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অটিস্টিক শিশুদের দক্ষতার কমতি দেখা যায়। বিকাশের সাথে সাথে শিশুর ভাষা শিক্ষা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু অটিজম-আক্রান্ত অনেক শিশু ভাষা শিখতে ব্যর্থ হয়।

২. কথা শেখা 

দেখা যায়, ২ বা ৩ বছর বয়সী শিশুরা যে সব শব্দ উচ্চারণ করতে পারে, সমবয়সী অটিস্টিক শিশুরা তা পারে না। বাকযন্ত্রের গঠন, জিভ-তালু, ধ্বনির উচ্চারণে কোন সমস্যা না থাকলেও এবং শিশুর সাথে নিয়মিত কথা বলা হলেও অটিস্টিক শিশু অনেক সময় কথা শিখতে পারে না।

৩. বাক্য শেষ করতে পারে না 

কোনো কোনো ক্ষেত্রে শব্দ ভান্ডার হয়তো ঠিকই থাকে, কিন্তু বাক্য শুরু করতে অস্বাভাবিক দেরী হয়। অথবা বাক্য শুরু করলেও কথা চালিয়ে যেতে পারে না বা যথাযথভাবে তা শেষ করতে পারে না। অনেকের সর্বনাম ব্যবহারে অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। ‘আমি’-এর জায়গায় ‘তুমি’ বলে। যেমন, নিজের কোন প্রয়োজনে ‘আমি চাই’ না বলে ‘তুমি চাও’ – এভাবে বলে।

৪. কল্পনাশ্রয়ী ও গঠনমূলক খেলা

অনেকে অপ্রাসংগিকভাবে অর্থবোধক বা নিরর্থক শব্দ বা বাক্যাংশ বার বার উচ্চারণ করে। তিন বছর বা তার কম বয়সী স্বাভাবিক শিশুরা তাদের বয়সোপযোগী নানা ধরণের কল্পনাশ্রয়ী ও গঠনমূলক খেলা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তৈরী করে। যেমন, পুতুল হাতে পেলে পুতুলকে খাওয়ানো, কাপড় পরানো বা খেলনা গাড়ি চালানোর ভান করা ইত্যাদি। অটিস্টিক শিশুরা খেলনা হাতে পেলেও এরকম উদ্ভাবনী কোন দক্ষতা দেখাতে পারে না।

অটিস্টিক শিশুর আচরণ ও আগ্রহ মূলক প্রতিক্রিয়া কি কি হতে পারে?
১. বার বার আচরণ

অটিস্টিক শিশু অহেতুক বা উদ্দেশ্যবিহীনভাবে একই আচরণ বার বার করতে থাকে। যেমন, মাথা সামনে-পেছনে দোলাতে বা হাততালি দিতে থাকে। এদের আচরণ ও কাজকর্ম সীমিত বা গন্ডিবদ্ধ। অনেকে সব কিছু রুটিনমাফিক বা একইরকমভাবে করতে পছন্দ করে।

২. খুব শৃংখলাপূর্ণ

যেমন, সকালে নিয়মিত গোসলের অভ্যাস করানো হলে কোনদিন যদি তা না করানো হয় বা দেরী হয় তাহলে সে অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়। আবার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বা অবস্থার পরিবর্তনও সে সহ্য করতে পারে না। ঘরের আসবাব যেরকম ভাবে ছিল, তার পরিবর্তনেও শিশু বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়, চিৎকার করে বা কাঁদে। এর মানে অবশ্য এই নয়, যে তারা খুব শৃংখলাপূর্ণ জীবনযাপন করে। এই রুটিন অনাবশ্যক এবং অপ্রয়োজনীয় হলেও তারা এর বাইরে যেতে অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

৩. পুনরাবৃত্তিমূলক খেলা পছন্দ করে

বিশেষ কোন খেলনা বা বস্তু বা কাজের প্রতি এদের অতিরিক্ত মোহ দেখা যায়। যেমন, কোন নির্দিষ্ট খেলনা গাড়ি পছন্দ হলে সেটা নিয়েই সব সময় খেলা করে। নতুন এবং আগের চেয়ে ভালো কোন খেলনা গাড়ি দিলেও সে পুরনোটিই আঁকড়ে থাকে। অনেকে আবার খেলনার চেয়ে খেলনার নির্দিষ্ট কোন বিষয় নিয়েই মেতে থাকে। যেমন, খেলনা পুতুল নিয়ে পুতুলের মতো না খেলে এর একটি হাত নিয়েই কেবল নাড়াচাড়া করতে থাকে। অনেকে দোলনা বা রকিং চেয়ার বা একই স্থানে দাঁড়িয়ে ঘুরতে থাকে বা এ জাতীয় পুনরাবৃত্তিমূলক খেলা পছন্দ করে।

৪. বিরূপ প্রতিক্রিয়া

এছাড়াও অটিস্টিক শিশুদের মাঝে আরো নানা ধরণের উপসর্গ-লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অনেক অটিস্টিক শিশু আওয়াজ পছন্দ করে না। উচ্চস্বরে কথা বা গান শুনলে তারা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়। অনেকে আবার নির্দিষ্ট কোন ধরণের শব্দ, যেমন- ঘড়ির টিক টিক শব্দ বা ফ্যান ঘোরার আওয়াজ প্রভৃতিতে অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক দীর্ঘস্থায়ী আগ্রহ দেখায়।

৫. ব্যথার প্রতিক্রিয়া

অনেকের ব্যথার অনুভূতি কমে যায়, আবার কেউ কেউ একটুতেই অস্বাভাবিক বেশী ব্যথার প্রতিক্রিয়া দেখায়।

৬. বুদ্ধি

কোনো কোনো অটিস্টিক শিশু আপাতদৃষ্টিতে কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে রেগে যায় বা ভয় পায়। অটিজম-আক্রান্ত সকল শিশুই বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী নয়, তবে ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে অটিস্টিক শিশুর বুদ্ধি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কিছুটা কম হয়।

৭. খিঁচুনী থাকতে পারে

আবার, কিছু অটিস্টিক শিশুর বিশেষ কোন বিষয়ে, যেমন- সংগীত, ছবি আঁকা, আবৃত্তি প্রভৃতিতে এমন পারদর্শিতা দেখা যায়, যা তার বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক। অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে ২৫ শতাংশের খিঁচুনী থাকতে পারে।

তবে, শিশু অটিজম-আক্রান্ত কি না- এ ব্যাপারে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেবেন অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। বই বা পত্রিকা পড়ে কিংবা ইন্টারনেট প্রকাশিত উপসর্গ মিলিয়ে ঘরে বসে শিশুকে অটিস্টিক ভেবে নেয়া উচিত নয়। তাই, লক্ষণ দেখা দিলে বা সন্দেহ হলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

অটিস্টিক শিশুরা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের মধ্যে প্রাপ্ত বয়স্ক অনেকেই তাদেরকে পাগল ভেবে দূরে সরিয়ে দিতে চাই, কিন্ত এটা সম্পূর্ণ অমানবিক ও গর্হিত কাজ। শিশুদের আমরা সবাই ভালোবাসি, এমনটাকি হতে পারত না, ওই অটিস্টিক বাচ্চাটা আপনার বা আমার সন্তান, ভাই-বোন, আত্মীয় স্বজন বা খুব কাছের কেও? তখনকি আমরা তাদের সাথে এমনটি করতাম? অটিস্টিক শিশুদের সমাজের অন্যান্য স্বাভাবিক বাচ্চাদের সাথে মিশতে দিলেই তারা ধীরে ধীরে অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আর আমাদের সবার প্রত্যাশা, আমাদের সমাজের অটিস্টিক বাচ্চারা যেন কখনোই বঞ্চনা, দুর্ব্যবহার ও তাচ্ছিল্যের শিকার না হয়। আমরা সবাই মিলে যেন তাদের খুব খেয়াল রাখতে পারি 🙂

আরও জানুন » আলোর অপেক্ষা »

Comments

comments